📄 শিক্ষক-শিক্ষিকাদের উদ্দেশ্যে আমাদের একটি বার্তা
প্রিয় শিক্ষক-শিক্ষিকা মহোদয়, সন্তানদের নিয়ে উপায়ান্তর না দেখে শেষমেশ আমরা আপনাদের নিকট ছুটে এসেছি। তাদের এই স্বচ্ছ হৃদয় ও সুস্থ ফিতরাত নিয়ে বহু আশায় বুক বেঁধে আমরা এসেছি, সমাজের বিকৃতি ও পচন থেকে তাদের মন মেজাজ যেন রক্ষা পায়। আশপাশের বহু স্কুল ও কিন্ডারগার্টেন বাদ দিয়ে ব্যয়বহুল হওয়া সত্ত্বেও আপনাদের নিকট সন্তানদের পাঠানোর পেছনে মূল উদ্দেশ্য হলো, যেন তারা সেখানে এমন সব আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হয় যা তাদের জীবনে স্থায়ী প্রভাব ফেলবে, তারা আলোকিত মানুষ হয়ে গড়ে উঠবে।
আমার শিক্ষিকা বোনটি, যখন আপনি পর্দার ক্ষেত্রে শিথিলতা প্রদর্শন করলেন, জমকালো বোরকা পরিধান করলেন কিংবা নিকাব পড়াই বাদ দিলেন আপনার এই কর্মকাণ্ড ছাত্রীদের হৃদয়ে কী প্রভাব রাখবে ভাবতে পারছেন?! তারা দেখবে আপনি আল্লাহর বিধানকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছেন। আপনিই যখন ইসলামি বেশভূষায় অভ্যস্ত নন তখন কন্যাদের হৃদয়কে ইসলামের ভালোবাসায় সিক্ত করবেন কীভাবে? অন্ধ কি আর পথ দেখাতে সক্ষম!?
ওহে সন্তান গড়ার কারিগর, যখন আমার কন্যা আপনাকে সঠিক পর্দা থেকে বিচ্যুত দেখতে পাবে তখন সে নিম্নোক্ত দুই পথের কোনো একটি বেছে নিতে বাধ্য হবে。
হয়তো কন্যা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সেও হিজাবকে ছুঁড়ে ফেলবে। তখন সে-সহ অন্যান্য যারা আপনার দ্বারা প্রভাবিত, প্রত্যেকের পাপের বোঝা আপনার ওপর এসেই বর্তাবে。
কিংবা হতে পারে, আপনি তাদের কাছ থেকে গ্রহণযোগ্যতা হারাবেন। আপনার কথাগুলো প্রভাবশূন্য হয়ে পড়বে। তারা আপনার কাছ থেকে বৈপরীত্য শিখবে。
একদিকে আপনি আল্লাহ ও রাসূল -এর ভালোবাসাপূর্ণ কবিতাগুলো তাদের পড়াচ্ছেন, কুরআন কারীমের সে আয়াতগুলো তাদের শিক্ষা দিচ্ছেন যেখানে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা আছে আর অপরদিকে সন্তানরা দেখতে পাবে সেই আপনিই আল্লাহর স্পষ্ট অবাধ্যতায় লিপ্ত আছেন। তা হলে বলুন তারা কী শিখবে? বর্তমান সমাজে এই বৈপরীত্যগুলোর কারণেই কি সরলমনা শিশুরা বিপথগামী হচ্ছে না, তারা তাদের সুস্থ-সুন্দর ফিতরাত হারাচ্ছে না?
যখন আপনি সঠিক পর্দা ছেড়ে দেবেন তখন সমস্যা শুধুমাত্র এই একটি পাপে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এর দ্বারা সবচেয়ে বড়ো যে বিপদটি হবে তা হলো, আপনার চারপাশের শিশুদের ওপর মানসিক ও দীক্ষাগত একটি বিরূপ প্রভাব পড়বে। মনে রাখবেন, যখন থেকেই আপনি শিক্ষকতার এই ময়দানে পা রেখেছেন তখন থেকেই আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ ও আচরণ গভীর পর্যবেক্ষণের অধীনে। আপনার আশপাশের অসংখ্য ছোটো ছোটো চোখ আপনাকে সার্বক্ষণিক নজরদারির মাঝে রেখেছে। এর মধ্যে যেকোনো ধরনের অসঙ্গতি ও বৈপরীত্য তারা তৎক্ষণাৎ ধরে ফেলে এবং তাতেই অভ্যস্ত হয়ে ওঠে。
সম্মানিত শিক্ষক-শিক্ষিকাবৃন্দ, উম্মাহ আজ যে লাঞ্ছনা ও উদাসীনতার সময় পার করছে তার মোকাবিলায় এই প্রজন্মকে নিয়ে আমাদের অনেক স্বপ্ন রয়েছে। আর এই প্রজন্মকেই আমরা তুলে দিচ্ছি আপনাদের হাতে। আশা থাকবে যে মহান গুরুদায়িত্ব ও আমানত আপনাদের ওপর বর্তানো হয়েছে আপনারা এর সঠিক তদারকি করবেন। আল্লাহ পরিপূর্ণরূপে দায়িত্ব পালনে আপনাদের সহযোগিতা করুন。
📄 হতাশার কোনো সুযোগ নেই
আমাকে এক ভাই সেদিন একটি চিঠি পাঠালেন। দ্বীনি সচেতনতা তৈরিতে ভাইটির প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়। চিঠিতে তিনি মুসলিম সন্তানদের দ্বীনের ব্যাপারে অজ্ঞতা, শারীআর প্রতি অস্বীকৃতি ও চারিত্রিক অধঃপতনের কিছু বাস্তব চিত্র তুলে ধরলেন। শেষে বললেন, 'সত্যি বলতে আমি এখন একপ্রকার হতাশ হয়ে পড়েছি।'
আমি আমার এই ভাই ও অন্যান্য সকলকে উদ্দেশ্য করে বলতে চাই, হতাশার কোনো সুযোগ নেই। বরং আমি আমাকে ও আপনাদের সকলকে সফল হিসেবেই দেখতে পাচ্ছি। আমি তো দেখতে পাই, আল্লাহ আমাদের ওপর নিয়ামাতের অশেষ ফল্গুধারা বর্ষণ করছেন, এই কঠিন মুহূর্তেও তিনি আমাদের উম্মাহর কল্যাণে কাজ করার এবং সংস্কার করার সুযোগ দিয়েছেন। বিশুদ্ধ নিয়ত ও সঠিক পথ অনুসরণের মাধ্যমে আমরা যখন যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাব তখন আমরা সফল।
হতাশার কোনো সুযোগ নেই। এমন অনেক আয়াত আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে যেগুলো মূলত আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন হতাশাকে মোকাবিলা করতে এবং সে স্থলে উচ্চাকাঙ্ক্ষার বীজ বপন করতে। সবার অবস্থা দেখে হাহুতাশ করে নিজেকে বিলিয়ে না দেওয়াই হলো সে আয়াতগুলোর মূল উদ্দেশ্য। ভবিষ্যৎ নিয়ে অজানা আশঙ্কা, হতাশা ও দুঃখ আমাদের থাকতে পারবে না। মনে রাখতে হবে, যা কিছু চলছে ও চলবে সবকিছুই মূলত আল্লাহ তাআলার আওতাধীন, তার নির্ধারিত তাকদীরের অংশ। সবকিছুই তার গভীর প্রজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত。
গভীরভাবে এই আয়াতগুলো লক্ষ করুন,
فَلَا تَذْهَبْ نَفْسُكَ عَلَيْهِمْ حَسَرَاتٍ “সুতরাং আপনি তাদের জন্য অনুতাপ করে নিজেকে ধ্বংস করবেন না।”[১১২]
لَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَّفْسَكَ أَلَّا يَكُوْنُوْا مُؤْمِنِينَ “তারা মুমিন হচ্ছে না দেখে আপনি হয়ত মনোকষ্টে আত্মঘাতী হয়ে পড়বেন।”[১১৩]
وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ مَا فَعَلُوْهُ “যদি আপনার পালনকর্তা চাইতেন, তবে তারা এ কাজ করত না।”[১১৪]
أَفَلَمْ يَيْأَسِ الَّذِينَ آمَنُوا أَنْ لَّوْ يَشَاءُ اللَّهُ لَهَدَى النَّاسَ جَمِيعًا “তবে কি যারা ঈমান এনেছে তারা জানে না যে, আল্লাহ ইচ্ছে করলে সকলকেই সৎপথে পরিচালিত করতেন?”[১১৫]
হয়তো আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, 'কাফিরদের সমস্ত কুফরি আল্লাহর আয়ত্তাধীন—এই বিষয়টি এত বেশি করে আলোচনা করার কারণ কী? অথচ এটি একটি সুস্পষ্ট বিষয়। আল্লাহ যা চান তা-ই তো করতে পারেন।'
আমি বলব, 'এই সমস্ত আয়াত আমাকে ও আপনাকেই সম্বোধন করে বলছে যে, ভয় পেয়ো না, হতাশ হয়ো না; বরং একে সুযোগ হিসেবে লুফে নাও। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করো যে, তিনি তোমাকে সে সময় সঠিক পথ দেখিয়েছেন যখন অন্যকে পথভ্রষ্ট করেছেন। দৃঢ়চিত্তে শক্ত মনোবলে আল্লাহর সাহায্য কামনা করো। বাস্তবতাকে একটি উর্বর ভূমি হিসেবে দেখো, যেখানে দাওয়াতের একটি বীজ আল্লাহর ইচ্ছায় একদিন বিশাল শস্যগুদামে পরিণত হবে।
আসলে এই মানসিকতা নিয়েই আমি বাস্তবতার মুখোমুখি হই। স্বীকার করছি, এখন কঠিন সময় চলছে। মেনে নিচ্ছি, এখন মুসলিম ঘরের সন্তানও ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। আর এই দৃশ্য নিশ্চয় কোনো অনুভূতিসম্পন্ন ও জীবিত আত্মাকে স্বস্তি দিতে পারে না। কিন্তু একই সাথে আমি একে সুযোগ হিসেবে দেখি। মনোযন্ত্রণা ও কষ্টকে আশা ও কাজের বাস্তবতায় ফুটিয়ে তুলতে চাই। আর আলহামদুলিল্লাহ আমার নিরবচ্ছিন্ন দাওয়াতি কর্মকাণ্ডে আমি এই মানসিকতার বেশ ভালো ও সুস্পষ্ট প্রভাব দেখতে পাই。
অতএব হতাশ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং এটি এক ঐতিহাসিক সুযোগ। আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য মনোনীত একটি অনুগ্রহ। অতএব এ সুযোগকে কাজে লাগান。
টিকাঃ
[১১২] সূরা ফাতির, ৩৫:৮。
[১১৩] সূরা শুআরা, ২৬:৩。
[১১৪] সূরা আনআম, ৬: ১১২。
[১১৫] সূরা রা'দ, ১৩: ৩১。