📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 কর্মবিদ্রোহী প্রার্থনা

📄 কর্মবিদ্রোহী প্রার্থনা


রোগী যখন একদিকে ক্ষতিকর সব খাদ্য গ্রহণ করে, আর অপরদিকে গভীর রাতে আল্লাহর দরবারে সুস্থতার জন্য কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করে তখন চিকিৎসা না করার কারণে সে রোগী অবশ্যই গুনাহগার হবে। ঠিক এভাবে পিতা যদি সন্তানের সঠিক দীক্ষা দেওয়ার মূলনীতিগুলো প্রয়োগ না করে বরং এর উল্টো কাজটি করে, তারপর আল্লাহর নিকট সুসন্তান লাভের উদ্দেশ্যে দুআ করে তা হলে এই পিতাও সন্দেহাতীতভাবে গুনাহগার হবে。

অনেক মা-বাবাকে দেখবেন চিৎকার করে বলছেন, 'কেন আমার সন্তান আমার উদ্বেগ ও দুঃখকষ্টের মূল কারণে পরিণত হয়েছে? অথচ আল্লাহ তো বলেছেন, সন্তান হলো দুনিয়ার জীবনের সৌন্দর্য!?'

এ কথাগুলো তারা বলেন তাকদীরের ওপর একপ্রকার দোষ চাপিয়ে, এমনকি সন্তান যে একটি নিয়ামাত সে বিষয়েই তারা সন্দেহ করতে শুরু করেন। অনেকে তো আবার বংশবৃদ্ধির এই চিরাচরিত নিয়মের মধ্যে আল্লাহর হিকমত সম্পর্কেই সংশয়ে পড়ে যান। তাদের এই প্রশ্নের উত্তর স্বয়ং মহান আল্লাহ তাআলাই দিচ্ছেন,

قُلْ هُوَ مِنْ عِنْدِ أَنْفُسِكُمْ

“আপনি বলে দিন, 'এ কষ্ট তোমাদের কাছে এসেছে তোমাদেরই পক্ষ থেকে।” [৬৪]

অন্যান্য সব বিষয়ে যেমন মাধ্যম ও উপকরণ গ্রহণ করা জরুরি, সন্তানকে সুসন্তানে পরিণত করার বিষয়টিও ঠিক এমনই। সুস্থতার জন্য যেমন চিকিৎসা, তৃষ্ণা নিবারণের জন্য যেমন পানি, বেঁচে থাকতে যেমন খাবার প্রয়োজন ঠিক সেভাবেই সুসন্তান গড়ে তুলতে প্রয়োজন সঠিক দীক্ষা。

আপনি তো প্রথম ধাপেই রাসূল -এর আদেশ লঙ্ঘন করেছেন। সন্তানের সঠিক দীক্ষার প্রথম ধাপ হলো দ্বীনদার স্ত্রী নির্বাচন। রাসূল বলেছেন,

فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ

“সুতরাং তুমি দ্বীনদারী ও ধার্মিকতাকেই প্রাধান্য দেবে, নতুবা তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” [৬৫]

এরপর আপনি লঙ্ঘন করলেন নবিজি -এর বাতলে দেওয়া সন্তান দীক্ষা দেওয়ার অন্যান্য সব নীতিমালা। সত্যি বলতে অনেক নীতিমালা সম্পর্কে আপনার ধারণাই ছিল না। আর যেগুলো জানা ছিল তা প্রয়োগ না করে বরং উলটো ও ভুল পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন。

সুতরাং এখন আল্লাহর নিকট ‘ইয়া আল্লাহ’ বলে বেশ কাকুতিমিনতি করার পর যদি কোনো ফলাফল দৃষ্টিগোচর না হয়, তা হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বরং এমন ‘কর্মবিরোধী প্রার্থনা’র জন্যই আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করুন। না হয় আপনিই বলুন, বিষ পান করতে করতে আল্লাহর নিকট সুস্থতা প্রার্থনা করা যায়?!

টিকাঃ
[৬৪] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৬৫。
[৬৫] বুখারি, ৫০৯০; মুসলিম, ১৪৬৬。

📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 বয়ঃসন্ধি

📄 বয়ঃসন্ধি


আপনার সদ্য প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান যখন আপনার সাথে অভদ্রতার সব সীমা অতিক্রম করবে, যখন সে অবাধ্য হবে এবং জেদ ধরে বসবে তখন আপনার মন চাইবে ‘শিষ্টাচার শিক্ষা’ ও ‘সম্মান রক্ষা’র নামে তাকে প্রহার করতে কিংবা বকাঝকা ও হুমকী-ধামকি দিতে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, এর মাধ্যমে সে-ই আপনার ওপর বিজয় লাভ করবে আর আপনি নিজ সম্মান হারিয়ে বসবেন! কারণ আপনি তার সামনে দুর্বল হয়ে পড়লেন, রাগের বশবর্তী হয়ে অমানবিক আচরণ করলেন, নিজের অস্থিরতায় নিয়ন্ত্রণ হারালেন। সত্যি বলতে এটিই হলো দুর্বলতার সংজ্ঞা。

لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ، إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الغَضَبِ

“প্রকৃত বীর সে নয় যে কুস্তিতে বিজয়ী হয় বরং বীর তো সে-ই, যে রাগের মুহূর্তে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।”[৬৬]

আমাদের প্রত্যেকেই এই হাদীসটি জানি ও শুনি। কিন্তু অন্তরে কখনো এই কথা আমাদের আসেনি যে, এটি সন্তানদের দীক্ষাদান ও তাদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। সন্তানকে শারীরিক বা মানসিকভাবে ধরাশায়ী করার মাধ্যমে আমাদের শক্তি ও সম্মান রক্ষা হয় না। বরং এগুলো তখনই রক্ষা হয় যখন তাদের উত্তেজক কর্মকাণ্ডের পরও নিজেকে শান্ত রাখা যায়。

আমাদের সদ্য কৈশোরে পা-দেওয়া-সন্তানেরা একটি শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। এই কারণে তাদের ভেতর ত্বরিত বিদ্রোহী প্রতিক্রিয়া। দেখা দেয়, সেই সাথে তারা এমন আচরণও করে বসে যার কারণে স্বয়ং নিজেরাই একসময় অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। আসলে আমাদের ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয় মাত্র কয়েক সেকেন্ডের, এরপরই বিদ্রোহভাব, প্রতিশোধ-প্রবণতা চলে যায়। তখন শান্ত হয়ে বসে সন্তানের সাথে কথা বলুন। তার ভুল তার নিকট স্পষ্ট করুন। প্রয়োজনে এরপর তাকে শাস্তি দিন। তখন সে দেখতে পাবে এই শাস্তি একজন ন্যায়পরায়ণ শক্তিশালী বাবার পক্ষ থেকে, যিনি রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেন। সে আরও বুঝবে তথাকথিত দীক্ষার নামে নিজের রাগ ঝাড়ার উদ্দেশ্যে নয়; বরং প্রকৃতপক্ষে দীক্ষা দিতেই আপনি তাকে শাস্তি দিচ্ছেন。

সন্তান যখন এটি বুঝতে সক্ষম হয় যে, পিতা তাকে শাস্তি প্রদান করছে নিছক ভালোবাসা থেকে, তার কল্যাণের উদ্দেশ্যে, তখন শাস্তি যত তীব্রই হোক না কেন, এর কারণে সে বাবাকে আরও বেশি ভালোবাসে। বাবার সাথে তার সম্পর্ক উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। কিন্তু সে যদি বাবার চোখে ক্রোধ ও প্রতিশোধের আগুন বাদে আর কিছু দেখতে না পায়, যদি তার অন্তরে এই অনুভূতি জাগে যে, এই শাস্তি মূলত একপ্রকার শত্রুতা ও ঘৃণা থেকেই, তখন বাবার প্রতি তার অন্তরে কঠোরতা তৈরি হয়。

তবে বলতেই হয়, আমরা আমাদের কঠোরতা ও প্রতিশোধকে যত যাই বলে সমর্থন করি না কেন শেষমেশ মানবজাতির শিক্ষক নবি ﷺ-এর কথাই তো সত্য হবে। তিনি বলেছেন,

إِنَّ الرِّفْقَ لَا يَكُوْنُ فِي شَيْءٍ إِلَّا زَانَهُ، وَلَا يُنْزَعُ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا شَانَهُ

“কোনো বিষয়ে নম্রতা থাকলে তার সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। আর কোনো বিষয় থেকে নম্রতা দূর করা হলে তা কলুষিত হয়।”[৬৭]

টিকাঃ
[৬৬] বুখারি, ৬১১৪; মুসলিম, ২৬০৯。
[৬৭] মুসলিম, ২৫৯৪。

📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 চাঁদের দিকে লাফ!

📄 চাঁদের দিকে লাফ!


আমার মেয়ে একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করল, 'বাবা, কাফিররা কি কখনো কুরআনের মতো আরেকটি কিতাব তৈরি করার চেষ্টা করেনি?'

আমি তাকে বললাম, 'খুব ভালো প্রশ্ন করেছ। কিন্তু এর আগে আমি তোমাকে কিছু প্রশ্ন করব আর তুমি উত্তর দেবে। আমি যদি বলি, এখান থেকে দরজা পর্যন্ত একটি লাফ দাও (প্রায় ২ মিটার)। তুমি কি চেষ্টা করবে?'

'হ্যাঁ।'

* 'আচ্ছা যদি টেবিলের ওপর দিতে বলি? (৪ মিটার)।'

* 'ইমমম.. একটু চেষ্টা করব। (হেসে উত্তর দিলো)।'

* 'আচ্ছা এবার যদি বলি, চাঁদ পর্যন্ত লাফ দাও।'

তারা ভাই-বোন সকলে একযোগে হেসে উঠল。

* 'অবশ্যই না।'

* 'মা, কাফিরদের সাথে ঠিক এটাই ঘটেছিল। তারা বিশুদ্ধ আরবিভাষী ছিল, গদ্য ও পদ্য লিখত ঠিক; কিন্তু কুরআনের মতো আরেকটি কিতাব রচনার চেষ্টা করা মূলত তাদের নিকট চাঁদ পর্যন্ত লাফ দেওয়ার মতোই ছিল। কেউ যদি এর চেষ্টাও করত তাকে মানুষ বোকা বাদে আর কিছু ঠাওর করত না। আর তারা নিশ্চয় বোকা হতে চাইত না। তুমি নিজেই কল্পনা করে দেখো, তুমি কাপড় সামান্য গোটালে, তারপর এক পা এগিয়ে আবার এক পা পিছিয়ে লাফ দেওয়ার চেষ্টা করলে। কতটা হাস্যকর দেখাবে!?'

এই কারণে পুরো ইতিহাস ঘেঁটে এমন কোনো ঘটনা পাওয়া যাবে না যেখানে তারা বেশ মনোযোগের সাথে কুরআনকে অনুকরণের চেষ্টা করেছে। বরং তারা এদিকে না গিয়ে নবিজি ﷺ-এর বিরোধিতা, হুমকি-ধামকি, মিথ্যা অপবাদ ইত্যাদি কাজে নিজেদের ব্যস্ত রেখেছিল。

এই মুসলিম প্রজন্মের বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভয়ংকর যে ষড়যন্ত্রটি করা হয়েছে তা হলো, আরবি ভাষায় দুর্বলতা সৃষ্টি করে দেওয়া। এই কারণে আজ তাদেরকে ব্যাখ্যা দিয়ে বলতে হয় যে, কেন কুরআন একটি মু'জিযাসম্পন্ন কিতাব। তাদেরকে দেখাতে হয়, দুই মিটারের দূরত্ব আর চাঁদের দূরত্বের মাঝে পার্থক্য কত। এই নষ্ট শিক্ষাব্যবস্থা তাদেরকে পূর্ব-পশ্চিমের সব জ্ঞান শেখালেও সামান্য এই পার্থক্যটুকু শেখাতে সক্ষম হয়নি।

📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 একটি বালকের গল্প

📄 একটি বালকের গল্প


সেদিন মাসজিদে ইশার সালাত শেষে একটু বসলাম। সামনে দেখতে পেলাম এক কিশোর সুন্নাত সালাতগুলো আদায় করছে। শপথ করে বলতে পারব, অধিকাংশ মুসলিম তার মতো একাগ্রচিত্তে সালাত আদায় করে না। সে কী প্রশান্ত ভাব! কতটা নিরবচ্ছিন্নভাবে রুকু ও সাজদাগুলো আদায় করছে! ছেলেটির মুখে ভদ্রতা ও সততার ছাপ পরিচ্ছন্ন। আমি তার পাশে-বসা-লোকটির দিকে এগিয়ে গিয়ে বললাম, 'ছেলেটি কি আপনার?'
লোকটি বলল, 'হ্যাঁ।'
'বয়স কত তার?'
'১৩ বছর।'
'কী নাম?'
'জিয়াউদ্দীন।'
'ভাই, আপনারা কোথা হতে এসেছেন?'
'সিরিয়া থেকে।'
'সন্তানদের দীক্ষার বিষয়ে আমাকে একটু নসীহত করুন। আমি দেখেছি আপনার সন্তান যুগের ছেলেদের তুলনায় মা শা আল্লাহ, অনেক সুন্দর করে সালাত আদায় করে।'
লোকটি বাহ্যিক বেশভূষায় ছিলেন নিরেট একজন সাধারণ লোক। তিনি আমাকে জবাব দিলেন, 'আমি সবসময় একটি কথাই মাথায় রেখেছি-সন্তানকে কুরআন শিক্ষা দিন। কুরআন তাকে সব শিখিয়ে দেবে।'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00