📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 কুরআনকে তাদের নিকট প্রিয় করুন

📄 কুরআনকে তাদের নিকট প্রিয় করুন


মাঝে মাঝে কুরআন তিলাওয়াতের উদ্দেশ্যে পরিবারের সবাই আমরা একটি ঘরে একত্র হই। তারপর সমস্বরে তিলাওয়াত করতে থাকি। এমনই একদিন আমার এক মেয়ে আমাকে বলল, ‘বাবা, সত্যি বলতে কুরআন তিলাওয়াতের সময় আমার মধ্যে একপ্রকার বিরক্তবোধ কাজ করে।’
'কেন মা?'
* 'কারণ কথাগুলো বুঝি না!'
* 'আচ্ছা আমরা তা হলে কিছু সূরার তাফসীর আরম্ভ করতে পারি। তোমার কী মনে হয়?'
* 'আচ্ছা। ঠিক আছে...'
এরপর থেকে ঘুমের আগে ছোট্ট একটি সময় নির্ধারণ করে প্রতিদিন আমরা তাফসীর পড়তে আরম্ভ করলাম। প্রথমে ছোটো ছোটো সূরাগুলো তারপর সূরা রহমান, আর সর্বশেষ সূরা হুজরাত। কিন্তু লক্ষ করলাম যে সূরাটি সন্তানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল, তা হলো সূরা ইউসুফ। এখানকার সব ঘটনা যেন তারা হা হয়ে গিলছিল, স্পষ্ট দেখতে পেলাম তাদের হৃদয়ে এগুলো রেখাপাত করছিল। তাদের কিশোর বয়সের উপযোগী হয় এমন আকীদাগত ও চারিত্রিক কিছু ছোটো ছোটো প্রাসঙ্গিক কথাও তাদেরকে শুনিয়ে দিলাম।
যেমন ধরুন, সূরা ইউসুফে আকীদাগত প্রাসঙ্গিক আলোচনা করতে গিয়ে তাদেরকে বললাম, ‘দেখো, আল্লাহর নবি ইউসুফ -এর ওপর মিথ্যা অপবাদ দিয়ে কেমন নির্যাতন চালানো হয়েছিল, এতকিছু সত্ত্বেও যখন তিনি দেখতে পেলেন তার কারাগারের এক সাথি অচিরেই মুক্তি পেতে যাচ্ছে, তখন তিনি তাঁর সেই সাথিকে বাদশার নিকট সুপারিশ করতে বলার চেয়ে তাওহীদের প্রতি দাওয়াত দেওয়ার ব্যাপারে অধিক গুরুত্বারোপ করলেন।'
চরিত্রগত বিষয়ে তাদেরকে বললাম, 'এক দূত এসে যখন ইউসুফ -কে জানাল যে, বাদশাহ তোমার সাথে দেখা করতে চায়। দেখো, তখন তিনি কেমন দৃঢ়তা ও আত্মমর্যাদার সাথে এই কথা বলেছিলেন যে, সকলের সামনে যতক্ষণ আমার দোষমুক্তি ঘোষণা করা না হবে ততক্ষণ আমি এখান থেকে বের হব না।'
তাই প্রত্যেক বাবা-মাকেই আমি পরামর্শ দেবো তারা যেন সূরা ইউসুফ দিয়েই সন্তানদের নিকট কুরআনকে প্রিয় করে তোলার এই প্রকল্প আরম্ভ করেন। আল্লাহ তাআলাই তাওফীকদাতা।

📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 কীভাবে বুঝব যে, আমার সন্তান শিক্ষিত!

📄 কীভাবে বুঝব যে, আমার সন্তান শিক্ষিত!


সমসাময়িক অনেক বিষয়ে কথা বলা থেকে আমি সাধারণত বিরত থাকি। কারণ একদিকে তো এর ছোটোখাটো সংস্কার পর্যন্ত করা সম্ভব হয় না আর সে সাথে বড়োসড়ো এক বিতর্কও সৃষ্টি হয়ে যায়। সত্যি বলতে, বর্তমান মুসলিম বিশ্বে আমাদের সন্তানেরা সঠিক শিক্ষা পাচ্ছে বলে আমি মনে করি না। এই সিলেবাসকে আমার 'শিক্ষা সিলেবাস' বলে মনে হয় না। আর এই স্কুলগুলোকে 'শিক্ষালয়'ও বলা যায় না。
* আপনার সন্তান ১২-১৪ বছর স্কুলে কাটিয়ে সে যখন তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর কার্যকরী জবাব জানবে না তখন বলুন এই শিক্ষার কী-ইবা মূল্য?! (জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সে প্রশ্নগুলো হলো: কে আমি? কেন আমার এই অস্তিত্ব? আল্লাহর অস্তিত্বের যৌক্তিক ও স্বভাবজাত প্রমাণগুলো কী কী? নবিজির নুবুওয়াতের দলীল কী? প্রচলিত ভ্রান্তিসমূহ নিরসনে আমার জবাব কী হবে? ঈমান ও ইলম, দৃশ্য ও অদৃশ্যের মাঝে সম্পর্ক কী? ইত্যাদি)
* আপনি দেখলেন আপনার সন্তান বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি অতিক্রম করে ফেলছে অথচ সে জানে না এই জীবনে সে মূলত কী চায়? সে এখনো জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়নি। তাকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে সে উদ্দেশ্য কীভাবে বাস্তবায়িত হয় সে সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই। তা হলে বলুন এই শিক্ষার কীইবা মূল্য?!
☆ সে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করে ফেলছে অথচ তার ভেতর চিন্তাগত, আকীদাগত ও পদ্ধতিগত কোনো রক্ষাকবচ নেই। ফলে তুচ্ছ থেকে তুচ্ছ বিষয়ও তার ঈমানকে হুমকিতে ফেলে দেয়। এমন অনেক আন্ডার-গ্র্যাজুয়েট, গ্র্যাজুয়েট ও পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট শিক্ষিতদের আমরা দেখতে পাই যারা নাস্তিকে পরিণত হয়েছেন কিংবা অন্ততপক্ষে এমন সন্দেহে নিপতিত হয়েছেন যা তাদের ঈমান ছিনিয়ে নিতে যথেষ্ট। তা হলে বলুন এই শিক্ষার কীইবা মূল্য?!
* আপনার সন্তান উচ্চশিক্ষার ধাপ শেষ করেছে ঠিকই কিন্তু সে নিজের ইতিহাস সম্পর্কে কোনো ধারণাই রাখে না। সে জানে না তার আদর্শ কী আর প্রকৃত বীর কারা? নিজের ইসলামি আত্মপরিচয়ে তো সে গর্ববোধ করেই না; বরং তার মধ্যে একপ্রকার হীনমন্যতা ও পরাজিত মানসিকতা কাজ করে। বেশভূষায় সে ভিনদেশি ব্যভিচারী ও মদ্যপদের অনুসরণ করে। তা হলে বলুন এই শিক্ষার কীইবা মূল্য?!
* পড়াশোনার অধ্যায় তার প্রায় শেষ অথচ ব্যক্তিগত জীবনে আল্লাহর অবস্থান সম্পর্কে তার কোনো জানাশোনা নেই। আল্লাহর সম্মান, ভালোবাসা ও আনুগত্য তার অন্তরে কতটুকু বিরাজ করা অত্যাবশ্যক সে ব্যাপারে তার সামান্যতম ধারণা নেই। সে জানেই না, অন্য সব আদেশের ওপর আল্লাহর আদেশকে প্রাধান্য দিতে হয়, আল্লাহর খাতিরেই বন্ধুত্ব স্থাপন করতে হয় এবং তাঁর খাতিরেই শত্রুতা পোষণ করতে হয়। ভালোবাসতে হয় আল্লাহর জন্য আবার ঘৃণাও করতে হয় তারই জন্য। এখন বলুন এই শিক্ষার কীইবা মূল্য?!
* আপনার সন্তানের উচ্চশিক্ষার অধ্যায় শেষ অথচ সে এখনো যথাযথ জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। সিলেবাস, গবেষণা, প্রবন্ধ রচনা, বৈজ্ঞানিক সমালোচনা ও দলীল-প্রমাণের ক্ষেত্রে মৌলিক জ্ঞান পর্যন্ত সে রাখে না। তা হলে বলুন এই শিক্ষার কীইবা মূল্য?!
* সে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেছে অথচ এমন কোনো জ্ঞান তার নেই যা তাকে মানসিকভাবে প্রশান্ত করবে, নিজের সাথে স্বাচ্ছন্দ্য হতে শেখাবে। নিজেকে মূল্যায়ন করতে শেখাবে, বুঝতে শেখাবে, গ্রহণ করতে শেখাবে। যে জ্ঞান তার দুর্বলতা ও শক্তির স্থানগুলো ধরে ধরে চিহ্নিত করবে, তাকে পরিশুদ্ধ করবে। তা হলে বলুন এই শিক্ষার কী-ইবা মূল্য?!
এতক্ষণ পর্যন্ত এই স্কুলগুলো আমাদের কী শেখায়নি সে বিষয়গুলোই শুধু বর্ণনা করলাম, উল্টো কী বিষ শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে গেঁথে দিচ্ছে সে বিষয়ে তো কোনো আলোচনা-ই করিনি!
এত বছর আমি আমার সন্তানদের এক স্কুল থেকে অন্য স্কুলে ভর্তি করিয়েই যাচ্ছি। যাতে তারা এই অস্থির পরিস্থিতির মাঝেও এমন কোনো স্থান খুঁজে পায়, যা শিক্ষা ও দীক্ষার ক্ষেত্রে তাদের অন্তরে কিছু ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করবে। কিন্তু অবস্থা হতাশাজনক। আপনারা যারা বাবা-মা, সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়েছেন ভেবে নিশ্চিন্ত মনে নিজেকে প্রবোধ দিয়ে যাবেন না। ওপরে এতকথা এইজন্যই বললাম। আর মনে রাখবেন, তাদের শিক্ষাদীক্ষার প্রকৃত দায়িত্ব আপনাদের ঘাড়েই বর্তায়। এই দায়িত্ব থেকে আপনাদের মুক্তি নেই। সুতরাং বিষয়টির প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দিন।

📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 তারবিয়াতকেন্দ্রিক গ্রাফিক ভুল

📄 তারবিয়াতকেন্দ্রিক গ্রাফিক ভুল


আমাদের মধ্যে অনেকেই সন্তানদের ওপর 'তারবিয়াত বিনাশী' কর্মকাণ্ড চালান। কেউ চিল্লান, কেউ-বা লাঞ্ছিত করেন, অবজ্ঞা ও উপহাসের সুরে কথা বলেন, ভয় দেখান, হুমকি দেন। এমনকি কেউ একপ্রকার প্রতিশোধ থেকেই সন্তানদের প্রহার করেন। এরপর যদি সেই পুত্র বা কন্যা কোনো ধরনের ব্যক্তিত্ব বা শক্তির অধিকারী হয়ে থাকে তা হলে সে নিজের ব্যক্তিত্ব রক্ষার্থে প্রতিরোধের চেষ্টা চালায়। অনেক সময় এই ক্ষেত্রে সে বেশ কঠোরতার আশ্রয় নেয়। কথা অমান্য করে, চোখ লাল করে দেখে, অবজ্ঞাভরে উত্তর দেয়, ভয়ংকর সব কর্মকাণ্ড করে। আর সে এসব কিছু করে মূলত নিজের অবশিষ্ট ব্যক্তিত্ব রক্ষার্থে যা আমরা ভেঙে দিতে চাই। এরপর তাদের এসমস্ত প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ড দেখার পর আমরা শারীআতের দোহাই টানতে থাকি, আর তাদেরকে আল্লাহর ভয় দেখাই—'তুমি পিতামাতার অবাধ্য সন্তান', 'যেখানে আল্লাহ পিতামাতাকে উফ পর্যন্ত বলতে নিষেধ করেছে সেখানে তুমি কিনা চোখ রাঙিয়ে কথা বলছো', 'আমি তোমার প্রতি অসন্তুষ্ট' ইত্যাদি সব বলতে থাকি।
আমরা মূলত আমাদের সন্তানদের আল্লাহর ভালোবাসার ওপর গড়ে তুলতে সচেষ্ট হইনি। তাদের সাথে বিরোধের মুহূর্তেই শুধু আল্লাহর বাণী সুন্দর করে আওড়িয়েছি, কেবল তখনই আমরা তাদেরকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়েছি যখন আমাদের প্রয়োজন পড়েছে। এর মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে সন্তানের হৃদয়ে আমরা যে বিকৃত রূপ তৈরি করে দিয়েছি এর ক্ষতিকর তিনটি পরিণতি হলো :
১. আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের প্রতি ভালোবাসায় সন্তানদের হৃদয়ে ঘাটতি তৈরি হয়。
২. তাদের ব্যক্তিত্ব-ধ্বংসকারী তারবিয়াতের ক্ষেত্রে ভুল একটি পদ্ধতি তাদের ওপর প্রয়োগ করা হয়。
৩. ভুল এই পদ্ধতি প্রয়োগের কারণে তারা কঠোর ও খারাপ আচরণের মাধ্যমে নিজেদের ব্যক্তিত্ব রক্ষা করতে চায়; যার ফলে তাদের স্বভাব-চরিত্র প্রায় বিনষ্ট হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়।
প্রিয় ভাইয়েরা, সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগ পর্যন্ত আল্লাহ তাদের ওপর কোনো প্রকার ভার অর্পণ করেননি, তাদের ভুলের জবাবদিহিতা তিনি চাননি। এটি মূলত তার গভীর হিকমত ও প্রজ্ঞার অংশ। এসময় তারা আমাদের ভুল থেকে নিজেদের ব্যক্তিত্ব রক্ষা করতে অনেকটা নির্বোধের মতো আচরণ করে বসে। যেহেতু আমরা তাদেরকে সুন্দর আচরণ শেখাইনি তাই এছাড়া ভিন্ন কোনো প্রতিরোধ সম্পর্কে তাদের ধারণা থাকে না। তাদের এমন কর্মকাণ্ড আমাদের জন্য সতর্কঘণ্টা হিসেবে কাজ করে। যেন আমরা তাদেরকে অসময়ে আল্লাহর ভয় না দেখিয়ে বরং নিজেদের ভুলগুলো সংশোধনে মনোযোগ দিতে পারি。
আমরা মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে চেপে-বসা সে শাসকগোষ্ঠীর মতো হতে চাই না যারা একদিকে নিজেদের দায়িত্ব পূরণ করে না, আবার অন্যদিকে মানুষকে নিজেদের অনুগত রাখতে শারীআর উদ্ধৃতির আশ্রয় গ্রহণ করে。
আমরা আমাদের সন্তানদের সে স্তরে পৌঁছাতে চাই না যেখানে পৌঁছে তারা আমাদের উদ্দেশ্যে বলবে, 'হ্যাঁ আমি অবাধ্য সন্তান', 'তোমার ইচ্ছা হলে আমার ওপর অসন্তুষ্ট হও, তাতে আমার কী আসে যায়', 'আমি এসব পাত্তা দিই না'। একে তো এভাবে আমরা তাদের কাছ থেকে আমাদের প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা আদায় করতে পারি না, উপরন্তু সে অবস্থায় আল্লাহর আদেশ-নিষেধের প্রতিও তাদের অন্তরে কোনো ধরনের শ্রদ্ধাবোধ বাকি থাকে না。
আমরা অবশ্যই চাই, আমাদের সন্তানদের মধ্যে যেন আনুগত্য ও সদাচরণের বীজ বপন করা যায়। অবাধ্যতা ও অসদাচরণের ক্ষেত্রে তাদের ভেতর যেন আল্লাহভীতি ঢুকিয়ে দেওয়া যায়। যাতে আমাদের সমাজ সেসব সন্তান দ্বারা আক্রান্ত হয়ে না পড়ে যারা পিতার বিরুদ্ধে আগ্রাসী মনোভাব লালন করে। কারণ এটি পশ্চিমা মতাদর্শেরই বিষফল。
তাই আপনার কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করুন, এরপর নিজ অধিকার চেয়ে নিন, আল্লাহ তাআলা প্রত্যেককেই তার অধিকার পরিপূর্ণভাবে প্রদান করেছেন。

📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 পচন যখন মূলে!

📄 পচন যখন মূলে!


আমার ভাতিজা আমায় সেদিন একটি ঘটনা শোনাল। সে বলল, 'চাচা, কিছুদিন আগে আমি কিছু তরুণকে সুইমিং পুলে যাওয়ার প্ল্যানিং করতে শুনলাম। আমি তাদেরকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিলাম। এমনকি তাদের আত্মমর্যাদাবোধ উসকে দিতে এও বললাম যে, 'ভাই দেখো, তোমার বোন যদি পরপুরুষের সাথে সাঁতার কাটে, এই দৃশ্য কি তোমার জন্য কখনো সুখকর হবে?' তাদের একজন জবাব দিলো, 'এটা তো স্বাভাবিক বিষয়। তা ছাড়া বোনকে তো আর সাথে নিয়ে যাচ্ছি না।'

আমাদের দেশে সাধারণত দেখবেন, সদ্য কৈশোরে পদার্পণ-করা-ছেলেগুলো তাদের 'পুরুষত্বের' প্রমাণ রাখতে একে অপরকে গালিগাগাছ করে। স্বয়ং বন্ধুর মুখে পিতার বিরুদ্ধে অশ্রাব্য গালি শুনতে পেয়েও সে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকে, কিংবা বিষয়টি সহজেই উড়িয়ে দেয়। সে সেগুলো শুনে আবার হাসে!

তাদের সামনে আপনি কথা বলবেন ঠিকই কিন্তু কী বলে তাদের সম্বোধন করবেন সেটি ঠিক ঠাহর করে উঠতে পারবেন না। ধার্মিকতা না থাকাই তাদের মূল সমস্যা নয়; বরং সমস্যা আরও গভীরে। মূলত ইসলামের সম্বোধন যে মূলভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে সেটিই তাদের মধ্য থেকে গায়েব। তাদের মধ্যে সে আত্মমর্যাদাবোধ নেই যার মাধ্যমে তাদেরকে উসকে দেওয়া যাবে, সে ফিতরাতের সামান্য অংশটুকুও বাকি নেই যেটিকে কেন্দ্র করে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সম্বোধন করেছেন。

ইসলাম এসেছিল আরবের সে গোত্রের নিকট যাদের ছিল আত্মমর্যাদাবোধ, সম্মান ও অহমিকার এক সুউচ্চ প্রাসাদ। শুনলে অবাক হবেন, তাদের কন্যাদের জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো জঘন্য এই কাজ করার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল গায়রাত ও আত্মমর্যাদাবোধ, অর্থাৎ কন্যা অশ্লীলতায় জড়িয়ে পড়তে পারে এই আশঙ্কায়。
তারা সামান্য এক বাক্য গালিকে কেন্দ্র করে কত হাজার-লাখ মাথা যে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল তার কোনো ইয়ত্তা নেই。

এক যুবক নবিজি ﷺ-এর নিকট এসে বলেছিল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাকে ব্যভিচারের অনুমতি দিন।' রাসূলুল্লাহ ﷺ শুধু তাকে এটুক বলেছিলেন, “তোমার মায়ের ক্ষেত্রে কি এটি তুমি পছন্দ করো? তোমার মেয়ে...? তোমার বোন...? তোমার ফুফু...? তোমার খালা...?” যুবক উত্তর দিয়েছিল, 'ওয়াল্লাহ! ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি এটি চাই না। আমার প্রাণ আপনার তরে উৎসর্গিত হোক।”[৬১]

একজন সুস্থ মানুষের উত্তর তো এছাড়া ভিন্ন কিছু হওয়ার কথা নয়। তাই নবিজি তার আত্মমর্যাদাকে কেন্দ্র করে তাকে সম্বোধন করেছিলেন। কিন্তু আজ?! যদি হুবহু সে প্রশ্নগুলোই আজকের মুসলিম যুবকদের করা হয় এবং তারা যদি এই বলে উত্তর দেয় যে, 'হ্যাঁ, আমি পছন্দ করি। আমার মা বোনেরা কী করবে সেটা তাদের ব্যক্তিগত চয়েস।' এরপর আপনার বলার আর কীইবা বাকি থাকবে!?

নবিজি ﷺ বলেছিলেন:

إِنَّ مِنْ أَكْبَرِ الْكَبَائِرِ أَنْ يَلْعَنَ الرَّجُلُ وَالِدَيْهِ
"সবচেয়ে বড়ো গুনাহ হলো, ব্যক্তি নিজের পিতামাতাকে গালি দেওয়া।”

এতটুকু শুনেই সাহাবায়ে কেরাম হতভম্ব হয়ে পড়েছিলেন। বলেছিলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, কেউ কীভাবে নিজের পিতামাতাকে গালি দিতে পারে!?'

তারা মূলত ভাবতেই পারছিলেন না কোনো মানুষ থেকে এই আচরণ প্রকাশ পেতে পারে。

তখন রাসূল ﷺ উত্তরে বলেছিলেন,

يَسُبُّ الرَّجُلُ أَبَا الرَّجُلِ ، فَيَسُبُّ أَبَاهُ ، وَيَسُبُّ أُمَّهُ فَيَسُبُّ أُمَّهُ

“সে অন্যের পিতাকে গালি দেবে, তখন সেই ব্যক্তি তার পিতাকে গালি দেবে, এমনিভাবে সে অন্যের মাকে গালি দেবে, তখন সেই ব্যক্তিও তার মাকে গালি দেবে। (আর এভাবে সে যেন তার নিজের পিতামাতাকেই গালি দিলো)।”[৬২]

সেসময় শুধু এটুক ভাবা যেত যে, কেউ উত্তেজিত অবস্থায় অন্যের বাবা-মার নাম ধরে গালি দিয়ে ফেলল, আর অপরপক্ষও উত্তেজিত অবস্থায় প্রত্যুত্তরে একই শব্দ ব্যবহার করে ফেলল। আমার মনে হয় না, সাহাবায়ে কেরাম জানতেন যে, পরবর্তী সময়ে এমন একটি জাতি আসবে যারা নিজেদের মুসলিম বলে পরিচয় দেবে আবার হাসি মুখে বাবা-মায়ের উদ্দেশ্যে দেওয়া গালিকে হজমও করবে। তাঁরা ইসলামি যুগে তো দূরের কথা জাহিলি যুগে পর্যন্ত এই বিষয়টি কল্পনা করতে পারতেন না。

যারা আজ বাবা-মা হয়েছেন আপনাদের বলি,
* সন্তানদের সাথে বসে যখন একসাথে আপনারা টিভি সিরিয়াল দেখেন তখন মূলত তাদের লাজ-লজ্জার দেওয়াল ভেঙে দেন。
* আল্লাহ যে পোশাক ঘৃণা করে আপনারা যখন তা পরে বাইরে পা রাখেন, তখন তাদের দ্বীনি মানসিকতাকে নষ্ট করে দেন。
* যখন সন্তানদের সম্মান, আত্মমর্যাদাবোধ, সংগ্রাম ও দ্বীনি অহমিকার ওপর গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আপনারা অবহেলা করেন এবং তাদের থেকে দূরে থাকেন, তাদেরকে অলসতা ও অর্থহীন জীবনযাপনের মধ্যে ছেড়ে দেন, তখন আপনারা মূলত সন্তানদের জন্মগত মৌলিক ফিতরাতকেই ধ্বংস করে দেন। আপনাদের কর্মগুণেই তারা এমন সব স্বভাবের ওপর নিজেদের গড়ে তোলে যা জাহিলি যুগের অমানবিক স্বভাবকেও হার মানায়। কবি বলেন,

إِذَا كَانَ الطَّبَاعُ طِبَاعَ سُوءٍ *** فَلَا أَدَبُ يُفِيدُ وَلَا أَدِيبُ

যার জন্মগত স্বভাব-চরিত্র বিগড়ে যায়, সে কোনো উপদেশেই উপকার না পায়。

টিকাঃ
[৬১] আহমাদ, ২২২১১。
[৬২] বুখারি, ৫৯৭৩; মুসলিম, ৯০。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00