📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 অসুস্থ সন্তানের সাথে আচরণগত কিছু ত্রুটি

📄 অসুস্থ সন্তানের সাথে আচরণগত কিছু ত্রুটি


অসুস্থ সন্তানের সাথে ভুল আচরণের বিষয়টি আমরা আশপাশের প্রায় প্রত্যেকের মাঝেই দেখতে পাই। ড. য়াকির হাশিমীকে একদিন আমি সাহাবীর সব অবস্থা খুলে বলে কিছু পরামর্শ নিলাম। তিনি বললেন, 'তার সাথে ভিন্ন রকম আচরণ করতে যাবেন না। অসুস্থতার কারণে অতিরিক্ত আদর দেবেন না। এই আদর তার ক্ষতি করবে। কিন্তু তার সাথে মন খুলে কথা বলুন। তার মনের কথা জেনে নিন। তাকে বলুন, 'মা, কোনো রকম মনোকষ্ট থাকলে কাঁদো।' (প্রসঙ্গে আসাইফী বলে রাখি, কাউকে কাঁদতে দেখলে চুপ করতে বলতেন না। কান্নার মনের দুঃখ লাঘব হয়। চুপ করতে বলার ক্ষতির প্রভাব রয়েছে।) তাকে বলুন, 'মা, তোমার যেকোনো প্রয়োজনে তোমার বাবা হাজিরা।'

অতিরিক্ত আদর দিতে নিষেধ করা হলেও তাদের কড়াকড়ি বা বকাবকি করা একেবারেই অনুচিত। ভাইয়ের সাথে ঝগড়া করায় একদিন সাহাবীর সাথে আমি সামান্য কঠোর আচরণ করি। লক্ষ করলাম, কিছুদিন পরেই তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। পরবর্তীতে অবশ্য তার নামে একটি কবিতা লিখে তার মন ভালো করে দিয়েছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ ড. য়াকিরের এই পরামর্শগুলো আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলাম。

আরেকটি ভুল আচরণ হলো, অসুস্থ সন্তানের সব আবদার মনে নেওয়া। আমার ট্যাব লাগবে, না-ও আমার মোবাইল লাগবে, না-ও না প্রিয় ভাইয়েরা, এই সময়েও তারবিয়াতের উপরোক্ত নিয়মগুলোর ব্যত্যয় ঘটানো যাবে না। তাকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিন, 'তোমার এই চাওয়া আমি পূরণ করছি না কেন জানো? কারণ আমি তোমার কল্যাণ চাই।'

সন্তানের সারাদিনের পীড়াপীড়িতে অনেক বাবাই বিরক্ত হয়ে তাদের আবদার পূরণ করে ফেলেন। বলেন, 'যা চাও, নাও। তারপর কেটে পড়ো।' আপনারাই বলুন এটি কি ভালোবাসার প্রমাণ? না। বরং স্পষ্ট ভাষায় বলুন, 'তোমাদের কথা ভেবেই আমি আজ তোমাদের আবদার পূরণ করছি না।' এককথায় তার অসহায়ত্ব, অসুস্থতা ও মায়ার কারণে সব আবদার পূরণ করতে যাবেন না。

আরেকটি ভুল আচরণ হলো, সন্তানকে মিথ্যা আশা দেওয়া। মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে আর এদিকে আপনি সন্তানকে বলছেন, 'সবকিছু ঠিক আছে মা, তুমি সুস্থ হয়ে যাবে!' না, এটি একদিকে তো মিথ্যা সেই সাথে এর পরিণতিও খুব একটা ভালো নয়。

সারাহর শেষদিনগুলোতে আমি ড. যাকিরসহ বিভিন্ন মনোবিজ্ঞানীর সাথে যোগাযোগ করলাম। তাদেরকে জানালাম, 'চিকিৎসাগতভাবে তার মৃত্যু সন্নিকটে, একপ্রকার অবশ্যম্ভাবী। এখন মেয়েকে কী এই ব্যাপারে স্পষ্ট কথা জানিয়ে দেওয়া যায়? যাতে সে নিজের জীবনটা গুছিয়ে নিয়ে আখিরাতের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারে?' তাদের প্রত্যেকের জবাব ছিল, 'স্পষ্টভাবে হোক কিংবা ইঙ্গিতে হোক তাকে এই বিষয়ে জানানোর কোনো প্রয়োজন নেই। এই খবর তাকে চমকে দেবে। কখনো সে এই বিষয়ে জানতে চাইলে, উত্তর এড়িয়ে যাবেন।' অতএব মৃত্যুসময় ঘনিয়ে আসার বিষয়টি তাদের জানানোর প্রয়োজন নেই。

অনেক সময় বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন ও প্রিয়জনদের এমন কিছু আচরণ আমাদের সহ্য করতে হয় যা হৃদয়ে আঘাত দেয়। সেরকমই একটি কষ্টদায়ক আচরণ হলো, 'অতিরিক্ত করুণার দৃষ্টি। পিতামাতা ও অসুস্থ সন্তান সকলের জন্যই এই চাহনি অত্যন্ত কষ্টের। আলহামদুলিল্লাহ, আমি এই বিপদে নিজেকে স্থির রাখতে পেরেছিলাম। মেয়ের সাথে পরবর্তী সাক্ষাতের কথা ভেবে নিজেকে প্রবোধ দিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু অনেক ভাই এসে সান্তনাস্বরূপ বলতে লাগলেন, 'আমি বুঝতে পারছি আপনি অনেক কষ্টের সময় অতিবাহিত করছেন। ধৈর্য ধরুন।'

অনেকেই আবার আমার মেয়েকে হাসপাতালে দেখতে এসে করুণার চোখে দেখতে লাগলেন। এই কারণে একপ্রকার বাধ্য হয়েই হাসপাতালের দরজায় আমি 'সাক্ষাতের নিয়মাবলী' শিরোনামে একটি নোটিশ টাঙিয়ে দিয়েছিলাম। তো এই ধরনের আচরণ সন্তান ও তার অভিভাবককে এক কথায় নিষ্প্রাণ করে ফেলে! সন্তান হয়তো সেভাবে প্রকাশ করতে পারে না。

'আমি তোমার এই ভয়ংকর বিপদ বুঝতে পারছি' না বলে তাকে এই কথা বলে সান্তনা দিন যে, ‘আল্লাহর প্রতিদানের কথা ভুলো না’, ‘কার পথে কষ্ট সহ্য করছো তা স্মরণ রাখবে’, ‘মনে রেখ, আল্লাহ বেশ চড়ামূল্যে প্রতিদান দেন।’ এভাবে বলাই হলো রাসূলুল্লাহ -এর সুন্নাত। তিনি কোনো রোগী দেখতে গেলেই বলতেন,

لَا بَأْسَ طَهُورُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ “কোনো অসুবিধা নেই। ইন শা আল্লাহ, সুস্থ হয়ে যাবে।”[৫৩]

তিনি বলতেন না যে, আহ, তোমার কী যে কষ্ট! কত বিপদ!

একব্যক্তি রাসূলুল্লাহ এর নিকট এল। তার সাথে তার এক পুত্রও ছিল। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি একে ভালোবাস?” লোকটি জবাব দিলো, ‘আল্লাহ আপনাকে যেরূপ মহব্বত করেন, আমি তাকে ঠিক সেভাবেই মহব্বত করি।’ পরবর্তী সময়ে রাসূলুল্লাহ তার ছেলেকে দেখতে না পেয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন যে, সে মৃত্যুবরণ করেছে。

এবার লক্ষ করুন লোকটিকে সান্তনা দিতে গিয়ে নবিজি কী বলেছেন। তিনি বললেন, “তুমি কি এই কথা শুনে আনন্দিত হবে না যে, তুমি জান্নাতের যে দরজা দিয়েই প্রবেশ করবে সে দরজার সামনে তোমার ছেলেকে দেখতে পাবে, সে তোমাকে জান্নাতের দরজা খুলতে সাহায্য করবে?”[৫৪]

সুবহানাল্লাহ! নবিজি এভাবেই সুসংবাদ দিতেন, আল্লাহর প্রতিদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন。

শেষকথা: প্রিয় ভাইয়েরা, সন্তানকে সফলভাবে গড়ে তোলার এই গল্প আপনি একা রচনা করতে পারবেন না, বরং বিভিন্ন চরিত্র এই গল্প রচনায় অংশ নেবে। সকলের সহযোগিতা ও আল্লাহর সাহায্যেই এই অধ্যায় পূর্ণতা পাবে। আল্লাহ আপনাদের উত্তম প্রতিদান দান করুন। এই কথাগুলো দ্বারা উপকৃত হওয়ার তাওফীক দিন, আমীন。

টিকাঃ
[৫৩] বুখারি, ৩৬১৬, ৫৬৫৬。
[৫৪] নাসাঈ, ১৮৭০。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00