📄 মাপকাঠি
কোনো এক মাধ্যমিক স্কুলের ছাত্রীদের মাঝে ছেলে-মেয়ের পারস্পরিক মেলামেশার বিষয়ে মতানৈক্য দেখা দিলো। একদল মনে করে 'ভালো উদ্দেশ্য' থাকলেই যথেষ্ট হবে, কিন্তু অপরপক্ষের মত হলো শারীআতের বেঁধে দেওয়া নিয়ম মানতেই হবে。
'আমরা তো এখনো ছোটো।'
* 'ছোটো কিংবা বড়ো হওয়াটা কীসের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে? তা ছাড়া প্রশ্নটা হওয়া উচিত ছিল, শারীআত তার ওপর দায়িত্ব চাপিয়েছে কি না? তার কাছ থেকে হিসেব গ্রহণ করা হবে নাকি সে বিনা হিসেবে পার পেয়ে যাবে?'
* 'যা-ই বলো না কেন, মেলামেশার কাজটা অত খারাপ কিছু না।'
☆ "খারাপ কিছু না' কোন হিসেবে বললে? সমাজ নাকি শারীআতের মানদণ্ডে?'
* 'তুমি দেখছি মাত্রাতিরিক্ত হুজুর হয়ে গেছ!'
আলোচনা এখানে এসে থেমে গেল। একসময় ঘটনা শিক্ষিকার কান পর্যন্ত পৌঁছল। তিনি ক্লাসরুমে আসলেন। কোনো রকম ভূমিকাতে না গিয়ে হঠাৎ প্রশ্ন করে বসলেন, 'এই টেবিলটি ছোটো নাকি বড়ো?'
একজন বলল, 'বড়ো।' সাথে সাথে অপর পাশ থেকে উত্তর এল, 'না, ছোটো।' তৃতীয়জন বলল, 'মাঝামাঝি।'
শিক্ষিকা : 'তোমরা এভাবে মতানৈক্যে জড়িয়ে পড়লে! এখন মেয়েরা বলো, এই অবস্থায় আমাদের করণীয় কী?'
* একজন বলল, 'ছোটো আর বড়োর সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে হবে।'
* 'বাহ! এবার বলো, সংজ্ঞা নির্ধারণের পর কী করতে হবে?'
* 'একটি স্কেল লাগবে। যাতে মেপে নির্ধারণ করে বলা যায় যে, জিনিসটা ছোটো নাকি বড়ো।'
* 'মা শা আল্লাহ! বেশ ভালো বলেছ। এভাবেই আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে একটি স্কেলের প্রয়োজন। মাপকাঠি না থাকলে আমরা মতানৈক্য করেই যাব। মেয়েরা, এখন বলো তো দেখি, কোন সে স্কেল যেটা দিয়ে আমরা জীবনের সবকিছু মাপতে পারি?'
'সমাজ।'
* 'আচ্ছা। কিন্তু সমাজ যদি পালটে যায়?' ছাত্রীরা সবাই চুপ。
একজন বলল, 'তা হলে আমাদের বাবা-মা যে শিক্ষা দিয়েছেন সেটি।'
* 'কিন্তু তারাও যদি তোমাদের মতো মতানৈক্যে জড়িয়ে পড়ে।'
* 'তা হলে, বোধবুদ্ধি।'
* 'সবার বোধবুদ্ধি কি এক রকম?'
* 'না।'
* 'তা হলে তখন কার বোধবুদ্ধি দিয়ে আমরা চলব?' সবাই চুপ। আরেকজন বলল, 'তা হলে যুক্তি দিয়ে বিচার করব।'
* 'তোমার নিকট যেটা যুক্তির, সেটা কি সবার নিকট যুক্তিপূর্ণ বলে গণ্য হবে?'
* 'না।' আবার সবাই চুপ。
* 'আচ্ছা তোমরাই বলো, সমাজ, প্রচলন, পারিবারিক শিক্ষা, বোধবুদ্ধি, যুক্তি এসব তোমাদের সঠিক পথ দেখাবে বলে কোনো নিশ্চয়তা কি আছে?' মেয়েরা চুপচাপ ভাবছে। শেষমেশ 'মাত্রাতিরিক্ত হুজুর হয়ে যাওয়া' মেয়েটি বলল,
'আমরা শারীআ দিয়েই সবকিছু মাপব।'
* 'একদম ঠিক বলেছ। আমার মেয়েরা, আমরা সবাই মুসলিম। তোমরা কি জানো, মুসলিম বলতে কী বুঝায়? মুসলিম হলো যারা একমাত্র আল্লাহর নির্দেশের সামনে আত্মসমর্পণ করে। টু শব্দটিও করে না। আল্লাহ তাআলা কী বলেছেন শোনো-
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ
“আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো কাজের আদেশ করলে কোনো ঈমানদার পুরুষ ও নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন কোনো সিদ্ধান্তের নেওয়ার ক্ষমতা নেই।”[৭৭]
وَمَا اخْتَلَفْتُمْ فِيْهِ مِنْ شَيْءٍ فَحُكْمُهُ إِلَى اللَّهِ
“আর তোমরা যে বিষয়েই মতভেদ করো না কেন, এর ফয়সালা আল্লাহর নিকটেই সোপর্দ।”[৭৮]
فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا *
“যদি তোমরা কোনো বিষয়ে বিবাদে লিপ্ত হও, তা হলে তা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নিকট ফিরিয়ে দাও। যদি তোমরা আল্লাহ ও কিয়ামাত দিবসের ওপর বিশ্বাসী হয়ে থাকো। আর এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে উত্তম।”[৭৯]
আমার মেয়েরা, আমরা অনেক সময় ভুল করি, কখনো-বা শারীআতের বিধানকে অমান্য করি কিন্তু একটি বিষয় একেবারে স্পষ্ট থাকা উচিত। আর তা হলো : শারীআতের বিধানই হলো একমাত্র সঠিক ও নির্ভুল।
আল্লাহ তাআলা এই সম্মানিতা শিক্ষিকাকে কবুল করুন। তাদের মতো ব্যক্তি আরও বৃদ্ধি করুন। আহ, তাদের সংখ্যা কতই-না কম!
আপনার সন্তানকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে শিক্ষাটি দেবেন তা হলো : শারীআতই আমাদের জীবনের মাপকাঠি। সবকিছু পরিচালিত করতে হবে কেবল শারীআত নির্ধারিত পদ্ধতিতেই。
টিকাঃ
[৭৭] সূরা আহযাব, ৩৩: ৩৬。
[৭৮] সূরা শূরা, ৪২: ১০。
[৭৯] সূরা নিসা, ৪:৫৯。
📄 বাবা, তুমি আমাকে দ্বীনের ব্যাপারে বিতৃষ্ণ করে ফেলেছো!
পুত্র : 'বাবا, আমাকে একটি অ্যান্ড্রয়েড সেট কিনে দাও।'
পিতা: 'কিন্তা বাবা, এখন তুমি এর জন্য মোটেও উপযুক্ত নও। কেন নও সেটা এর আগেও ব্যাখ্যা করেছি। আমি তোমার কল্যাণ চাই আর তোমার ব্যাপারে একদিন আল্লাহর দরবারে আমি জিজ্ঞাসিত হব।'
পুত্র : 'বাবা, এর মাধ্যমে তুমি আমাকে দ্বীনের ব্যাপারে বিতৃষ্ণ করে ফেলছো।'
কন্যা: 'বাবা, ঈদ উপলক্ষে আমার এই পোশাকটা চাই-ই চাই।'
পিতা: 'না মা, এটা উলঙ্গ কাপড়। ইসলামসম্মত নয়।'
কন্যা: 'বাবা, এর মাধ্যমে তুমি আমাকে দ্বীনের ব্যাপারে বিতৃষ্ণ করে তুলছো।'
স্ত্রী : 'সন্তানদের এভাবে চাপে রেখো না। কেন শুধু শুধু তাদের সামনে দ্বীনকে এভাবে কষ্টের বানিয়ে ফেলছো?...'
মা (সন্তানদের দাদী) : 'এভাবে চাপ দিয়ো না। দ্বীনের ব্যাপারে তারা বিরক্ত হয়ে পড়বে।...'
পিতা: 'সবাই বসো। আমি কী বলছি মনোযোগ দিয়ে শোনো, আমার দায়িত্ব হলো, সন্তানদের আল্লাহ ও তাঁর রাসূল -এর আনুগত্যের ওপর গড়ে তোলা। যে বিষয়ে আমি তাদের আদেশ করব সে ক্ষেত্রে আমিই তাদের আদর্শ ও দৃষ্টান্ত হব। যদ্দুর সম্ভব তাদের নিকট আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর দ্বীনকে প্রিয় করে তুলব। সেসাথে আমার আরও দায়িত্ব হলো, তাদেরকে সৎকাজের আদেশ দেওয়া ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা, দুনিয়া বা আখিরাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন বিষয় থেকে তাদের রক্ষা করা, তাদের সঙ্গ দেওয়া, সঠিক বিকল্প খুঁজে দেওয়া এবং যদ্দুর সম্ভব উপকারী বস্তু দ্বারা তাদের জীবনকে পূর্ণতা দেওয়া। এতসব কিছু করার পর, যে দ্বীনকে আপন করে নেবে সে সফল, অপরদিকে যে ঘৃণার চোখে দেখবে তার ব্যাপারে,
إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ
"আপনি যাকে ভালোবাসেন ইচ্ছে করলেই তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না।” [৮০]
'বেশি চাপ দিয়ো না, তারা দ্বীন থেকে উদাসীন হয়ে পড়বে' এমন কথা আপনারা আমাকে বলবেন না। তখন তারা সুযোগ পেয়ে যাবে, আমাকে আল্লাহর অবাধ্য হতে বাধ্য করবে। আমার প্রিয় সন্তান, তোমরা দ্বীন থেকে বিমুখ হবে ভেবে আমি আমার রবের অবাধ্য হতে পারি না। আল্লাহ তাঁর নবি-কে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন,
قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَكُمُ الْحَقُّ مِنْ رَّبِّكُمْ فَمَنِ اهْتَدَى فَإِنَّمَا يَهْتَدِي لِنَفْسِهِ وَمَنْ ضَلَّ فَإِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيْهَا وَمَا أَنَا عَلَيْكُم بِوَكِيْلٍ *
“আপনি বলুন, 'হে লোকসকল, তোমাদের রবের কাছ থেকে তোমাদের নিকট সত্য চলে এসেছে। কাজেই যারা সৎপথ অবলম্বন করবে তারা তো নিজেদের মঙ্গলের জন্যই সৎপথ অবলম্বন করবে, আর যারা পথভ্রষ্ট হবে তারা পথভ্রষ্ট হবে নিজেদেরই ধ্বংসের জন্য এবং আমি তোমাদের ওপর কর্মবিধায়ক নই।” [৮১]
“আমি তোমাদের ওপর কর্মবিধায়ক নই”-এর অর্থ হলো, তোমাদের সঠিক পথে চলতে বাধ্য করার দায়িত্ব আমার ওপর বর্তায় না। বরং তোমাদের বিষয়টি আল্লাহর ওপর সোপর্দ। তিনিই তোমাদের মধ্যে যাকে চান, সঠিক পথে অটল রাখবেন。
তাই তোমাদের প্রতি আমার যা কর্তব্য রয়েছে আমি তা পালন করেই যাব। এই ক্ষেত্রে আল্লাহর অবাধ্যতা আমি করতে পারব না। যে ব্যাপারে আল্লাহ আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন সে ব্যাপারে আমি তোমাদের বাধ্য করব। আমি চাই আল্লাহ তোমাদের সঠিক পথ দেখান, নিশ্চয় আল্লাহ যা চান তা-ই করেন。
[বি. দ্র. : এটি একটি সাধারণ সংলাপ। আমার সাথে এমন কিছু ঘটেনি, আলহামদুলিল্লাহ। এক ভাই এই বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন বিধায় ভাবলাম এদিকে একটু ইঙ্গিত দিই。]
টিকাঃ
[৮০] সূরা কাসাস, ২৮: ৫৬。
[৮১] সূরা ইউনুস, ১০: ১০৮。
📄 বাবা, সাওম পালন করতে আমার ভালো লাগে না
'বাবা, সাওম পালন করা আমার একেবারেই পছন্দ না।'
'না মা, এমনটি করা হারাম। সাওমকে তোমার পছন্দ করতেই হবে। কারণ আল্লাহ এর নির্দেশ দিয়েছেন।'
প্রিয় বাবা/মা, এই ধরনের উত্তর দেওয়ার মাধ্যমে আপনি মূলত আপনার সন্তান ও তার ঈমানকে হুমকিতে ফেলে দিলেন, অথচ আপনি ভেবেছেন, তার উপকারই করেছেন। কারণ আপনার এই উত্তর নিম্নোক্ত সম্ভাবনাগুলো তৈরি করে :
এর মাধ্যমে যেন আপনি তাকে শেখালেন, সে যেন দ্বীনের বিষয়ে নিজের অনুভূতি ও মনের ভাব প্রকাশ না করে। যদি দ্বীনের কোনো বিষয়ে তার বিরক্তিভাব তৈরি হয়, তা হলে সে যেন তার বিরক্তিভাব নিজের মধ্যেই পুষে রাখে। যার ফলে তার মধ্যে ধীরে ধীরে নিফাকের ডালপালা বিস্তৃত হতে থাকবে!
যেন আপনি তাকে জানালেন, ইসলাম হলো সম্পূর্ণ অবাস্তবিক একটি দ্বীন। সাধারণত অন্তর যা অপছন্দ করে, ইসলাম তা পছন্দ করতে একপ্রকার বাধ্য করে!
'আচ্ছা, তা হলে এই প্রশ্নের সঠিক জবাব কী হবে?'
তাকে বলবেন, 'বাবা, সাওম পালনের কারণে চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণ করে রাখা হয়, আর এটিই তোমার অপছন্দের তাই তো। তুমি খেতে চাইলে কেউ তোমাকে বাধা দিক সেটি তোমার পছন্দ না। না খেতে পেয়ে শরীরে দুর্বলতা আসুক, যা তোমার ভালো লাগে না। স্বাভাবিক, ভালো না লাগারই কথা। কিন্তু দেখো, মহান আল্লাহ তাআলা কী বলেছেন,
كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ وَهُوَ كُرْهُ لَّكُمْ
“তোমাদের ওপর যুদ্ধ ফরজ করা হয়েছে, অথচ তা তোমাদের নিকট অপছন্দনীয়।”[৮২]
এই অনুভূতির সাথে কিন্তু আরেকটি অনুভূতিও রয়েছে। আল্লাহর আনুগত্য করতে পারার সুখানুভূতি। নিজের পছন্দকে বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার প্রমাণ পেশ করতে পারার এক অনাবিল আনন্দের অনুভূতি। সাওমের বিনিময়ে আল্লাহ তোমাকে যে জান্নাত দান করবেন সে সম্পর্কে ভাবতে পারার আনন্দ। এই অনুভূতিগুলোর স্বাদ কতই-না সুমিষ্ট, সেই কষ্টের তুলনায় যা তুমি আল্লাহর জন্য পরিত্যাগ করো।'
'বাবা, খাবার থেকে বিরত থাকার প্রতি তোমার যে অপছন্দভাব রয়েছে, আনন্দের এই অনুভূতি একে হার মানাবে। তবুও যদি তোমার মনে হয় যে, আনন্দের অনুভূতি অপছন্দভাবকে হার মানাতে পারছে না তা হলে আগের সে অর্থগুলোকে আবার স্মরণ করো। দেখো, আল্লাহ তাআলা কীভাবে বলেছেন,
وَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ وَعَسَى أَنْ تُحِبُّوْا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُوْنَ
"তোমরা যা অপছন্দ করো, হতে পারে তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর যা পছন্দ করো, হতে পারে তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। নিশ্চয় আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।”[৮০]
ঠিক এভাবেই একদম সহজ করে বিষয়টি তাদের নিকট স্পষ্ট করুন। এমন একটি পদ্ধতি অবলম্বন করুন, যা তাদের মনের ভাব প্রকাশকে বাধাগ্রস্ত করবে না, আপনার জবাব শুনে ইসলামকে তাদের নিকট অবাস্তবিক কিছু মনে হবে না। ঠিক এভাবেই তাদেরকে ইসলামের সৌন্দর্য বুঝিয়ে বলুন যখন রমাদান শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে তাদেরকে আনন্দিত হতে দেখবেন。
টিকাঃ
[৮২] সূরা বাকারা, ২: ২১৬。
[৮৩] সূরা বাকারা, ২: ২১৬。
📄 আল্লাহ তোমাকে জাহান্নামে ফেলে দেবেন!
☆'মিথ্যা বললে আল্লাহ মারবে। তোমাকে জাহান্নামে ফেলে দেবেন।'
☆'তুমি যদি ভাইয়াকে মারো আল্লাহ অনেক গুনাহ লিখবেন।'
আমরা সাধারণত এসব বাক্য ব্যবহার করে শিশুদের মিথ্যা বলা থেকে বিরত রাখতে চাই! অথচ বলতে গেলে আমাদের এই বাক্যগুলোই জঘন্য পর্যায়ের মিথ্যা। আল্লাহর রহমতের প্রতি খারাপ ধারণা এসব বাক্য থেকেই শুরু হয়। আমরা এই কথাগুলো একজন শিশুকে তখন বলি যখন সে ব্যক্তিত্ব গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তরে অবস্থান করে。
১. সবাই আমরা ভালো করেই জানি, শিশুর ওপর শরীআত কোনো ভার অর্পণ করেনি এবং তার জন্য কোনো গুনাহই লেখা হয় না। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা কোনো প্রয়োজন ছাড়াই অনর্থকভাবে এমনটা করেননি। যেখানে স্বয়ং আল্লাহ শিশুদের হিসাব-নিকাশ নেবেন না, শাস্তি দেবেন না বলে নির্ধারণ করেছেন সেখানে কোন অধিকারে আমরা তার জন্য এই বিষয়গুলো সাব্যস্ত করি?!
২. হয়তো আপনি বলতে পারেন, 'কিন্তু আমি আমার সন্তানের মধ্যে আল্লাহর সার্বক্ষণিক নজরদারির বিষয়টি গেঁথে দিতে চাই'।
আচ্ছা ঠিক আছে। কিন্তু এর তো আরও বিভিন্ন পন্থা রয়েছে। আপনি তাকে বলতে পারেন, 'প্রিয় বৎস, তুমি কি আল্লাহকে ভালোবাসো না? এখন তুমি যে কাজটি করলে তা আল্লাহ মোটেও পছন্দ করেন না। আল্লাহ মিথ্যা ভালোবাসেন না, বরং তিনি সত্যবাদীকে অনেক পছন্দ করেন।'
৩. আমরা সন্তানদের গড়ে তুলব উৎসাহের দিকটিকে প্রাধান্য দিয়ে। যেমন, 'যদি আল্লাহকে খুশি করার উদ্দেশ্যে এই কাজটি তুমি ছেড়ে দাও তা হলে আল্লাহ তোমকে অনেক সাওয়াব দেবেন।' এই কথাটি কিন্তু মিথ্যা নয়। কোনো শিশু আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে যদি কোনোকিছু করে আল্লাহ তাকে তার প্রতিদান দেন。
৪. এমন একটি হাদীসও কি দেখাতে পারবেন যেখানে আল্লাহর রাসূল শিশুদেরকে আল্লাহর শাস্তির ভয় দেখিয়েছেন? বরং 'সহীহ বুখারি'র হাদীসে এসেছে, একবার হাসান সদাকার খেজুর মুখে দিয়ে ফেলেছিলেন। তখন নবিজি ওয়াক ওয়াক করলেন যাতে হাসান খেজুর মুখ থেকে ফেলে দেয়। তারপর রাসূলুল্লাহ বলেন,
أَمَا شَعَرْتَ أَنَّا لَا تَأْكُلُ الصَّدَقَةَ
“তুমি কি জানো না যে, আমরা সদাকার কোনোকিছু খাই না?”[৮৪]
'আল্লাহ মারবে, তোমাকে জাহান্নামে ফেলে দেবে' এমন কিছু কিন্তু বলেননি。
৫. যদি বলেন, 'আমি তাদেরকে হারাম কাজ থেকে বিরত রাখতে চাই।' এর জবাবে বলব, 'তবে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে নয়। হারাম থেকে বাঁচাতে গিয়ে তাদের হৃদয়ে আল্লাহ সম্পর্কে বিকৃত চিত্র অঙ্কন করা কীভাবে বৈধ হয়?'
৬. আমার এক মনোবিজ্ঞানী বন্ধুকে আমি এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছিলেন, 'একটি শিশু আট বছর পর্যন্ত যেকোনো কিছুর স্পর্শযোগ্য আকৃতি নিজের ভেতর তৈরি করে নেয়। তখন যদি সে শোনে, 'মিথ্যা বললে আল্লাহ তোমাকে মারবে। তোমাকে জাহান্নামে ফেলে দেবে।' তখন সে নিজ মানসপটে দুষ্ট লোকের আকৃতি এঁকে নেয়।'
৭. খ্রিষ্টান মিশনারি স্কুলগুলোতে দেখুন। তারা শিশুদের বলে, 'চোখ বন্ধ করো। এবার খোলো। দেখো, যিশু তোমাদের কত চকলেট দিয়েছেন!' এর বিপরীতে খুব কষ্ট হয় যখন দেখি আমাদের স্কুলগুলোতে বলা হয়, 'আল্লাহ কিন্তু তোমাকে জাহান্নামে ফেলে দেবেন!'
৮. প্রিয় শিক্ষিকা বোনটি, যখন আমার সন্তান আমাকে বলে, 'বাবা, ম্যাডাম আজ আমাদের বলেছেন, 'যদি আমরা এই কাজটি করি তা হলে আমাদের জাহান্নামে যেতে হবে' তখন আমার সামনে মাত্র দুটি পথ খোলা থাকে। হয়তো তাকে আল্লাহর প্রতি খারাপ ধারণা করার মাঝে ছেড়ে দিই কিংবা আপনার দেওয়া তথ্যের প্রতি অনাস্থার সৃষ্টি করি। আল্লাহর ওয়াস্তে হাতজোড় করে বলছি, আমাদের এই দুই পথের একটিকে বেছে নিতে বাধ্য করবেন না。
টিকাঃ
[৮৪] বুখারি, ১৪৯১; মুসলিম, ১০৬৯。