📄 পচন যখন মূলে!
আমার ভাতিজা আমায় সেদিন একটি ঘটনা শোনাল। সে বলল, 'চাচা, কিছুদিন আগে আমি কিছু তরুণকে সুইমিং পুলে যাওয়ার প্ল্যানিং করতে শুনলাম। আমি তাদেরকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিলাম। এমনকি তাদের আত্মমর্যাদাবোধ উসকে দিতে এও বললাম যে, 'ভাই দেখো, তোমার বোন যদি পরপুরুষের সাথে সাঁতার কাটে, এই দৃশ্য কি তোমার জন্য কখনো সুখকর হবে?' তাদের একজন জবাব দিলো, 'এটা তো স্বাভাবিক বিষয়। তা ছাড়া বোনকে তো আর সাথে নিয়ে যাচ্ছি না।'
আমাদের দেশে সাধারণত দেখবেন, সদ্য কৈশোরে পদার্পণ-করা-ছেলেগুলো তাদের 'পুরুষত্বের' প্রমাণ রাখতে একে অপরকে গালিগাগাছ করে। স্বয়ং বন্ধুর মুখে পিতার বিরুদ্ধে অশ্রাব্য গালি শুনতে পেয়েও সে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকে, কিংবা বিষয়টি সহজেই উড়িয়ে দেয়। সে সেগুলো শুনে আবার হাসে!
তাদের সামনে আপনি কথা বলবেন ঠিকই কিন্তু কী বলে তাদের সম্বোধন করবেন সেটি ঠিক ঠাহর করে উঠতে পারবেন না। ধার্মিকতা না থাকাই তাদের মূল সমস্যা নয়; বরং সমস্যা আরও গভীরে। মূলত ইসলামের সম্বোধন যে মূলভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে সেটিই তাদের মধ্য থেকে গায়েব। তাদের মধ্যে সে আত্মমর্যাদাবোধ নেই যার মাধ্যমে তাদেরকে উসকে দেওয়া যাবে, সে ফিতরাতের সামান্য অংশটুকুও বাকি নেই যেটিকে কেন্দ্র করে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সম্বোধন করেছেন。
ইসলাম এসেছিল আরবের সে গোত্রের নিকট যাদের ছিল আত্মমর্যাদাবোধ, সম্মান ও অহমিকার এক সুউচ্চ প্রাসাদ। শুনলে অবাক হবেন, তাদের কন্যাদের জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো জঘন্য এই কাজ করার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল গায়রাত ও আত্মমর্যাদাবোধ, অর্থাৎ কন্যা অশ্লীলতায় জড়িয়ে পড়তে পারে এই আশঙ্কায়。
তারা সামান্য এক বাক্য গালিকে কেন্দ্র করে কত হাজার-লাখ মাথা যে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল তার কোনো ইয়ত্তা নেই。
এক যুবক নবিজি ﷺ-এর নিকট এসে বলেছিল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাকে ব্যভিচারের অনুমতি দিন।' রাসূলুল্লাহ ﷺ শুধু তাকে এটুক বলেছিলেন, “তোমার মায়ের ক্ষেত্রে কি এটি তুমি পছন্দ করো? তোমার মেয়ে...? তোমার বোন...? তোমার ফুফু...? তোমার খালা...?” যুবক উত্তর দিয়েছিল, 'ওয়াল্লাহ! ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি এটি চাই না। আমার প্রাণ আপনার তরে উৎসর্গিত হোক।”[৬১]
একজন সুস্থ মানুষের উত্তর তো এছাড়া ভিন্ন কিছু হওয়ার কথা নয়। তাই নবিজি তার আত্মমর্যাদাকে কেন্দ্র করে তাকে সম্বোধন করেছিলেন। কিন্তু আজ?! যদি হুবহু সে প্রশ্নগুলোই আজকের মুসলিম যুবকদের করা হয় এবং তারা যদি এই বলে উত্তর দেয় যে, 'হ্যাঁ, আমি পছন্দ করি। আমার মা বোনেরা কী করবে সেটা তাদের ব্যক্তিগত চয়েস।' এরপর আপনার বলার আর কীইবা বাকি থাকবে!?
নবিজি ﷺ বলেছিলেন:
إِنَّ مِنْ أَكْبَرِ الْكَبَائِرِ أَنْ يَلْعَنَ الرَّجُلُ وَالِدَيْهِ
"সবচেয়ে বড়ো গুনাহ হলো, ব্যক্তি নিজের পিতামাতাকে গালি দেওয়া।”
এতটুকু শুনেই সাহাবায়ে কেরাম হতভম্ব হয়ে পড়েছিলেন। বলেছিলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, কেউ কীভাবে নিজের পিতামাতাকে গালি দিতে পারে!?'
তারা মূলত ভাবতেই পারছিলেন না কোনো মানুষ থেকে এই আচরণ প্রকাশ পেতে পারে。
তখন রাসূল ﷺ উত্তরে বলেছিলেন,
يَسُبُّ الرَّجُلُ أَبَا الرَّجُلِ ، فَيَسُبُّ أَبَاهُ ، وَيَسُبُّ أُمَّهُ فَيَسُبُّ أُمَّهُ
“সে অন্যের পিতাকে গালি দেবে, তখন সেই ব্যক্তি তার পিতাকে গালি দেবে, এমনিভাবে সে অন্যের মাকে গালি দেবে, তখন সেই ব্যক্তিও তার মাকে গালি দেবে। (আর এভাবে সে যেন তার নিজের পিতামাতাকেই গালি দিলো)।”[৬২]
সেসময় শুধু এটুক ভাবা যেত যে, কেউ উত্তেজিত অবস্থায় অন্যের বাবা-মার নাম ধরে গালি দিয়ে ফেলল, আর অপরপক্ষও উত্তেজিত অবস্থায় প্রত্যুত্তরে একই শব্দ ব্যবহার করে ফেলল। আমার মনে হয় না, সাহাবায়ে কেরাম জানতেন যে, পরবর্তী সময়ে এমন একটি জাতি আসবে যারা নিজেদের মুসলিম বলে পরিচয় দেবে আবার হাসি মুখে বাবা-মায়ের উদ্দেশ্যে দেওয়া গালিকে হজমও করবে। তাঁরা ইসলামি যুগে তো দূরের কথা জাহিলি যুগে পর্যন্ত এই বিষয়টি কল্পনা করতে পারতেন না。
যারা আজ বাবা-মা হয়েছেন আপনাদের বলি,
* সন্তানদের সাথে বসে যখন একসাথে আপনারা টিভি সিরিয়াল দেখেন তখন মূলত তাদের লাজ-লজ্জার দেওয়াল ভেঙে দেন。
* আল্লাহ যে পোশাক ঘৃণা করে আপনারা যখন তা পরে বাইরে পা রাখেন, তখন তাদের দ্বীনি মানসিকতাকে নষ্ট করে দেন。
* যখন সন্তানদের সম্মান, আত্মমর্যাদাবোধ, সংগ্রাম ও দ্বীনি অহমিকার ওপর গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আপনারা অবহেলা করেন এবং তাদের থেকে দূরে থাকেন, তাদেরকে অলসতা ও অর্থহীন জীবনযাপনের মধ্যে ছেড়ে দেন, তখন আপনারা মূলত সন্তানদের জন্মগত মৌলিক ফিতরাতকেই ধ্বংস করে দেন। আপনাদের কর্মগুণেই তারা এমন সব স্বভাবের ওপর নিজেদের গড়ে তোলে যা জাহিলি যুগের অমানবিক স্বভাবকেও হার মানায়। কবি বলেন,
إِذَا كَانَ الطَّبَاعُ طِبَاعَ سُوءٍ *** فَلَا أَدَبُ يُفِيدُ وَلَا أَدِيبُ
যার জন্মগত স্বভাব-চরিত্র বিগড়ে যায়, সে কোনো উপদেশেই উপকার না পায়。
টিকাঃ
[৬১] আহমাদ, ২২২১১。
[৬২] বুখারি, ৫৯৭৩; মুসলিম, ৯০。
📄 এই পরিবারই আপনার ক্যারিয়ার
মহান আল্লাহ তাআলা পুরুষের মাঝে এমন ঘাটতি রেখেছেন যা নারী ছাড়া কখনো পূরণ হয় না। ঠিক তেমনিভাবে নারীর অপূর্ণতা পুরুষ ছাড়া পূর্ণতা পায় না। তাই একে অপরের সম্পর্ক হবে পরিপূরক হিসেবে, প্রতিযোগী হিসেবে নয়। অনেকটা পাশাপাশি অবস্থিত হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসের ন্যায় সম্পর্ক। তাই ইসলাম নারী-পুরুষ প্রত্যেককেই বিভিন্ন অধিকার ও দায়িত্ব দিয়েছেন এই অপূর্ণতাকে পূর্ণতা দেবার উদ্দেশ্যেই।
অধিকাংশ বাবা-মা সন্তান গ্রহণ করেন ব্যক্তিগত চাহিদার অংশ হিসেবে। এই সন্তান জন্মদানে তাদের ভেতর কোনো মহান উদ্দেশ্য কাজ করে না। ফলস্বরূপ একসময় গিয়ে সন্তান তাদের বোঝায় পরিণত হয়, ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের পথে তারা কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। কলিগদের সামনে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেকে প্রমাণ করতে ব্যস্ত বাবা-মা সন্তানদের দিকে মনোযোগ দেওয়ার সময় পান না। তারা সন্তানদের ব্যাপারে মাথা না ঘামিয়ে তাদেরকে প্রচলিত নষ্ট সভ্যতার কবলে ছেড়ে দেন, সন্তান তখন পশ্চিমাদের তৈরি চরিত্রবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে。
প্রিয় পাঠক, শুনে রাখুন! আপনার সন্তানই আপনার সবচেয়ে বড়ো 'ক্যারিয়ার', অন্য কিছু দিয়ে নয় তাদের মাধ্যমেই নিজেকে প্রমাণ করুন। মৃত্যুর পরে তারাই হবে আপনার সদাকায়ে জারিয়া বা চলমান নেক আমল। তাদের প্রতি আপনার অবহেলা একসময় কুঠার হয়ে ফিরবে, যা কেবল আপনার আফসোসেরই কারণ হয়ে দাঁড়াবে。
قُلْ إِنَّ الْخَاسِرِيْنَ الَّذِيْنَ خَسِرُوا أَنْفُسَهُمْ وَأَهْلِيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَلَا ذَلِكَ هُوَ الْخُسْرَانُ الْمُبِينُ
“আপনি বলুন, 'তারাই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত, যারা কিয়ামতের দিন নিজেকে ও নিজের পরিবার-পরিজনকে ক্ষতির মধ্যে ফেলে দেয়। আর জেনে রেখো, এটাই সুস্পষ্ট ক্ষতি।”[৬৩]
এই উম্মাহর সবচেয়ে শক্তিশালী দুর্গ হলো পরিবার। তাই শত্রুপক্ষ সর্বশক্তি ব্যয় করে এই পরিবার ব্যবস্থা ধ্বংস করতে উঠেপড়ে লেগেছে। যদি পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমরা আল্লাহকে ভয় না করে চলি, তা হলে শত্রুর আগে আমরা নিজেদেরই বারোটা বাজিয়ে ছাড়ব。
টিকাঃ
[৬৩] সূরা যুমার, ৩৯: ১৫。
📄 কর্মবিদ্রোহী প্রার্থনা
রোগী যখন একদিকে ক্ষতিকর সব খাদ্য গ্রহণ করে, আর অপরদিকে গভীর রাতে আল্লাহর দরবারে সুস্থতার জন্য কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করে তখন চিকিৎসা না করার কারণে সে রোগী অবশ্যই গুনাহগার হবে। ঠিক এভাবে পিতা যদি সন্তানের সঠিক দীক্ষা দেওয়ার মূলনীতিগুলো প্রয়োগ না করে বরং এর উল্টো কাজটি করে, তারপর আল্লাহর নিকট সুসন্তান লাভের উদ্দেশ্যে দুআ করে তা হলে এই পিতাও সন্দেহাতীতভাবে গুনাহগার হবে。
অনেক মা-বাবাকে দেখবেন চিৎকার করে বলছেন, 'কেন আমার সন্তান আমার উদ্বেগ ও দুঃখকষ্টের মূল কারণে পরিণত হয়েছে? অথচ আল্লাহ তো বলেছেন, সন্তান হলো দুনিয়ার জীবনের সৌন্দর্য!?'
এ কথাগুলো তারা বলেন তাকদীরের ওপর একপ্রকার দোষ চাপিয়ে, এমনকি সন্তান যে একটি নিয়ামাত সে বিষয়েই তারা সন্দেহ করতে শুরু করেন। অনেকে তো আবার বংশবৃদ্ধির এই চিরাচরিত নিয়মের মধ্যে আল্লাহর হিকমত সম্পর্কেই সংশয়ে পড়ে যান। তাদের এই প্রশ্নের উত্তর স্বয়ং মহান আল্লাহ তাআলাই দিচ্ছেন,
قُلْ هُوَ مِنْ عِنْدِ أَنْفُسِكُمْ
“আপনি বলে দিন, 'এ কষ্ট তোমাদের কাছে এসেছে তোমাদেরই পক্ষ থেকে।” [৬৪]
অন্যান্য সব বিষয়ে যেমন মাধ্যম ও উপকরণ গ্রহণ করা জরুরি, সন্তানকে সুসন্তানে পরিণত করার বিষয়টিও ঠিক এমনই। সুস্থতার জন্য যেমন চিকিৎসা, তৃষ্ণা নিবারণের জন্য যেমন পানি, বেঁচে থাকতে যেমন খাবার প্রয়োজন ঠিক সেভাবেই সুসন্তান গড়ে তুলতে প্রয়োজন সঠিক দীক্ষা。
আপনি তো প্রথম ধাপেই রাসূল -এর আদেশ লঙ্ঘন করেছেন। সন্তানের সঠিক দীক্ষার প্রথম ধাপ হলো দ্বীনদার স্ত্রী নির্বাচন। রাসূল বলেছেন,
فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ
“সুতরাং তুমি দ্বীনদারী ও ধার্মিকতাকেই প্রাধান্য দেবে, নতুবা তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” [৬৫]
এরপর আপনি লঙ্ঘন করলেন নবিজি -এর বাতলে দেওয়া সন্তান দীক্ষা দেওয়ার অন্যান্য সব নীতিমালা। সত্যি বলতে অনেক নীতিমালা সম্পর্কে আপনার ধারণাই ছিল না। আর যেগুলো জানা ছিল তা প্রয়োগ না করে বরং উলটো ও ভুল পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন。
সুতরাং এখন আল্লাহর নিকট ‘ইয়া আল্লাহ’ বলে বেশ কাকুতিমিনতি করার পর যদি কোনো ফলাফল দৃষ্টিগোচর না হয়, তা হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বরং এমন ‘কর্মবিরোধী প্রার্থনা’র জন্যই আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করুন। না হয় আপনিই বলুন, বিষ পান করতে করতে আল্লাহর নিকট সুস্থতা প্রার্থনা করা যায়?!
টিকাঃ
[৬৪] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৬৫。
[৬৫] বুখারি, ৫০৯০; মুসলিম, ১৪৬৬。
📄 বয়ঃসন্ধি
আপনার সদ্য প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান যখন আপনার সাথে অভদ্রতার সব সীমা অতিক্রম করবে, যখন সে অবাধ্য হবে এবং জেদ ধরে বসবে তখন আপনার মন চাইবে ‘শিষ্টাচার শিক্ষা’ ও ‘সম্মান রক্ষা’র নামে তাকে প্রহার করতে কিংবা বকাঝকা ও হুমকী-ধামকি দিতে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, এর মাধ্যমে সে-ই আপনার ওপর বিজয় লাভ করবে আর আপনি নিজ সম্মান হারিয়ে বসবেন! কারণ আপনি তার সামনে দুর্বল হয়ে পড়লেন, রাগের বশবর্তী হয়ে অমানবিক আচরণ করলেন, নিজের অস্থিরতায় নিয়ন্ত্রণ হারালেন। সত্যি বলতে এটিই হলো দুর্বলতার সংজ্ঞা。
لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ، إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الغَضَبِ
“প্রকৃত বীর সে নয় যে কুস্তিতে বিজয়ী হয় বরং বীর তো সে-ই, যে রাগের মুহূর্তে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।”[৬৬]
আমাদের প্রত্যেকেই এই হাদীসটি জানি ও শুনি। কিন্তু অন্তরে কখনো এই কথা আমাদের আসেনি যে, এটি সন্তানদের দীক্ষাদান ও তাদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। সন্তানকে শারীরিক বা মানসিকভাবে ধরাশায়ী করার মাধ্যমে আমাদের শক্তি ও সম্মান রক্ষা হয় না। বরং এগুলো তখনই রক্ষা হয় যখন তাদের উত্তেজক কর্মকাণ্ডের পরও নিজেকে শান্ত রাখা যায়。
আমাদের সদ্য কৈশোরে পা-দেওয়া-সন্তানেরা একটি শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। এই কারণে তাদের ভেতর ত্বরিত বিদ্রোহী প্রতিক্রিয়া। দেখা দেয়, সেই সাথে তারা এমন আচরণও করে বসে যার কারণে স্বয়ং নিজেরাই একসময় অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। আসলে আমাদের ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয় মাত্র কয়েক সেকেন্ডের, এরপরই বিদ্রোহভাব, প্রতিশোধ-প্রবণতা চলে যায়। তখন শান্ত হয়ে বসে সন্তানের সাথে কথা বলুন। তার ভুল তার নিকট স্পষ্ট করুন। প্রয়োজনে এরপর তাকে শাস্তি দিন। তখন সে দেখতে পাবে এই শাস্তি একজন ন্যায়পরায়ণ শক্তিশালী বাবার পক্ষ থেকে, যিনি রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেন। সে আরও বুঝবে তথাকথিত দীক্ষার নামে নিজের রাগ ঝাড়ার উদ্দেশ্যে নয়; বরং প্রকৃতপক্ষে দীক্ষা দিতেই আপনি তাকে শাস্তি দিচ্ছেন。
সন্তান যখন এটি বুঝতে সক্ষম হয় যে, পিতা তাকে শাস্তি প্রদান করছে নিছক ভালোবাসা থেকে, তার কল্যাণের উদ্দেশ্যে, তখন শাস্তি যত তীব্রই হোক না কেন, এর কারণে সে বাবাকে আরও বেশি ভালোবাসে। বাবার সাথে তার সম্পর্ক উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। কিন্তু সে যদি বাবার চোখে ক্রোধ ও প্রতিশোধের আগুন বাদে আর কিছু দেখতে না পায়, যদি তার অন্তরে এই অনুভূতি জাগে যে, এই শাস্তি মূলত একপ্রকার শত্রুতা ও ঘৃণা থেকেই, তখন বাবার প্রতি তার অন্তরে কঠোরতা তৈরি হয়。
তবে বলতেই হয়, আমরা আমাদের কঠোরতা ও প্রতিশোধকে যত যাই বলে সমর্থন করি না কেন শেষমেশ মানবজাতির শিক্ষক নবি ﷺ-এর কথাই তো সত্য হবে। তিনি বলেছেন,
إِنَّ الرِّفْقَ لَا يَكُوْنُ فِي شَيْءٍ إِلَّا زَانَهُ، وَلَا يُنْزَعُ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا شَانَهُ
“কোনো বিষয়ে নম্রতা থাকলে তার সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। আর কোনো বিষয় থেকে নম্রতা দূর করা হলে তা কলুষিত হয়।”[৬৭]
টিকাঃ
[৬৬] বুখারি, ৬১১৪; মুসলিম, ২৬০৯。
[৬৭] মুসলিম, ২৫৯৪。