📄 সন্তানের সাথে মজবুত সম্পর্ক গড়ে তোলা
তার সাথে এমনভাবে সম্পর্ক দৃঢ় করুন যে, আপনার প্রতি ভালোবাসা থেকে সে ধৈর্য ধারণ করতে বাধ্য হবে। আর এই সম্পর্ক তৈরি হয় সন্তানকে যথাযথ সময় দেওয়ার মাধ্যমে, তাদের সাথে আন্তরিক হওয়ার মাধ্যমে।
📄 তাদের মতো অন্যান্য শিশুদের কষ্ট ও যন্ত্রণার কথা তাদেরকে শোনানো
কিংবা যারা আরও মারাত্মক রোগে আক্রান্ত তাদের সম্পর্কে জানানো। সারাহকে হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর আমার পরিচয় হয় আবদুর রহমান নামের এক শিশুর সাথে। তার চোখ ও হাড়ের ক্যান্সার। এটি বেশ মারাত্মক ধরনের এক ক্যান্সার। এর ভয়ংকর দিক হলো, এটি একপাশ থেকে অন্যপাশে সংক্রমিত হয়। আরও ভয়ংকর দিক হলো, এই রোগ এক সন্তান থেকে আরেক সন্তানে সংক্রমিত হয়। তো তার বাবা তাকে জার্মানিতে চিকিৎসার জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন; কিন্তু সেখানকার ডাক্তার চোখ উপড়ে ফেলা ছাড়া আর কোনো পথ বাকি নেই বলে জানিয়েছেন। তা ছাড়া হাড়ের ক্যান্সারের কারণে পাও কেটে ফেলতে হবে。
আবদুর রহমানের বাবার সাথে আমার কথা হয়েছিল। একেবারেই সাধারণ মানুষ। কিন্তু তিনি এক অসাধারণ কথা আমাকে বললেন, 'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ রব্বুল আলামীনের। মানুষ যখন অন্যের বিপদ দেখে, তখন সে নিজের বিপদ ভুলে যায়। যাক ড. ইয়াদ, আবদুর রহমান আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, সে যদি ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহ কি তাকে সাওয়াব দেবে? সাওয়াব না দিলে নাকি সে ধৈর্য ধরবে না।'
আমি আবদুর রহমানকে বললাম, 'দেখি, তুমি আমাকে বলো, কীভাবে কীভাবে ধৈর্য ধরেছ, তোমার সাওয়াব কত হয়েছে আমি গুণে দিই।' শেষ পর্যন্ত বললাম, 'গুণে রাখা তো সম্ভব হচ্ছে না!' এভাবে দশ-পনেরো মিনিটি তার সাথে বেশ অন্তরঙ্গ কথাবার্তা হলো। আর এসব কথাবার্তা হয়েছিল সারাহর সামনে। ঘরে ফিরে সে তার ভাই ফারুককে আবদুর রহমানের সব ঘটনা বেশ আশ্চর্যের সাথে খুলে বলেছিল。
এভাবে তাকে আরও কিছু অসুস্থ ব্যক্তির ঘটনা শুনিয়েছিলাম। তবে এই কথা বুঝতে দেওয়া ছাড়া যে, আমি এসবের মাধ্যমে তাকে সান্তনা দিতে চাচ্ছি। বরং গল্প বলার পদ্ধতি ছিল, অসুস্থতা কীভাবে নিয়ামাত হয়ে ধরা দিতে পারে তা বোঝানো। এরকমই একটি হলো, আবদুল্লাহ বানেমা'র ঘটনা। আল্লাহর অবাধ্যতায় যার পুরো জীবন কেটেছিল। একসময় সে আবিষ্কার করল তার পুরো শরীর অবশ হয়ে পড়েছে, সম্পূর্ণরূপে প্যারালাইজড। কিন্তু যখনই তার শরীর আটকে গেল, আল্লাহ তার বদ্ধ হৃদয় উন্মুক্ত করে দিলেন। ফলে সে একসময় বেশ প্রসিদ্ধ দাঈতে পরিণত হয়। পরবর্তী সময়ে তার কথায় হাজারো উদাসীন যুবক হিদায়াত ও সঠিক পথের দিশা পায়, তাকে দেখে নিজেকে আল্লাহর প্রকৃত বান্দা হিসেবে গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত হয়。
কিন্তু প্রিয় ভাইয়েরা, এই ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি থেকে সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ অসুস্থ ব্যক্তিকে এভাবে লাগাতার অসুস্থতার ঘটনা শোনাতে শুরু করলে বিপরীত প্রভাব পড়ারও সমূহ আশঙ্কা থাকে। অনেক সময় সারাহ বিষয়টি ধরে ফেলতে পেরে বলত, 'বাবা, তুমি এভাবে তাদের কথা আমাকে কেন বলছো?' তাই এমন ঘটনা খুব বেশি প্রয়োজন না পড়লে না বলাই উত্তম。
📄 তার চিকিৎসায় সর্বাধিক প্রচেষ্টা চালানো
এবং এর পাশাপাশি তাকে এই সম্পর্কে অবহিত করাও অত্যাধিক জরুরি। ইসলামিক মোটিভেশন দেওয়ার সাথে সাথে চিকিৎসাকেন্দ্রিক এই প্রচেষ্টাও সমানতালে চলবে। আমি সারাহর চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন দেশ থেকে বিশেরও অধিক ওষুধ আনিয়েছিলাম। তাকে বলতাম, 'মা, মালয়েশিয়া থেকে তোমার ওষুধ অচিরেই এসে পৌঁছবে। আমেরিকা থেকে তোমার ইনজেকশন রওনা দিয়েছে' ইত্যাদি। তাকে এই কথা বুঝতে দিয়েছি যে, আমার সাধ্যের যত চেষ্টা হতে পারে আমি তা করছি। হ্যাঁ, এসবের সাথে সাথে আমি তাকে আশার বাণীও শুনিয়েছি, প্রতিদান প্রাপ্তির কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছি。
সুস্থতার সব মাধ্যম গ্রহণ করার পর সে আপনার কাছ থেকে উপদেশমূলক কথার অপেক্ষা করবে। কিন্তু পক্ষান্তরে কোনো বাবা যদি শুধুমাত্র কুরআন-হাদীসের কথা শুনিয়ে যান, প্রয়োজনীয় চিকিৎসার উদ্যোগ গ্রহণ না করেন, ভাবুন তো তার প্রতি সন্তানের কী ধারণা সৃষ্টি হবে?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আপনার এই দুর্বলতার সময়ে অনেক সুযোগসন্ধানী আপনাকে শিকারে পরিণত করতে চাইবে। বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় ওষুধপত্র লিখে দিয়ে তারা অসহায় বাবাদের কাছ থেকে বিশাল অর্থমূল্য আদায় করে নেয়। এই বিষয়টিতে সজাগ দৃষ্টি রাখবেন, এর বিপরীতে সদাকা করুন। সদাকায় সন্তানের আরোগ্যের নিয়ত করুন。
শেষ সময়গুলোতে সারাহ আমাকে বলত, 'বাবা, তা হলে কি আর কোনো উপায় নেই?' আমি উত্তরটা একটু ঘুরিয়ে দিয়ে বলতাম, 'মা, আমরা এখন এই ওষুধটা দিয়ে চেষ্টা করে দেখছি।' এভাবে তার আশা জিইয়ে রাখুন। তাকে বুঝতে দিন আপনি সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই কথা বলতে যাবেন না, 'মা শা আল্লাহ, তোমার অবস্থা এখন অনেক ভালো।' না এভাবে মিথ্যে আশা দিলে একসময় গিয়ে তার হৃদয় একবারেই দু টুকরো হয়ে পড়বে। বরং ঘুরিয়ে উত্তর দিন, 'মা, আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আল্লাহ যা চান তা-ই হবে।'
📄 তাকে উপকারী কাজে ব্যস্ত রাখা
তখন কাজের ব্যস্ততায় রোগের দুশ্চিন্তা তাকে আচ্ছন্ন করার সুযোগ পাবে না। ফলে সে কিছুটা স্বস্তিবোধ করবে, প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে。
সারাহর উপন্যাসের প্রতি খুব বেশি ঝোঁক ছিল। একবার একটি উপন্যাসের বই নিয়ে এসে আমার সামনে সে বইটি সম্পর্কে কিছু মন্তব্য পেশ করল। আমি সাথে সাথে তার সামনেই লেখককে ফোন দিয়ে বললাম, 'আপনার এই উপন্যাসের ব্যাপারে আমার মেয়ে এই এই মূল্যায়ন পেশ করেছে।' এভাবে কাজটি করার পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল, তাকে এই কথা বুঝতে দেওয়া যে আমার নিকট তার বক্তব্যের মূল্য আছে。
ঠিক এভাবে অভাবীদের প্রয়োজন পূরণে চ্যারিটি ফান্ড খুলে তাদেরকে এসব কাজে ব্যস্ত রাখা যায়। রোগের দুশ্চিন্তা ভুলে থাকতে তাদেরকে নিয়মিত স্কুলে যেতে উৎসাহ দেওয়া যায়। রোগের ক্লান্তি এভাবে কেটে ওঠে। ফলে স্বাভাবিক জীবনযাপন মস্তিষ্কে ভালো প্রভাব ফেলে। সারাহ কঠিন অসুস্থতা সত্ত্বেও বিভিন্ন ইসলামিক কোর্সে বেশ আগ্রহী ছিল। শত্রুর সাংস্কৃতিক প্রভাব থেকে মুসলিম নারী কীভাবে আত্মরক্ষা করবে সে সংক্রান্ত কোর্সগুলো করতে আমি তাকে উৎসাহ দিতাম। আমি মনে করি, খাবার-দাবার ও চিকিৎসা থেকে এই কাজ মোটেও কম গুরুত্বের নয়。