📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 চাঁদের দিকে লাফ!

📄 চাঁদের দিকে লাফ!


আমার মেয়ে একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করল, 'বাবা, কাফিররা কি কখনো কুরআনের মতো আরেকটি কিতাব তৈরি করার চেষ্টা করেনি?'

আমি তাকে বললাম, 'খুব ভালো প্রশ্ন করেছ। কিন্তু এর আগে আমি তোমাকে কিছু প্রশ্ন করব আর তুমি উত্তর দেবে। আমি যদি বলি, এখান থেকে দরজা পর্যন্ত একটি লাফ দাও (প্রায় ২ মিটার)। তুমি কি চেষ্টা করবে?'

'হ্যাঁ।'

* 'আচ্ছা যদি টেবিলের ওপর দিতে বলি? (৪ মিটার)।'

* 'ইমমম.. একটু চেষ্টা করব। (হেসে উত্তর দিলো)।'

* 'আচ্ছা এবার যদি বলি, চাঁদ পর্যন্ত লাফ দাও।'

তারা ভাই-বোন সকলে একযোগে হেসে উঠল。

* 'অবশ্যই না।'

* 'মা, কাফিরদের সাথে ঠিক এটাই ঘটেছিল। তারা বিশুদ্ধ আরবিভাষী ছিল, গদ্য ও পদ্য লিখত ঠিক; কিন্তু কুরআনের মতো আরেকটি কিতাব রচনার চেষ্টা করা মূলত তাদের নিকট চাঁদ পর্যন্ত লাফ দেওয়ার মতোই ছিল। কেউ যদি এর চেষ্টাও করত তাকে মানুষ বোকা বাদে আর কিছু ঠাওর করত না। আর তারা নিশ্চয় বোকা হতে চাইত না। তুমি নিজেই কল্পনা করে দেখো, তুমি কাপড় সামান্য গোটালে, তারপর এক পা এগিয়ে আবার এক পা পিছিয়ে লাফ দেওয়ার চেষ্টা করলে। কতটা হাস্যকর দেখাবে!?'

এই কারণে পুরো ইতিহাস ঘেঁটে এমন কোনো ঘটনা পাওয়া যাবে না যেখানে তারা বেশ মনোযোগের সাথে কুরআনকে অনুকরণের চেষ্টা করেছে। বরং তারা এদিকে না গিয়ে নবিজি ﷺ-এর বিরোধিতা, হুমকি-ধামকি, মিথ্যা অপবাদ ইত্যাদি কাজে নিজেদের ব্যস্ত রেখেছিল。

এই মুসলিম প্রজন্মের বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভয়ংকর যে ষড়যন্ত্রটি করা হয়েছে তা হলো, আরবি ভাষায় দুর্বলতা সৃষ্টি করে দেওয়া। এই কারণে আজ তাদেরকে ব্যাখ্যা দিয়ে বলতে হয় যে, কেন কুরআন একটি মু'জিযাসম্পন্ন কিতাব। তাদেরকে দেখাতে হয়, দুই মিটারের দূরত্ব আর চাঁদের দূরত্বের মাঝে পার্থক্য কত। এই নষ্ট শিক্ষাব্যবস্থা তাদেরকে পূর্ব-পশ্চিমের সব জ্ঞান শেখালেও সামান্য এই পার্থক্যটুকু শেখাতে সক্ষম হয়নি।

📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 একটি বালকের গল্প

📄 একটি বালকের গল্প


সেদিন মাসজিদে ইশার সালাত শেষে একটু বসলাম। সামনে দেখতে পেলাম এক কিশোর সুন্নাত সালাতগুলো আদায় করছে। শপথ করে বলতে পারব, অধিকাংশ মুসলিম তার মতো একাগ্রচিত্তে সালাত আদায় করে না। সে কী প্রশান্ত ভাব! কতটা নিরবচ্ছিন্নভাবে রুকু ও সাজদাগুলো আদায় করছে! ছেলেটির মুখে ভদ্রতা ও সততার ছাপ পরিচ্ছন্ন। আমি তার পাশে-বসা-লোকটির দিকে এগিয়ে গিয়ে বললাম, 'ছেলেটি কি আপনার?'
লোকটি বলল, 'হ্যাঁ।'
'বয়স কত তার?'
'১৩ বছর।'
'কী নাম?'
'জিয়াউদ্দীন।'
'ভাই, আপনারা কোথা হতে এসেছেন?'
'সিরিয়া থেকে।'
'সন্তানদের দীক্ষার বিষয়ে আমাকে একটু নসীহত করুন। আমি দেখেছি আপনার সন্তান যুগের ছেলেদের তুলনায় মা শা আল্লাহ, অনেক সুন্দর করে সালাত আদায় করে।'
লোকটি বাহ্যিক বেশভূষায় ছিলেন নিরেট একজন সাধারণ লোক। তিনি আমাকে জবাব দিলেন, 'আমি সবসময় একটি কথাই মাথায় রেখেছি-সন্তানকে কুরআন শিক্ষা দিন। কুরআন তাকে সব শিখিয়ে দেবে।'

📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 আমার মেয়ের রোজনামচা

📄 আমার মেয়ের রোজনামচা


কিছুক্ষণ পূর্বে আমার নয় বছরের কন্যাকে যথারীতি ডাক্তারি চেকআপ করালাম। ডাক্তার তাকে জানাল এই বছর ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সে বান্ধবীদের সাথে অংশ নিতে পারবে না। অথচ বেশ কিছুদিন ধরে সে অধীর আগ্রহে এর জন্য প্রহর গুনছিল। কিন্তু আমাকে বেশ অবাক করে দিয়ে মিটিমিটি হেসে সে আমাকে বলল, 'জানো বাবা, আমি কেন চিন্তিত নই? কারণ আল্লাহ আমাকে ধৈর্যধারণের শক্তি দিয়েছেন।'

সে যেন বলছিল, আমি সন্তুষ্ট। আর আল্লাহ তাআলা আমাকে এভাবে সন্তুষ্ট ও ধৈর্যশীল বানিয়ে মূলত আমার ওপরই অনুগ্রহ করেছেন। আমি আনন্দিত, কারণ মহান আল্লাহ তাঁর দয়া বর্ষণের জন্য আমাকে নির্বাচিত করেছেন। কত সংক্ষিপ্ত বাক্যে কত বড়ো কথা সে বলে ফেলল। আপনার সন্তানদের আল্লাহর নির্ধারিত নিয়তির ওপর সন্তুষ্ট থাকার শিক্ষা দিন。

*****

আমার কন্যা সারাহর মৃত্যুর পর আমার স্ত্রী বিভিন্ন সময়ই তার খাতা ও নোটগুলো ঘাটাঘাটি করত। ফলে এমন অনেক কিছুই ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে লাগল যা সারাহ তার নীরব ও নিভৃতের সময়গুলোতে টুকে রাখত। যেমন ধরুন, আজ একটি খুঁজে পেলাম। সে এটি লিখেছিল তার লিভার অপারেশনের একদিন আগে।

সে ডানপাশে একটি বক্স এঁকে সেখানে একটি সম্ভাবনা লিখেছে, 'ক্যান্সারের ঝুঁকিমুক্ত ফুসফুস।' তারপর বামপাশে বক্স এঁকে সেখানে লিখেছে আরেকটি সম্ভাবনা, 'ক্যান্সার দ্বারা পরিপূর্ণ ফুসফুস?' এই বাক্যের শেষে একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন। অর্থাৎ, ফলাফল কী হতে পারে কে জানে...

এরপর এদুটি বক্সের নিচে সে স্পষ্ট বাক্যে লিখেছে,

'এই দুই সম্ভাবনার যা-ই হোক না কেন আমার কোনো ভয় নেই। কারণ সবকিছুই আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীর অনুযায়ী হবে। শেষমেশ তাকদীরে আল্লাহ যে সময়টা নির্ধারণ করে রেখেছেন মৃত্যু কেবল তখনই হবে। আমার ওপর কর্তব্য শুধুমাত্র এটুকু যে, মাধ্যম গ্রহণ করা ও চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া। এসব কিছুর চেয়ে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইবাদাত-বন্দেগির ওপর অটল থাকা। যাতে আল্লাহর সাথে আমার সত্যিকার সম্পর্ক অটুট থাকে। আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে থাকেন।'

📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 সুহী ও রাগী

📄 সুহী ও রাগী


গ্রীষ্মের ছুটি কীভাবে কাটানো যায় সে ব্যাপারে বলছিলেন আমার বন্ধু ড. আবদুর রহমান যাকির। তার একটি কথা আমার মনে ধরল, যা অনেকটা এমন, 'আপনার সন্তানকে একজন পূণ্যবান ও সুখী ব্যক্তির সান্নিধ্যে রাখার চেষ্টা করুন। কারণ আপনার সন্তান যখন তার বাবা-মা উভয়কে একই সাথে মুমিন ও সুখী দেখতে পাবে তখন সে আর ক্ষতিকর বস্তুতে আসক্ত হওয়ার প্রয়োজন অনুভব করবে না।'

যখন আপনি একজন 'সুখী মুমিন' হবেন তখন এটি স্পষ্ট যে, আপনি ঈমানকে পরিপূর্ণরূপে বুঝেছেন। সে সময়টিতে আপনি আদর্শ মা-বাবা ও আদর্শ বন্ধু হওয়ার যোগ্যতা রাখেন。

আপনার সত্যিকার একটি নির্ভেজাল হাসি ও প্রশান্ত হৃদয় চারপাশের সকলের জন্য সর্বোত্তম দাওয়াত। তারা আপনাকে দেখে প্রভাবিত হবে। কারণ মানুষ এমন মতাদর্শ ও ধর্ম খোঁজে যা সত্যিকার সুখের বাস্তবায়ন ঘটায়। দেখুন, মহান আল্লাহ তাআলাও মুমিনদের সুখী জীবনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন。

مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةٌ “মুমিন পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে কেউ পূণ্যের কাজ করবে, অবশ্যই আমি তাকে সুখের জীবন দান করব।”[১৬]

তাই আপনার সুখের জীবন আপনার আমল কবুল হওয়ার প্রমাণ。

*****

হতে পারে আপনি খুব দ্রুত রেগে যান। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর ব্যথায় ব্যথিত হন। কখনো স্ত্রীর সাথে, কখনো ছেলে-মেয়ে বা ভাইবোনদের সাথে। অনেকের একটি পরামর্শে আপনার কান ঝালাপালা হওয়ার উপক্রম, 'রাগান্বিত হোয়ো না'। এই বাক্যটি দ্বারা নবিজি -ও নসীহত করেছিলেন। কিন্তু এই উত্তম পরামর্শের বিপরীতে আপনার জবাব হয়, 'আমি পারি না। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি।'

আচ্ছা যদিও 'আমি পারি না' বাক্যের সাথে আমরা একমত হতে পারলাম না, তবু আপনার কাছে এমন একটি জিনিস চাইব যা আপনি নিজেই স্বীকার করবেন যে, আপনি পারবেন। কী সেটা?

খুব দ্রুত সহজ হয়ে যান। নিজের আপন অবস্থায় ফেরত আসুন। আপনার রাগের কারণে যে ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে সেটি দ্রুত সংশোধন করে ফেলুন। যদি এই রাগ ক্ষণিকের প্রতিক্রিয়া হয় তা হলে মুহূর্তের ভেতর নিজেকে সামলে নিলে তো আর কোনো অসুবিধে নেই তাই না!? হ্যাঁ তবে অহমিকায় বাধা দিলে সেটি ভিন্ন বিষয়! হাদীসে নবিজি মানুষকে তিন স্তরে বিভক্ত করেছেন— بَطِيْءُ الْغَضَبِ سَرِيعُ الْفَيْءِ
১. যারা রাগান্বিত হয় খুব ধীরে আর নিজেকে সামলে নিয়ে ফিরে আসে মুহূর্তের মধ্যে, খুব দ্রুত। হাদীসে এই শ্রেণির মানুষকেই সর্বোত্তম বলা হয়েছে। سَرِيعُ الْغَضَبِ سَرِيعُ الْفَيْءِ
২. যারা রাগান্বিত হয় খুব দ্রুত, আবার ফিরেও আসে খুব দ্রুত। তাদের ব্যাপারে হাদীসে বলা হয়েছে, তাদের বিষয়টি একটি আরেকটির মাধ্যমে কাটাকাটি যাবে। (অর্থাৎ তাকে ভালোও বলা যাবে না, খারাপও বলা যাবেন)। سَرِيعَ الغَضَبِ بَطِيْءَ الْفَيْءِ
৩. যারা খুব দ্রুত রাগান্বিত হয় ঠিক, কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে ফিরে আসতে তাদের অনেক সময় লাগে। হাদীসে তাদেরকে সর্বনিকৃষ্ট মানুষ বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।[৬৯]
চেষ্টা করুন, রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার, খুব কঠিন কিছু না হওয়া ছাড়া রাগ না দেখানোর। আর যদি রাগ করতেই হয়, তা হলে খুব দ্রুত নিজেকে সামলে নিন, স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসুন। দ্বিধাহীনচিত্তে বলুন, ‘দুঃখিত! ভুল হয়ে গেল।’ নিজের স্ত্রী-সন্তানদের কাছে টেনে নিন। ঘরের স্বাভাবিক রূপ ফিরিয়ে আনতে কোনো ভূমিকা ছাড়াই তাদের চুমু খান。
সাবধান! তাদের দলে অন্তর্ভুক্ত হতে যাবেন না যাদের সর্বনিকৃষ্ট বলা হয়েছে—যারা খুব দ্রুত রাগান্বিত হলেও, দ্রুত এর সমাধান করে না, রাগ থেকে ফিরে আসে না। অনেক সময় এর পেছনে মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করে—অহমিকা。

টিকাঃ
[১৬] সূরা নাহল, ১৬: ৯৭。
[৬৯] বিস্তারিত দেখুন—তিরমিযি, ২১৯১。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00