📄 নিজে তাদের সামনে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ও আদর্শ হিসেবে উপস্থিত হওয়া
সন্তান যখন শত বিপদেও আপনাকে ধৈর্য ধরতে দেখবে, আপনার নির্ভার মুখ দেখে অভ্যস্ত হবে তখন এই ধৈর্য ও প্রশান্তি তার মধ্যেও গিয়ে স্থান করে নেবে。
📄 মনে রাখবেন, আল্লাহ আপনার সন্তানের প্রতি আপনার চাইতেও অধিক দয়ালু
দ্বিতীয়ত সবসময় মনে রাখবেন, আল্লাহ আপনার সন্তানের প্রতি খোদ আপনার চাইতেও অধিক দয়ালু। আপনার দায়িত্ব শুধু যথাসাধ্য চেষ্টা চালানো, এরপর পুরো বিষয়টিকে আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া।
এই সময়টিতে এসে আমি সারাহর অসুস্থ জীবনের শুরু ও শেষদিকের দিনগুলোর মাঝে তুলনা করলাম। দেখলাম এই রোগের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাকে অনেক কিছুই শিখিয়ে দিয়েছেন। আগে সারাহকে সালাতের জন্য বলতে হতো, কুরআন পড়ার কথা মনে করিয়ে দিতে হতো; কিন্তু তার ডায়েরি ঘেঁটে দেখলাম শেষ কয়েকমাসে সে তীব্র অসুস্থতা সত্ত্বেও নিয়মিত সালাত আদায় করত, শেষ রাতে তাহাজ্জুদ পড়ত আর দশ পৃষ্ঠা কুরআন তিলাওয়াত ছিল তার প্রাত্যহিক রুটিনের অংশ। একসময় তাকে কোনো কাজে উদ্বুদ্ধ করতে দীর্ঘ উপদেশমূলক কথা বলার প্রয়োজন পড়ত, কিন্তু শেষ সময়গুলোতে এসে সে নিজ থেকেই আমাকে বলত, 'বাবা, জান্নাত সম্পর্কে আমাকে কিছু বলো।' আসলে রোগ যেভাবে আমাদের ভেতর পরিবর্তন আনে ঠিক সেভাবে শিশুদের মাঝেও প্রভাব সৃষ্টি করে。
রোগের বিষয়টি সন্তানকে হঠাৎ জানিয়ে দেওয়া অনুচিত। ধীরে সুস্থে পরিবেশ তৈরি করে কোনো রকম মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া ছাড়াই তাকে জানাতে হবে। ক্যান্সারের সংবাদটি আমি সারাহকে কোনো রকম মিথ্যা বলা ছাড়াই জানিয়েছিলাম। সে রোগ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে আমি বললাম, * 'মা, তোমার মধ্যে একপ্রকার ফুলন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।' * 'ফুলন কী বাবা?' * 'ব্লক।' * 'এখন কোন হাসপাতালে যাচ্ছিস?' * 'হুসাইন হাসপাতালে।' * 'কেন?' * 'ক্যান্সারের জন্য।' * 'তা হলে আমার ক্যান্সার হয়েছে?' * 'পাথরজনিত কিছু হওয়ারও সম্ভাবনা আছে।'
অর্থাৎ, ধীরে ধীরে পরিস্থিতি তৈরি করে তবেই তাকে রোগের কথা জানান। মিথ্যা বলে নিজের কথার ওজন কমিয়ে ফেলবেন না, আবার আকস্মিকভাবে সংবাদটি শুনিয়ে তাকে হতভম্বও করে দেবেন না。
📄 সন্তানের সাথে মজবুত সম্পর্ক গড়ে তোলা
তার সাথে এমনভাবে সম্পর্ক দৃঢ় করুন যে, আপনার প্রতি ভালোবাসা থেকে সে ধৈর্য ধারণ করতে বাধ্য হবে। আর এই সম্পর্ক তৈরি হয় সন্তানকে যথাযথ সময় দেওয়ার মাধ্যমে, তাদের সাথে আন্তরিক হওয়ার মাধ্যমে।
📄 তাদের মতো অন্যান্য শিশুদের কষ্ট ও যন্ত্রণার কথা তাদেরকে শোনানো
কিংবা যারা আরও মারাত্মক রোগে আক্রান্ত তাদের সম্পর্কে জানানো। সারাহকে হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর আমার পরিচয় হয় আবদুর রহমান নামের এক শিশুর সাথে। তার চোখ ও হাড়ের ক্যান্সার। এটি বেশ মারাত্মক ধরনের এক ক্যান্সার। এর ভয়ংকর দিক হলো, এটি একপাশ থেকে অন্যপাশে সংক্রমিত হয়। আরও ভয়ংকর দিক হলো, এই রোগ এক সন্তান থেকে আরেক সন্তানে সংক্রমিত হয়। তো তার বাবা তাকে জার্মানিতে চিকিৎসার জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন; কিন্তু সেখানকার ডাক্তার চোখ উপড়ে ফেলা ছাড়া আর কোনো পথ বাকি নেই বলে জানিয়েছেন। তা ছাড়া হাড়ের ক্যান্সারের কারণে পাও কেটে ফেলতে হবে。
আবদুর রহমানের বাবার সাথে আমার কথা হয়েছিল। একেবারেই সাধারণ মানুষ। কিন্তু তিনি এক অসাধারণ কথা আমাকে বললেন, 'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ রব্বুল আলামীনের। মানুষ যখন অন্যের বিপদ দেখে, তখন সে নিজের বিপদ ভুলে যায়। যাক ড. ইয়াদ, আবদুর রহমান আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, সে যদি ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহ কি তাকে সাওয়াব দেবে? সাওয়াব না দিলে নাকি সে ধৈর্য ধরবে না।'
আমি আবদুর রহমানকে বললাম, 'দেখি, তুমি আমাকে বলো, কীভাবে কীভাবে ধৈর্য ধরেছ, তোমার সাওয়াব কত হয়েছে আমি গুণে দিই।' শেষ পর্যন্ত বললাম, 'গুণে রাখা তো সম্ভব হচ্ছে না!' এভাবে দশ-পনেরো মিনিটি তার সাথে বেশ অন্তরঙ্গ কথাবার্তা হলো। আর এসব কথাবার্তা হয়েছিল সারাহর সামনে। ঘরে ফিরে সে তার ভাই ফারুককে আবদুর রহমানের সব ঘটনা বেশ আশ্চর্যের সাথে খুলে বলেছিল。
এভাবে তাকে আরও কিছু অসুস্থ ব্যক্তির ঘটনা শুনিয়েছিলাম। তবে এই কথা বুঝতে দেওয়া ছাড়া যে, আমি এসবের মাধ্যমে তাকে সান্তনা দিতে চাচ্ছি। বরং গল্প বলার পদ্ধতি ছিল, অসুস্থতা কীভাবে নিয়ামাত হয়ে ধরা দিতে পারে তা বোঝানো। এরকমই একটি হলো, আবদুল্লাহ বানেমা'র ঘটনা। আল্লাহর অবাধ্যতায় যার পুরো জীবন কেটেছিল। একসময় সে আবিষ্কার করল তার পুরো শরীর অবশ হয়ে পড়েছে, সম্পূর্ণরূপে প্যারালাইজড। কিন্তু যখনই তার শরীর আটকে গেল, আল্লাহ তার বদ্ধ হৃদয় উন্মুক্ত করে দিলেন। ফলে সে একসময় বেশ প্রসিদ্ধ দাঈতে পরিণত হয়। পরবর্তী সময়ে তার কথায় হাজারো উদাসীন যুবক হিদায়াত ও সঠিক পথের দিশা পায়, তাকে দেখে নিজেকে আল্লাহর প্রকৃত বান্দা হিসেবে গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত হয়。
কিন্তু প্রিয় ভাইয়েরা, এই ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি থেকে সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ অসুস্থ ব্যক্তিকে এভাবে লাগাতার অসুস্থতার ঘটনা শোনাতে শুরু করলে বিপরীত প্রভাব পড়ারও সমূহ আশঙ্কা থাকে। অনেক সময় সারাহ বিষয়টি ধরে ফেলতে পেরে বলত, 'বাবা, তুমি এভাবে তাদের কথা আমাকে কেন বলছো?' তাই এমন ঘটনা খুব বেশি প্রয়োজন না পড়লে না বলাই উত্তম。