📄 আল্লাহর আশপাশে নাক গলানো!
প্রতিদিনের মতো আজও ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে সন্তানদের নিয়ে স্কুল থেকে বাসায় ফিরছিলাম। হঠাৎ লুজাইন (আমার মেয়ে, ক্লাস ফোরে পড়ে) বলে উঠল, 'বাবা, আজ আমার এক বান্ধবী আমাকে বলল, তার মা নাকি তাকে বলেছে, 'প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তবেই তুমি হিজাব ধরবে।' আমি তাকে বলে দিয়েছি, 'তোমাকে অবশ্যই প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই পর্দা করতে হবে। কারণ আল্লাহ বলেছেন,
وَإِنْ جَاهَدَاكَ عَلَى أَنْ تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا
"আর তোমার পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার সাথে শিরক করার জন্য পীড়াপীড়ি করে, যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তা হলে তুমি তাদের কথা মানবে না।” [৮৫]
এই আয়াতটি দ্বারা এমনভাবে দলীল পেশ করা এখানে জুতসই হয়নি ঠিক কিন্তু আমাকে যে বিষয়টি আশ্চর্যান্বিত করল সেটি হলো, লুজাইন বান্ধবীকে বুঝানোর জন্য কুরআন থেকে দলীল পেশ করেছে। তাই তাকে বললাম, 'লুজাইন, অসাধারণ কাজ করেছ তুমি। তোমার বান্ধবীকে আরও বলবে, যখন আল্লাহ কোনো বিষয়ের আদেশ দেবেন তখন সে বিষয়ে কারও কোনো ধরনের নাক গলানোর অধিকার নেই। আচ্ছা, একটা উদাহরণ দিই। হঠাৎ রাস্তার কোনো অপরিচিত আগন্তুক এসে তোমার ঘরের দরজায় কড়া নাড়ল। তুমি ভেতর থেকে আওয়াজ দিয়ে বললে, 'বলুন, কী চাই আপনার?' সে উত্তর দিলো, 'আমি চাই আপনি আজ কেএফসি থেকে অর্ডার করে চিকেন রোস্ট খাবেন।' তখন তুমি কী করবে?'
* 'তার কথা অগ্রাহ্য করব।' কেন করবে মা?
* 'কারণ আমি কী খাব সেটা তার বিষয় না। এতে তার মাথা ঘামানোর কী আছে?'
* 'একদম ঠিক বলেছ। এই ব্যাপারটিও ঠিক তেমন। যখন আল্লাহ আমাদের কোনো আদেশ দেন, তখন বাবা-মা যদি আল্লাহর আদেশ বিরোধী কোনো কথা বলেন তখন আল্লাহ কি সে কথাকে গ্রাহ্য করবেন?'
* 'না। কারণ সে আল্লাহর আদেশের ব্যাপারে নাক গলাচ্ছে।'
প্রিয় মুসলিম ভাইয়েরা, সন্তানদেরকে আল্লাহর সাথে পরিচয় করিয়ে দিন।
وَاللهُ يَحْكُمُ لَا مُعَقِّبَ لِحُكْمِهِ "আর আল্লাহই একমাত্র আদেশদাতা, তাঁর আদেশ রদ করার কেউ নেই।”[৮৬]
যে মহিলা তার কন্যাকে বলে, 'আল্লাহর বিধান হলো এমন কিন্তু আমি মনে করি বিষয়টি এমন হওয়া উচিত!' তাকে এই কথা জানিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, সে যে পথের দিকে ডাকছে সেটি সে ইসলাম নয় যে ইসলামে মানুষ তার রবের সামনে পরিপূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করে। আসলে সে আল্লাহর বিধানকে নয়, প্রাধান্য দিচ্ছে নিজ সিদ্ধান্তকে।
প্রিয় ভাইয়েরা, সন্তানদের এই শিক্ষা দিন,
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُوْنَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا )
“আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো কাজের আদেশ করলে কোনো ঈমানদার পুরুষ ও নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের নেওয়ার ক্ষমতা নেই। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল সে স্পষ্টভাবে পথভ্রষ্ট হলো।”[৮৭]
সন্তানদের এই শিক্ষা দিন যে, যখন আল্লাহ কোনো বিষয়ে ফায়সালা করবেন তখন সে বিষয়ে নাক গলানোর অধিকার কারও নেই। এই বিষয়ে কারও আনুগত্য চলবে না। এমনকি এই কথাও স্পষ্ট করে বলুন, খোদ আপনারাই যদি তাদেরকে আল্লাহর অবাধ্যতার আদেশ দেন তারা যেন সেই ক্ষেত্রে আপনাদের আনুগত্য না করে।
وَاللَّهُ يَحْكُمُ لَا مُعَقِّبَ لِحُكْمِهِ وَهُوَ سَرِيعُ الْحِسَابِ "আল্লাহই একমাত্র আদেশদাতা, তাঁর আদেশ রদ করার কেউ নেই?। আর তিনি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।”[৮৮]
টিকাঃ
[৮৫] সূরা লোকমান, ৩১: ১৫。
[৮৬] সূরা রা'দ, ১৩: ৪১。
[৮৭] সূরা আহযাব, ৩৩: ৩৬。
[৮৮] সূরা রা'দ, ১৩: ৪১。
📄 শিশু মনের কুরআনি জিজ্ঞাসা
আমি ভাবলাম, আজ আপনাদের নিকট একটি বিষয় শেয়ার করি। অনেক সময় পরিবারের সবাই মিলে একসাথে বসে আমরা কুরআন তিলাওয়াত করি। তো মাঝে মাঝে আমার মেয়েরা আমাকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘বাবা, এই আয়াতের অর্থ কী?’
আপনাদের প্রতিও আমার পরামর্শ থাকবে, কুরআন তিলাওয়াতের সময়টিতে সন্তানদের প্রশ্ন করার জন্য উৎসাহ দিন। বিরক্ত হয়ে এই কথা বলতে যাবেন না, ‘তোমরা এভাবে প্রশ্ন করতে থাকলে আমি তো দুই পৃষ্ঠার বেশি এগুতে পারব না।’ না, এভাবে নয়। বরং প্রশ্নের জবাব দিয়ে দুই পৃষ্ঠা তিলাওয়াত করা, সন্তানদের কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এক পারা তিলাওয়াত করার চেয়ে অনেক বেশি উত্তম। এই কারণে আপনার সন্তান যখনই বলবে, ‘বাবা, এই শব্দের অর্থ কী?’ আপনার উচিত খুব আগ্রহের সাথে তাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং তাদেরকে উৎসাহিত করা।
গত পরশু স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে আমি সূরা হিজর তিলাওয়াত করছিলাম। আমার মেয়ে (বয়স দশ বছরেরও কম) হঠাৎ আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘বাবা, نَسْلُكُهُ শব্দের কী অর্থ?’ অর্থাৎ, এই আয়াতে যে শব্দটি এসেছে সেটি,
كَذَلِكَ نَسْلُكُهُ فِي قُلُوْبِ الْمُجْرِمِينَ لَا يُؤْمِنُوْنَ بِهِ وَقَدْ خَلَتْ سُنَّةُ الْأَوَّلِينَ
“এমনিভাবে অপরাধীদের অন্তরে আমি তা প্রবেশ করিয়ে দিই যে, তারা এর প্রতি ঈমান আনবে না। পূর্ববর্তীদের থেকে এমন রীতি চলে আসছে।”[৮৯]
আকীদা সম্পর্কে শিশুদের করা-প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার পদ্ধতি বেশ দীর্ঘ আলোচনার দাবি রাখে। কিন্তু সে দীর্ঘ আলোচনার সময় আজ নয়। সামান্য যে অনুভূতি আমার হৃদয়ে উদিত হয়েছে আজ শুধু সেগুলোই আপনাদের জানাব।
আচ্ছা এবার উত্তরের দিকে ফিরে যাই। আমি তাকে বললাম, 'মা, একটু অপেক্ষা করো। আমি দেখে জানাচ্ছি।' তারপর মোবাইল খুলে আয়াতটির তাফসীর দেখতে বসলাম। বিভিন্ন মুফাসসিরের ভিন্ন ভিন্ন অভিমতগুলো দেখে নিলাম। আজাব, পথভ্রষ্টতা, তাকদীর ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনাকে পাশ কাটিয়ে বললাম, * نسلكه শব্দের অর্থ হলো, আমি তা প্রবেশ করিয়ে দিই। অর্থাৎ, কুরআনকে আমি এভাবেই অপরাধীদের অন্তরে ঢুকিয়ে দিই। নবিজি যখন তাদের সম্বোধন করেন, কুরআনের আয়াত যখন তারা শুনতে পায় সাথে সাথে তা বুঝতে সক্ষম হয়, যেহেতু আরবি ভাষা তাই তারা প্রতিটি শব্দের অর্থও বুঝে নেয়। কিন্তু এর দ্বারা তারা মোটেও প্রভাবিত হয় না, তাদের হৃদয়ে এই আয়াতগুলো ঈমান সঞ্চারিত করে না। এমনভাবে আল্লাহ তাদের হৃদয়ে কুরআনকে প্রবেশ করান যে, তারা এগুলো শুনতে ও বুঝতে সক্ষম হলেও, প্রভাবিত হয় না। এই কারণেই আল্লাহ তাআলা বলেছেন, كَذَلِكَ نَسْلُكُهُ فِي قُلُوْبِ الْمُجْرِمِينَ )
“এমনিভাবে অপরাধীদের অন্তরে আমি তা প্রবেশ করিয়ে দিই।”
* 'ঠিক আছে বাবা। আল্লাহ তাদের হৃদয়ে কুরআনকে এমনভাবে প্রবেশ করান যে, তাদের হৃদয় এর দ্বারা প্রভাবিত হয় না। কিন্তু তিনি তাদের হৃদয়কে এমন বক্র করার পর, সেই তিনিই আবার এর কারণে তাদের শাস্তি দেবেন?!'
প্রিয় ভাইয়েরা, সন্তান যখন এমন প্রশ্ন করবে তখন এই বলে ধমকাতে যাবেন না, 'এটা তুমি কী বললে? এমন প্রশ্ন হারাম! এভাবে বলে না বাবা,' এই ধরনের জবাব কোনোভাবেই কাম্য নয়। হ্যাঁ, কিছু সময় এই জবাবও দিতে হয় যে, 'আমরা যেহেতু মুসলিম তাই আমাদের চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করতে হবে, আল্লাহর বিধানের সামনে আত্মসমর্পণ করতে হবে।' তবে যেকোনো প্রশ্নের জবাবে তো আর এই কথা বলা যায় না। বরং অধিকাংশ প্রশ্নের উত্তর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে সন্তানদের সন্তুষ্ট করা সম্ভব।
তাই আমি মুচকি হেসে বললাম, 'খুব ভালো প্রশ্ন করেছ লীন, তুমি বলতে চাইছ, কেন আল্লাহ তাদেরকে নিজ থেকে পথভ্রষ্ট করে আবার শাস্তি দেবেন তাই তো?' 'হ্যাঁ, বাবা।' * 'ঠিক আছে দাঁড়াও। বলছি।'
এভাবে সন্তানকে বুঝতে দিন, আপনি প্রশ্নটিকে গুরুত্বের সাথে নিচ্ছেন, আর খুব মনোযোগের সাথে তার কথা শুনছেন। তারপর হতে পারে প্রশ্নের উত্তর আপনার জানা আছে, আবার জানা নাও থাকতে পারে। যদি জানা না থাকে বলুন, 'মা, আমি তোমার প্রশ্ন বুঝতে পেরেছি। ইন শা আল্লাহ, আজ বা কাল ওই সময়ে আমি তোমাকে বিষয়টি বুঝিয়ে দেবো।' আপনি জবাব দিতে আগ্রহী এই বিষয়টি তাকে বুঝতে দেবেন।
আমার মরহুম পিতা একদিন আমাকে বলেছিলেন, 'সন্তান যখন কোনো প্রশ্ন করে সে সময়টিই হলো শিক্ষা দানের সবচেয়ে অনুকূল মুহূর্ত। কারণ তখন তাদের হৃদয় তোমার কাছ থেকে কোনোকিছু জানতে মুখিয়ে থাকে। তাদেরকে ডেকে পড়ানোর চেয়ে এই সময়টি অধিক কার্যকর।'
আচ্ছা যাক। আমি তাকে বললাম, 'বেশ ভালো প্রশ্ন করেছ। এর উত্তর হলো, তারা নিজেরাই নিজেদের পথভ্রষ্টতার জন্য দায়ী। দেখো, আল্লাহ তাআলা কীভাবে বলেছেন,
كَذَلِكَ نَسْلُكُهُ فِي قُلُوْبِ الْمُجْرِمِينَ
“এমনিভাবে অপরাধীদের অন্তরে আমি তা প্রবেশ করিয়ে দিই।”
অপরাধী কারা? যারা রাসূলের কথা শোনার পরও, সত্যকে সত্য বলে জানার পরও অনুসরণ করবে দূরে থাক; বরং উপহাস ও ঠাট্টামজাকে লিপ্ত ছিল। কুরআন তাই আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে, সত্যকে সত্য বলে জানার পরও, প্রথম থেকেই এর বিরোধীতা করার পরিণতি কতটা ভয়ংকর হতে পারে। এই কারণে আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেছেন,
وَنُقَلِّبُ أَفْئِدَتَهُمْ وَأَبْصَارَهُمْ كَمَا لَمْ يُؤْمِنُوا بِهِ أَوَّلَ مَرَّةٍ وَّنَذَرُهُمْ فِي طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُوْنَ
“যেহেতু তারা প্রথমবারে এর ওপর ঈমান আনেনি, তাই আমিও তাদের অন্তর ও দৃষ্টিকে উল্টে দেবো। আর আমি তাদেরকে তাদের অবাধ্যতায় উদভ্রান্ত ছেড়ে দেবো。”[৯০]
এই আয়াত আমাদের শিক্ষা দিচ্ছে, সত্য যখন আমাদের সামনে স্পষ্ট হবে তখন যেন আমরা হিংসাবশত কিংবা অহংকার করে একে প্রত্যাখ্যান না করি। যদি আমরা সত্যকে অস্বীকার করি, হতে পারে আল্লাহ এমন অবস্থা সৃষ্টি করবেন যে, আমরা কুরআন শুনব অথচ তা আমাদের হৃদয়ে কোনো প্রভাব সৃষ্টি করবে না! এমনিভাবে কুরআন আমার হৃদয়ে প্রবেশ করবে যেভাবে অপরাধীদের হৃদয়ে তা প্রবেশ করেছিল। এটিই হলো এই আয়াতের শিক্ষা।'
বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট হওয়ার জন্য সহজ ও বোধগম্য কিছু উদাহরণ দেওয়ার চেষ্টা করবেন। যেমন, উপরিউক্ত বিষয়টি বুঝাতে গিয়ে আমি তাকে বলেছি, 'ধরো তোমার হৃদয় হলো একটি আয়না। উজ্জ্বল ও স্বচ্ছ আয়না। এখন তুমি যদি এটাকে তোমার সামনে ধরো, দেখবে তোমার পরিপূর্ণ অবয়ব স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। কিন্তু সে স্বচ্ছ আয়নায় যদি তুমি কাদা মেখে দাও, বলো দেখি, তুমি কি পরিপূর্ণ আকৃতি দেখতে পাবে?'
'না।'
কথা বলার মাঝখানে কিছু প্রশ্ন করবেন যাতে আগ্রহ বাকি থাকে。
* 'ঠিক একইভাবে কোনো মানুষকে যখন আল্লাহ বারবার সতর্ক করেন, তাকে বলেন, হে মানব সন্তান, যদি তুমি আমার কথা অস্বীকার করো, আমার ওপর অহংকার দেখাও আমি তোমার হৃদয়ের আয়না মলিন করে দেবো।'
فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُوْنَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ *
“কাজেই যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে তারা যেন সতর্ক হয় যে, বিপর্যয় তাদের ওপর আপতিত হবে কিংবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি নেমে আসবে।”[৯১]
যখন তুমি অবাধ্যাচরণ করবে আল্লাহ তোমার হৃদয়কে এতটা কর্দমাক্ত করে দেবেন যে, তুমি সত্যকে সত্য আর মিথ্যাকে মিথ্যা বলে চিহ্নিত করতে পারবে না।
فَلَمَّا زَاغُوْا أَزَاغَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ )
“অতঃপর যখন তারা বক্র পথ অবলম্বন করল, আল্লাহ তাদের হৃদয়কেও বক্র করে দিলেন। নিশ্চয় আল্লাহ পাপাচারীদের পথপ্রদর্শন করেন না।”[৯২]
☆'ওহ আচ্ছা। বাবা, তা হলে তারা নিজেদের কারণেই পথভ্রষ্ট হয়েছে, তাই না?' * 'হ্যাঁ মা। নিজেদের কারণেই। দেখো, আল্লাহ তাআলা কী বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ النَّاسَ شَيْئًا وَلَكِنَّ النَّاسَ أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُوْنَ )
“আল্লাহ মানুষের ওপর কোনো জুলুম করেন না, বরং মানুষ নিজেই নিজের ওপর জুলুম করে।”[৯৩]
এতগুলো আয়াত আমাদের কী শিক্ষা দিচ্ছে?
হক আমাদের নিকট স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর আমরা যেন এর বিরোধীতা না করি。
আমাদের হৃদয়ের আয়না যেন স্বচ্ছ থাকে। কোনোভাবেই যেন এটিকে কর্দমাক্ত হতে না দিই। যদি ময়লা বসে যায় তখন সবকিছু আমরা উলটো দেখতে পাব, হককে বাতিল আর বাতিলকে হক মনে করে বসব。
আল্লাহর সামনে আমাদের বিনয় প্রদর্শন করতে হবে। তিনি আমাদের সতর্ক করে দেওয়ার পরও যদি আমরা তার ওপর অহংকার প্রদর্শন করি হতে পারে হককে আমরা চিরতরের জন্য কখনো চিনতে আর সক্ষম হব না。
কিন্তু যদি আমরা বিনয় ও নম্রতা প্রদর্শন করি, হাদীসে কুদসিতে কী এসেছে দেখো,
يَا عِبَادِي كُلُّكُمْ ضَالٌّ إِلَّا مَنْ هَدَيْتُهُ فَاسْتَهْدُوْنِي أَهْدِكُمْ
“আমার বান্দারা, তোমরা সবাই ছিলে পথহারা, তবে আমি যাকে হিদায়াত দিয়েছি সে ব্যতীত। অতএব তোমরা আমার নিকট হিদায়াত প্রার্থনা করো, আমি তোমাদের হিদায়াত দান করব।”[৯৪]
মেয়েকে আরও বললাম, 'আল্লাহ তাআলা দয়ালু। যখন তিনি কারও মধ্যে সততা, সরলতা ও কল্যাণ দেখতে পান তাকে বারবার সুযোগ দিয়ে থাকেন। এই কারণেই তিনি বলেছেন,
وَلَوْ عَلِمَ اللَّهُ فِيْهِمْ خَيْرًا لَّأَسْمَعَهُمْ
“আল্লাহ যদি তাদের মধ্যে ভালো কিছু দেখতেন, তবে তিনি অবশ্যই তাদেরকে শুনাতেন।”[৯৫]
সর্বশেষ তাকে স্মরণ করিয়ে দিলাম, নবিজির নুবুওয়াতপ্রাপ্তির পর এমন অনেক ব্যক্তি পাওয়া যায় যারা ৬-৭ বছর তাঁর দাওয়াতের পথে বাধা সৃষ্টি করেছিল, কিন্তু শেষমেশ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলেই আশ্রয় নিয়েছিল। অর্থাৎ যখনই আল্লাহ তাআলা কোনো ব্যক্তির মধ্যে কল্যাণ দেখতে পান, কুফরির ওপর তাকে মৃত্যু দেন না। অপরদিকে যারা কুরআনের ভাষায় অপরাধী তাদের পরিণাম হয় ভয়াবহ。
প্রিয় ভাইয়েরা, ছোট্ট এই অভিজ্ঞতাটুকু আপনাদের সাথে আলোচনা করলাম, এই আশায় যে, হয়তো কারও উপকারে আসবে。
টিকাঃ
[৮৯] সূরা হিজর, ১৫: ১২১。
[৯০] সূরা আনআম, ৬:১১০。
[৯১] সূরা নূর, ২৪:৬৩。
[৯২] সূরা সাফ, ৬১ : ৫。
[৯৩] সূরা ইউনুস, ১০: ৪৪。
[৯৪] মুসলিম, ২৫৭৭。
[৯৫] সূরা আনফাল, ৮: ২৩。
📄 সন্তান বিপথগামী হলে করণীয়
এমন অনেক দ্বীনদার মা-বাবাদের আমি চিনি যাদের সন্তান বিপথগামী হয়েছে, অনেকে আবার নাস্তিকতার পথ বেছে নিয়েছে। পরিণতিতে তারা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছেন। আবার এমন অনেক বাবা আছেন, যারা ব্যক্তিগতভাবে দাঈ, বেশ সফলতার সাথে মানুষদের দ্বীনের পথে ডাকেন, সমাজে যাদের ব্যক্তিত্ব ও বেশ প্রভাবও রয়েছে।
আজ সেসব মানুষ সম্পর্কে কথা বলতে যাব না, যাদের ইখলাসের ঘাটতি রয়েছে, যারা মানুষকে দাওয়াত দিয়ে জনপ্রিয় হতে চায়, সমাজ সংশোধন করতে গিয়ে নিজ পরিবারকে যারা আপন অবস্থায় ছেড়ে দেয়, সন্তান বিপথগামী হলে যারা ভাবে, 'এই কথা যেন কেউ জানতে না পারে। না হয় আমার সুনাম মাটিতে মিশে যাবে।' আজ আমাদের আলোচনা এই শ্রেণির মানুষদের সম্পর্কে নয়।
বরং আমরা কথা বলব সেসব একনিষ্ঠ দাঈ সম্পর্কে যারা সন্তানদের ব্যাপারে যত্নশীল। তাদের বিপথগামী হতে দেখলে যারা অপরাধবোধ থেকে নিজেকে ভর্ৎসনা করে বলেন, 'নিশ্চিতভাবে আমি তাদের দীক্ষায় ত্রুটি করেছি। যেখানে আমার সন্তানরাই বিপথগামী সেখানে অন্য মানুষদের আমি কীভাবে দাওয়াত দিই! আমি দুমুখো নীতি অবলম্বন করতে পারি না। এখন আমার মূল দায়িত্ব হলো, নিজ সন্তানকে ইসলামে ফিরিয়ে আনা।'
এই শ্রেণির বাবা-মা যখন কোনো ভালো কাজের আদেশ দিতে যান কিংবা মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করতে যান তখন তারা নিজেদের মুনাফিক বা প্রতারক মনে করতে থাকেন। তারা সন্তানদের মাঝে পরিবর্তন আনতে চান কিন্তু অধিকাংশ সময় ব্যর্থ হন। এভাবে দিনে দিনে ব্যর্থতাবোধ ও হতাশা এসে তাদের গ্রাস করে ফেলে。
আমরা এই শ্রেণির বাবা-মাদের উদ্দেশ্য করে বলতে চাই, আমরা মনে করি আপনাদের এই অনুভূতি আপনাদের ভেতরে থাকা কল্যাণ ও মঙ্গলের ইঙ্গিত দেয়。
কিন্তু প্রিয় ভাইয়েরা, ইখলাস, সততা, অপরাধবোধ ইত্যাদি বিভিন্ন নামে শয়তান আপনাদের টলিয়ে দিতে চায়। হতে পারে আপনার সন্তান তাদের অন্তর্ভুক্ত যাদের কপালে আল্লাহ হিদায়াত রাখেননি। হ্যাঁ যখন সে বিপথগামী হবে তখন অবশ্যই আপনার দায়িত্ব, তার এই করুণ পরিস্থিতির পেছনের কারণ তালাশ করা, কোন কারণে সে এই পথ বেছে নিল তার অনুসন্ধান করা। এরপর তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার যথাসাধ্য চেষ্টা চালানো। বিশেষ করে আগের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে অন্যান্য সন্তানদের আদর্শ পদ্ধতিতে গড়ে তোলা。
দ্বীনদার ও দাঈ ব্যক্তিদের সন্তান বিগড়ে যাওয়ার বিভিন্ন কারণ হতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো-সন্তানদের ইসলামি শিক্ষা দেওয়া হলেও পাশাপাশি তাদের মনের আকুতি মনোযোগ দিয়ে না শোনা, কড়াকড়ি করা, হিংস্রতা দেখানো, অতিরিক্ত প্রশ্রয় দেওয়া, বিভিন্ন পারিবারিক সমস্যা, অনেক সময় হতে পারে দাওয়াতের পথে বাবা বেশ কষ্টসাধ্য পথ পাড়ি দিয়েছেন কিন্তু সন্তান এই পথের কষ্ট দেখে ইসলাম ছেড়ে দিয়েছে, শয়তান বা নফসের প্ররোচনায় পড়েছে ইত্যাদি বিভিন্ন কারণ হতে পারে। মোদ্দাকথা আপনার দায়িত্ব হলো, পূর্বের ভুল চিহ্নিত করে যথাসম্ভব অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো আর বিগড়ে যাওয়া সন্তানকে ফিরিয়ে আনাকে নিজের সবচেয়ে অগ্রগণ্য মিশনে পরিণত করা。
কিন্তু প্রিয় ভাইয়েরা, একই সাথে আমি এই কথাও বলি যে, নিজেকে মুনাফিক ভেবে দ্বিমুখীতার দোহাই দিয়ে দাওয়াতের এই মহান কাজ থেকে বিরত থাকা মোটেও উচিত হবে না। ভেবে দেখুন, এক লোকের কথায় সমাজের বহু মানুষ হিদায়াতের দিশা পেত, একসময় শয়তান তার সন্তানকে কুপথগামী করল আর এই কারণে লোকটি দাওয়াত দেওয়াই বন্ধ করে দিলো। তার এমন কর্মকাণ্ডে শয়তান কতটা সফলতার হাসি হাসবে ভাবতে পারছেন? এমনকি আপনার এই হতাশা বিপথগামী সন্তানের সাথে উপযুক্ত আচরণ করা এবং তার ওপর প্রভাব সৃষ্টির সক্ষমতাটুকুও কেড়ে নেবে। আজকের এই কথাগুলো এতটা দৃঢ়তার সাথে এজন্য বলছি, কারণ আমার কিছু প্রিয় ব্যক্তিদের এই কঠিন অবস্থার সামনে আমি দেখতে পাচ্ছি, যাদের আমি সৎ ও মুখলিস বলেই জানি。
প্রিয় ভাই, আপনার সন্তান বিপথগামী হওয়ার পরও দাওয়াতের এই পথে অবিচল থাকার অর্থ এই নয় যে, আপনি মুনাফিক।
إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ
"আপনি যাকে পছন্দ করেন ইচ্ছে করলেই তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না।” [৯৬]
আয়াতটি আপনি বিশ্বাস করেন, কিন্তু যখন বিষয়টি আপনার সাথেই ঘটল তখন আপনি আর নিতে পারলেন না, ভাবতে পারলেন না যে, আপনার সন্তানও জাহান্নামের অধিবাসী হতে পারে। হ্যাঁ, মেনে নেওয়া বেশ কষ্টকর বটে তবে নিজেকে ভর্ৎসনা করার পরিবর্তে দাওয়াত চালিয়ে যান আর রবের দরবারে সন্তানের হিদায়াতের দুআ করতে থাকুন। সেই সাথে এই বাস্তবতাটুকুও মেনে নিন যে, আপনার সন্তানকে হিদায়াতের পথ দেখানোর ক্ষমতা আপনার হাতে নেই。
'সন্তানকে ইসলামে ফিরে আনাই হলো আমার জীবনের মূল লক্ষ্য' এই বাক্যটি আমি কখনো সঠিক মনে করি না। কারণ আপনি জীবনের সফলতা এমন এক বস্তুর সাথে সম্পৃক্ত করে রেখেছেন যার ক্ষমতা আপনার হাতে নেই। হতে পারে সৃষ্টির হাজারো বছর পূর্বে আল্লাহ এর উলটোটি নির্ধারণ করে রেখেছেন। সন্তানকে ইসলামে ফিরিয়ে আনা নয়; বরং আপনার জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত তাকে দাওয়াত দেওয়া। তখন তার প্রতি জমে থাকা আপনার মায়া ও মর্মবেদনা মিশ্রিত দাওয়াত তাকে আকৃষ্ট করবেই। তবুও যদি সে সৎপথ গ্রহণ না করে তখন ব্যর্থতার দায়ে ভেঙে পড়বেন না। মানুষদের দাওয়াত দেওয়ার পথে অবিচল থাকুন, সমাজ সংস্কারে নিজেকে নিয়োজিত রাখুন। স্মরণে রাখুন, নূহ আলাইহিস সালাম দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নবি হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহর ইচ্ছা ছিল তার সন্তানকে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত করা。
টিকাঃ
[৯৬] সূরা কাসাস, ২৮: ৫৬。
📄 সন্তানদের ধৈর্য ও দৃঢ়তা শিক্ষা দিন
[মিশরে ইসলামপন্থীদের পতনের পর স্বৈরাচারী সরকারের পক্ষ থেকে তাদের ওপর নেমে আসে নির্যাতনের খড়গ। রাবেয়ার প্রান্তরে একদিনেই খুন করা হয় দুই হাজারেরও অধিক ধর্মপ্রাণ আন্দোলনকারীদের। এই ঘটনার পর আল-জাযিরা 'ফী সাবই সিনীন' নামে একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করে। যেখানে দেখানো হয়, অনেক ইসলামপন্থী সরকারি প্রহসন ও জেল-জুলুম সহ্য করতে না পেরে ইসলাম ছেড়ে দিচ্ছে, আল্লাহর সাহায্য থেকে হতাশ হয়ে সংশয়গ্রস্ত হয়ে পড়ছে কিংবা অনেকেই বাম ও সেক্যুলার রাজনীতিতে যোগদান করছে। ডকুমেন্টারিটির প্রতিক্রিয়ায় শাইখ কুনাইবি (হাফিজাহুল্লাহ) কিছু কথা বলেন। আমরা সেখান থেকে প্রাসঙ্গিক কিছু অংশ চয়ন করে এখানে যুক্ত করে দিচ্ছি।- অনুবাদক]
নাস্তিকতা, সন্দেহ ও সংশয় রোধে পরিবারই হলো সবচেয়ে বড়ো দুর্গ। সন্তানদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সর্বোত্তম যে পন্থা অবলম্বন করবেন সেটি হলো, কুরআনি দীক্ষা। তখন ষড়যন্ত্রকারীর শত চক্রান্তও তাদেরকে আপনার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে সক্ষম হবে না।
প্রথমত নিজেকে, এরপর সন্তানসহ অন্যান্য সকলকে এই কথার ওপর গড়ে তুলুন যে, আমাদের সৃষ্টিই করা হয়েছে পরীক্ষা করার জন্য。
الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَياةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا
“যিনি মরণ ও জীবনকে সৃষ্টি করেছেন, তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য।”[৯৭]
এটাই হলো বাস্তবতা। পরীক্ষা করার জন্য। তাদের ভালোভাবে আরও শিক্ষা দিন:
وَمَا مُحَمَّدُ إِلا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَإِنْ مَّاتَ أَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ وَمَنْ يَنْقَلِبْ عَلَى عَقِبَيْهِ فَلَنْ يَضُرَّ اللَّهَ شَيْئًا وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّاكِرِينَ “আর মুহাম্মদ একজন রাসূল মাত্র; তাঁর পূর্বেও বহু রাসূল অতিবাহিত হয়েছেন। যদি তিনি মারা যান বা নিহত হন তবে কি তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে? বস্তুত যদি কেউ উলটো ফিরে যায়, তবে আল্লাহর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আর যারা কৃতজ্ঞ, আল্লাহ তাদের পুরস্কৃত করবেন।”[৯৮]
সন্তানদের বলুন, 'প্রিয় বৎস, মহান আল্লাহ আমাদের পরীক্ষা না করেই সফলতা দেবেন এমন বলেননি বরং পরীক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—
وَلَتَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوْعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ "আর অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি এবং ফল-ফসল বিনষ্ট করার মাধ্যমে। আর আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।” [৯৯]
তাদের বলে দিন,
لَتَبْلَوُنَّ فِي أَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ وَلَتَسْمَعُنَّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَمِنَ الَّذِينَ أَشْرَكُوا أَذًى كَثِيرًا وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوْا فَإِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ “অবশ্যই তোমাদেরকে তোমাদের ধনসম্পদে ও জীবনে পরীক্ষা করা হবে। তোমাদের আগে যাদের কিতাব দেওয়া হয়েছিল তাদের এবং মুশরিকদের কাছ থেকে তোমরা অনেক কষ্টদায়ক কথা শুনতে পাবে। যদি তোমরা ধৈর্যধারণ করো এবং খোদাভীতি অবলম্বন করো তবে নিশ্চয়ই তা হবে দৃঢ় সংকল্পের কাজ।”[১০০]
তাই প্রিয় ছেলে, যখন আমাদের রব আমাদের পরীক্ষার সম্মুখীন করবেন, তখন ধৈর্য হারিয়ে তার ওপর প্রশ্ন তুলবে না।
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَعْبُدُ اللهَ عَلَى حَرْفٍ فَإِنْ أَصَابَهُ خَيْرُ اطْمَأَنَّ بِهِ وَإِنْ أَصَابَتْهُ فِتْنَةُ انْقَلَبَ عَلَى وَجْهِهِ خَسِرَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةَ ذَلِكَ هُوَ الْخُسْرَانُ الْمُبِينُ )
“মানুষের মধ্যে কেউ কেউ দ্বিধা-দ্বন্দ্বে নিপতিত হয়ে আল্লাহর ইবাদাত করে। যদি সে কল্যাণপ্রাপ্ত হয়, তখন ইবাদতের ওপর অটল থাকে কিন্তু যদি কোনো পরীক্ষায় পড়ে, তৎক্ষণাৎ পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়। ইহকালে ও পরকালে ক্ষতিগ্রস্ত তো সে-ই। আর এটাই তো সুস্পষ্ট ক্ষতি।”[১০১]
সন্তানকে বলুন। 'ছেলে আমার, খবরদার, তোমার ভালো কাজের প্রতিদান দুনিয়ায় আশা করবে না। দুনিয়া হলো পরীক্ষার স্থান, প্রতিদান প্রাপ্তির নয়。
وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
“কেবল কিয়ামাতের দিনেই তোমাদেরকে তোমাদের প্রতিদান পূর্ণ মাত্রায় বুঝিয়ে দেওয়া হবে।”[১০২]
তাদের এই কথা বলতে যাবেন না যে, 'সালাত পড়লে আল্লাহ তোমাকে পরীক্ষায় ভালো নাম্বার দেবেন। সদাকা ও যাকাত পরিপূর্ণরূপে আদায় করো, এর মাধ্যমে আল্লাহ তোমার সম্পদের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি করবেন।' এসব না বলে বরং তাকে এই কথা বলুন যে, সালাত পড়লে আল্লাহ খুশি হবেন। হতে পারে সালাত পড়ার পরও আল্লাহ তোমাকে পরীক্ষায় ফেলবেন, কিন্তু জেনে রেখো, আল্লাহ তোমার সাথেই থাকবেন।'
يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوْفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ
“ওহে বৎস, সালাত কায়েম রাখো, সৎকাজের আদেশ দাও, মন্দকাজের নিষেধ করো এবং তোমার ওপর নেমে আসা বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করো।”[১০৩]
শত্রুর অত্যাচারের মুখে সে যেন হতাশ হয়ে না পড়ে। আপনার সন্তানকে বুঝিয়ে বলুন,
وَلَوْ يَشَاءُ اللَّهُ لَا انْتَصَرَ مِنْهُمْ وَلَكِنْ لِيَبْلُوَ بَعْضَكُمْ بِبَعْضٍ
“আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তোমাদের কতককে কতকের মাধ্যমে পরীক্ষা করতে চান।”[১০৪]
তাকে এই কথার ওপর গড়ে তুলুন,
وَجَعَلْنَا بَعْضَكُمْ لِبَعْضٍ فِتْنَةً أَتَصْبِرُوْنَ
“আমি তোমাদের কতককে কতকের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ বানিয়েছি। দেখি, তোমরা সবর করো কি না?”[১০৫]
তাকে এও বলুন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوْا عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُمْ مَنْ ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ
“হে মুমিনগণ, তোমাদের দায়িত্ব তোমাদেরই ওপর। যদি তোমরা সৎপথে পরিচালিত হও তবে পথভ্রষ্ট কেউ তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে সক্ষম হবে না।”[১০৬]
সন্তানদের হৃদয়ে ইসলামের জন্য আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি করুন। যখন সে ইসলামের কোনো ক্ষতি হতে দেখবে যেন সাথে সাথে জ্বলে ওঠে, কেউ ইসলামের পতাকা ভূলুণ্ঠিত করতে চাইলে যে যেন নিজ দায়িত্বে বীরদর্পে এগিয়ে আসে। তাদেরকে আল্লাহ তাআলার এই বাণীর ওপর প্রতিষ্ঠিত করুন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُوْنُوا أَنْصَارَ اللَّهِ
“হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারী হয়ে যাও。”[১০৭]
তাদেরকে সেসব ব্যক্তির মতো তৈরি করুন যাদের ব্যাপারে কুরআনে এসেছে,
الَّذِيْنَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوْا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيْمَانًا وَقَالُوْا حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيْلُ “এদেরকে লোকেরা বলেছিল, ‘তোমাদের বিরুদ্ধে লোক জড়ো হয়েছে, কাজেই তোমরা তাদেরকে ভয় করো’। কিন্তু এ কথা তাদের ঈমানকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং তারা বলেছিল, 'আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কতই-না উত্তম অভিভাবক!’[১০৮]
তাদেরকে ব্যক্তিত্ব ও দৃঢ়তা শিক্ষা দিন। জালিমের অত্যাচার যাদের ঈমানকে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করবে। তাদের সামনে সেসব মুমিনের দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করুন যাদেরকে তাদের ঈমানের কারণে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, অথচ আল্লাহ তাদের ব্যাপারে বলেছেন,
إِنَّ الَّذِيْنَ آمَنُوْا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَهُمْ جَنَّاتٌ تَجْرِيْ مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ ذَلِكَ الْفَوْزُ الْكَبِيْرُ “যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত, যার তলদেশে প্রবাহিত হয় ঝরনাসমূহ। আর এটাই তো মহাসাফল্য।”[১০৯]
মানুষগুলোকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল তবু আল্লাহ তাদের সফল বলে আখ্যা দিয়েছেন। কারণ তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিল, শেষ সময় পর্যন্ত দৃঢ় থেকেছিল。
সন্তানদের এই শিক্ষা দিন, যেন তারা এতসব যন্ত্রণা সহ্য করেও সুখী থাকে। কারণ তাদের জন্য তো এটাই যথেষ্ট যে, আল্লাহ তাদের সাথে রয়েছেন। সন্তানকে বলুন, 'প্রিয় বৎস, আল্লাহ দুনিয়া প্রত্যেককেই দেন। পছন্দের-অপছন্দের সকলকেই। কিন্তু ঈমান শুধু তাদেরকেই দেন যাদের তিনি ভালোবাসেন। যদি তুমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-কে ভালোবাসো তা হলে ভেবে নেবে আল্লাহ তাআলা তোমাকে পছন্দ করেন। এরপর থেকে তোমার যা কিছুই হবে সবই তোমার কল্যাণে。
قُلْ هَلْ تَرَبَّصُوْنَ بِنَا إِلَّا إِحْدَى الْحُسْنَيَيْنِ
“বলুন, তোমরা তো আমাদের জন্য দুটি মঙ্গলের কোনো একটির অপেক্ষাই করছো।” [১১০]
অর্থাৎ আমাদের সাথে যা-ই ঘটুক না কেন উভয়টি কল্যাণ ও মঙ্গলের। হয়তো আমরা বিজয়ী হব না হয় প্রভুর সন্তুষ্টির পথে শাহাদাত বরণ করব। এই দুই কল্যাণকর পরিণতি ছাড়া আমাদের আর কী-ইবা ঘটবে?!
আখিরাতের সাথে সন্তানদের সম্পর্ককে মজবুত করুন। এই আয়াতটি তাদের দেখিয়ে দিন,
إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ
“নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের থেকে তাদের জান ও মাল ক্রয় করে নিয়েছেন। এই মূল্যে যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত." [১১১]
টিকাঃ
[৯৭] সূরা মুলক, ৬৭ : ২。
[৯৮] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৪৪。
[৯৯] সূরা বাকারা, ২: ১৫৫。
[১০০] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৮৬。
[১০১] সূরা হাজ্জ, ২২: ১১。
[১০২] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৮৫。
[১০৩] সূরা লোকমান, ৩১: ১৭。
[১০৪] সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭:৪。
[১০৫] সূরা ফুরকান, ২৫:২০。
[১০৬] সূরা মায়িদা, ৫:১০৫。
[১০৭] সূরা সাফ, ৬১:১৪。
[১০৮] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৭৩。
[১০৯] সূরা বুরূজ, ৮৫: ১১。
[১১০] সূরা তাওবাহ, ৯ : ৫২。
[১১১] সূরা তাওবাহ, ৯: ১১১。