📄 তাদের বুঝতে দিন, আপনি তাদের প্রতি যত্নশীল
আমাকে যদি জিজ্ঞেস করেন, 'এই যুগে সন্তানদের ওপর প্রভাব বিস্তার করব কীভাবে? বিশেষ করে এই সময়ে যখন নেতিবাচক ও ভয়ংকর সব প্রভাব তাদের আচ্ছন্ন করে রাখছে?
উত্তরে আমি বলব, 'এর একমাত্র উপায় হলো, তাদের ভেতর এই অনুভূতি তৈরি করুন যে, আপনি তাদের গুরুত্ব দেন। তাদের বিষয়ে আপনি যথেষ্ট মনোযোগী ও যত্নশীল। দ্বীন, সুস্থতা, মানসিকতা থেকে শুরু করে সব বিষয়ে আপনি তাদের জন্য সর্বোত্তমটাই কামনা করেন, এমনকি এর জন্য নিজেকে একপ্রকার বিলিয়ে দেন।'
অন্যান্য সব বস্তু যেভাবে তাদের মোহাবিষ্ট করে রেখেছে আমাদের হয়তো প্রভাব বিস্তারের সে শক্তিটুকু নেই, কিন্তু তাদের প্রতি আমাদের প্রকৃত মনোযোগ একসময় তাদের বাধ্য করবে আমাদের কোলে আশ্রয় নিতে। যতক্ষণ-না সন্তানদের প্রতি এই মনোযোগ আপনি দিতে পারছেন ততক্ষণ আপনি সফল পিতা হতে পারবেন না।
আপনি নিজ কন্যাকে পর্দার আদেশ দিলেন। কিন্তু কেন? কারণ সমাজ আপনাকে ভালো বলবে। 'বেপর্দা কন্যার বাপ' বলে আপনাকে তারা ভর্ৎসনা করবে না। ব্যস শুধুমাত্র এই কারণেই। তখন কন্যা মনে মনে ভাববে, 'এসব তোমার ব্যক্তিগত সমস্যা। তোমার কারণে আমি তো আর নিজের লাইফস্টাইল বদলাতে পারি না!' কন্যাকে তখন এই কথা বলে খুব একটা সুবিধা করতে পারবেন না যে, 'তোমার কল্যাণের কথা ভেবেই আমি পর্দার আদেশ দিচ্ছি।' প্রত্যুত্তরে হয়তো মনে মনে সে বলে উঠতে পারে, 'তুমি আবার কখন থেকে আমার প্রতি যত্নশীল হতে শুরু করলে!?'
হ্যাঁ হতে পারে, সন্তানদের আপনি সর্বোত্তম খাবার খাওয়ান, দোকানের সবচেয়ে দামি পোশাক কিনে দেন, ঘর-চিকিৎসা থেকে শুরু করে বেশ আরামেই তাদের রেখেছেন, হতে পারে চাইবার আগেই ট্যাব, আইফোন দিয়ে তাদের হাত ভরে রেখেছেন, শিক্ষার পেছনে লাখ লাখ টাকা ঢালছেন কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও তাদের চাহিদা মনোযোগ দিয়ে শোনার ফুরসতটুকু আপনার হয় না, সন্তানদের সামাজিক ও মানসিক সমস্যা সমাধানের কোনো চেষ্টা আপনি করেন না, তাদের প্রতিভা বিকাশে ও যোগ্যতা তৈরিতে কোনো সচেষ্ট ভূমিকা আপনি রাখেন না, এমনকি নিজের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিতে কীভাবে তাকাতে হয় সেটি পর্যন্ত তাদের শেখান না। তারা আপনার সাথে কথা বলছে আর আপনি ডুবে আছেন মোবাইলে, কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেকে সফল প্রমাণ করতে আপনি ব্যস্ত!
এমনকি প্রিয় বোন, সন্তানকে পড়ানোর সময় আপনি বলে বসলেন, 'ভালো করে পড়াশোনা করো। তুমি ফেইল করলে সবাই আমাকে কী বলবে?!' যেন সন্তানেরা শুধুমাত্র আপনার 'ব্যক্তিগত চাকচিক্যের' অংশ, আপনার কাছে তার অস্তিত্বের যেন কোনো গুরুত্বই নেই!
এরপর কন্যা যখন তার প্রতি আপনার কোনো যত্ন ও গুরুত্ব দেখতে পাবে না, তখন শেষমেশ আপনি তাকে গুরুত্বহীন বাজে কোনো ছেলের সাথে মিশতে দেখবেন। যখন পুত্রকে গুরুত্ব দেবেন না, তখন সেও তার মতো করে অসৎ সঙ্গ খুঁজে নেবে।
সন্তান স্কুলের কোনো সমস্যার কথা আপনাকে জানালে সমাধানের উদ্দেশ্যে তাকে সাথে নিয়ে সশরীরে স্কুলে গিয়ে উপস্থিত হোন। ফোন করে সমাধান করতে পারলে তবুও যান। এর মাধ্যমে আপনি যে তার আবেগ ও অনুভূতিকে মূল্যায়ন করেন সেটি প্রকাশ পাবে। অফিস থেকে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে রাতে বাসায় ফেরার পর সন্তান যখন সেমিনারে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য আপনাকে একটি বিষয় নির্বাচন করে দিতে বলবে তখন তাকে তা নির্বাচন করে দিন। সে আপনার গুরুত্বের বিষয়টি অনুভব করবে। মোটেও ভাবতে যাবেন না যে, এগুলো সময় নষ্ট। আপনি এসব কাজ করবেন একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সামনে রেখে।
আমার ছেলে ফারুকের একটি ঘটনা বললেই বিষয়টির গুরুত্ব আপনারা অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন। একদিন সে আমাকে বলল, 'বাবা, প্রত্যেককেই দেখি তারা এই এই কাজগুলো করছে, অথচ তুমি আমাকে সেসব করার অনুমতি দাও না কেন?'
আমি বললাম, 'দেখো বাবা, আমি চাইলেই একবাক্যে এসব করার অনুমতি তোমাকে দিতে পারতাম, তোমার যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে একবাক্যে বলে দিতে পারতাম, আচ্ছা করো। কিন্তু আমি জানি, বিষয়টি তোমার ব্যক্তিত্ব, দ্বীন ও বোধবুদ্ধির জন্য মোটেও উপযুক্ত নয়। তাই সাময়িক কিছু যন্ত্রণা সহ্য করে হলেও তোমাকে সে বিষয়টি থেকে রক্ষা করি। কারণ তোমার ব্যাপারে আমি যত্নশীল। তোমার সবচেয়ে বেশি কল্যাণ রয়েছে যেখানে আমি সেখানেই আছি।'
এই কথাগুলো বলার পর লক্ষ করলাম, অত্যন্ত জেদি হওয়া সত্ত্বেও সে একেবারে চুপ হয়ে গেল।
অনেক সময় আমার মেয়ে সারাহ কোনো কাজে আমাকে ডাকলে আমি সাথে সাথে সাড়া দিই। অথচ আমি দেখতে পাচ্ছি, এই কাজটি সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছুই নয়, তবুও। তখন সে আমার খুব ঘনিষ্ঠ হয় আর আদর করে মুখে চুমু এঁকে দেয়।
অতএব প্রিয় পাঠক, সন্তানদের বুঝতে দিন আপনি তাদের প্রতি যত্নশীল। তারা যেন জানতে পারে, আপনার নিকট তারা বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
📄 সন্তানদের থেকে অমনোযোগী হবেন না
সন্তান দিনে দিনে শারীরিকভাবে বড়ো হচ্ছে, কিন্তু ধর্মীয় বিষয়ে আগের সে ছোট্ট বাচ্চাটিই রয়ে গেছে। সে খাবার খেয়ে তৃপ্ত হচ্ছে কিন্তু ভালোবাসা ও সঙ্গের অভাবে তৃষ্ণায় ধুঁকে ধুঁকে মরছে।
আজকের দিনটি গতকালের মতো নয়। আজকে যখন আপনি তার প্রতি অমনোযোগী ঠিক সে সময়টিতেই তার মস্তিষ্কে শত ভুল চিন্তা এসে হামলে পড়ছে, দুচোখে হাজারো নোংরা দৃশ্য এসে ভিড় করছে, তার সময় অকাজে অযথায় নষ্ট হচ্ছে। ভেবে দেখুন, সপ্তাহ মাস বছর ধরে যে সন্তানটি কোনো রকম উপদেশ, দিকনির্দেশনা ও শিক্ষণীয় মজলিস থেকে দূরে থাকে তার অবস্থা কতটা শোচনীয় হতে পারে?
আজ আপনারা যারা বাবা হয়েছেন, মনে রাখবেন, ভালো জামাকাপড়, খাবার, ভোগবিলাসিতা, অর্থকড়ি, বড়ো বড়ো ব্যাংক-ব্যালেন্স বা বিশাল উত্তরাধিকার সম্পত্তি আপনার সন্তানের কোনো উপকারেই আসবে না যদি আপনি তাকে আল্লাহর ভালোবাসা ও তাঁর দ্বীনের ওপর গড়ে না তোলেন। তাই বলছি, তার ভেতর লুকিয়ে থাকা ভালো গুণগুলো খুঁজে বের করুন, এগুলোর সঠিক পরিচর্যা ও বিকাশ করুন। তার ভেতরে থাকা অনিষ্ট ও মন্দপ্রবণতাকে ধুয়েমুছে একজন স্বচ্ছ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুন।
সময় স্বল্পতার দোহাই দেবেন না। একসময় নিজের কথায় নিজেরই হেসে উঠতে হবে। সাহাবায়ে কেরাম বিশ্বজয় করে ঘরে ফিরে এসে সন্তানদের হৃদয় জয় করতেন। তাদেরকে সঠিক দীক্ষায় গড়ে তুলতেন, খুব গুরুত্বের সাথে দ্বীন ও আদব-আখলাক শেখাতেন, এগুলোকে নিজের অপরিহার্য কর্তব্য বলে মনে করতেন।
বিভিন্ন কারণ দর্শিয়ে সটকে পড়বেন না। সন্তানের হৃদয় পিতার প্রভাব ও মায়ের স্পর্শের মুখাপেক্ষী। অন্য কিছু এদুটোর বিকল্প হতে পারে না। তাদের জন্য রুজিরুটি কামাইয়ের দোহাই দিতে যাবেন না। সে রুজিরুটি কতই-না নিকৃষ্ট যা উম্মাহকে কিছু উদ্দেশ্যহীন পশু ও চরিত্রহীন দেহ উপহার দেয়!
সময় এখন খুবই কঠিন। ওয়াল্লাহ! আমাদের সন্তানেরা এখন নিঃস্ব। তাদের বয়সে আমাদের যতটা ফিতনার মোকাবিলা করতে হয়েছিল সে তুলনায় আজকের যুগ অনেক বেশি ভয়ংকর ও নির্দয়。
প্রিয় ভাইয়েরা, বাড়িতে ফিরে যান। বুকে জড়িয়ে ধরে, নিজ সান্নিধ্যে রেখে তাদের অতৃপ্ত হৃদয়কে পরিতৃপ্ত করুন। তাদের সাথে খেলুন, শিক্ষামূলক গল্প শোনান আর এরচেয়েও বেশি তাদের কথা শুনুন, মন দিয়ে শুনুন। তাদের দিকে চেয়ে হাত থেকে মোবাইলটা রাখুন, এই নিষ্পাপ মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে কিছু ব্যস্ততা কমিয়ে ফেলুন। কলিজার এই টুকরোগুলোর জন্য প্রয়োজনে পুরো দুনিয়াকে স্তব্ধ করে রাখুন。
মৃত্যুর পর আপনার কোনো এক সন্তান যখন মন থেকে বলবে,
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ
“রব আমার, আমাকে এবং আমার বাবা-মাকে ক্ষমা করো।”
ভাবুন তো, এতসব অনর্থক ব্যস্ততা যার দোহাই দিয়ে আপনি সন্তানদের এড়িয়ে চলছেন তার তুলনায় তাদের প্রতি একটু মনোযোগ কতটা উপকার বয়ে আনবে?!
📄 বাবা, সবাই তখন আমাকে পতিত বলে ডাকবে!
* 'বাবা জানো, স্যার আজ আমাদের এক ইয়াহুদির ঘটনা শুনিয়েছেন। সে নবিজির ঘরের দরজায় আবর্জনা স্তূপ করে রাখত।'
* 'না বাবা, ঘটনাটি সঠিক নয়। স্যার যখনই তোমাদের কোনো হাদীস শুনাবেন তাকে সম্মানের সাথে বলবে, 'স্যার, দয়া করে জানাবেন, হাদীসটি কি সহীহ?'
* 'আচ্ছা ঠিক আছে। তিনি আমাদের আরও বলেছেন যে, বুধবারে নখ কাটা একেবারেই অনুচিত।'
* 'না বাবা, এই কথাটিও সঠিক নয়। যখন স্যার তোমাদের কোনোকিছু সম্পর্কে হালাল-হারাম বা উচিত-অনুচিত বলবেন তাকে জিজ্ঞেস করবে, 'স্যার, এর স্বপক্ষে দলীল কী?'
* 'আচ্ছা বাবা, সেদিন অন্য এক শিক্ষক ব্যাংকের সুদকে সাধারণ বিষয় বলেছিলেন। বলেছিলেন এগুলোর নাম সুদ নয়, মুনাফা।'
* 'তাকে বলবে, 'স্যার, আপনি যেটিকে মুনাফা বলছেন মহান আল্লাহর দ্বীনে এর হুকুম কী?'
* 'কিন্তু বাবা, সব কিছুতে এভাবে প্রশ্ন তুললে সবাই আমাকে নিয়ে উপহাস করবে। তারা বলবে, 'পণ্ডিত হয়ে গেছ নাকি?!'
* 'আমি তোমাকে একটি প্রশ্ন করি—ধরো, তোমাদের স্কুলে কোনো আইকিউ টেস্ট হলো আর তুমি সর্বোচ্চ মার্কস অর্জন করলে, তখন সবাই তোমাকে নিয়ে হাসাহাসি করল, তোমাকে মেধাবী বলে ক্ষেপাতে লাগল, 'এই যে মেধাবী' বলে ডাকতে লাগল তখন তুমি লজ্জিত হবে নাকি গর্বিত?'
☆ 'গর্বিত হব।'
* 'তারা এসমস্ত কথা বলার কারণে তাদেরকে ভালো মনে হবে নাকি তাদের ওপর করুণা হবে তোমার? কারণ তারা তোমার মেধাকেও উপহাসের বস্তু বানিয়ে নিয়েছে।'
☆ 'তাদের ওপর করুণা হবে।'
* 'ঠিক এরকমই দাঁড়ায় যখন তারা তোমার কোনো সুন্দর বা ভালো দিক নিয়ে হাসিমজা করে। ঠিক আছে?'
☆ 'হুম। তবে বাবা, নিজের সৌন্দর্য, মেধা, সম্পদ—এসবের জন্য গর্ব করতে নেই। কারণ এগুলো সবই আল্লাহর অনুগ্রহ, আমার নিজস্ব অর্জন নয়। ঠিক বলেছি?'
* 'জি। তবে যে বিষয়টি নিয়ে তুমি সত্যিই গর্ব করতে পারো সেটি হলো, তোমার মুসলিম পরিচয়। যে মুসলিম আল্লাহকে সম্মান করে, নিজের প্রতিটি চালচলনে তাঁর বিধানকে গুরুত্ব দেয়। এমন মুসলিম হয়ে তুমি গর্ববোধ করতে পারো যে প্রতিটি তথ্যকে যাচাই-বাছাই করে দেখে, একজন জ্ঞানী মুসলিম তো এমনই হয়।'
তাই ছেলেরা যখন তোমাকে ‘পণ্ডিত হয়ে গেছ নাকি’ বলে ক্ষেপাবে তখন স্পষ্টভাবে তাদের বলবে, ‘দেখো, আমি একজন মানুষ যার জীবনে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য রয়েছে। সবাই তো জানো যে, আল্লাহ আমাকে অনর্থক সৃষ্টি করেননি, তাঁর নিকট আমার ফিরে যেতেই হবে। তাই তাকে সন্তুষ্ট রাখার বিষয়টিকে আমি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিই। কারণ তাঁর সন্তুষ্টি ছাড়া আমার জীবন অর্থহীন ও তুচ্ছ। সহজ কথায় একেই মুসলিম বলে। কী তোমরাও কি মুসলিম হতে চাও না নাকি?’
সন্তানকে ইসলাম নিয়ে গর্বিত হতে শেখান।
📄 মাপকাঠি
কোনো এক মাধ্যমিক স্কুলের ছাত্রীদের মাঝে ছেলে-মেয়ের পারস্পরিক মেলামেশার বিষয়ে মতানৈক্য দেখা দিলো। একদল মনে করে 'ভালো উদ্দেশ্য' থাকলেই যথেষ্ট হবে, কিন্তু অপরপক্ষের মত হলো শারীআতের বেঁধে দেওয়া নিয়ম মানতেই হবে。
'আমরা তো এখনো ছোটো।'
* 'ছোটো কিংবা বড়ো হওয়াটা কীসের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে? তা ছাড়া প্রশ্নটা হওয়া উচিত ছিল, শারীআত তার ওপর দায়িত্ব চাপিয়েছে কি না? তার কাছ থেকে হিসেব গ্রহণ করা হবে নাকি সে বিনা হিসেবে পার পেয়ে যাবে?'
* 'যা-ই বলো না কেন, মেলামেশার কাজটা অত খারাপ কিছু না।'
☆ "খারাপ কিছু না' কোন হিসেবে বললে? সমাজ নাকি শারীআতের মানদণ্ডে?'
* 'তুমি দেখছি মাত্রাতিরিক্ত হুজুর হয়ে গেছ!'
আলোচনা এখানে এসে থেমে গেল। একসময় ঘটনা শিক্ষিকার কান পর্যন্ত পৌঁছল। তিনি ক্লাসরুমে আসলেন। কোনো রকম ভূমিকাতে না গিয়ে হঠাৎ প্রশ্ন করে বসলেন, 'এই টেবিলটি ছোটো নাকি বড়ো?'
একজন বলল, 'বড়ো।' সাথে সাথে অপর পাশ থেকে উত্তর এল, 'না, ছোটো।' তৃতীয়জন বলল, 'মাঝামাঝি।'
শিক্ষিকা : 'তোমরা এভাবে মতানৈক্যে জড়িয়ে পড়লে! এখন মেয়েরা বলো, এই অবস্থায় আমাদের করণীয় কী?'
* একজন বলল, 'ছোটো আর বড়োর সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে হবে।'
* 'বাহ! এবার বলো, সংজ্ঞা নির্ধারণের পর কী করতে হবে?'
* 'একটি স্কেল লাগবে। যাতে মেপে নির্ধারণ করে বলা যায় যে, জিনিসটা ছোটো নাকি বড়ো।'
* 'মা শা আল্লাহ! বেশ ভালো বলেছ। এভাবেই আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে একটি স্কেলের প্রয়োজন। মাপকাঠি না থাকলে আমরা মতানৈক্য করেই যাব। মেয়েরা, এখন বলো তো দেখি, কোন সে স্কেল যেটা দিয়ে আমরা জীবনের সবকিছু মাপতে পারি?'
'সমাজ।'
* 'আচ্ছা। কিন্তু সমাজ যদি পালটে যায়?' ছাত্রীরা সবাই চুপ。
একজন বলল, 'তা হলে আমাদের বাবা-মা যে শিক্ষা দিয়েছেন সেটি।'
* 'কিন্তু তারাও যদি তোমাদের মতো মতানৈক্যে জড়িয়ে পড়ে।'
* 'তা হলে, বোধবুদ্ধি।'
* 'সবার বোধবুদ্ধি কি এক রকম?'
* 'না।'
* 'তা হলে তখন কার বোধবুদ্ধি দিয়ে আমরা চলব?' সবাই চুপ। আরেকজন বলল, 'তা হলে যুক্তি দিয়ে বিচার করব।'
* 'তোমার নিকট যেটা যুক্তির, সেটা কি সবার নিকট যুক্তিপূর্ণ বলে গণ্য হবে?'
* 'না।' আবার সবাই চুপ。
* 'আচ্ছা তোমরাই বলো, সমাজ, প্রচলন, পারিবারিক শিক্ষা, বোধবুদ্ধি, যুক্তি এসব তোমাদের সঠিক পথ দেখাবে বলে কোনো নিশ্চয়তা কি আছে?' মেয়েরা চুপচাপ ভাবছে। শেষমেশ 'মাত্রাতিরিক্ত হুজুর হয়ে যাওয়া' মেয়েটি বলল,
'আমরা শারীআ দিয়েই সবকিছু মাপব।'
* 'একদম ঠিক বলেছ। আমার মেয়েরা, আমরা সবাই মুসলিম। তোমরা কি জানো, মুসলিম বলতে কী বুঝায়? মুসলিম হলো যারা একমাত্র আল্লাহর নির্দেশের সামনে আত্মসমর্পণ করে। টু শব্দটিও করে না। আল্লাহ তাআলা কী বলেছেন শোনো-
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ
“আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো কাজের আদেশ করলে কোনো ঈমানদার পুরুষ ও নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন কোনো সিদ্ধান্তের নেওয়ার ক্ষমতা নেই।”[৭৭]
وَمَا اخْتَلَفْتُمْ فِيْهِ مِنْ شَيْءٍ فَحُكْمُهُ إِلَى اللَّهِ
“আর তোমরা যে বিষয়েই মতভেদ করো না কেন, এর ফয়সালা আল্লাহর নিকটেই সোপর্দ।”[৭৮]
فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا *
“যদি তোমরা কোনো বিষয়ে বিবাদে লিপ্ত হও, তা হলে তা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নিকট ফিরিয়ে দাও। যদি তোমরা আল্লাহ ও কিয়ামাত দিবসের ওপর বিশ্বাসী হয়ে থাকো। আর এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে উত্তম।”[৭৯]
আমার মেয়েরা, আমরা অনেক সময় ভুল করি, কখনো-বা শারীআতের বিধানকে অমান্য করি কিন্তু একটি বিষয় একেবারে স্পষ্ট থাকা উচিত। আর তা হলো : শারীআতের বিধানই হলো একমাত্র সঠিক ও নির্ভুল।
আল্লাহ তাআলা এই সম্মানিতা শিক্ষিকাকে কবুল করুন। তাদের মতো ব্যক্তি আরও বৃদ্ধি করুন। আহ, তাদের সংখ্যা কতই-না কম!
আপনার সন্তানকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে শিক্ষাটি দেবেন তা হলো : শারীআতই আমাদের জীবনের মাপকাঠি। সবকিছু পরিচালিত করতে হবে কেবল শারীআত নির্ধারিত পদ্ধতিতেই。
টিকাঃ
[৭৭] সূরা আহযাব, ৩৩: ৩৬。
[৭৮] সূরা শূরা, ৪২: ১০。
[৭৯] সূরা নিসা, ৪:৫৯。