📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 কন্যার কবরের সামনে শাইখের দেওয়া আবেগঘন নসীহা

📄 কন্যার কবরের সামনে শাইখের দেওয়া আবেগঘন নসীহা


আলহামদুলিল্লাহ, এতকিছু সত্ত্বেও আমার মেয়ে আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর একটিবারের জন্যও অসন্তুষ্ট হয়নি। আল্লাহর করুণা। সে গতকাল আমাকে বলেছিল, 'বাবা, জান্নাতের সৌন্দর্য বর্ণিত হয়েছে এমন কিছু আয়াত আমাকে তিলাওয়াত করে শোনাও।'

ফুসফুস অচল হয়ে যাওয়ার কারণে গতরাতে তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। আর সে তখন অবিরাম জপছিল, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। ইয়া আল্লাহ, ইয়া রব, সমস্ত প্রশংসা আপনার। আমার ধারণা আল্লাহ তাকে অনেক সম্মানিত করবেন। বিশেষ করে এই কারণে যে, সে ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক নাবালেগা। ওয়াল্লাহ! আমার ধারণা আল্লাহ তাকে সম্মানিত করবেনই。

আমি ও আমার পরিবার বিষয়টি খুব সহজভাবে নিয়েছি। উত্তম আমল করার পর আমরা তার সাথে জান্নাতে মিলিত হব, ইন শা আল্লাহ। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

وَالَّذِينَ آمَنُوا وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُمْ بِإِيْمَانٍ أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَمَا أَلَتْنَاهُمْ مِّنْ عَمَلِهِمْ مِّنْ شَيْءٍ كُلُّ امْرِئٍ بِمَا كَسَبَ رَهِينٌ *

“যারা ঈমান আনে এবং যাদের সন্তানেরা ঈমানের ক্ষেত্রে তাদের অনুগামী হয়, আমি তাদেরকে তাদের পিতৃপুরুষদের সাথে মিলিত করব এবং তাদের আমল বিন্দুমাত্রও হ্রাস করব না। প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃত কর্মের জন্য দায়ী।”[৫৯]
আমি তো সেই বাবার কথা কল্পনা-ই করতে পারছি না যিনি সন্তানদের সঠিক তারবিয়াতে গড়ে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন, অথচ সন্তান আল্লাহর অবাধ্যতা কিংবা কুফরি অবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। তার বাবার নিশ্চয় আফসোসের অন্ত থাকবে না, কারণ হতে পারে এটাই ছিল তার সাথে শেষ সাক্ষাৎ, যার পরে তাদের আর কখনো দেখা হবে না। একজনের আবাস হবে চিরস্থায়ী জান্নাত আর অপরজনের ঠিকানা চিরস্থায়ী জাহান্নাম। ওয়াল্লাহ! এটাই হলো প্রকৃত যন্ত্রণা。

قُلْ إِنَّ الْخَاسِرِينَ الَّذِيْنَ خَسِرُوا أَنْفُسَهُمْ وَأَهْلِيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَلَا ذَلِكَ هُوَ الْخُسْرَانُ الْمُبِينُ .

“বলুন, ক্ষতিগ্রস্ত তো তারাই যারা কিয়ামাতের দিন নিজেদের ও নিজেদের পরিজনবর্গের ক্ষতিসাধন করে। জেনে রেখো, এটাই সুস্পষ্ট ক্ষতি।”[৬০]

কেউ হয়তো জান্নাতে যাবে, কিন্তু সে তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে। কারণ তারা জাহান্নামী। আল্লাহ আমাদের সবাইকে রক্ষা করুন。

ওয়াল্লাহ! আমার দুঃখ শুধু এটুকুই যে আমার কন্যা আমাকে ছেড়ে গেছে। কিন্তু বিশ্বাস করুন আমার অন্তর এরচেয়েও বেশি প্রশান্তিতে ছেয়ে আছে। আল্লাহ তাকে এরকম উত্তম অবস্থায় জীবনের পরিসমাপ্তি দিয়েছেন। এ তো আল্লাহর বিশেষ করুণা ও রহমত。

প্রিয় ভাইয়েরা, আমি বারবার বলছি, আপনাদের প্রতি উপদেশ থাকবে, ভালোবাসার প্রিয়জনদের মৃত্যুর পূর্বে অন্তত তাদের হিদায়াতের প্রতি আগ্রহী হোন, তাদের কাছ থেকে তাওবা একপ্রকার ছিনিয়ে নিন। না হয় হতে পারে আপনি উদাসীন থাকার কারণে আপনার কোনো প্রিয় ব্যক্তি কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে। হয়তো সে সংশয় নিয়ে কিংবা আল্লাহর বিধানকে উপহাস করে পরকালে পাড়ি জমাবে, যা আপনার জন্য গ্লানি হয়ে থাকবে আর তার ঠিকানা হবে চিরযন্ত্রণার জাহান্নাম。

স্মরণ করুন প্রিয় নবি -এর ঘটনা। তিনি চাচা আবু তালিবের শিয়রে বসে তার মুখ থেকে কালিমা বের করার কত জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রিয় চাচা, শুধু একবার কালিমাটা পড়ুন, এর মাধ্যমে কিয়ামাতের দিন আমি আল্লাহর কাছে আপনার জন্য সুপারিশ করব। শুধু কালিমাটা পড়ুন, হয়তো আল্লাহ রহম করবেন।

যে চাচা নিজের জান-মাল-সন্তান তাঁর জন্য উৎসর্গ করে দিয়েছিল নবিজি ﷺ সেই চাচার সাথে জান্নাতে একত্রিত হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি আবদুল মুত্তালিবের ধর্মে মৃত্যুবরণ করলেন। সত্যিই এটি খুব করুণ পরিস্থিতি। আমি নিজে সহ্য করতে পারতাম না。

আল্লাহর অনুগ্রহ যে আমার মেয়ে ধৈর্যশীল ও সন্তুষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। শেষ সময়ে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত শরীরেও সে বলেছিল, 'যোহরের সালাত পড়িনি, আমাকে ওজু করিয়ে দাও।'

নিজের হিজাব, লজ্জা ও লাজুকতার ব্যাপারে সে সদা সতর্ক ছিল। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর কোনো বিধান নিয়ে উপহাস হতে দেখলে সে ক্রোধে জ্বলে উঠত আর বলত, 'বাবা দেখো! তারা রক্ষণশীলতা নিয়ে উপহাস করছে...। বাবা, দেখো ইসলাম নিয়ে বাজে মন্তব্য করছে...।'

আমি আল্লাহর প্রতি এই সুধারণা রাখতে পারি যে, তিনি আমার কন্যাকে সম্মানিত করবেন। আমি আশা করি, আমাদের সান্নিধ্যের তুলনায় নিশ্চয় আল্লাহর সান্নিধ্য তার জন্য অধিক কল্যাণকর হবে। এখন আমার কাজ শুধু এটুকুই যে, জীবনের বাকি সময়গুলো উত্তম কাজে ব্যবহার করে তার সাথে মিলিত হওয়া。

এই উপস্থিতির কারণে আল্লাহ আপনাদের সকলকে উত্তম প্রতিদান দিন। আল্লাহর নিকট প্রার্থনা যেন তিনি প্রিয়জনদের হিদায়াত দানের মাধ্যমে আপনাদের সম্মানিত করেন, কোনো রকম হিসাব ছাড়া তাদের সাথে জান্নাতুল ফিরদাউসে একত্র করেন, আমীন。

টিকাঃ
[৫৯] সূরা তুর, ৫২: ২১。
[৬০] সূরা যুমার, ৩৯ : ১৫。

📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 কুরআনকে তাদের নিকট প্রিয় করুন

📄 কুরআনকে তাদের নিকট প্রিয় করুন


মাঝে মাঝে কুরআন তিলাওয়াতের উদ্দেশ্যে পরিবারের সবাই আমরা একটি ঘরে একত্র হই। তারপর সমস্বরে তিলাওয়াত করতে থাকি। এমনই একদিন আমার এক মেয়ে আমাকে বলল, ‘বাবা, সত্যি বলতে কুরআন তিলাওয়াতের সময় আমার মধ্যে একপ্রকার বিরক্তবোধ কাজ করে।’
'কেন মা?'
* 'কারণ কথাগুলো বুঝি না!'
* 'আচ্ছা আমরা তা হলে কিছু সূরার তাফসীর আরম্ভ করতে পারি। তোমার কী মনে হয়?'
* 'আচ্ছা। ঠিক আছে...'
এরপর থেকে ঘুমের আগে ছোট্ট একটি সময় নির্ধারণ করে প্রতিদিন আমরা তাফসীর পড়তে আরম্ভ করলাম। প্রথমে ছোটো ছোটো সূরাগুলো তারপর সূরা রহমান, আর সর্বশেষ সূরা হুজরাত। কিন্তু লক্ষ করলাম যে সূরাটি সন্তানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল, তা হলো সূরা ইউসুফ। এখানকার সব ঘটনা যেন তারা হা হয়ে গিলছিল, স্পষ্ট দেখতে পেলাম তাদের হৃদয়ে এগুলো রেখাপাত করছিল। তাদের কিশোর বয়সের উপযোগী হয় এমন আকীদাগত ও চারিত্রিক কিছু ছোটো ছোটো প্রাসঙ্গিক কথাও তাদেরকে শুনিয়ে দিলাম।
যেমন ধরুন, সূরা ইউসুফে আকীদাগত প্রাসঙ্গিক আলোচনা করতে গিয়ে তাদেরকে বললাম, ‘দেখো, আল্লাহর নবি ইউসুফ -এর ওপর মিথ্যা অপবাদ দিয়ে কেমন নির্যাতন চালানো হয়েছিল, এতকিছু সত্ত্বেও যখন তিনি দেখতে পেলেন তার কারাগারের এক সাথি অচিরেই মুক্তি পেতে যাচ্ছে, তখন তিনি তাঁর সেই সাথিকে বাদশার নিকট সুপারিশ করতে বলার চেয়ে তাওহীদের প্রতি দাওয়াত দেওয়ার ব্যাপারে অধিক গুরুত্বারোপ করলেন।'
চরিত্রগত বিষয়ে তাদেরকে বললাম, 'এক দূত এসে যখন ইউসুফ -কে জানাল যে, বাদশাহ তোমার সাথে দেখা করতে চায়। দেখো, তখন তিনি কেমন দৃঢ়তা ও আত্মমর্যাদার সাথে এই কথা বলেছিলেন যে, সকলের সামনে যতক্ষণ আমার দোষমুক্তি ঘোষণা করা না হবে ততক্ষণ আমি এখান থেকে বের হব না।'
তাই প্রত্যেক বাবা-মাকেই আমি পরামর্শ দেবো তারা যেন সূরা ইউসুফ দিয়েই সন্তানদের নিকট কুরআনকে প্রিয় করে তোলার এই প্রকল্প আরম্ভ করেন। আল্লাহ তাআলাই তাওফীকদাতা।

📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 কীভাবে বুঝব যে, আমার সন্তান শিক্ষিত!

📄 কীভাবে বুঝব যে, আমার সন্তান শিক্ষিত!


সমসাময়িক অনেক বিষয়ে কথা বলা থেকে আমি সাধারণত বিরত থাকি। কারণ একদিকে তো এর ছোটোখাটো সংস্কার পর্যন্ত করা সম্ভব হয় না আর সে সাথে বড়োসড়ো এক বিতর্কও সৃষ্টি হয়ে যায়। সত্যি বলতে, বর্তমান মুসলিম বিশ্বে আমাদের সন্তানেরা সঠিক শিক্ষা পাচ্ছে বলে আমি মনে করি না। এই সিলেবাসকে আমার 'শিক্ষা সিলেবাস' বলে মনে হয় না। আর এই স্কুলগুলোকে 'শিক্ষালয়'ও বলা যায় না。
* আপনার সন্তান ১২-১৪ বছর স্কুলে কাটিয়ে সে যখন তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর কার্যকরী জবাব জানবে না তখন বলুন এই শিক্ষার কী-ইবা মূল্য?! (জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সে প্রশ্নগুলো হলো: কে আমি? কেন আমার এই অস্তিত্ব? আল্লাহর অস্তিত্বের যৌক্তিক ও স্বভাবজাত প্রমাণগুলো কী কী? নবিজির নুবুওয়াতের দলীল কী? প্রচলিত ভ্রান্তিসমূহ নিরসনে আমার জবাব কী হবে? ঈমান ও ইলম, দৃশ্য ও অদৃশ্যের মাঝে সম্পর্ক কী? ইত্যাদি)
* আপনি দেখলেন আপনার সন্তান বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি অতিক্রম করে ফেলছে অথচ সে জানে না এই জীবনে সে মূলত কী চায়? সে এখনো জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়নি। তাকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে সে উদ্দেশ্য কীভাবে বাস্তবায়িত হয় সে সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই। তা হলে বলুন এই শিক্ষার কীইবা মূল্য?!
☆ সে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করে ফেলছে অথচ তার ভেতর চিন্তাগত, আকীদাগত ও পদ্ধতিগত কোনো রক্ষাকবচ নেই। ফলে তুচ্ছ থেকে তুচ্ছ বিষয়ও তার ঈমানকে হুমকিতে ফেলে দেয়। এমন অনেক আন্ডার-গ্র্যাজুয়েট, গ্র্যাজুয়েট ও পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট শিক্ষিতদের আমরা দেখতে পাই যারা নাস্তিকে পরিণত হয়েছেন কিংবা অন্ততপক্ষে এমন সন্দেহে নিপতিত হয়েছেন যা তাদের ঈমান ছিনিয়ে নিতে যথেষ্ট। তা হলে বলুন এই শিক্ষার কীইবা মূল্য?!
* আপনার সন্তান উচ্চশিক্ষার ধাপ শেষ করেছে ঠিকই কিন্তু সে নিজের ইতিহাস সম্পর্কে কোনো ধারণাই রাখে না। সে জানে না তার আদর্শ কী আর প্রকৃত বীর কারা? নিজের ইসলামি আত্মপরিচয়ে তো সে গর্ববোধ করেই না; বরং তার মধ্যে একপ্রকার হীনমন্যতা ও পরাজিত মানসিকতা কাজ করে। বেশভূষায় সে ভিনদেশি ব্যভিচারী ও মদ্যপদের অনুসরণ করে। তা হলে বলুন এই শিক্ষার কীইবা মূল্য?!
* পড়াশোনার অধ্যায় তার প্রায় শেষ অথচ ব্যক্তিগত জীবনে আল্লাহর অবস্থান সম্পর্কে তার কোনো জানাশোনা নেই। আল্লাহর সম্মান, ভালোবাসা ও আনুগত্য তার অন্তরে কতটুকু বিরাজ করা অত্যাবশ্যক সে ব্যাপারে তার সামান্যতম ধারণা নেই। সে জানেই না, অন্য সব আদেশের ওপর আল্লাহর আদেশকে প্রাধান্য দিতে হয়, আল্লাহর খাতিরেই বন্ধুত্ব স্থাপন করতে হয় এবং তাঁর খাতিরেই শত্রুতা পোষণ করতে হয়। ভালোবাসতে হয় আল্লাহর জন্য আবার ঘৃণাও করতে হয় তারই জন্য। এখন বলুন এই শিক্ষার কীইবা মূল্য?!
* আপনার সন্তানের উচ্চশিক্ষার অধ্যায় শেষ অথচ সে এখনো যথাযথ জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। সিলেবাস, গবেষণা, প্রবন্ধ রচনা, বৈজ্ঞানিক সমালোচনা ও দলীল-প্রমাণের ক্ষেত্রে মৌলিক জ্ঞান পর্যন্ত সে রাখে না। তা হলে বলুন এই শিক্ষার কীইবা মূল্য?!
* সে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেছে অথচ এমন কোনো জ্ঞান তার নেই যা তাকে মানসিকভাবে প্রশান্ত করবে, নিজের সাথে স্বাচ্ছন্দ্য হতে শেখাবে। নিজেকে মূল্যায়ন করতে শেখাবে, বুঝতে শেখাবে, গ্রহণ করতে শেখাবে। যে জ্ঞান তার দুর্বলতা ও শক্তির স্থানগুলো ধরে ধরে চিহ্নিত করবে, তাকে পরিশুদ্ধ করবে। তা হলে বলুন এই শিক্ষার কী-ইবা মূল্য?!
এতক্ষণ পর্যন্ত এই স্কুলগুলো আমাদের কী শেখায়নি সে বিষয়গুলোই শুধু বর্ণনা করলাম, উল্টো কী বিষ শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে গেঁথে দিচ্ছে সে বিষয়ে তো কোনো আলোচনা-ই করিনি!
এত বছর আমি আমার সন্তানদের এক স্কুল থেকে অন্য স্কুলে ভর্তি করিয়েই যাচ্ছি। যাতে তারা এই অস্থির পরিস্থিতির মাঝেও এমন কোনো স্থান খুঁজে পায়, যা শিক্ষা ও দীক্ষার ক্ষেত্রে তাদের অন্তরে কিছু ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করবে। কিন্তু অবস্থা হতাশাজনক। আপনারা যারা বাবা-মা, সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়েছেন ভেবে নিশ্চিন্ত মনে নিজেকে প্রবোধ দিয়ে যাবেন না। ওপরে এতকথা এইজন্যই বললাম। আর মনে রাখবেন, তাদের শিক্ষাদীক্ষার প্রকৃত দায়িত্ব আপনাদের ঘাড়েই বর্তায়। এই দায়িত্ব থেকে আপনাদের মুক্তি নেই। সুতরাং বিষয়টির প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দিন।

📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 তারবিয়াতকেন্দ্রিক গ্রাফিক ভুল

📄 তারবিয়াতকেন্দ্রিক গ্রাফিক ভুল


আমাদের মধ্যে অনেকেই সন্তানদের ওপর 'তারবিয়াত বিনাশী' কর্মকাণ্ড চালান। কেউ চিল্লান, কেউ-বা লাঞ্ছিত করেন, অবজ্ঞা ও উপহাসের সুরে কথা বলেন, ভয় দেখান, হুমকি দেন। এমনকি কেউ একপ্রকার প্রতিশোধ থেকেই সন্তানদের প্রহার করেন। এরপর যদি সেই পুত্র বা কন্যা কোনো ধরনের ব্যক্তিত্ব বা শক্তির অধিকারী হয়ে থাকে তা হলে সে নিজের ব্যক্তিত্ব রক্ষার্থে প্রতিরোধের চেষ্টা চালায়। অনেক সময় এই ক্ষেত্রে সে বেশ কঠোরতার আশ্রয় নেয়। কথা অমান্য করে, চোখ লাল করে দেখে, অবজ্ঞাভরে উত্তর দেয়, ভয়ংকর সব কর্মকাণ্ড করে। আর সে এসব কিছু করে মূলত নিজের অবশিষ্ট ব্যক্তিত্ব রক্ষার্থে যা আমরা ভেঙে দিতে চাই। এরপর তাদের এসমস্ত প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ড দেখার পর আমরা শারীআতের দোহাই টানতে থাকি, আর তাদেরকে আল্লাহর ভয় দেখাই—'তুমি পিতামাতার অবাধ্য সন্তান', 'যেখানে আল্লাহ পিতামাতাকে উফ পর্যন্ত বলতে নিষেধ করেছে সেখানে তুমি কিনা চোখ রাঙিয়ে কথা বলছো', 'আমি তোমার প্রতি অসন্তুষ্ট' ইত্যাদি সব বলতে থাকি।
আমরা মূলত আমাদের সন্তানদের আল্লাহর ভালোবাসার ওপর গড়ে তুলতে সচেষ্ট হইনি। তাদের সাথে বিরোধের মুহূর্তেই শুধু আল্লাহর বাণী সুন্দর করে আওড়িয়েছি, কেবল তখনই আমরা তাদেরকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়েছি যখন আমাদের প্রয়োজন পড়েছে। এর মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে সন্তানের হৃদয়ে আমরা যে বিকৃত রূপ তৈরি করে দিয়েছি এর ক্ষতিকর তিনটি পরিণতি হলো :
১. আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের প্রতি ভালোবাসায় সন্তানদের হৃদয়ে ঘাটতি তৈরি হয়。
২. তাদের ব্যক্তিত্ব-ধ্বংসকারী তারবিয়াতের ক্ষেত্রে ভুল একটি পদ্ধতি তাদের ওপর প্রয়োগ করা হয়。
৩. ভুল এই পদ্ধতি প্রয়োগের কারণে তারা কঠোর ও খারাপ আচরণের মাধ্যমে নিজেদের ব্যক্তিত্ব রক্ষা করতে চায়; যার ফলে তাদের স্বভাব-চরিত্র প্রায় বিনষ্ট হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়।
প্রিয় ভাইয়েরা, সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগ পর্যন্ত আল্লাহ তাদের ওপর কোনো প্রকার ভার অর্পণ করেননি, তাদের ভুলের জবাবদিহিতা তিনি চাননি। এটি মূলত তার গভীর হিকমত ও প্রজ্ঞার অংশ। এসময় তারা আমাদের ভুল থেকে নিজেদের ব্যক্তিত্ব রক্ষা করতে অনেকটা নির্বোধের মতো আচরণ করে বসে। যেহেতু আমরা তাদেরকে সুন্দর আচরণ শেখাইনি তাই এছাড়া ভিন্ন কোনো প্রতিরোধ সম্পর্কে তাদের ধারণা থাকে না। তাদের এমন কর্মকাণ্ড আমাদের জন্য সতর্কঘণ্টা হিসেবে কাজ করে। যেন আমরা তাদেরকে অসময়ে আল্লাহর ভয় না দেখিয়ে বরং নিজেদের ভুলগুলো সংশোধনে মনোযোগ দিতে পারি。
আমরা মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে চেপে-বসা সে শাসকগোষ্ঠীর মতো হতে চাই না যারা একদিকে নিজেদের দায়িত্ব পূরণ করে না, আবার অন্যদিকে মানুষকে নিজেদের অনুগত রাখতে শারীআর উদ্ধৃতির আশ্রয় গ্রহণ করে。
আমরা আমাদের সন্তানদের সে স্তরে পৌঁছাতে চাই না যেখানে পৌঁছে তারা আমাদের উদ্দেশ্যে বলবে, 'হ্যাঁ আমি অবাধ্য সন্তান', 'তোমার ইচ্ছা হলে আমার ওপর অসন্তুষ্ট হও, তাতে আমার কী আসে যায়', 'আমি এসব পাত্তা দিই না'। একে তো এভাবে আমরা তাদের কাছ থেকে আমাদের প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা আদায় করতে পারি না, উপরন্তু সে অবস্থায় আল্লাহর আদেশ-নিষেধের প্রতিও তাদের অন্তরে কোনো ধরনের শ্রদ্ধাবোধ বাকি থাকে না。
আমরা অবশ্যই চাই, আমাদের সন্তানদের মধ্যে যেন আনুগত্য ও সদাচরণের বীজ বপন করা যায়। অবাধ্যতা ও অসদাচরণের ক্ষেত্রে তাদের ভেতর যেন আল্লাহভীতি ঢুকিয়ে দেওয়া যায়। যাতে আমাদের সমাজ সেসব সন্তান দ্বারা আক্রান্ত হয়ে না পড়ে যারা পিতার বিরুদ্ধে আগ্রাসী মনোভাব লালন করে। কারণ এটি পশ্চিমা মতাদর্শেরই বিষফল。
তাই আপনার কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করুন, এরপর নিজ অধিকার চেয়ে নিন, আল্লাহ তাআলা প্রত্যেককেই তার অধিকার পরিপূর্ণভাবে প্রদান করেছেন。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00