📄 প্রভাব!
সেদিন আমার বন্ধু ড. যাকির আমাকে তার স্বচক্ষে দেখা দুটি ঘটনা জানালেন。
প্রথমটি হলো : একজন মা তার যুবক ছেলেকে সালাতের তাগাদা দিত। একবার মা যখন সালাতের জন্য খুব বেশি পীড়াপীড়ি করছিল তখন ছেলেটি জবাব দিয়েছিল, 'আমি কেন সালাত পড়ব?! আমার সালাত আদায়ের কারণে তো আমি কখনো তোমার সুখ-শান্তিতে কোনো রকম প্রভাব পড়তে দেখিনি।' অর্থাৎ আমার সালাতের কারণে তোমাকে কখনো প্রশান্তি লাভ করতে দেখিনি。
দ্বিতীয় ঘটনাটি হলো এক যুবকের। সে ইসলামের ব্যাপারে সংশয়বাদী হয়ে পড়েছিল। নাস্তিক্যবাদী জীবনাচারে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। একদিন ড. যাকির তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার দিন কীভাবে শুরু হয়?'
* 'আমি সকাল বেলা উঠে প্রথমে ফজরের সালাত আদায় করি।'
☆'ফজরের সালাত পড়ো?! অথচ তুমি...'
*'সালাতটা আসলে ছেড়ে দিতে পারছিলাম না। কারণ এই সালাতের অনেক বড়ো একটা প্রভাব আমি আমার মায়ের ওপর দেখেছি। আমি সালাত আদায় করলে তিনি কেমন যেন বেশ প্রশান্তি লাভ করেন।'
নিঃসন্দেহে প্রথম ঘটনায় ছেলেটি যে অজুহাত পেশ করেছে সেটি গ্রহণযোগ্য ছিল। আর দ্বিতীয় ঘটনার ছেলেটি পরবর্তীকালে নীড়ে ফিরে এসেছিল এবং ফিরে পেয়েছিল তার বিশ্বাস。
এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষণীয় বিষয় হলো: বাবা-মা থেকে শুরু করে যারাই তারবিয়াত ও দীক্ষার কাজে জড়িত! ভুলে যাবেন না, আপনার প্রশান্তি ও সুখের মধ্যে যখন আপনার সন্তান দ্বীনের প্রভাব লক্ষ করবে, তখন সেটিই হবে তাদের জন্য সবচেয়ে কার্যকরী ও ফলপ্রসূ দাওয়াহ।
📄 পর্যাপ্ত পুরুষ
অনেক সময় বিভিন্ন জরুরি কারণে পুরুষদের ঘরে অবস্থান করতে হয়। তখন ভালোবাসা বৃদ্ধির সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো, সন্তানদের সামনে সেই কাজগুলো নিজে হাতে করা, যা সাধারণত ঘরের গৃহিণীরা করে থাকে। যেমন: ঘর পরিচ্ছন্ন করা, খাবার তৈরি করা, খাবার পরিবেশন করা ইত্যাদি। আর এসব কাজে সন্তানদেরও অংশীদার করানো উত্তম।
এর মাধ্যমে আপনি যেন আপনার স্ত্রীকে বললেন, 'আমি এই কাজগুলোকে ছোটো মনে করি না। সাধারণ দিনগুলোতে আমি অন্যান্য দায়িত্ব আঞ্জাম দেওয়ার কারণে এই দায়িত্ব তোমার কাঁধে এসে বর্তায়। এখন যখন তোমাকে সহযোগিতা করার সুযোগ পেলাম দেখ কত খুশি মনে কাজ করছি।' তখন স্ত্রীর হৃদয় আনন্দে আটখানা হয়ে পড়বে।
এই কাজের কারণে সন্তানদের নিকট যে বার্তা যাবে তা হলো, 'তোমরা তোমাদের মাকে সাহায্য করো। আমি এক্ষেত্রে তোমাদের আদর্শ। দেখো, তোমাদের আদেশ দেওয়ার আগে আমি নিজেই কাজটি করছি।'
অনেককেই পাবেন যারা এই কথাগুলোকে ঠিক মেনে নিতে পারেন না কিংবা উপহাস করেন; জেনে রাখবেন, এতটুকুই যথেষ্ট যে এই কাজটি 'সর্বোত্তম পুরুষ' ও নবি-রাসূলদের সর্দার নবি -এরও সুন্নাহ। যার প্রতিটি সময় ছিল সবচেয়ে মূল্যবান, আয়িশা -কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল,
مَا كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصْنَعُ فِي بَيْتِهِ؟
'নবি ঘরে থাকাকালীন কী কাজ করতেন?'
তিনি জবাব দিয়েছিলেন,
كَانَ يَكُوْنُ فِي مِهْنَةِ أَهْلِهِ - تَعْنِي خِدْمَةَ أَهْلِهِ - فَإِذَا حَضَرَتِ الصَّلَاةُ خَرَجَ إِلَى الصَّلَاةِ
“তিনি ঘরে পারিবারিক কাজগুলো করতেন—অর্থাৎ তাদেরকে সহায়তা করতেন—আর সালাতের সময় হলে সালাত আদায়ের জন্য বেরিয়ে যেতেন।”[৭১]
অন্য এক হাদীসে আয়েশা রাসূলুল্লাহ্ সম্পর্কে বলেছেন,
مَا كَانَ إِلَّا بَشَرًا مِّنَ الْبَشَرِ. كَانَ يَفْلِي ثَوْبَهُ - يَعْنِي يُنَظِّفُ ثَوْبَهُ وَيَحْلُبُ شَاتَهُ وَيَخْدُمُ نَفْسَهُ
“তিনি তো অন্যান্যদের মতো একজন মানুষই ছিলেন। নিজের কাপড় পরিষ্কার করতেন, বকরির দুধ দোহন করতেন এবং নিজের কাজ নিজেই সম্পাদন করতেন।”[৭২]
নিজের পারিবারিক ভিতকে মজবুত করুন। স্ত্রী-সন্তানদের সাথে সহজ হয়ে উঠুন। 'পরিবার' নামক মজবুত এই দুর্গটিকে সুদৃঢ় করুন। পরিবারের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করুন।
وَتَزَوَّدُوْا فَإِنَّ خَيْرَ الزَّادِ التَّقْوَى "তোমরা পাথেয় অবলম্বন করো। আর সর্বোত্তম পাথেয় হলো আল্লাহভীতি।”[৭৩]
টিকাঃ
[৭১] বুখারি, ৬৭৬, ৬০৩৯。
[৭২] আহমাদ, আল-মুসনাদ, ২৬১৯৪。
[৭৩] সূরা বাকারা, ২: ১৯৭。
📄 বাদানুবাদ
* 'সন্তানদের কিছু সময় দাও। তাদের সাথে একটু বসো।'
* 'আমি এখন ক্লান্ত। তুমি গিয়ে বসো।'
* 'মোবাইলটা একটু রাখো। ছেলেদের কিছু পড়াও।'
* 'মাত্র অফিস করে আসলাম। তুমি যাও না!'
* 'ছেলেদের সাথে কিছুক্ষণ খেল। এটা তাদের তারবিয়াতেরই একটি অংশ।'
* 'তুমি গিয়ে খেল। আমি সারাদিন ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকি। এখন বিশ্রাম করব।'
প্রিয় বাবা-মা, হাতজোড় করে বলি, এই বাদানুবাদগুলো সন্তানদের সামনে করবেন না। তাদের ওপর চিৎকার চেঁচামেচি করা এবং তাদেরকে প্রহার করার তুলনায় এই ধরনের আলোচনা তাদের আরও বেশি ক্ষতি করে।
আপনি কখনো তাকে প্রহার করলেন, কখনো-বা রাগ ঝাড়লেন, কখনো মাত্রাতিরিক্ত শাসন করে ফেললেন; কিন্তু এসব ওপরে বর্ণিত বাদানুবাদের তুলনায় তুচ্ছ। কারণ আপনি যখন সন্তানের ওপর কঠোরতা দেখালেন, সে বুঝে নেবে এই কঠোরতা তার কল্যাণের জন্যই করা হয়েছে। কিন্তু 'তুমি সময় দাও। না, তুমি দাও' এই জাতীয় অনীহামূলক কথোপকথন তাকে একটি নেতিবাচক বার্তা দেবে। সে বুঝে নেবে যেন আপনারা তাকে বলছেন, 'আমাদের কাছে তুমি মুখ্য বিষয় নও। তোমাকে সময় দিয়ে আমরা কোনোভাবেই স্বস্তি পাই না। তাই আমরা উভয়ে তোমার বোঝা একে অপরের ঘাড়ে তুলে দিয়ে নিজে বাঁচতে চাই।'
লক্ষ করুন কত ভয়ংকর একটি বার্তা তাদের নিকট পৌঁছাচ্ছে! আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন। সবসময় মনে রাখবেন,
كُلُّكُمْ رَاعٍ ، وَكُلُّكُمْ مَّسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
“তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। আর প্রত্যেকেই তার নিজ দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।”[৭৪]
টিকাঃ
[৭৪] বুখারি, ২৪০৯; মুসলিম, ১৮২৯。
📄 কন্যা যদি আপনার চোখে আল্লাহর সম্মান দেখতে পেত!
আপনার মেয়ে এখন প্রাপ্তবয়স্ক। এই অবস্থায় এক-দুই বছর অতিবাহিত হলো। তবুও সে এখনো পর্দায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি。
☆ 'নিজের মেয়ের কিছু খবর রাখেন?'
☆ 'তার পর্দা করার ইচ্ছা আছে। তাই আমি আর চাপ দিতে চাই না।'
☆ 'চাপ দিতে চান না.. যখন তাকে হাম, পোলিও, বসন্ত ইত্যাদি রোগ থেকে বাঁচাতে টিকা কেন্দ্রে একপ্রকার জোর করে নিয়ে যান, তখন কি এই চাপের কথা মনে থাকে না?!'
কোনটি অধিক ভয়ংকর? এই রোগগুলো নাকি সে আগুন যা থেকে মহান আল্লাহ তাআলা আপনার মেয়েকে বাঁচানোর নির্দেশ দিয়েছেন?
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوْا قُوْا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُوْدُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ
“হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনদের সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।”[৭৪]
যদি আপনি আপনার মেয়েকে দুনিয়ার কোনো আগুনের দিকে এগিয়ে যেতে দেখেন তখন তাকে কি এই কথা বলে ছেড়ে দেবেন, 'তার ওপর আমি চাপ প্রয়োগ করতে চাই না!?'
যদি আপনার মেয়ে এমন কোনো রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে যা অবহেলা করলে দিনের পর দিন মারাত্মক আকার ধারণ করবে, আপনি কি তাকে এক দুই বছর এজন্য ছেড়ে দেবেন যাতে সে নিজ সন্তুষ্টিতে চিকিৎসা করুক? নাকি তাকে পর্দাহীন ছেড়ে দিয়ে দিনের পর দিন আপনি যে গুনাহ কামাচ্ছেন তা দুনিয়ার এসমস্ত রোগবালাইয়ের তুলনায় আপনার নিকট অধিক তুচ্ছ?
বলতেই হয়, যদি মা-বাবা তাদের কন্যাকে শৈশব থেকেই আল্লাহর আনুগত্য ও লজ্জার ওপর গড়ে তুলতেন তা হলে কন্যা এই বয়সে পর্দা না করে পারত না। আচ্ছা অতীতে যা হওয়ার হয়েছে। আপনি অবহেলা করে কাটিয়েছেন। কিন্তু আজ যদি তার বয়ঃসন্ধিকালের এই সময়টাতে তাকে দৃঢ়প্রত্যয়ী হয়ে কোমল স্বরে বলতেন, 'মা, তুমি এখন যথেষ্ট সুন্দরী হয়েছ। চলো, আজ তোমার জন্য হিজাব কিনব। এর মাধ্যমে তোমার সম্মান রক্ষা হবে, তুমি সুসংরক্ষিত থাকবে।' আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُوْنَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا
“আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো কাজের আদেশ করলে কোনো ঈমানদার পুরুষ ও নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের নেওয়ার ক্ষমতা নেই। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল সে স্পষ্টভাবে পথভ্রষ্ট হলো।” [৭৬]
আপনি আল্লাহর হুকুমের সামনে বিনয়ী হয়ে যদি তাকে বোঝাতেন তা হলে সে আপনার দুচোখে আল্লাহ ও তাঁর অবতীর্ণ বিধানের প্রতি সম্মানবোধ দেখতে পেত। এই সম্মানবোধ একসময় তার মধ্যেও স্থান করে নিত।
অপরদিকে তার সাথে যদি এই বিষয়ে লজ্জিত হয়ে কথা বলেন, এমনভাবে কথা বলেন যে, আল্লাহ আপনাকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার দিয়েছে তখন আল্লাহর বিধানকে ছোটো করে দেখার এই প্রবণতা তাকেও প্রভাবিত করবে। (অর্থাৎ এভাবে বলা, আমি আসলে তোমাকে বুঝাতে চাচ্ছি.. এখানে মূলত কোনো প্রকার জোরজবরদস্তি নেই!)
আল্লাহ তাআলা এই কথাগুলো সেই বাবা-মায়ের কানে পৌঁছে দিক যারা সন্তানদের ভালোবাসেন, তাদের কথা ভাবেন। হতে পারে অতীতের ভুল তারা আজ শুধরে নেবেন。
টিকাঃ
[৭৫] সূরা তাহরীম, ৬৬ : ৬。
[৭৬] সূরা আহযাব, ৩৩: ৩৬。