📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 আমাদের সন্তানদের যেভাবে কেড়ে নেওয়া হয়

📄 আমাদের সন্তানদের যেভাবে কেড়ে নেওয়া হয়


একটি ঘটনা সেদিন আমার হৃদয়ে দাগ কেটে দিলো। আমেরিকার একটি পরিবারের ঘটনা। সে পরিবারের বাবা-মা দুজন লেবানিজ মুসলিম। তাদের ঘরে দুই মেয়ে ও এক ছেলে। তাদের নতুন এক সন্তান হলো। কিন্তু তার শরীরে অস্বাভাবিক কিছু লক্ষণ দেখা দিলো। তার মা তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তাররা মনে করল হয়তো তার মা তাকে মারে বলেই এমন অবস্থা। তারা পুলিশে খবর দিলো। পুলিশ এসে সঙ্গে সঙ্গে তাদের বাড়িতে গিয়ে অন্য সন্তানদের তাদের দাদীর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে কট্টর খ্রিষ্টান এক আমেরিকান পরিবারকে দিয়ে দিলো। তারা সন্তানদের নাম পরিবর্তন করে খ্রিষ্ট ধর্মে বড়ো করে তুলল। বাবা-মা নিজ সন্তানদের ফিরে পাওয়ার অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো। কী দিং মান চাঁপার চরনের দিকে।
এদিকে হাসপাতালে নবজাতকের মৃত্যু হলো। হাসপাতাল তার ময়নাতদন্ত করে আবিষ্কার করল যে, তার এই অস্বাভাবিক লক্ষণগুলো মূলত জেনেটিক রোগের কারণে, কোনো আঘাতের কারণে না। আদালত মা-বাবাকে নির্দোষ ঘোষণা করল。
আপনি কি কল্পনা করতে পারেন তখন বেচারি মায়ের অনুভূতি! তিনি আদালত থেকে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে বলেছিলেন, 'আজ আমার সন্তানরা জানতে পারবে যে আমি নির্দোষ!'
কিন্তু এখানেই ছিল সারপ্রাইজ! কয় বছর পরে নির্দোষ প্রমাণিত হলেন? সতেরো বছর! হ্যাঁ, সতেরো বছর পরে। ততদিনে তিন সন্তান আমেরিকার ভিন্ন ভিন্ন শহরে বড়ো হয়েছে। তাদের জীবনে এসেছে আমূল পরিবর্তন। আমেরিকানদের জীবনযাত্রায় তারা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। বাবা-মায়ের দ্বীনে তাদের আর বিশ্বাস নেই。
তাদের এক মেয়ের বয়স তখন উনিশ বছর। এক সাক্ষাৎকারে তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘আপনার মা যে নির্দোষ প্রমাণিত হলো, এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী?’

তার উত্তর ছিল, ‘এই মহিলার সাথে এখন আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমি ওই পরিবারের সাথে বড়ো হয়েছি। ওদেরকেই আমার বাবা-মা মনে করি। ভবিষ্যতে হয়তো এই মহিলাকে গুরুত্ব দিতে পারি। তবে এখন আমার কোনো আগ্রহ নেই!’

খারাপ আচরণের সন্দেহে বাবা-মাকে সন্তান থেকে বঞ্চিত করা মানবরচিত আহম্মকি আইনের পরিণতি, যে আইন আল্লাহর শারীআত মানে না。

এর থেকে কঠিন শাস্তি আর হতে পারে না! হয়তো সন্তানদের হত্যা করাও এর চাইতে তুচ্ছ। কিন্তু এভাবে আপনার সন্তানকে হরণ করা হবে তারপর আইনের জোর খাটিয়ে এমন কিছু মানুষের কাছে রাখা হবে যারা তাদেরকে শিরকের ওপর, কুরআন ও নবিকে অস্বীকার করার ওপর বড়ো করে তুলবে, আর আপনি চেয়ে চেয়ে দেখবেন, কিছু করতে পারবেন না! অথচ ওরা আপনার সন্তান, আপনার কলিজার টুকরো! খুবই কষ্টের অনুভূতি! আল্লাহ, আমাদের ও মুসলিমদের নিরাপদ রাখুন。

পশ্চিমা দেশগুলোতে অবস্থানরত আমাদের মুসলিম ভাইয়েরা প্রতিনিয়ত এই ঘটনাগুলোর সম্মুখীন হচ্ছেন। কিন্তু প্রিয় ভাইয়েরা, আমি যদি বলি, আমাদের মুসলিম দেশগুলোতে তো বটেই এমনকি খোদ নিজেদের ঘরেও এই ধরনের ঘটনা অনেক বেশি ঘটছে, তা হলে কি আপনি বিশ্বাস করবেন? আচ্ছা কীভাবে?

কিছুদিন আগে আমি এক শিক্ষাবিদের সাথে বসে গল্প করছিলাম। তিনি আমাকে জানালেন, ‘শিশুদের এই জগতে আমার আট বছরের অভিজ্ঞতা। গত বছর ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে যে নৈতিক অবক্ষয় আমি লক্ষ করেছি ইতঃপূর্বে কখনো এমনটা চোখে পড়েনি! সবখানেই এখন অভিযোগ আর অভিযোগ। আমার এই স্কুলে শুধু নয়, সবখানেই। বাবারা তাদের সন্তানদের বাছবিচার ছাড়াই মোবাইল, ট্যাব, আইপ্যাড দিয়ে দিচ্ছেন। কোনোরকম দিকনির্দেশনা পর্যন্ত দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করছেন না। তাদের সন্তান এই যন্ত্র কোন খাতে ব্যয় করছে সেদিকে লক্ষ করছেন না। এই আধুনিক যন্ত্রগুলো আমাদের সন্তানদের মনমস্তিষ্ককে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রসিদ্ধ ইউটিউব চ্যানেলগুলো ইচ্ছামতো তাদের মন-মেজাজ তৈরি করছে। ট্রল, মিমস, রোস্ট, ঠাট্টা-মশকরা আর অশ্লীলতার ওপর গড়ে উঠছে এই প্রজন্ম। ধর্মীয় বিধিনিষেধ ও মূল্যবোধকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এগুলোকে তাদের সামনে হাসিমজার বিষয়ে পরিণত করা হচ্ছে। এগুলোতেই এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে আমাদের স্বপ্নের সন্তানেরা!

সেই লেবানিজ পরিবারের সাথে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার সাথে এগুলোর খুব একটা পার্থক্য নেই। আমাদের সন্তানদের চুরি করা হচ্ছে। তাদের ইসলামি পরিচয় কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। স্বভাবজাত প্রকৃতি ও ফিতরাতকে পাল্টে ফেলা হচ্ছে। ইসলামবিদ্বেষী চিন্তা-চেতনা দ্বারা তাদের মস্তিষ্ক পরিপুষ্ট করা হচ্ছে。

প্রিয় পাঠক, আপনারা যারা বাবা-মা, স্পষ্ট ভাষায় একটি উপদেশ দিই স্মরণ রাখুন, হয় সন্তানদের সঠিকভাবে গড়ে তুলুন এবং তাদেরকে সময় দিন আর না হয় সন্তান জন্ম দেওয়া থেকেই বিরত থাকুন!

📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 যা চাও নাও, তারপর কেটে পড়ো!

📄 যা চাও নাও, তারপর কেটে পড়ো!


অনেক বাবা-ই সন্তানের সব রকম চাহিদা পূরণে সিদ্ধহস্ত থাকেন। তাদের ওপর বাড়াবাড়ি রকমের খরচ করেন। যেন তারা বলতে চান, 'যা চাও নাও, তারপর কেটে পড়ো!

বাবা-মা কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ত সময় পার করেন, স্বপ্ন পূরণের পেছনে তারা দৌড়াতে থাকেন। সামান্য যেটুকু সময় ফুরসত পান সেগুলো বন্ধুবান্ধব ও কলিগদের সাথে আড্ডায় কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যয় হয়ে যায়। তাই সন্তানের তারবিয়াত ও তাদের দীক্ষাদানে খুব একটা সময় কুলিয়ে উঠতে পারেন না。

শত ব্যস্ততার মাঝেও তারা তাদের সন্তানদের ভালোবাসেন, আবার তারা তাদের প্রতি 'যত্নশীল'ও বটে! তবে তাদের এই ভালোবাসা ও যত্ন বিভিন্ন প্রকার নামিদামি গিফট ও বিলাসবহুল জীবন উপহার দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

সন্তান এমন কিছু আবদার করে বসেছে, যা তার জন্য মোটেও কল্যাণকর নয়। আমি চাইলে তাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলতে পারি, তাকে আরেকটি বিকল্প বস্তু দিয়ে শান্ত করতে পারি; কিন্তু এটি বেশ জটিল ও বিরক্তিকর কাজ, সন্তানও গোঁ ধরে বসে আছে। ঠিক আছে দিয়েই দিই। এই যন্ত্রের মধ্যে সে ব্যস্ত থাকবে, আর এদিকে আমার সময়গুলোও বেঁচে যাবে। তাকে উপদেশ দিয়ে সময় নষ্ট না করে, এই সময়কে গুরুত্বপূর্ণ অন্য কাজে লাগানো যাবে!

এভাবে অতিরিক্ত লাই দিয়ে রাখা বাবারা সন্তানদের সামনে ভালো বাবা হওয়ার প্রতিযোগিতা করেন। অথচ বাস্তবে তার কারণেই সন্তান ধ্বংসের পথে পা বাড়ায়, অন্ধকারে হারিয়ে যায়。

রাসূল-এর এই হাদীস শুনলেই আমি আঁতকে উঠি, মুষড়ে পড়ি। তিনি বলেছেন,

كَفَى بِالْمَرْءِ إِثْمًا أَنْ تُضَيِّعَ مَنْ يَقُوْتُ

“একজন মানুষ পাপী হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, সে যাদের জীবিকার ব্যাপারে দায়িত্বশীল তাদের অধিকার নষ্ট করে।”[৫৭]

এই হাদীস শুধু তাদের উদ্দেশ্যে নয় যারা সন্তানদের প্রয়োজনীয় খাবার ও পোশাক দিতে কার্পণ্য করেন; বরং তারাও এর অন্তর্ভুক্ত যারা সন্তানদের সমস্ত চাহিদা লাগামহীনভাবে পূরণ করে যান, যারা তাদেরকে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ দেওয়ার সামান্যতম প্রয়োজনও অনুভব করেন না。

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম বলেছেন, 'কত মানুষই নিজের কলিজার টুকরো সন্তানকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়। তাদের অবহেলা করে, শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না, নিজ প্রবৃত্তি দমনে তাদের সহযোগিতা করে না। এমন বাবার ধারণা, সন্তানকে সে সম্মান করছে, অথচ বাস্তবতা হলো তাকে সে লাঞ্ছিত করছে। ভাবছে তাকে দয়া করছে, অথচ বাস্তবে সে তার ওপর জুলুম করছে, তাকে বঞ্চিত করছে।'[৫৮]

সন্তান আবদার করার পরও যখন আপনি তাকে বস্তুটি দেবেন না তখন আপনার উচিত হলো, না দেওয়ার কারণ কী তাকে তা স্পষ্ট করে বলা। তাকে বলবেন, 'বাবা, তুমি যে যন্ত্রের বায়না ধরেছ আমি চাইলেই সেটা তোমাকে দিতে পারি। তোমাকে যন্ত্রটি কিনে দিলে তুমিও শান্ত হতে, আমিও তোমার হাত থেকে নিস্তার পেতাম। কিন্তু আমি জানি এটা তোমার জন্য কখনই কল্যাণকর হবে না। আমি মূলত তোমার কল্যাণের জন্যই যন্ত্রটি কিনে দিচ্ছি না। কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি, তোমাকে নিয়ে ভাবী। প্রিয় ছেলে, অনেক সময় সন্তান যা চায় তা-ই তাকে দিয়ে দেওয়া সন্তানের প্রতি একপ্রকার অবহেলা। তাই তোমার উচিত, সহপাঠীদের হাতে যে যন্ত্র আছে সে কারণে তাদের প্রতি ঈর্ষান্বিত না হওয়া। বরং একসময় দেখবে তোমার প্রতি তোমার বাবার যত্ন ও গুরুত্বের কারণে তোমাকে দেখে তারাই ঈর্ষান্বিত হবে।'

টিকাঃ
[৫৭] আবূ দাউদ, ১৬৯২; আহমাদ, ৬৪৯৫。
[৫৮] তুহফাতুল মাওদূদ ফী আহকামিল মাওলুদ, ২৪২。

📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 লজ্জা এক দিনেই তৈরি হয় না

📄 লজ্জা এক দিনেই তৈরি হয় না


সমাজের একটি প্রচলিত দৃশ্য আমাকে বেশ যন্ত্রণা দেয়। ছোটো তবে খুব শীঘ্রই পর্দা ওয়াজিব হতে যাবে এমন অনেক মেয়ে অতিরিক্ত ছোটো কাপড়ে হাঁটাচলা করে, লজ্জা ও লাজুকতার সামান্য ধারও ধারে না। অনেক সময় আবার তাদের সাথে দেখা মিলে হিজাব পরিহিতা মায়ের!

এসব দেখে আমি মনে মনে বলি, 'বর্তমান মুসলিম মেয়েদের ওপর এগুলো তুর্কি টিভি সিরিজের কোনো প্রভাব নয়তো?'

পুরো পরিবারের সকলে একসাথে মিলে এই সিরিজগুলো দেখা হয়। বাবা ঘুণাক্ষরেও টের পান না যে, এর মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের মাঝে নৈতিক অবক্ষয় ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। এরপর শিশুরাও এগুলো স্বাভাবিকভাবেই দেখে, তারা এসবে কোনো অসুবিধা খুঁজে পায় না!

আজ আপনারা যারা বাবা-মা হয়েছেন! আজকের বালিকা ও আগামীর যুবতীর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করুন। আল্লাহকে ভয় করুন সে কন্যার ব্যাপারে যে আর বছর দুয়েকের ভেতর প্রাপ্তবয়স্কে পরিণত হবে। এখন এই বেশভূষায় তাকে বাইরে বের হওয়ার অনুমতি দেবেন, আবার এই ধারণা রাখবেন যে, প্রাপ্তবয়স্ক হলে আপনাতেই সে হিজাব গ্রহণ করে নেবে। এটা কি সম্ভব? সে আচমকা একদিনেই পরিবর্তিত হয়ে যাবে!

লজ্জা এমন একটি গুণ, যা শৈশব থেকেই অর্জিত হতে থাকে, এর জন্য ধারাবাহিকভাবে উৎসাহ দিতে হয়, তাদের সামনে নিজে পালন করে প্রায়োগিকভাবে তা শেখাতে হয়। সুতরাং কন্যাদের লাজুকতা তৈরিতে আপন কর্তব্য পালনে পিছপা হবেন না। কারণ মনে রাখবেন, লজ্জা এক দিনেই তৈরি হয় না।

📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 কন্যার কবরের সামনে শাইখের দেওয়া আবেগঘন নসীহা

📄 কন্যার কবরের সামনে শাইখের দেওয়া আবেগঘন নসীহা


আলহামদুলিল্লাহ, এতকিছু সত্ত্বেও আমার মেয়ে আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর একটিবারের জন্যও অসন্তুষ্ট হয়নি। আল্লাহর করুণা। সে গতকাল আমাকে বলেছিল, 'বাবা, জান্নাতের সৌন্দর্য বর্ণিত হয়েছে এমন কিছু আয়াত আমাকে তিলাওয়াত করে শোনাও।'

ফুসফুস অচল হয়ে যাওয়ার কারণে গতরাতে তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। আর সে তখন অবিরাম জপছিল, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। ইয়া আল্লাহ, ইয়া রব, সমস্ত প্রশংসা আপনার। আমার ধারণা আল্লাহ তাকে অনেক সম্মানিত করবেন। বিশেষ করে এই কারণে যে, সে ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক নাবালেগা। ওয়াল্লাহ! আমার ধারণা আল্লাহ তাকে সম্মানিত করবেনই。

আমি ও আমার পরিবার বিষয়টি খুব সহজভাবে নিয়েছি। উত্তম আমল করার পর আমরা তার সাথে জান্নাতে মিলিত হব, ইন শা আল্লাহ। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

وَالَّذِينَ آمَنُوا وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُمْ بِإِيْمَانٍ أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَمَا أَلَتْنَاهُمْ مِّنْ عَمَلِهِمْ مِّنْ شَيْءٍ كُلُّ امْرِئٍ بِمَا كَسَبَ رَهِينٌ *

“যারা ঈমান আনে এবং যাদের সন্তানেরা ঈমানের ক্ষেত্রে তাদের অনুগামী হয়, আমি তাদেরকে তাদের পিতৃপুরুষদের সাথে মিলিত করব এবং তাদের আমল বিন্দুমাত্রও হ্রাস করব না। প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃত কর্মের জন্য দায়ী।”[৫৯]
আমি তো সেই বাবার কথা কল্পনা-ই করতে পারছি না যিনি সন্তানদের সঠিক তারবিয়াতে গড়ে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন, অথচ সন্তান আল্লাহর অবাধ্যতা কিংবা কুফরি অবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। তার বাবার নিশ্চয় আফসোসের অন্ত থাকবে না, কারণ হতে পারে এটাই ছিল তার সাথে শেষ সাক্ষাৎ, যার পরে তাদের আর কখনো দেখা হবে না। একজনের আবাস হবে চিরস্থায়ী জান্নাত আর অপরজনের ঠিকানা চিরস্থায়ী জাহান্নাম। ওয়াল্লাহ! এটাই হলো প্রকৃত যন্ত্রণা。

قُلْ إِنَّ الْخَاسِرِينَ الَّذِيْنَ خَسِرُوا أَنْفُسَهُمْ وَأَهْلِيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَلَا ذَلِكَ هُوَ الْخُسْرَانُ الْمُبِينُ .

“বলুন, ক্ষতিগ্রস্ত তো তারাই যারা কিয়ামাতের দিন নিজেদের ও নিজেদের পরিজনবর্গের ক্ষতিসাধন করে। জেনে রেখো, এটাই সুস্পষ্ট ক্ষতি।”[৬০]

কেউ হয়তো জান্নাতে যাবে, কিন্তু সে তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে। কারণ তারা জাহান্নামী। আল্লাহ আমাদের সবাইকে রক্ষা করুন。

ওয়াল্লাহ! আমার দুঃখ শুধু এটুকুই যে আমার কন্যা আমাকে ছেড়ে গেছে। কিন্তু বিশ্বাস করুন আমার অন্তর এরচেয়েও বেশি প্রশান্তিতে ছেয়ে আছে। আল্লাহ তাকে এরকম উত্তম অবস্থায় জীবনের পরিসমাপ্তি দিয়েছেন। এ তো আল্লাহর বিশেষ করুণা ও রহমত。

প্রিয় ভাইয়েরা, আমি বারবার বলছি, আপনাদের প্রতি উপদেশ থাকবে, ভালোবাসার প্রিয়জনদের মৃত্যুর পূর্বে অন্তত তাদের হিদায়াতের প্রতি আগ্রহী হোন, তাদের কাছ থেকে তাওবা একপ্রকার ছিনিয়ে নিন। না হয় হতে পারে আপনি উদাসীন থাকার কারণে আপনার কোনো প্রিয় ব্যক্তি কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে। হয়তো সে সংশয় নিয়ে কিংবা আল্লাহর বিধানকে উপহাস করে পরকালে পাড়ি জমাবে, যা আপনার জন্য গ্লানি হয়ে থাকবে আর তার ঠিকানা হবে চিরযন্ত্রণার জাহান্নাম。

স্মরণ করুন প্রিয় নবি -এর ঘটনা। তিনি চাচা আবু তালিবের শিয়রে বসে তার মুখ থেকে কালিমা বের করার কত জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রিয় চাচা, শুধু একবার কালিমাটা পড়ুন, এর মাধ্যমে কিয়ামাতের দিন আমি আল্লাহর কাছে আপনার জন্য সুপারিশ করব। শুধু কালিমাটা পড়ুন, হয়তো আল্লাহ রহম করবেন।

যে চাচা নিজের জান-মাল-সন্তান তাঁর জন্য উৎসর্গ করে দিয়েছিল নবিজি ﷺ সেই চাচার সাথে জান্নাতে একত্রিত হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি আবদুল মুত্তালিবের ধর্মে মৃত্যুবরণ করলেন। সত্যিই এটি খুব করুণ পরিস্থিতি। আমি নিজে সহ্য করতে পারতাম না。

আল্লাহর অনুগ্রহ যে আমার মেয়ে ধৈর্যশীল ও সন্তুষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। শেষ সময়ে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত শরীরেও সে বলেছিল, 'যোহরের সালাত পড়িনি, আমাকে ওজু করিয়ে দাও।'

নিজের হিজাব, লজ্জা ও লাজুকতার ব্যাপারে সে সদা সতর্ক ছিল। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর কোনো বিধান নিয়ে উপহাস হতে দেখলে সে ক্রোধে জ্বলে উঠত আর বলত, 'বাবা দেখো! তারা রক্ষণশীলতা নিয়ে উপহাস করছে...। বাবা, দেখো ইসলাম নিয়ে বাজে মন্তব্য করছে...।'

আমি আল্লাহর প্রতি এই সুধারণা রাখতে পারি যে, তিনি আমার কন্যাকে সম্মানিত করবেন। আমি আশা করি, আমাদের সান্নিধ্যের তুলনায় নিশ্চয় আল্লাহর সান্নিধ্য তার জন্য অধিক কল্যাণকর হবে। এখন আমার কাজ শুধু এটুকুই যে, জীবনের বাকি সময়গুলো উত্তম কাজে ব্যবহার করে তার সাথে মিলিত হওয়া。

এই উপস্থিতির কারণে আল্লাহ আপনাদের সকলকে উত্তম প্রতিদান দিন। আল্লাহর নিকট প্রার্থনা যেন তিনি প্রিয়জনদের হিদায়াত দানের মাধ্যমে আপনাদের সম্মানিত করেন, কোনো রকম হিসাব ছাড়া তাদের সাথে জান্নাতুল ফিরদাউসে একত্র করেন, আমীন。

টিকাঃ
[৫৯] সূরা তুর, ৫২: ২১。
[৬০] সূরা যুমার, ৩৯ : ১৫。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00