📘 সৎ মানুষের হৃদয়ে শয়তান প্রবেশর ধরণ ও প্রকৃতি > 📄 বেদ'আতকে মানুষের জন্য সুসজ্জিত করা

📄 বেদ'আতকে মানুষের জন্য সুসজ্জিত করা


দুই :
বিদ'আতকে মানুষের জন্য সুসজ্জিত করা। বিদ 'আতকে সুসজ্জিত করে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে শয়তান মানুষের কাছে এসে বলে, আজকাল লোকেরা দ্বীন-ধর্ম পরিত্যাগ করেছে। তাদেরকে দ্বীনের পথে প্রত্যাবর্তন করানো দুস্কর। তাই কোনো কোনো 'ইবাদত যদি আমরা বাড়িয়ে করতাম, তাহলে হয়ত লোকেরা পূণরায় 'ইবাদতে লিপ্ত হত।
কখনো আবার সে হাদীসে বর্ণিত 'ইবাদাতের উপর বর্ধিত কোনো পদ্ধতি নিয়ে এসে বলে, 'ভালোর বৃদ্ধিও ভাল', তাই বাড়িয়ে কর। এ বৃদ্ধি তখন এ 'ইবাদতের আদলেই বা নয়া সংযোজন রূপে অস্তিত্ব লাভ করে।
আবার কেউ কেউ বলে, লোকেরা দ্বীন থেকে দূরে সরে গেছে তাই ভীতি সঞ্চারক¹ কিছু হাদীস সংগ্রহ করা প্রয়োজন। এই বলে মনগড়া হাদীস তৈরী করে রাসূলের নামে বর্ণনা করে। আর বলে, আমরা মিথ্যা বলি, তবে রাসূলের বিরুদ্ধে নয়; পক্ষে।
অদ্ভুত যুক্তি! রাসূলের পক্ষে (?) মিথ্যা বলে! তাই মনগড়া হাদীস তৈরী করে তা দ্বারা লোকদেরকে জাহান্নামের ভয় দেখায়।
অভিনব পন্থায় জাহান্নামের চিত্রায়ন করে;
আমরা জানি যে, ইবাদাতসমূহ শরী 'আত নির্ধারিত। অর্থাৎ আল্লাহর থেকে রাসূলের কাছে যেভাবে এসেছে, রাসূলের থেকে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, আমরা হুবহু সেভাবেই গ্রহণ করব। কোনো বৃদ্ধি-সংযোজন ইচ্ছামাফিক পরিবর্তনের অবকাশ নেই। যদি করি, তবে সেটাই বিদ 'আত যা শয়তানের কাজ। অনেক লোক এমন আছেন স্বীকার করেন কাজটি বিদ'আত। তারপরও করেন এ যুক্তি দিয়ে যে এর দ্বারা আল্লাহ মানুষকে হেদায়েত করতে পারেন। এর দ্বারা মানুষকে ডেকে কিছু ভাল কথা শুনানো যায়। এতে মন্দের কি আছে?

টিকাঃ
1 অথবা আগ্রহ ও উৎসাহব্যঞ্জক, অথবা ফযিলত বিষয়ক কিছু হাদিস বানিয়ে বলা বা বর্ণনা করা। [২য় সম্পাদক]

📘 সৎ মানুষের হৃদয়ে শয়তান প্রবেশর ধরণ ও প্রকৃতি > 📄 এক দিককে অন্যদিকের তুলনায় অধিক প্রাধান্য দেয়া

📄 এক দিককে অন্যদিকের তুলনায় অধিক প্রাধান্য দেয়া


তিন :
এক দিককে অন্যদিকের তুলনায় অধিক প্রাধান্য দেয়া, এটা দু'ভাবে হতে পারে; সামাজিক পর্যায়ে, ব্যক্তিগত পর্যায়ে।
(ক) সামাজিক পর্যায়
কোনো ব্যক্তি অসংখ্য পাপাচার ও নাফরমানী করে পাশাপাশি নামাযও পড়ে। গুনাহসমূহের ব্যাপারে মনকে এই বলে প্রবোধ দেয় যে, নামায দ্বীনের স্তম্ভ; কেয়ামতের দিন মানুষের আমলের মধ্যে সর্বপ্রথম দৃষ্টি দেয়া হবে নামাযের প্রতি। আর তুমি তো নামায পড়ছই, তাই সামান্য কিছু পাপাচার নাফরমানিতে কোনো অসুবিধা নেই ।
তখন সে অন্যান্য ইবাদতের ত্রুটিগুলোর বৈধতা দানের জন্য নামাযকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেয় এবং অন্য বিষয়সমূহের হিসাবের তুলনায় নামাযকেই বড় করে দেখে।
নামাযই দ্বীনের স্তম্ভ, কথা সত্য, তবে পূর্ণাঙ্গ দ্বীন নয়। তাই শয়তান তার ত্রুটিসমূহের বৈধতা দানের জন্য এ পথ অবলম্বন করে, যাতে সে বিভ্রান্ত হয়।
অন্য এক ব্যক্তি এসে বলে, ইসলাম হল 'মু 'আমালা' বা ভাল আচরণের নাম। ইসলামে র গুরুত্বপূর্ণ বিষয়তো এটা ই যে, তুমি লোকদের সাথে সদাচারী হবে। তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা রটনা করবে না, তাদেরকে ধোকা দেবে না। নামায না পড়, না পড় কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন "দ্বীন হল ভাল আচার-আচরণ” অর্থাৎ নামাযের তুলনায় মু 'আমালাত বা ভাল আচার-ব্যবহার অত্যাধিক গুরুত্বপূর্ণ, তাই নামাযের উদাসীন হলেও মু'আমালার ব্যাপারে সচেতন থেকো।
এমনিভাবে পাবেন অনেক এমন ব্যক্তিকে, যে মনে করে নামায-রোযা করলে নিজের উপকার। আর মানব সেবা করলে মানুষের কল্যাণ সাধিত হয়। আল্লাহও খুশী হন। আল্লাহ নিজেও মানুষের কল্যাণের জন্য সব কিছু করেছেন। তাই সবেচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল মানব কল্যাণ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো বলেছেনঃ “দ্বীন হলো কল্যাণ কামনা।” এটা মনে করে সে নামায-রোযার গুরুত্ব দেয় না। মানব কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করতে ব্যস্ত। এটাও শয়তানের একটি প্রবেশ পথ।
অপর এক ব্যক্তি নেক আমলসমূহ বর্জন করে শুধু সুন্দর নিয়্যতের উপর নির্ভর করে এবং বলে, 'দ্বীনের জরুরী বিষয়তো পরিশুদ্ধ নিয়্যত'। তাই তো আমি হিংসা বিদ্বেষমুক্ত পরিচ্ছন্ন অন্তরে রাত যাপন করি।
অনেকে কুরআন শিক্ষাদান, কিরাত ও তাজভীদে গুরুত্ব দেন। তাই অন্য বিষয়ের তুলনায় এ বিষয়টিকে তারা শ্রেষ্ঠত্ব দেন। আর একটি বিষয় তাদের কাছে গুরুত্ব পাওয়ায় অন্য অনেক বিষয় তারা পরিত্যাগ করেন। সন্দেহ নেই যে, এটাই ইসলামের একমাত্র বিষয় নয়। আবার এ বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেয়াও ভুল নয়; বরং ভুল তো হল, অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের তুলনায় একটি বিষয় নিয়ে আদিখ্যেতা।
(খ) সামাজিক পর্যায়
সামাজিকভাবেও বিশেষ একটি দিককে প্রাধান্য দেয়া হয়ে থাকে। তাই সমাজে এ কথা বলার একটা 'হুজুগ' প্রত্যক্ষ করবেন যে, সবচে' বেশী গুরুত্বের বিষয় তো মুসলিম ও মুসলিমদের দুশমনদের অবস্থা অবহিত হওয়া। আর রাজনৈতিক বিষয়াবলীতো আরো গুরুত্বের। কারণ, বর্তমানে আমরা যে যুগে বাস করছি তা শুধু সুফি দরবেশদের যুগ নয়।
এ ধরনের হুজুগ প্রবণদের দেখবেন, তারা সমাজতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা, মাসুনিয়াহ, বাহাই ও কাদিয়ানী সব মতবাদ আত্মস্থ করেছে। কিন্তু ইসলাম সম্পর্কে প্রশ্ন করুন, দেখবেন, ঠুটো জগন্নাথ' কিছু জানে না। এরা সমকালীন বিষয়কে অধিক প্রাধান্য দেয়। অন্যদিকে একপক্ষ 'ইবাদতকেই অধিক প্রাধান্য দিয়ে বলেন, 'আল্লাহর সাথে সম্পর্কই চূড়ান্ত বিষয়; নামায, দুনিয়া বিমুখতা ও তাকওয়াই মূখ্য এবং আত্মিক বিষয় ছাড়া অন্যসব বিষয় মূল্যহীন।
অপর একদল পাবেন, যারা বলে, মুসলিম উম্মাহর ঐক্যই আসল বিষয়। কারণ, আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ﴾ [ال عمران: ١٠٣] ج
“এবং তোমরা সবে আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধর, আর পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” [সূরা আলে ইমরান: ১০৩]
এ মতকেই তারা প্রতিপাদ্য বিষয় সাব্যস্ত করে, এমন কি আক্বীদার ওপরও! তাই তারা বিপরীত আক্বীদা পোষণকারীদের সাথেও আলাপ-আলোচনায় প্রবৃত্ত হয়, এ দাবী তুলে যে, যখন শত্রুরা আমাদের বিরুদ্ধে কুকুরের মত ঝাঁপিয়ে পড়েছে এমন মুহুর্তে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হব, এটাই সময়ের প্রধান দাবী। অথচ সঠিক ছিল তো বুনিয়াদের ওপর, দ্বীনের ওপর ঐক্যবদ্ধ হওয়া। নৈরাজ্য ও আক্বীদা বিশ্বাসে ভিন্নতার ওপরে নয়।
অতএব আলোচ্যবিষয়গুলো ও অন্যান্য বিষয়ের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরী। মোটকথা, বিশেষ কোনো দিককে ভিন্ন দিকের তুলনায় প্রাধান্য প্রদান, এটাই শয়তানের বহুল ব্যবহৃত পথ।

📘 সৎ মানুষের হৃদয়ে শয়তান প্রবেশর ধরণ ও প্রকৃতি > 📄 করব-করছি

📄 করব-করছি


চার :
করব-করছি, এরকম কাল বিলম্ব করা
করব-করছি, কাল বিলম্ব করা, প্রলম্বিত আশা, বা অনেকে যে বলে, 'কঠিন সমস্যায় আছি' ইত্যাদি সবই শয়তানের প্রবেশ পথ। অনেকেই সাধারণ কোনো একটা বিষয়কে 'প্রতিবন্ধক' সাব্যস্ত করে। যেমন বলে, 'পড়া-লেখা শেষ করে ইনশাআল্লাহ' তাওবা করব। এটা পড়া লেখার প্রতিবন্ধকতা। পড়া-লেখার পাঠ চুকিয়ে বলে, ঐ চাকরিটা পেলে 'তাওবা' করব, যখন 'বিবাহ' করব, যখন... যখন... আর যখন! এ যখন শেষ হয় না কখনো।
মানুষ সর্বদা সামনে একটা কল্পিত বাঁধা দাঁড় করিয়ে রাখে। করব-করছি, ধীর-সুস্থে করে-করে প্রলম্বিত আশা নিয়ে জীবন যাপন করে। এভাবেই বেঁচে থাকে। অতঃপর মৃত্যুবরণ করে। কিছুই করতে পারে না। প্রকৃত জীবন শুরুই করে না।

📘 সৎ মানুষের হৃদয়ে শয়তান প্রবেশর ধরণ ও প্রকৃতি > 📄 এরকম কাল বিলম্ব করা

📄 এরকম কাল বিলম্ব করা


আপনার কাছে শয়তানের চূড়ান্ত প্রত্যাশা, আপনাকে আমল থেকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা কিংবা আমল বিলম্বিত করা। আর এটা আল্লাহ ওয়ালাদের জন্য শয়তানের অবলম্বিত ভয়ংকর পথ।
শয়তান এসে আপনাকে কু-মন্ত্রণা দেবে যে, তুমি এখনও অন্যকে শিক্ষা দেয়া বা দাওয়াত দেয়ার মত উপযুক্ত নও, তাই নিজে শেখা পর্যন্ত অপেক্ষা করো। অথচ একটি আয়াত জানলেও তা অন্যের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য আমরা আদিষ্ট। তাই যখনই কিছু শিখবেন অন্যকে তা শেখান! হোক তা একটি আয়াত!!
ইবনুল জাওযী রহ. 'তালবীসে ইবলীস' নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেন, 'শয়তান প্রচেষ্টায় দৃঢ় সংকল্প কত ব্যক্তিকে করব-করছির টালবাহানায় ফেলেছে! অর্থাৎ এই তো করব বলিয়েছে । উৎকর্ষের পথে ধাবমান কত ব্যক্তির সময় ক্ষেপন করিয়েছে ! অনেক সময় বিদ্যান ব্যক্তি পাঠ পূর্ণ অধ্যয়নের ইচ্ছা করেন, তখন শয়তান বলে, 'খানিক বিশ্রাম নিন' এভাবেই সে অলসতাকে বানাচ্ছে প্রিয়, আর কাল ক্ষেপন করাচ্ছে বিরামহীনভাবে।
অনেক সময় রাতে নামাযে অভ্যস্ত 'আবেদের কাছে এসে শয়তান বলে, রাত এখনও অনেক বাকী! এভাবেই সকাল হয়ে যায়, কিন্তু 'আবেদের আর নামায আদায় করা হয় না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00