📄 বাবা, সাওম পালন করতে আমার ভালো লাগে না
'বাবা, সাওম পালন করা আমার একেবারেই পছন্দ না।'
'না মা, এমনটি করা হারাম। সাওমকে তোমার পছন্দ করতেই হবে। কারণ আল্লাহ এর নির্দেশ দিয়েছেন।'
প্রিয় বাবা/মা, এই ধরনের উত্তর দেওয়ার মাধ্যমে আপনি মূলত আপনার সন্তান ও তার ঈমানকে হুমকিতে ফেলে দিলেন, অথচ আপনি ভেবেছেন, তার উপকারই করেছেন। কারণ আপনার এই উত্তর নিম্নোক্ত সম্ভাবনাগুলো তৈরি করে :
এর মাধ্যমে যেন আপনি তাকে শেখালেন, সে যেন দ্বীনের বিষয়ে নিজের অনুভূতি ও মনের ভাব প্রকাশ না করে। যদি দ্বীনের কোনো বিষয়ে তার বিরক্তিভাব তৈরি হয়, তা হলে সে যেন তার বিরক্তিভাব নিজের মধ্যেই পুষে রাখে। যার ফলে তার মধ্যে ধীরে ধীরে নিফাকের ডালপালা বিস্তৃত হতে থাকবে!
যেন আপনি তাকে জানালেন, ইসলাম হলো সম্পূর্ণ অবাস্তবিক একটি দ্বীন। সাধারণত অন্তর যা অপছন্দ করে, ইসলাম তা পছন্দ করতে একপ্রকার বাধ্য করে!
'আচ্ছা, তা হলে এই প্রশ্নের সঠিক জবাব কী হবে?'
তাকে বলবেন, 'বাবা, সাওম পালনের কারণে চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণ করে রাখা হয়, আর এটিই তোমার অপছন্দের তাই তো। তুমি খেতে চাইলে কেউ তোমাকে বাধা দিক সেটি তোমার পছন্দ না। না খেতে পেয়ে শরীরে দুর্বলতা আসুক, যা তোমার ভালো লাগে না। স্বাভাবিক, ভালো না লাগারই কথা। কিন্তু দেখো, মহান আল্লাহ তাআলা কী বলেছেন,
كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ وَهُوَ كُرْهُ لَّكُمْ
“তোমাদের ওপর যুদ্ধ ফরজ করা হয়েছে, অথচ তা তোমাদের নিকট অপছন্দনীয়।”[৮২]
এই অনুভূতির সাথে কিন্তু আরেকটি অনুভূতিও রয়েছে। আল্লাহর আনুগত্য করতে পারার সুখানুভূতি। নিজের পছন্দকে বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার প্রমাণ পেশ করতে পারার এক অনাবিল আনন্দের অনুভূতি। সাওমের বিনিময়ে আল্লাহ তোমাকে যে জান্নাত দান করবেন সে সম্পর্কে ভাবতে পারার আনন্দ। এই অনুভূতিগুলোর স্বাদ কতই-না সুমিষ্ট, সেই কষ্টের তুলনায় যা তুমি আল্লাহর জন্য পরিত্যাগ করো।'
'বাবা, খাবার থেকে বিরত থাকার প্রতি তোমার যে অপছন্দভাব রয়েছে, আনন্দের এই অনুভূতি একে হার মানাবে। তবুও যদি তোমার মনে হয় যে, আনন্দের অনুভূতি অপছন্দভাবকে হার মানাতে পারছে না তা হলে আগের সে অর্থগুলোকে আবার স্মরণ করো। দেখো, আল্লাহ তাআলা কীভাবে বলেছেন,
وَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ وَعَسَى أَنْ تُحِبُّوْا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُوْنَ
"তোমরা যা অপছন্দ করো, হতে পারে তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর যা পছন্দ করো, হতে পারে তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। নিশ্চয় আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।”[৮০]
ঠিক এভাবেই একদম সহজ করে বিষয়টি তাদের নিকট স্পষ্ট করুন। এমন একটি পদ্ধতি অবলম্বন করুন, যা তাদের মনের ভাব প্রকাশকে বাধাগ্রস্ত করবে না, আপনার জবাব শুনে ইসলামকে তাদের নিকট অবাস্তবিক কিছু মনে হবে না। ঠিক এভাবেই তাদেরকে ইসলামের সৌন্দর্য বুঝিয়ে বলুন যখন রমাদান শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে তাদেরকে আনন্দিত হতে দেখবেন。
টিকাঃ
[৮২] সূরা বাকারা, ২: ২১৬。
[৮৩] সূরা বাকারা, ২: ২১৬。
📄 আল্লাহ তোমাকে জাহান্নামে ফেলে দেবেন!
☆'মিথ্যা বললে আল্লাহ মারবে। তোমাকে জাহান্নামে ফেলে দেবেন।'
☆'তুমি যদি ভাইয়াকে মারো আল্লাহ অনেক গুনাহ লিখবেন।'
আমরা সাধারণত এসব বাক্য ব্যবহার করে শিশুদের মিথ্যা বলা থেকে বিরত রাখতে চাই! অথচ বলতে গেলে আমাদের এই বাক্যগুলোই জঘন্য পর্যায়ের মিথ্যা। আল্লাহর রহমতের প্রতি খারাপ ধারণা এসব বাক্য থেকেই শুরু হয়। আমরা এই কথাগুলো একজন শিশুকে তখন বলি যখন সে ব্যক্তিত্ব গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তরে অবস্থান করে。
১. সবাই আমরা ভালো করেই জানি, শিশুর ওপর শরীআত কোনো ভার অর্পণ করেনি এবং তার জন্য কোনো গুনাহই লেখা হয় না। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা কোনো প্রয়োজন ছাড়াই অনর্থকভাবে এমনটা করেননি। যেখানে স্বয়ং আল্লাহ শিশুদের হিসাব-নিকাশ নেবেন না, শাস্তি দেবেন না বলে নির্ধারণ করেছেন সেখানে কোন অধিকারে আমরা তার জন্য এই বিষয়গুলো সাব্যস্ত করি?!
২. হয়তো আপনি বলতে পারেন, 'কিন্তু আমি আমার সন্তানের মধ্যে আল্লাহর সার্বক্ষণিক নজরদারির বিষয়টি গেঁথে দিতে চাই'।
আচ্ছা ঠিক আছে। কিন্তু এর তো আরও বিভিন্ন পন্থা রয়েছে। আপনি তাকে বলতে পারেন, 'প্রিয় বৎস, তুমি কি আল্লাহকে ভালোবাসো না? এখন তুমি যে কাজটি করলে তা আল্লাহ মোটেও পছন্দ করেন না। আল্লাহ মিথ্যা ভালোবাসেন না, বরং তিনি সত্যবাদীকে অনেক পছন্দ করেন।'
৩. আমরা সন্তানদের গড়ে তুলব উৎসাহের দিকটিকে প্রাধান্য দিয়ে। যেমন, 'যদি আল্লাহকে খুশি করার উদ্দেশ্যে এই কাজটি তুমি ছেড়ে দাও তা হলে আল্লাহ তোমকে অনেক সাওয়াব দেবেন।' এই কথাটি কিন্তু মিথ্যা নয়। কোনো শিশু আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে যদি কোনোকিছু করে আল্লাহ তাকে তার প্রতিদান দেন。
৪. এমন একটি হাদীসও কি দেখাতে পারবেন যেখানে আল্লাহর রাসূল শিশুদেরকে আল্লাহর শাস্তির ভয় দেখিয়েছেন? বরং 'সহীহ বুখারি'র হাদীসে এসেছে, একবার হাসান সদাকার খেজুর মুখে দিয়ে ফেলেছিলেন। তখন নবিজি ওয়াক ওয়াক করলেন যাতে হাসান খেজুর মুখ থেকে ফেলে দেয়। তারপর রাসূলুল্লাহ বলেন,
أَمَا شَعَرْتَ أَنَّا لَا تَأْكُلُ الصَّدَقَةَ
“তুমি কি জানো না যে, আমরা সদাকার কোনোকিছু খাই না?”[৮৪]
'আল্লাহ মারবে, তোমাকে জাহান্নামে ফেলে দেবে' এমন কিছু কিন্তু বলেননি。
৫. যদি বলেন, 'আমি তাদেরকে হারাম কাজ থেকে বিরত রাখতে চাই।' এর জবাবে বলব, 'তবে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে নয়। হারাম থেকে বাঁচাতে গিয়ে তাদের হৃদয়ে আল্লাহ সম্পর্কে বিকৃত চিত্র অঙ্কন করা কীভাবে বৈধ হয়?'
৬. আমার এক মনোবিজ্ঞানী বন্ধুকে আমি এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছিলেন, 'একটি শিশু আট বছর পর্যন্ত যেকোনো কিছুর স্পর্শযোগ্য আকৃতি নিজের ভেতর তৈরি করে নেয়। তখন যদি সে শোনে, 'মিথ্যা বললে আল্লাহ তোমাকে মারবে। তোমাকে জাহান্নামে ফেলে দেবে।' তখন সে নিজ মানসপটে দুষ্ট লোকের আকৃতি এঁকে নেয়।'
৭. খ্রিষ্টান মিশনারি স্কুলগুলোতে দেখুন। তারা শিশুদের বলে, 'চোখ বন্ধ করো। এবার খোলো। দেখো, যিশু তোমাদের কত চকলেট দিয়েছেন!' এর বিপরীতে খুব কষ্ট হয় যখন দেখি আমাদের স্কুলগুলোতে বলা হয়, 'আল্লাহ কিন্তু তোমাকে জাহান্নামে ফেলে দেবেন!'
৮. প্রিয় শিক্ষিকা বোনটি, যখন আমার সন্তান আমাকে বলে, 'বাবা, ম্যাডাম আজ আমাদের বলেছেন, 'যদি আমরা এই কাজটি করি তা হলে আমাদের জাহান্নামে যেতে হবে' তখন আমার সামনে মাত্র দুটি পথ খোলা থাকে। হয়তো তাকে আল্লাহর প্রতি খারাপ ধারণা করার মাঝে ছেড়ে দিই কিংবা আপনার দেওয়া তথ্যের প্রতি অনাস্থার সৃষ্টি করি। আল্লাহর ওয়াস্তে হাতজোড় করে বলছি, আমাদের এই দুই পথের একটিকে বেছে নিতে বাধ্য করবেন না。
টিকাঃ
[৮৪] বুখারি, ১৪৯১; মুসলিম, ১০৬৯。
📄 আল্লাহর আশপাশে নাক গলানো!
প্রতিদিনের মতো আজও ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে সন্তানদের নিয়ে স্কুল থেকে বাসায় ফিরছিলাম। হঠাৎ লুজাইন (আমার মেয়ে, ক্লাস ফোরে পড়ে) বলে উঠল, 'বাবা, আজ আমার এক বান্ধবী আমাকে বলল, তার মা নাকি তাকে বলেছে, 'প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তবেই তুমি হিজাব ধরবে।' আমি তাকে বলে দিয়েছি, 'তোমাকে অবশ্যই প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই পর্দা করতে হবে। কারণ আল্লাহ বলেছেন,
وَإِنْ جَاهَدَاكَ عَلَى أَنْ تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا
"আর তোমার পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার সাথে শিরক করার জন্য পীড়াপীড়ি করে, যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তা হলে তুমি তাদের কথা মানবে না।” [৮৫]
এই আয়াতটি দ্বারা এমনভাবে দলীল পেশ করা এখানে জুতসই হয়নি ঠিক কিন্তু আমাকে যে বিষয়টি আশ্চর্যান্বিত করল সেটি হলো, লুজাইন বান্ধবীকে বুঝানোর জন্য কুরআন থেকে দলীল পেশ করেছে। তাই তাকে বললাম, 'লুজাইন, অসাধারণ কাজ করেছ তুমি। তোমার বান্ধবীকে আরও বলবে, যখন আল্লাহ কোনো বিষয়ের আদেশ দেবেন তখন সে বিষয়ে কারও কোনো ধরনের নাক গলানোর অধিকার নেই। আচ্ছা, একটা উদাহরণ দিই। হঠাৎ রাস্তার কোনো অপরিচিত আগন্তুক এসে তোমার ঘরের দরজায় কড়া নাড়ল। তুমি ভেতর থেকে আওয়াজ দিয়ে বললে, 'বলুন, কী চাই আপনার?' সে উত্তর দিলো, 'আমি চাই আপনি আজ কেএফসি থেকে অর্ডার করে চিকেন রোস্ট খাবেন।' তখন তুমি কী করবে?'
* 'তার কথা অগ্রাহ্য করব।' কেন করবে মা?
* 'কারণ আমি কী খাব সেটা তার বিষয় না। এতে তার মাথা ঘামানোর কী আছে?'
* 'একদম ঠিক বলেছ। এই ব্যাপারটিও ঠিক তেমন। যখন আল্লাহ আমাদের কোনো আদেশ দেন, তখন বাবা-মা যদি আল্লাহর আদেশ বিরোধী কোনো কথা বলেন তখন আল্লাহ কি সে কথাকে গ্রাহ্য করবেন?'
* 'না। কারণ সে আল্লাহর আদেশের ব্যাপারে নাক গলাচ্ছে।'
প্রিয় মুসলিম ভাইয়েরা, সন্তানদেরকে আল্লাহর সাথে পরিচয় করিয়ে দিন।
وَاللهُ يَحْكُمُ لَا مُعَقِّبَ لِحُكْمِهِ "আর আল্লাহই একমাত্র আদেশদাতা, তাঁর আদেশ রদ করার কেউ নেই।”[৮৬]
যে মহিলা তার কন্যাকে বলে, 'আল্লাহর বিধান হলো এমন কিন্তু আমি মনে করি বিষয়টি এমন হওয়া উচিত!' তাকে এই কথা জানিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, সে যে পথের দিকে ডাকছে সেটি সে ইসলাম নয় যে ইসলামে মানুষ তার রবের সামনে পরিপূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করে। আসলে সে আল্লাহর বিধানকে নয়, প্রাধান্য দিচ্ছে নিজ সিদ্ধান্তকে।
প্রিয় ভাইয়েরা, সন্তানদের এই শিক্ষা দিন,
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُوْنَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا )
“আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো কাজের আদেশ করলে কোনো ঈমানদার পুরুষ ও নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের নেওয়ার ক্ষমতা নেই। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল সে স্পষ্টভাবে পথভ্রষ্ট হলো।”[৮৭]
সন্তানদের এই শিক্ষা দিন যে, যখন আল্লাহ কোনো বিষয়ে ফায়সালা করবেন তখন সে বিষয়ে নাক গলানোর অধিকার কারও নেই। এই বিষয়ে কারও আনুগত্য চলবে না। এমনকি এই কথাও স্পষ্ট করে বলুন, খোদ আপনারাই যদি তাদেরকে আল্লাহর অবাধ্যতার আদেশ দেন তারা যেন সেই ক্ষেত্রে আপনাদের আনুগত্য না করে।
وَاللَّهُ يَحْكُمُ لَا مُعَقِّبَ لِحُكْمِهِ وَهُوَ سَرِيعُ الْحِسَابِ "আল্লাহই একমাত্র আদেশদাতা, তাঁর আদেশ রদ করার কেউ নেই?। আর তিনি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।”[৮৮]
টিকাঃ
[৮৫] সূরা লোকমান, ৩১: ১৫。
[৮৬] সূরা রা'দ, ১৩: ৪১。
[৮৭] সূরা আহযাব, ৩৩: ৩৬。
[৮৮] সূরা রা'দ, ১৩: ৪১。
📄 শিশু মনের কুরআনি জিজ্ঞাসা
আমি ভাবলাম, আজ আপনাদের নিকট একটি বিষয় শেয়ার করি। অনেক সময় পরিবারের সবাই মিলে একসাথে বসে আমরা কুরআন তিলাওয়াত করি। তো মাঝে মাঝে আমার মেয়েরা আমাকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘বাবা, এই আয়াতের অর্থ কী?’
আপনাদের প্রতিও আমার পরামর্শ থাকবে, কুরআন তিলাওয়াতের সময়টিতে সন্তানদের প্রশ্ন করার জন্য উৎসাহ দিন। বিরক্ত হয়ে এই কথা বলতে যাবেন না, ‘তোমরা এভাবে প্রশ্ন করতে থাকলে আমি তো দুই পৃষ্ঠার বেশি এগুতে পারব না।’ না, এভাবে নয়। বরং প্রশ্নের জবাব দিয়ে দুই পৃষ্ঠা তিলাওয়াত করা, সন্তানদের কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এক পারা তিলাওয়াত করার চেয়ে অনেক বেশি উত্তম। এই কারণে আপনার সন্তান যখনই বলবে, ‘বাবা, এই শব্দের অর্থ কী?’ আপনার উচিত খুব আগ্রহের সাথে তাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং তাদেরকে উৎসাহিত করা।
গত পরশু স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে আমি সূরা হিজর তিলাওয়াত করছিলাম। আমার মেয়ে (বয়স দশ বছরেরও কম) হঠাৎ আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘বাবা, نَسْلُكُهُ শব্দের কী অর্থ?’ অর্থাৎ, এই আয়াতে যে শব্দটি এসেছে সেটি,
كَذَلِكَ نَسْلُكُهُ فِي قُلُوْبِ الْمُجْرِمِينَ لَا يُؤْمِنُوْنَ بِهِ وَقَدْ خَلَتْ سُنَّةُ الْأَوَّلِينَ
“এমনিভাবে অপরাধীদের অন্তরে আমি তা প্রবেশ করিয়ে দিই যে, তারা এর প্রতি ঈমান আনবে না। পূর্ববর্তীদের থেকে এমন রীতি চলে আসছে।”[৮৯]
আকীদা সম্পর্কে শিশুদের করা-প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার পদ্ধতি বেশ দীর্ঘ আলোচনার দাবি রাখে। কিন্তু সে দীর্ঘ আলোচনার সময় আজ নয়। সামান্য যে অনুভূতি আমার হৃদয়ে উদিত হয়েছে আজ শুধু সেগুলোই আপনাদের জানাব।
আচ্ছা এবার উত্তরের দিকে ফিরে যাই। আমি তাকে বললাম, 'মা, একটু অপেক্ষা করো। আমি দেখে জানাচ্ছি।' তারপর মোবাইল খুলে আয়াতটির তাফসীর দেখতে বসলাম। বিভিন্ন মুফাসসিরের ভিন্ন ভিন্ন অভিমতগুলো দেখে নিলাম। আজাব, পথভ্রষ্টতা, তাকদীর ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনাকে পাশ কাটিয়ে বললাম, * نسلكه শব্দের অর্থ হলো, আমি তা প্রবেশ করিয়ে দিই। অর্থাৎ, কুরআনকে আমি এভাবেই অপরাধীদের অন্তরে ঢুকিয়ে দিই। নবিজি যখন তাদের সম্বোধন করেন, কুরআনের আয়াত যখন তারা শুনতে পায় সাথে সাথে তা বুঝতে সক্ষম হয়, যেহেতু আরবি ভাষা তাই তারা প্রতিটি শব্দের অর্থও বুঝে নেয়। কিন্তু এর দ্বারা তারা মোটেও প্রভাবিত হয় না, তাদের হৃদয়ে এই আয়াতগুলো ঈমান সঞ্চারিত করে না। এমনভাবে আল্লাহ তাদের হৃদয়ে কুরআনকে প্রবেশ করান যে, তারা এগুলো শুনতে ও বুঝতে সক্ষম হলেও, প্রভাবিত হয় না। এই কারণেই আল্লাহ তাআলা বলেছেন, كَذَلِكَ نَسْلُكُهُ فِي قُلُوْبِ الْمُجْرِمِينَ )
“এমনিভাবে অপরাধীদের অন্তরে আমি তা প্রবেশ করিয়ে দিই।”
* 'ঠিক আছে বাবা। আল্লাহ তাদের হৃদয়ে কুরআনকে এমনভাবে প্রবেশ করান যে, তাদের হৃদয় এর দ্বারা প্রভাবিত হয় না। কিন্তু তিনি তাদের হৃদয়কে এমন বক্র করার পর, সেই তিনিই আবার এর কারণে তাদের শাস্তি দেবেন?!'
প্রিয় ভাইয়েরা, সন্তান যখন এমন প্রশ্ন করবে তখন এই বলে ধমকাতে যাবেন না, 'এটা তুমি কী বললে? এমন প্রশ্ন হারাম! এভাবে বলে না বাবা,' এই ধরনের জবাব কোনোভাবেই কাম্য নয়। হ্যাঁ, কিছু সময় এই জবাবও দিতে হয় যে, 'আমরা যেহেতু মুসলিম তাই আমাদের চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করতে হবে, আল্লাহর বিধানের সামনে আত্মসমর্পণ করতে হবে।' তবে যেকোনো প্রশ্নের জবাবে তো আর এই কথা বলা যায় না। বরং অধিকাংশ প্রশ্নের উত্তর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে সন্তানদের সন্তুষ্ট করা সম্ভব।
তাই আমি মুচকি হেসে বললাম, 'খুব ভালো প্রশ্ন করেছ লীন, তুমি বলতে চাইছ, কেন আল্লাহ তাদেরকে নিজ থেকে পথভ্রষ্ট করে আবার শাস্তি দেবেন তাই তো?' 'হ্যাঁ, বাবা।' * 'ঠিক আছে দাঁড়াও। বলছি।'
এভাবে সন্তানকে বুঝতে দিন, আপনি প্রশ্নটিকে গুরুত্বের সাথে নিচ্ছেন, আর খুব মনোযোগের সাথে তার কথা শুনছেন। তারপর হতে পারে প্রশ্নের উত্তর আপনার জানা আছে, আবার জানা নাও থাকতে পারে। যদি জানা না থাকে বলুন, 'মা, আমি তোমার প্রশ্ন বুঝতে পেরেছি। ইন শা আল্লাহ, আজ বা কাল ওই সময়ে আমি তোমাকে বিষয়টি বুঝিয়ে দেবো।' আপনি জবাব দিতে আগ্রহী এই বিষয়টি তাকে বুঝতে দেবেন।
আমার মরহুম পিতা একদিন আমাকে বলেছিলেন, 'সন্তান যখন কোনো প্রশ্ন করে সে সময়টিই হলো শিক্ষা দানের সবচেয়ে অনুকূল মুহূর্ত। কারণ তখন তাদের হৃদয় তোমার কাছ থেকে কোনোকিছু জানতে মুখিয়ে থাকে। তাদেরকে ডেকে পড়ানোর চেয়ে এই সময়টি অধিক কার্যকর।'
আচ্ছা যাক। আমি তাকে বললাম, 'বেশ ভালো প্রশ্ন করেছ। এর উত্তর হলো, তারা নিজেরাই নিজেদের পথভ্রষ্টতার জন্য দায়ী। দেখো, আল্লাহ তাআলা কীভাবে বলেছেন,
كَذَلِكَ نَسْلُكُهُ فِي قُلُوْبِ الْمُجْرِمِينَ
“এমনিভাবে অপরাধীদের অন্তরে আমি তা প্রবেশ করিয়ে দিই।”
অপরাধী কারা? যারা রাসূলের কথা শোনার পরও, সত্যকে সত্য বলে জানার পরও অনুসরণ করবে দূরে থাক; বরং উপহাস ও ঠাট্টামজাকে লিপ্ত ছিল। কুরআন তাই আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে, সত্যকে সত্য বলে জানার পরও, প্রথম থেকেই এর বিরোধীতা করার পরিণতি কতটা ভয়ংকর হতে পারে। এই কারণে আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেছেন,
وَنُقَلِّبُ أَفْئِدَتَهُمْ وَأَبْصَارَهُمْ كَمَا لَمْ يُؤْمِنُوا بِهِ أَوَّلَ مَرَّةٍ وَّنَذَرُهُمْ فِي طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُوْنَ
“যেহেতু তারা প্রথমবারে এর ওপর ঈমান আনেনি, তাই আমিও তাদের অন্তর ও দৃষ্টিকে উল্টে দেবো। আর আমি তাদেরকে তাদের অবাধ্যতায় উদভ্রান্ত ছেড়ে দেবো。”[৯০]
এই আয়াত আমাদের শিক্ষা দিচ্ছে, সত্য যখন আমাদের সামনে স্পষ্ট হবে তখন যেন আমরা হিংসাবশত কিংবা অহংকার করে একে প্রত্যাখ্যান না করি। যদি আমরা সত্যকে অস্বীকার করি, হতে পারে আল্লাহ এমন অবস্থা সৃষ্টি করবেন যে, আমরা কুরআন শুনব অথচ তা আমাদের হৃদয়ে কোনো প্রভাব সৃষ্টি করবে না! এমনিভাবে কুরআন আমার হৃদয়ে প্রবেশ করবে যেভাবে অপরাধীদের হৃদয়ে তা প্রবেশ করেছিল। এটিই হলো এই আয়াতের শিক্ষা।'
বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট হওয়ার জন্য সহজ ও বোধগম্য কিছু উদাহরণ দেওয়ার চেষ্টা করবেন। যেমন, উপরিউক্ত বিষয়টি বুঝাতে গিয়ে আমি তাকে বলেছি, 'ধরো তোমার হৃদয় হলো একটি আয়না। উজ্জ্বল ও স্বচ্ছ আয়না। এখন তুমি যদি এটাকে তোমার সামনে ধরো, দেখবে তোমার পরিপূর্ণ অবয়ব স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। কিন্তু সে স্বচ্ছ আয়নায় যদি তুমি কাদা মেখে দাও, বলো দেখি, তুমি কি পরিপূর্ণ আকৃতি দেখতে পাবে?'
'না।'
কথা বলার মাঝখানে কিছু প্রশ্ন করবেন যাতে আগ্রহ বাকি থাকে。
* 'ঠিক একইভাবে কোনো মানুষকে যখন আল্লাহ বারবার সতর্ক করেন, তাকে বলেন, হে মানব সন্তান, যদি তুমি আমার কথা অস্বীকার করো, আমার ওপর অহংকার দেখাও আমি তোমার হৃদয়ের আয়না মলিন করে দেবো।'
فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُوْنَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ *
“কাজেই যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে তারা যেন সতর্ক হয় যে, বিপর্যয় তাদের ওপর আপতিত হবে কিংবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি নেমে আসবে।”[৯১]
যখন তুমি অবাধ্যাচরণ করবে আল্লাহ তোমার হৃদয়কে এতটা কর্দমাক্ত করে দেবেন যে, তুমি সত্যকে সত্য আর মিথ্যাকে মিথ্যা বলে চিহ্নিত করতে পারবে না।
فَلَمَّا زَاغُوْا أَزَاغَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ )
“অতঃপর যখন তারা বক্র পথ অবলম্বন করল, আল্লাহ তাদের হৃদয়কেও বক্র করে দিলেন। নিশ্চয় আল্লাহ পাপাচারীদের পথপ্রদর্শন করেন না।”[৯২]
☆'ওহ আচ্ছা। বাবা, তা হলে তারা নিজেদের কারণেই পথভ্রষ্ট হয়েছে, তাই না?' * 'হ্যাঁ মা। নিজেদের কারণেই। দেখো, আল্লাহ তাআলা কী বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ النَّاسَ شَيْئًا وَلَكِنَّ النَّاسَ أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُوْنَ )
“আল্লাহ মানুষের ওপর কোনো জুলুম করেন না, বরং মানুষ নিজেই নিজের ওপর জুলুম করে।”[৯৩]
এতগুলো আয়াত আমাদের কী শিক্ষা দিচ্ছে?
হক আমাদের নিকট স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর আমরা যেন এর বিরোধীতা না করি。
আমাদের হৃদয়ের আয়না যেন স্বচ্ছ থাকে। কোনোভাবেই যেন এটিকে কর্দমাক্ত হতে না দিই। যদি ময়লা বসে যায় তখন সবকিছু আমরা উলটো দেখতে পাব, হককে বাতিল আর বাতিলকে হক মনে করে বসব。
আল্লাহর সামনে আমাদের বিনয় প্রদর্শন করতে হবে। তিনি আমাদের সতর্ক করে দেওয়ার পরও যদি আমরা তার ওপর অহংকার প্রদর্শন করি হতে পারে হককে আমরা চিরতরের জন্য কখনো চিনতে আর সক্ষম হব না。
কিন্তু যদি আমরা বিনয় ও নম্রতা প্রদর্শন করি, হাদীসে কুদসিতে কী এসেছে দেখো,
يَا عِبَادِي كُلُّكُمْ ضَالٌّ إِلَّا مَنْ هَدَيْتُهُ فَاسْتَهْدُوْنِي أَهْدِكُمْ
“আমার বান্দারা, তোমরা সবাই ছিলে পথহারা, তবে আমি যাকে হিদায়াত দিয়েছি সে ব্যতীত। অতএব তোমরা আমার নিকট হিদায়াত প্রার্থনা করো, আমি তোমাদের হিদায়াত দান করব।”[৯৪]
মেয়েকে আরও বললাম, 'আল্লাহ তাআলা দয়ালু। যখন তিনি কারও মধ্যে সততা, সরলতা ও কল্যাণ দেখতে পান তাকে বারবার সুযোগ দিয়ে থাকেন। এই কারণেই তিনি বলেছেন,
وَلَوْ عَلِمَ اللَّهُ فِيْهِمْ خَيْرًا لَّأَسْمَعَهُمْ
“আল্লাহ যদি তাদের মধ্যে ভালো কিছু দেখতেন, তবে তিনি অবশ্যই তাদেরকে শুনাতেন।”[৯৫]
সর্বশেষ তাকে স্মরণ করিয়ে দিলাম, নবিজির নুবুওয়াতপ্রাপ্তির পর এমন অনেক ব্যক্তি পাওয়া যায় যারা ৬-৭ বছর তাঁর দাওয়াতের পথে বাধা সৃষ্টি করেছিল, কিন্তু শেষমেশ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলেই আশ্রয় নিয়েছিল। অর্থাৎ যখনই আল্লাহ তাআলা কোনো ব্যক্তির মধ্যে কল্যাণ দেখতে পান, কুফরির ওপর তাকে মৃত্যু দেন না। অপরদিকে যারা কুরআনের ভাষায় অপরাধী তাদের পরিণাম হয় ভয়াবহ。
প্রিয় ভাইয়েরা, ছোট্ট এই অভিজ্ঞতাটুকু আপনাদের সাথে আলোচনা করলাম, এই আশায় যে, হয়তো কারও উপকারে আসবে。
টিকাঃ
[৮৯] সূরা হিজর, ১৫: ১২১。
[৯০] সূরা আনআম, ৬:১১০。
[৯১] সূরা নূর, ২৪:৬৩。
[৯২] সূরা সাফ, ৬১ : ৫。
[৯৩] সূরা ইউনুস, ১০: ৪৪。
[৯৪] মুসলিম, ২৫৭৭。
[৯৫] সূরা আনফাল, ৮: ২৩。