📄 সন্তানদের ধৈর্য ও দৃঢ়তা শিক্ষা দিন
[মিশরে ইসলামপন্থীদের পতনের পর স্বৈরাচারী সরকারের পক্ষ থেকে তাদের ওপর নেমে আসে নির্যাতনের খড়গ। রাবেয়ার প্রান্তরে একদিনেই খুন করা হয় দুই হাজারেরও অধিক ধর্মপ্রাণ আন্দোলনকারীদের। এই ঘটনার পর আল-জাযিরা 'ফী সাবই সিনীন' নামে একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করে। যেখানে দেখানো হয়, অনেক ইসলামপন্থী সরকারি প্রহসন ও জেল-জুলুম সহ্য করতে না পেরে ইসলাম ছেড়ে দিচ্ছে, আল্লাহর সাহায্য থেকে হতাশ হয়ে সংশয়গ্রস্ত হয়ে পড়ছে কিংবা অনেকেই বাম ও সেক্যুলার রাজনীতিতে যোগদান করছে। ডকুমেন্টারিটির প্রতিক্রিয়ায় শাইখ কুনাইবি (হাফিজাহুল্লাহ) কিছু কথা বলেন। আমরা সেখান থেকে প্রাসঙ্গিক কিছু অংশ চয়ন করে এখানে যুক্ত করে দিচ্ছি।- অনুবাদক]
নাস্তিকতা, সন্দেহ ও সংশয় রোধে পরিবারই হলো সবচেয়ে বড়ো দুর্গ। সন্তানদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সর্বোত্তম যে পন্থা অবলম্বন করবেন সেটি হলো, কুরআনি দীক্ষা। তখন ষড়যন্ত্রকারীর শত চক্রান্তও তাদেরকে আপনার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে সক্ষম হবে না।
প্রথমত নিজেকে, এরপর সন্তানসহ অন্যান্য সকলকে এই কথার ওপর গড়ে তুলুন যে, আমাদের সৃষ্টিই করা হয়েছে পরীক্ষা করার জন্য。
الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَياةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا
“যিনি মরণ ও জীবনকে সৃষ্টি করেছেন, তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য।”[৯৭]
এটাই হলো বাস্তবতা। পরীক্ষা করার জন্য। তাদের ভালোভাবে আরও শিক্ষা দিন:
وَمَا مُحَمَّدُ إِلا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَإِنْ مَّاتَ أَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ وَمَنْ يَنْقَلِبْ عَلَى عَقِبَيْهِ فَلَنْ يَضُرَّ اللَّهَ شَيْئًا وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّاكِرِينَ “আর মুহাম্মদ একজন রাসূল মাত্র; তাঁর পূর্বেও বহু রাসূল অতিবাহিত হয়েছেন। যদি তিনি মারা যান বা নিহত হন তবে কি তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে? বস্তুত যদি কেউ উলটো ফিরে যায়, তবে আল্লাহর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আর যারা কৃতজ্ঞ, আল্লাহ তাদের পুরস্কৃত করবেন।”[৯৮]
সন্তানদের বলুন, 'প্রিয় বৎস, মহান আল্লাহ আমাদের পরীক্ষা না করেই সফলতা দেবেন এমন বলেননি বরং পরীক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—
وَلَتَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوْعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ "আর অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি এবং ফল-ফসল বিনষ্ট করার মাধ্যমে। আর আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।” [৯৯]
তাদের বলে দিন,
لَتَبْلَوُنَّ فِي أَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ وَلَتَسْمَعُنَّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَمِنَ الَّذِينَ أَشْرَكُوا أَذًى كَثِيرًا وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوْا فَإِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ “অবশ্যই তোমাদেরকে তোমাদের ধনসম্পদে ও জীবনে পরীক্ষা করা হবে। তোমাদের আগে যাদের কিতাব দেওয়া হয়েছিল তাদের এবং মুশরিকদের কাছ থেকে তোমরা অনেক কষ্টদায়ক কথা শুনতে পাবে। যদি তোমরা ধৈর্যধারণ করো এবং খোদাভীতি অবলম্বন করো তবে নিশ্চয়ই তা হবে দৃঢ় সংকল্পের কাজ।”[১০০]
তাই প্রিয় ছেলে, যখন আমাদের রব আমাদের পরীক্ষার সম্মুখীন করবেন, তখন ধৈর্য হারিয়ে তার ওপর প্রশ্ন তুলবে না।
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَعْبُدُ اللهَ عَلَى حَرْفٍ فَإِنْ أَصَابَهُ خَيْرُ اطْمَأَنَّ بِهِ وَإِنْ أَصَابَتْهُ فِتْنَةُ انْقَلَبَ عَلَى وَجْهِهِ خَسِرَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةَ ذَلِكَ هُوَ الْخُسْرَانُ الْمُبِينُ )
“মানুষের মধ্যে কেউ কেউ দ্বিধা-দ্বন্দ্বে নিপতিত হয়ে আল্লাহর ইবাদাত করে। যদি সে কল্যাণপ্রাপ্ত হয়, তখন ইবাদতের ওপর অটল থাকে কিন্তু যদি কোনো পরীক্ষায় পড়ে, তৎক্ষণাৎ পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়। ইহকালে ও পরকালে ক্ষতিগ্রস্ত তো সে-ই। আর এটাই তো সুস্পষ্ট ক্ষতি।”[১০১]
সন্তানকে বলুন। 'ছেলে আমার, খবরদার, তোমার ভালো কাজের প্রতিদান দুনিয়ায় আশা করবে না। দুনিয়া হলো পরীক্ষার স্থান, প্রতিদান প্রাপ্তির নয়。
وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
“কেবল কিয়ামাতের দিনেই তোমাদেরকে তোমাদের প্রতিদান পূর্ণ মাত্রায় বুঝিয়ে দেওয়া হবে।”[১০২]
তাদের এই কথা বলতে যাবেন না যে, 'সালাত পড়লে আল্লাহ তোমাকে পরীক্ষায় ভালো নাম্বার দেবেন। সদাকা ও যাকাত পরিপূর্ণরূপে আদায় করো, এর মাধ্যমে আল্লাহ তোমার সম্পদের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি করবেন।' এসব না বলে বরং তাকে এই কথা বলুন যে, সালাত পড়লে আল্লাহ খুশি হবেন। হতে পারে সালাত পড়ার পরও আল্লাহ তোমাকে পরীক্ষায় ফেলবেন, কিন্তু জেনে রেখো, আল্লাহ তোমার সাথেই থাকবেন।'
يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوْفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ
“ওহে বৎস, সালাত কায়েম রাখো, সৎকাজের আদেশ দাও, মন্দকাজের নিষেধ করো এবং তোমার ওপর নেমে আসা বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করো।”[১০৩]
শত্রুর অত্যাচারের মুখে সে যেন হতাশ হয়ে না পড়ে। আপনার সন্তানকে বুঝিয়ে বলুন,
وَلَوْ يَشَاءُ اللَّهُ لَا انْتَصَرَ مِنْهُمْ وَلَكِنْ لِيَبْلُوَ بَعْضَكُمْ بِبَعْضٍ
“আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তোমাদের কতককে কতকের মাধ্যমে পরীক্ষা করতে চান।”[১০৪]
তাকে এই কথার ওপর গড়ে তুলুন,
وَجَعَلْنَا بَعْضَكُمْ لِبَعْضٍ فِتْنَةً أَتَصْبِرُوْنَ
“আমি তোমাদের কতককে কতকের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ বানিয়েছি। দেখি, তোমরা সবর করো কি না?”[১০৫]
তাকে এও বলুন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوْا عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُمْ مَنْ ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ
“হে মুমিনগণ, তোমাদের দায়িত্ব তোমাদেরই ওপর। যদি তোমরা সৎপথে পরিচালিত হও তবে পথভ্রষ্ট কেউ তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে সক্ষম হবে না।”[১০৬]
সন্তানদের হৃদয়ে ইসলামের জন্য আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি করুন। যখন সে ইসলামের কোনো ক্ষতি হতে দেখবে যেন সাথে সাথে জ্বলে ওঠে, কেউ ইসলামের পতাকা ভূলুণ্ঠিত করতে চাইলে যে যেন নিজ দায়িত্বে বীরদর্পে এগিয়ে আসে। তাদেরকে আল্লাহ তাআলার এই বাণীর ওপর প্রতিষ্ঠিত করুন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُوْنُوا أَنْصَارَ اللَّهِ
“হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারী হয়ে যাও。”[১০৭]
তাদেরকে সেসব ব্যক্তির মতো তৈরি করুন যাদের ব্যাপারে কুরআনে এসেছে,
الَّذِيْنَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوْا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيْمَانًا وَقَالُوْا حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيْلُ “এদেরকে লোকেরা বলেছিল, ‘তোমাদের বিরুদ্ধে লোক জড়ো হয়েছে, কাজেই তোমরা তাদেরকে ভয় করো’। কিন্তু এ কথা তাদের ঈমানকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং তারা বলেছিল, 'আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কতই-না উত্তম অভিভাবক!’[১০৮]
তাদেরকে ব্যক্তিত্ব ও দৃঢ়তা শিক্ষা দিন। জালিমের অত্যাচার যাদের ঈমানকে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করবে। তাদের সামনে সেসব মুমিনের দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করুন যাদেরকে তাদের ঈমানের কারণে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, অথচ আল্লাহ তাদের ব্যাপারে বলেছেন,
إِنَّ الَّذِيْنَ آمَنُوْا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَهُمْ جَنَّاتٌ تَجْرِيْ مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ ذَلِكَ الْفَوْزُ الْكَبِيْرُ “যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত, যার তলদেশে প্রবাহিত হয় ঝরনাসমূহ। আর এটাই তো মহাসাফল্য।”[১০৯]
মানুষগুলোকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল তবু আল্লাহ তাদের সফল বলে আখ্যা দিয়েছেন। কারণ তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিল, শেষ সময় পর্যন্ত দৃঢ় থেকেছিল。
সন্তানদের এই শিক্ষা দিন, যেন তারা এতসব যন্ত্রণা সহ্য করেও সুখী থাকে। কারণ তাদের জন্য তো এটাই যথেষ্ট যে, আল্লাহ তাদের সাথে রয়েছেন। সন্তানকে বলুন, 'প্রিয় বৎস, আল্লাহ দুনিয়া প্রত্যেককেই দেন। পছন্দের-অপছন্দের সকলকেই। কিন্তু ঈমান শুধু তাদেরকেই দেন যাদের তিনি ভালোবাসেন। যদি তুমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-কে ভালোবাসো তা হলে ভেবে নেবে আল্লাহ তাআলা তোমাকে পছন্দ করেন। এরপর থেকে তোমার যা কিছুই হবে সবই তোমার কল্যাণে。
قُلْ هَلْ تَرَبَّصُوْنَ بِنَا إِلَّا إِحْدَى الْحُسْنَيَيْنِ
“বলুন, তোমরা তো আমাদের জন্য দুটি মঙ্গলের কোনো একটির অপেক্ষাই করছো।” [১১০]
অর্থাৎ আমাদের সাথে যা-ই ঘটুক না কেন উভয়টি কল্যাণ ও মঙ্গলের। হয়তো আমরা বিজয়ী হব না হয় প্রভুর সন্তুষ্টির পথে শাহাদাত বরণ করব। এই দুই কল্যাণকর পরিণতি ছাড়া আমাদের আর কী-ইবা ঘটবে?!
আখিরাতের সাথে সন্তানদের সম্পর্ককে মজবুত করুন। এই আয়াতটি তাদের দেখিয়ে দিন,
إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ
“নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের থেকে তাদের জান ও মাল ক্রয় করে নিয়েছেন। এই মূল্যে যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত." [১১১]
টিকাঃ
[৯৭] সূরা মুলক, ৬৭ : ২。
[৯৮] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৪৪。
[৯৯] সূরা বাকারা, ২: ১৫৫。
[১০০] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৮৬。
[১০১] সূরা হাজ্জ, ২২: ১১。
[১০২] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৮৫。
[১০৩] সূরা লোকমান, ৩১: ১৭。
[১০৪] সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭:৪。
[১০৫] সূরা ফুরকান, ২৫:২০。
[১০৬] সূরা মায়িদা, ৫:১০৫。
[১০৭] সূরা সাফ, ৬১:১৪。
[১০৮] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৭৩。
[১০৯] সূরা বুরূজ, ৮৫: ১১。
[১১০] সূরা তাওবাহ, ৯ : ৫২。
[১১১] সূরা তাওবাহ, ৯: ১১১。
📄 শিক্ষক-শিক্ষিকাদের উদ্দেশ্যে আমাদের একটি বার্তা
প্রিয় শিক্ষক-শিক্ষিকা মহোদয়, সন্তানদের নিয়ে উপায়ান্তর না দেখে শেষমেশ আমরা আপনাদের নিকট ছুটে এসেছি। তাদের এই স্বচ্ছ হৃদয় ও সুস্থ ফিতরাত নিয়ে বহু আশায় বুক বেঁধে আমরা এসেছি, সমাজের বিকৃতি ও পচন থেকে তাদের মন মেজাজ যেন রক্ষা পায়। আশপাশের বহু স্কুল ও কিন্ডারগার্টেন বাদ দিয়ে ব্যয়বহুল হওয়া সত্ত্বেও আপনাদের নিকট সন্তানদের পাঠানোর পেছনে মূল উদ্দেশ্য হলো, যেন তারা সেখানে এমন সব আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হয় যা তাদের জীবনে স্থায়ী প্রভাব ফেলবে, তারা আলোকিত মানুষ হয়ে গড়ে উঠবে।
আমার শিক্ষিকা বোনটি, যখন আপনি পর্দার ক্ষেত্রে শিথিলতা প্রদর্শন করলেন, জমকালো বোরকা পরিধান করলেন কিংবা নিকাব পড়াই বাদ দিলেন আপনার এই কর্মকাণ্ড ছাত্রীদের হৃদয়ে কী প্রভাব রাখবে ভাবতে পারছেন?! তারা দেখবে আপনি আল্লাহর বিধানকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছেন। আপনিই যখন ইসলামি বেশভূষায় অভ্যস্ত নন তখন কন্যাদের হৃদয়কে ইসলামের ভালোবাসায় সিক্ত করবেন কীভাবে? অন্ধ কি আর পথ দেখাতে সক্ষম!?
ওহে সন্তান গড়ার কারিগর, যখন আমার কন্যা আপনাকে সঠিক পর্দা থেকে বিচ্যুত দেখতে পাবে তখন সে নিম্নোক্ত দুই পথের কোনো একটি বেছে নিতে বাধ্য হবে。
হয়তো কন্যা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সেও হিজাবকে ছুঁড়ে ফেলবে। তখন সে-সহ অন্যান্য যারা আপনার দ্বারা প্রভাবিত, প্রত্যেকের পাপের বোঝা আপনার ওপর এসেই বর্তাবে。
কিংবা হতে পারে, আপনি তাদের কাছ থেকে গ্রহণযোগ্যতা হারাবেন। আপনার কথাগুলো প্রভাবশূন্য হয়ে পড়বে। তারা আপনার কাছ থেকে বৈপরীত্য শিখবে。
একদিকে আপনি আল্লাহ ও রাসূল -এর ভালোবাসাপূর্ণ কবিতাগুলো তাদের পড়াচ্ছেন, কুরআন কারীমের সে আয়াতগুলো তাদের শিক্ষা দিচ্ছেন যেখানে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা আছে আর অপরদিকে সন্তানরা দেখতে পাবে সেই আপনিই আল্লাহর স্পষ্ট অবাধ্যতায় লিপ্ত আছেন। তা হলে বলুন তারা কী শিখবে? বর্তমান সমাজে এই বৈপরীত্যগুলোর কারণেই কি সরলমনা শিশুরা বিপথগামী হচ্ছে না, তারা তাদের সুস্থ-সুন্দর ফিতরাত হারাচ্ছে না?
যখন আপনি সঠিক পর্দা ছেড়ে দেবেন তখন সমস্যা শুধুমাত্র এই একটি পাপে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এর দ্বারা সবচেয়ে বড়ো যে বিপদটি হবে তা হলো, আপনার চারপাশের শিশুদের ওপর মানসিক ও দীক্ষাগত একটি বিরূপ প্রভাব পড়বে। মনে রাখবেন, যখন থেকেই আপনি শিক্ষকতার এই ময়দানে পা রেখেছেন তখন থেকেই আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ ও আচরণ গভীর পর্যবেক্ষণের অধীনে। আপনার আশপাশের অসংখ্য ছোটো ছোটো চোখ আপনাকে সার্বক্ষণিক নজরদারির মাঝে রেখেছে। এর মধ্যে যেকোনো ধরনের অসঙ্গতি ও বৈপরীত্য তারা তৎক্ষণাৎ ধরে ফেলে এবং তাতেই অভ্যস্ত হয়ে ওঠে。
সম্মানিত শিক্ষক-শিক্ষিকাবৃন্দ, উম্মাহ আজ যে লাঞ্ছনা ও উদাসীনতার সময় পার করছে তার মোকাবিলায় এই প্রজন্মকে নিয়ে আমাদের অনেক স্বপ্ন রয়েছে। আর এই প্রজন্মকেই আমরা তুলে দিচ্ছি আপনাদের হাতে। আশা থাকবে যে মহান গুরুদায়িত্ব ও আমানত আপনাদের ওপর বর্তানো হয়েছে আপনারা এর সঠিক তদারকি করবেন। আল্লাহ পরিপূর্ণরূপে দায়িত্ব পালনে আপনাদের সহযোগিতা করুন。
📄 হতাশার কোনো সুযোগ নেই
আমাকে এক ভাই সেদিন একটি চিঠি পাঠালেন। দ্বীনি সচেতনতা তৈরিতে ভাইটির প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়। চিঠিতে তিনি মুসলিম সন্তানদের দ্বীনের ব্যাপারে অজ্ঞতা, শারীআর প্রতি অস্বীকৃতি ও চারিত্রিক অধঃপতনের কিছু বাস্তব চিত্র তুলে ধরলেন। শেষে বললেন, 'সত্যি বলতে আমি এখন একপ্রকার হতাশ হয়ে পড়েছি।'
আমি আমার এই ভাই ও অন্যান্য সকলকে উদ্দেশ্য করে বলতে চাই, হতাশার কোনো সুযোগ নেই। বরং আমি আমাকে ও আপনাদের সকলকে সফল হিসেবেই দেখতে পাচ্ছি। আমি তো দেখতে পাই, আল্লাহ আমাদের ওপর নিয়ামাতের অশেষ ফল্গুধারা বর্ষণ করছেন, এই কঠিন মুহূর্তেও তিনি আমাদের উম্মাহর কল্যাণে কাজ করার এবং সংস্কার করার সুযোগ দিয়েছেন। বিশুদ্ধ নিয়ত ও সঠিক পথ অনুসরণের মাধ্যমে আমরা যখন যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাব তখন আমরা সফল।
হতাশার কোনো সুযোগ নেই। এমন অনেক আয়াত আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে যেগুলো মূলত আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন হতাশাকে মোকাবিলা করতে এবং সে স্থলে উচ্চাকাঙ্ক্ষার বীজ বপন করতে। সবার অবস্থা দেখে হাহুতাশ করে নিজেকে বিলিয়ে না দেওয়াই হলো সে আয়াতগুলোর মূল উদ্দেশ্য। ভবিষ্যৎ নিয়ে অজানা আশঙ্কা, হতাশা ও দুঃখ আমাদের থাকতে পারবে না। মনে রাখতে হবে, যা কিছু চলছে ও চলবে সবকিছুই মূলত আল্লাহ তাআলার আওতাধীন, তার নির্ধারিত তাকদীরের অংশ। সবকিছুই তার গভীর প্রজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত。
গভীরভাবে এই আয়াতগুলো লক্ষ করুন,
فَلَا تَذْهَبْ نَفْسُكَ عَلَيْهِمْ حَسَرَاتٍ “সুতরাং আপনি তাদের জন্য অনুতাপ করে নিজেকে ধ্বংস করবেন না।”[১১২]
لَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَّفْسَكَ أَلَّا يَكُوْنُوْا مُؤْمِنِينَ “তারা মুমিন হচ্ছে না দেখে আপনি হয়ত মনোকষ্টে আত্মঘাতী হয়ে পড়বেন।”[১১৩]
وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ مَا فَعَلُوْهُ “যদি আপনার পালনকর্তা চাইতেন, তবে তারা এ কাজ করত না।”[১১৪]
أَفَلَمْ يَيْأَسِ الَّذِينَ آمَنُوا أَنْ لَّوْ يَشَاءُ اللَّهُ لَهَدَى النَّاسَ جَمِيعًا “তবে কি যারা ঈমান এনেছে তারা জানে না যে, আল্লাহ ইচ্ছে করলে সকলকেই সৎপথে পরিচালিত করতেন?”[১১৫]
হয়তো আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, 'কাফিরদের সমস্ত কুফরি আল্লাহর আয়ত্তাধীন—এই বিষয়টি এত বেশি করে আলোচনা করার কারণ কী? অথচ এটি একটি সুস্পষ্ট বিষয়। আল্লাহ যা চান তা-ই তো করতে পারেন।'
আমি বলব, 'এই সমস্ত আয়াত আমাকে ও আপনাকেই সম্বোধন করে বলছে যে, ভয় পেয়ো না, হতাশ হয়ো না; বরং একে সুযোগ হিসেবে লুফে নাও। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করো যে, তিনি তোমাকে সে সময় সঠিক পথ দেখিয়েছেন যখন অন্যকে পথভ্রষ্ট করেছেন। দৃঢ়চিত্তে শক্ত মনোবলে আল্লাহর সাহায্য কামনা করো। বাস্তবতাকে একটি উর্বর ভূমি হিসেবে দেখো, যেখানে দাওয়াতের একটি বীজ আল্লাহর ইচ্ছায় একদিন বিশাল শস্যগুদামে পরিণত হবে।
আসলে এই মানসিকতা নিয়েই আমি বাস্তবতার মুখোমুখি হই। স্বীকার করছি, এখন কঠিন সময় চলছে। মেনে নিচ্ছি, এখন মুসলিম ঘরের সন্তানও ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। আর এই দৃশ্য নিশ্চয় কোনো অনুভূতিসম্পন্ন ও জীবিত আত্মাকে স্বস্তি দিতে পারে না। কিন্তু একই সাথে আমি একে সুযোগ হিসেবে দেখি। মনোযন্ত্রণা ও কষ্টকে আশা ও কাজের বাস্তবতায় ফুটিয়ে তুলতে চাই। আর আলহামদুলিল্লাহ আমার নিরবচ্ছিন্ন দাওয়াতি কর্মকাণ্ডে আমি এই মানসিকতার বেশ ভালো ও সুস্পষ্ট প্রভাব দেখতে পাই。
অতএব হতাশ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং এটি এক ঐতিহাসিক সুযোগ। আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য মনোনীত একটি অনুগ্রহ। অতএব এ সুযোগকে কাজে লাগান。
টিকাঃ
[১১২] সূরা ফাতির, ৩৫:৮。
[১১৩] সূরা শুআরা, ২৬:৩。
[১১৪] সূরা আনআম, ৬: ১১২。
[১১৫] সূরা রা'দ, ১৩: ৩১。