📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 সুহী ও রাগী

📄 সুহী ও রাগী


গ্রীষ্মের ছুটি কীভাবে কাটানো যায় সে ব্যাপারে বলছিলেন আমার বন্ধু ড. আবদুর রহমান যাকির। তার একটি কথা আমার মনে ধরল, যা অনেকটা এমন, 'আপনার সন্তানকে একজন পূণ্যবান ও সুখী ব্যক্তির সান্নিধ্যে রাখার চেষ্টা করুন। কারণ আপনার সন্তান যখন তার বাবা-মা উভয়কে একই সাথে মুমিন ও সুখী দেখতে পাবে তখন সে আর ক্ষতিকর বস্তুতে আসক্ত হওয়ার প্রয়োজন অনুভব করবে না।'

যখন আপনি একজন 'সুখী মুমিন' হবেন তখন এটি স্পষ্ট যে, আপনি ঈমানকে পরিপূর্ণরূপে বুঝেছেন। সে সময়টিতে আপনি আদর্শ মা-বাবা ও আদর্শ বন্ধু হওয়ার যোগ্যতা রাখেন。

আপনার সত্যিকার একটি নির্ভেজাল হাসি ও প্রশান্ত হৃদয় চারপাশের সকলের জন্য সর্বোত্তম দাওয়াত। তারা আপনাকে দেখে প্রভাবিত হবে। কারণ মানুষ এমন মতাদর্শ ও ধর্ম খোঁজে যা সত্যিকার সুখের বাস্তবায়ন ঘটায়। দেখুন, মহান আল্লাহ তাআলাও মুমিনদের সুখী জীবনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন。

مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةٌ “মুমিন পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে কেউ পূণ্যের কাজ করবে, অবশ্যই আমি তাকে সুখের জীবন দান করব।”[১৬]

তাই আপনার সুখের জীবন আপনার আমল কবুল হওয়ার প্রমাণ。

*****

হতে পারে আপনি খুব দ্রুত রেগে যান। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর ব্যথায় ব্যথিত হন। কখনো স্ত্রীর সাথে, কখনো ছেলে-মেয়ে বা ভাইবোনদের সাথে। অনেকের একটি পরামর্শে আপনার কান ঝালাপালা হওয়ার উপক্রম, 'রাগান্বিত হোয়ো না'। এই বাক্যটি দ্বারা নবিজি -ও নসীহত করেছিলেন। কিন্তু এই উত্তম পরামর্শের বিপরীতে আপনার জবাব হয়, 'আমি পারি না। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি।'

আচ্ছা যদিও 'আমি পারি না' বাক্যের সাথে আমরা একমত হতে পারলাম না, তবু আপনার কাছে এমন একটি জিনিস চাইব যা আপনি নিজেই স্বীকার করবেন যে, আপনি পারবেন। কী সেটা?

খুব দ্রুত সহজ হয়ে যান। নিজের আপন অবস্থায় ফেরত আসুন। আপনার রাগের কারণে যে ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে সেটি দ্রুত সংশোধন করে ফেলুন। যদি এই রাগ ক্ষণিকের প্রতিক্রিয়া হয় তা হলে মুহূর্তের ভেতর নিজেকে সামলে নিলে তো আর কোনো অসুবিধে নেই তাই না!? হ্যাঁ তবে অহমিকায় বাধা দিলে সেটি ভিন্ন বিষয়! হাদীসে নবিজি মানুষকে তিন স্তরে বিভক্ত করেছেন— بَطِيْءُ الْغَضَبِ سَرِيعُ الْفَيْءِ
১. যারা রাগান্বিত হয় খুব ধীরে আর নিজেকে সামলে নিয়ে ফিরে আসে মুহূর্তের মধ্যে, খুব দ্রুত। হাদীসে এই শ্রেণির মানুষকেই সর্বোত্তম বলা হয়েছে। سَرِيعُ الْغَضَبِ سَرِيعُ الْفَيْءِ
২. যারা রাগান্বিত হয় খুব দ্রুত, আবার ফিরেও আসে খুব দ্রুত। তাদের ব্যাপারে হাদীসে বলা হয়েছে, তাদের বিষয়টি একটি আরেকটির মাধ্যমে কাটাকাটি যাবে। (অর্থাৎ তাকে ভালোও বলা যাবে না, খারাপও বলা যাবেন)। سَرِيعَ الغَضَبِ بَطِيْءَ الْفَيْءِ
৩. যারা খুব দ্রুত রাগান্বিত হয় ঠিক, কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে ফিরে আসতে তাদের অনেক সময় লাগে। হাদীসে তাদেরকে সর্বনিকৃষ্ট মানুষ বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।[৬৯]
চেষ্টা করুন, রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার, খুব কঠিন কিছু না হওয়া ছাড়া রাগ না দেখানোর। আর যদি রাগ করতেই হয়, তা হলে খুব দ্রুত নিজেকে সামলে নিন, স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসুন। দ্বিধাহীনচিত্তে বলুন, ‘দুঃখিত! ভুল হয়ে গেল।’ নিজের স্ত্রী-সন্তানদের কাছে টেনে নিন। ঘরের স্বাভাবিক রূপ ফিরিয়ে আনতে কোনো ভূমিকা ছাড়াই তাদের চুমু খান。
সাবধান! তাদের দলে অন্তর্ভুক্ত হতে যাবেন না যাদের সর্বনিকৃষ্ট বলা হয়েছে—যারা খুব দ্রুত রাগান্বিত হলেও, দ্রুত এর সমাধান করে না, রাগ থেকে ফিরে আসে না। অনেক সময় এর পেছনে মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করে—অহমিকা。

টিকাঃ
[১৬] সূরা নাহল, ১৬: ৯৭。
[৬৯] বিস্তারিত দেখুন—তিরমিযি, ২১৯১。

📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 আদর

📄 আদর


কন্যাদের আদর করুন, স্নেহ ও আবেগ দিয়ে তাদের হৃদয় মাতিয়ে রাখুন। এর বিনিময়ে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রতিদান পাওয়ারও আশা করুন。
আমি আমার কন্যাদের বুকে জড়িয়ে রাখি, চুমু খাই, আদর দিই, তাদের সাথে কৌতুক করি, তাদের আবদার পূরণ করি। এগুলোর বিনিময়ে প্রতিদানের প্রত্যাশাও রাখি। কারণ এর মাধ্যমে আমি তাদের নিকট আল্লাহ ও রাসূল ﷺ-কে প্রিয় করে তোলার চেষ্টা করেছি। দ্বীনের একটি আদেশ পালন করেছি। কেননা শারীআত কন্যাদের প্রতি স্নেহ ও আবেগ প্রদর্শনে উদ্বুদ্ধ করেছেন。
আমি প্রতিদানের আশা রাখি, কারণ আমি তাদেরকে কখনো ক্ষুধার্ত রাখিনি। হতে পারত ক্ষুধার কারণে যুগের জাহিলিয়্যাতের পাতা-ফাঁদে তারা পা দিত, হারাম রিলেশনে উদ্বুদ্ধ হতো। অনেক বাবাকেই দেখতে পাবেন যারা কর্মস্থলের ব্যস্ততায় সময় কাটান, কন্যাদের সাথে কর্কশ আচরণ করেন। মনে রাখবেন, আপনার স্নেহশীলতা ও কোমলতা আপনার কন্যাদের আকীদা সংরক্ষণ করবে। তাদের ব্যক্তিত্বকে মজবুত করে গড়বে。
কন্যাদের উপলব্ধি করান, আপনি তাদের খুব ভালোবাসেন, আপনার নিকট তাদের একটি বিশেষ অবস্থান আছে। দেখুন এই শিক্ষা আমরা নবিজীবনেই পাই—যখন ফাতিমা ؓ আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর নিকট আসতেন তখন তিনি দাঁড়িয়ে যেতেন, তাকে চুমু খেতেন, তাঁর হাত ধরে নিয়ে এসে তাঁকে বসাতেন। এগুলোই ছিল ভালোবাসার উষ্ণতা, অভ্যর্থনা ও আদর। ঠিক ফাতিমাও ؓ যখন বাবাকে আসতে দেখতেন দাঁড়িয়ে যেতেন, তাঁকে চুমু খেতেন, হাত ধরে নিয়ে গিয়ে এক স্থানে বসাতেন।[৭০]

টিকাঃ
[৭০] আবূ দাউদ, ৫২১৭。

📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 প্রভাব!

📄 প্রভাব!


সেদিন আমার বন্ধু ড. যাকির আমাকে তার স্বচক্ষে দেখা দুটি ঘটনা জানালেন。
প্রথমটি হলো : একজন মা তার যুবক ছেলেকে সালাতের তাগাদা দিত। একবার মা যখন সালাতের জন্য খুব বেশি পীড়াপীড়ি করছিল তখন ছেলেটি জবাব দিয়েছিল, 'আমি কেন সালাত পড়ব?! আমার সালাত আদায়ের কারণে তো আমি কখনো তোমার সুখ-শান্তিতে কোনো রকম প্রভাব পড়তে দেখিনি।' অর্থাৎ আমার সালাতের কারণে তোমাকে কখনো প্রশান্তি লাভ করতে দেখিনি。
দ্বিতীয় ঘটনাটি হলো এক যুবকের। সে ইসলামের ব্যাপারে সংশয়বাদী হয়ে পড়েছিল। নাস্তিক্যবাদী জীবনাচারে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। একদিন ড. যাকির তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার দিন কীভাবে শুরু হয়?'
* 'আমি সকাল বেলা উঠে প্রথমে ফজরের সালাত আদায় করি।'
☆'ফজরের সালাত পড়ো?! অথচ তুমি...'
*'সালাতটা আসলে ছেড়ে দিতে পারছিলাম না। কারণ এই সালাতের অনেক বড়ো একটা প্রভাব আমি আমার মায়ের ওপর দেখেছি। আমি সালাত আদায় করলে তিনি কেমন যেন বেশ প্রশান্তি লাভ করেন।'
নিঃসন্দেহে প্রথম ঘটনায় ছেলেটি যে অজুহাত পেশ করেছে সেটি গ্রহণযোগ্য ছিল। আর দ্বিতীয় ঘটনার ছেলেটি পরবর্তীকালে নীড়ে ফিরে এসেছিল এবং ফিরে পেয়েছিল তার বিশ্বাস。
এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষণীয় বিষয় হলো: বাবা-মা থেকে শুরু করে যারাই তারবিয়াত ও দীক্ষার কাজে জড়িত! ভুলে যাবেন না, আপনার প্রশান্তি ও সুখের মধ্যে যখন আপনার সন্তান দ্বীনের প্রভাব লক্ষ করবে, তখন সেটিই হবে তাদের জন্য সবচেয়ে কার্যকরী ও ফলপ্রসূ দাওয়াহ।

📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 পর্যাপ্ত পুরুষ

📄 পর্যাপ্ত পুরুষ


অনেক সময় বিভিন্ন জরুরি কারণে পুরুষদের ঘরে অবস্থান করতে হয়। তখন ভালোবাসা বৃদ্ধির সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো, সন্তানদের সামনে সেই কাজগুলো নিজে হাতে করা, যা সাধারণত ঘরের গৃহিণীরা করে থাকে। যেমন: ঘর পরিচ্ছন্ন করা, খাবার তৈরি করা, খাবার পরিবেশন করা ইত্যাদি। আর এসব কাজে সন্তানদেরও অংশীদার করানো উত্তম।

এর মাধ্যমে আপনি যেন আপনার স্ত্রীকে বললেন, 'আমি এই কাজগুলোকে ছোটো মনে করি না। সাধারণ দিনগুলোতে আমি অন্যান্য দায়িত্ব আঞ্জাম দেওয়ার কারণে এই দায়িত্ব তোমার কাঁধে এসে বর্তায়। এখন যখন তোমাকে সহযোগিতা করার সুযোগ পেলাম দেখ কত খুশি মনে কাজ করছি।' তখন স্ত্রীর হৃদয় আনন্দে আটখানা হয়ে পড়বে।

এই কাজের কারণে সন্তানদের নিকট যে বার্তা যাবে তা হলো, 'তোমরা তোমাদের মাকে সাহায্য করো। আমি এক্ষেত্রে তোমাদের আদর্শ। দেখো, তোমাদের আদেশ দেওয়ার আগে আমি নিজেই কাজটি করছি।'

অনেককেই পাবেন যারা এই কথাগুলোকে ঠিক মেনে নিতে পারেন না কিংবা উপহাস করেন; জেনে রাখবেন, এতটুকুই যথেষ্ট যে এই কাজটি 'সর্বোত্তম পুরুষ' ও নবি-রাসূলদের সর্দার নবি -এরও সুন্নাহ। যার প্রতিটি সময় ছিল সবচেয়ে মূল্যবান, আয়িশা -কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল,

مَا كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصْنَعُ فِي بَيْتِهِ؟
'নবি ঘরে থাকাকালীন কী কাজ করতেন?'

তিনি জবাব দিয়েছিলেন,

كَانَ يَكُوْنُ فِي مِهْنَةِ أَهْلِهِ - تَعْنِي خِدْمَةَ أَهْلِهِ - فَإِذَا حَضَرَتِ الصَّلَاةُ خَرَجَ إِلَى الصَّلَاةِ

“তিনি ঘরে পারিবারিক কাজগুলো করতেন—অর্থাৎ তাদেরকে সহায়তা করতেন—আর সালাতের সময় হলে সালাত আদায়ের জন্য বেরিয়ে যেতেন।”[৭১]

অন্য এক হাদীসে আয়েশা রাসূলুল্লাহ্ সম্পর্কে বলেছেন,

مَا كَانَ إِلَّا بَشَرًا مِّنَ الْبَشَرِ. كَانَ يَفْلِي ثَوْبَهُ - يَعْنِي يُنَظِّفُ ثَوْبَهُ وَيَحْلُبُ شَاتَهُ وَيَخْدُمُ نَفْسَهُ

“তিনি তো অন্যান্যদের মতো একজন মানুষই ছিলেন। নিজের কাপড় পরিষ্কার করতেন, বকরির দুধ দোহন করতেন এবং নিজের কাজ নিজেই সম্পাদন করতেন।”[৭২]

নিজের পারিবারিক ভিতকে মজবুত করুন। স্ত্রী-সন্তানদের সাথে সহজ হয়ে উঠুন। 'পরিবার' নামক মজবুত এই দুর্গটিকে সুদৃঢ় করুন। পরিবারের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করুন।

وَتَزَوَّدُوْا فَإِنَّ خَيْرَ الزَّادِ التَّقْوَى "তোমরা পাথেয় অবলম্বন করো। আর সর্বোত্তম পাথেয় হলো আল্লাহভীতি।”[৭৩]

টিকাঃ
[৭১] বুখারি, ৬৭৬, ৬০৩৯。
[৭২] আহমাদ, আল-মুসনাদ, ২৬১৯৪。
[৭৩] সূরা বাকারা, ২: ১৯৭。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00