📄 অন্তরকে আখিরাতমুখী করা
অর্থাৎ নিজেকে বুঝতে দেওয়া যে, আমার সমস্ত মনোযোগ আখিরাতকে ঘিরে। লক্ষ করলে দেখবেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর সমস্ত শিক্ষা আখিরাতকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলেছেন。
وَإِنَّ الدَّارَ الْآخِرَةَ لَهِيَ الْحَيَوَانُ
"আর আখিরাতের জীবনই তো প্রকৃত জীবন।”[৪৫]
হাদীসে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'নবিজি বলেছেন,
مَا تَعُدُّوْنَ الرَّقُوْبَ فِيْكُمْ
"তোমরা তোমাদের মধ্যে কাকে নিঃসন্তান মনে করো?"
সাহাবিগণ বললেন, 'যার কোনো সন্তান নেই সেই নিঃসন্তান।'
তিনি জবাব দিলেন,
لَيْسَ ذَاكَ بِالرَّقُوْبِ وَلَكِنَّهُ الرَّجُلُ الَّذِي لَمْ يُقَدِّمُ مِنْ وَلَدِهِ شَيْئًا
“না, সে নিঃসন্তান নয়; বরং নিঃসন্তান হলো সেই ব্যক্তি যে তার কোনো সন্তানকে আগে পাঠায়নি। (অর্থাৎ যার জীবদ্দশায় কোনো সন্তান মারা যায়নি।) [৪৬]
দেখুন, সচরাচর আমরা যা দেখতে পাই তা হলো, পিতার জীবদ্দশায় সন্তান মৃত্যুবরণ করে না; বরং পিতার পরেই সন্তান ইহলোক ত্যাগ করে। কিন্তু নবিজি যেন উলটো এটি বুঝাতে চাইলেন যে, পিতার জীবদ্দশায় সন্তান মৃত্যুবরণ করবে এটাই হলো স্বাভাবিক বিষয়। অর্থাৎ আল্লাহ আপনার সন্তানদের মাধ্যমে আপনাকে পরীক্ষা করবেন। আর এমনটা হওয়া অসম্ভব কিছু না। এভাবে নিজের চিন্তার জগৎকে আখিরাতমুখী করতে হবে, ইসলামের শিক্ষায় নিজেকে রাঙাতে হবে。
বছর দুয়েক আগের কথা, রমাদানে আমি তারাবীর সালাত পড়ছিলাম। লক্ষ করলাম, যতটা একাগ্র হওয়া প্রয়োজন সেভাবে পারছি না। পেট স্বাভাবিকের তুলনায় একটু বেশিই ভরা, আর অন্তরে এসে ভর করেছে রাজ্যের যত চিন্তা। আমি ভাবলাম, ইন শা আল্লাহ শেষ দশদিনে সব পুষিয়ে নেব। কিন্তু এই সময়টিতে এসেও সেই আগের অবস্থা। এবার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে ঠিক করলাম যে, না। এভাবে আর নয়, ইন শা আল্লাহ সাতাশের রাতে আর ঢিল দেওয়া চলবে না। কিন্তু যেভাবে আশা করেছিলাম হয়নি। পরদিন সকাল থেকেই আমি চিন্তিত ছিলাম যে, এত এত ত্রুটির জন্য আল্লাহ যেন আমাকে পাকড়াও করে না বসেন। কিছুক্ষণ পর সারাহ এসে জানাল, 'বাবা, আমার পা আর চলছে না।' পরবর্তী সময়গুলো বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও একাধিক ডাক্তারের কাছে দৌড়াদৌড়িতে কেটে গেল। একসময় গিয়ে আবিষ্কার করলাম আমার মেয়ের ক্যান্সার হয়েছে। তখন আমি শুধু এই হাদীসই মনে মনে জপছিলাম,
إِنَّ الْعَبْدَ إِذَا سَبَقَتْ لَهُ مِنَ اللَّهِ مَنْزِلَةٌ ، لَمْ يَبْلُغْهَا بِعَمَلِهِ ابْتَلَاهُ اللَّهُ فِي جَسَدِهِ، أَوْ فِي مَالِهِ، أَوْ فِي وَلَدِهِ ثُمَّ صَبَّرَهُ عَلَى ذَلِكَ حَتَّى يُبْلُغَهُ الْمَنْزِلَةَ الَّتِي سَبَقَتْ لَهُ مِنَ اللَّهِ تَعَالَى
"কোনো বান্দার জন্য যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো মর্যাদার আসন নির্ধারিত হয়, কিন্তু সে তার আমলের মাধ্যমে সে পর্যন্ত পৌঁছাতে না পারে, তখন আল্লাহ তাআলা তাকে তার শরীর, সম্পদ অথবা সন্তানের মাধ্যমে বিপদাপদে লিপ্ত করেন। আবার তাকে সেই বিপদাপদে ধৈর্য ধারণ করারও শক্তি দান করেন। ফলে সে উক্ত মর্যাদাটি লাভ করতে সক্ষম হয়, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে তার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।[৪৭]
আলহামদুলিল্লাহ, ধীরে ধীরে অন্তর প্রশান্ত হলো। একসময় অনুভব করলাম আল্লাহ মূলত এর মাধ্যমে আমার কল্যাণই চান। কীভাবে? কারণ তিনি আমাকে পরীক্ষাও করেছেন আবার সেই সাথে ধৈর্য ধারণ করার তাওফীকও দিয়েছেন। প্রিয় ভাইয়েরা, আখিরাতের চিন্তা ও চেতনা এভাবেই অনেক যন্ত্রণাকে লাঘব করে দেয়。
টিকাঃ
[৪৫] সূরা আনকাবৃত, ২৯: ৬৪。
[৪৬] মুসলিম, ২৬০৮。
[৪৭] আবূ দাউদ, ৩০৯০。
📄 নবিজি ﷺ-এর কথা ভেবে সান্ত্বনা
সারাহর ক্যান্সার ধরা পড়ার কয়েকমাস পরেই এক ভাইয়ের কন্যারও ক্যান্সার ধরা পড়েছিল। সারাহর শেষ সময়টিতে সে ভাইটি আমার কাছে সারাহর অবস্থা জানতে চাইলেন। আমি বললাম, 'অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। আশঙ্কাজনক।' তিনি আমাকে বললেন, 'এতটুকুই যথেষ্ট যে, আল্লাহ তাঁর নবিকে যে পরীক্ষায় ফেলেছিলেন আপনাকেও সে পরীক্ষায় ফেলছেন।' কত সহজ একটি কথা। এই কথাটি আমার অনেক সান্তনার কারণ হয়েছিল। আমরা প্রত্যেকেই জানি, নবিজি তাঁর ছয় ছেলেমেয়ে দ্বারা পরিক্ষিত হয়েছিলেন।[৪৮] সে সময় গিয়ে এই আয়াতটি আমি নতুন করে পড়লাম।
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُوْلِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ
“নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূলের তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আর্দশ।”[৪৯]
আমার ভেতরে এই উপলব্ধি জাগ্রত হলো, রাসূলুল্লাহ তো সেসব মানুষেরও আদর্শ যারা তাদের সন্তানসন্ততি দ্বারা পরিক্ষিত হচ্ছেন。
টিকাঃ
[৪৮] রাসূলুল্লাহ তাঁর সাত সন্তানের মধ্যে ফাতিমা। ছাড়া বাকি সবাইকে তাঁর নিজের জীবদ্দশাতেই হারিয়েছিলেন。
[৪৯] সূরা আহযাব, ৩৩: ২১。
📄 নতুন অবস্থায় নিজেকে মানিয়ে নেওয়া এবং বাস্তবতাকে স্বাভাবিক করে নেওয়া
সেই সাথে আল্লাহর ওপর আপত্তি তোলা থেকে সতর্কভাবে বেঁচে থাকা। এর অর্থ এই নয় যে, আপনি দুর্বল হয়ে আশা ছেড়ে দেবেন। বরং এই কথার উদ্দেশ্য হলো, থমকে না গিয়ে নতুন এই অবস্থার বাস্তবতাকে সামনে রেখে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করা। অনেক মানুষই আছেন যারা মেনে নিতে পারেন না, নতুন বাস্তবতাকে গ্রহণ করতে চান না। এই মানুষগুলো নিজে তো যন্ত্রণায় থাকেন, সন্তানের যন্ত্রণাও বাড়িয়ে দেন。
একটু ব্যাখ্যা করে বলি। আমি চাই আমার সন্তান গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করে শিক্ষিত হয়ে বের হোক, ডাক্তার হোক, দাঈ হোক কিংবা আমি আমার কন্যাকে বিয়ের পিড়িতে দেখতে চাই। এতসব চাওয়ার সাথে আপনার কিন্তু এই কথাও বলতে জানতে হবে যে, আল্লাহ যা চান তা-ই হবে। প্রিয় ভাইয়েরা, এই কথা বলতে যাবেন না, 'ইশ! আজকে যদি সে রোগাক্রান্ত না হতো, যদি এমনটা না হতো।' এই চিন্তা মনমস্তিষ্কে আসতেই দেওয়া যাবে না। ছোট্ট এই বাক্যটির মধ্যে লুকিয়ে আছে শয়তানের অনেক বড়ো ফাঁদ。
অর্থাৎ বিকল্প কিছু ভাববেন না। আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন তা-ই। এর বাইরের সাধ্য কারও নেই。
مَا أَصَابَكَ لَمْ يَكُنْ لِيُخْطِئَكَ، وَمَا أَخْطَأَكَ لَمْ يَكُنْ لِيُصِيبَكَ
“তোমার সাথে যা ঘটেছে তা ভুলেও এড়িয়ে যাওয়ার ছিল না। পক্ষান্তরে, যা এড়িয়ে গেছে তা তোমার সাথে কখনো ঘটবার ছিল না।”[৫০]
টিকাঃ
[৫০] মৃত্যুশয্যায় এই কথাটি উবাদাহ ইবনুস সামিত তার সন্তান আবদুর রহমানকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন। দেখুন—আবূ নুআইম, হিলয়াতুল আউলিয়া, ৫/২৮১; আবু দাউদ, ৪৬৯৯; ইবনু মাজাহ, ৭৭。
📄 আরও কঠিন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকা
ধৈর্য ধরতে গিয়ে যে বিষয়টি আমার সবচেয়ে বেশি উপকারে এসেছে তা হলো, আরও কঠিন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকা। যত কঠিন ও ভয়ংকর পরিণতি হতে পারে তার জন্য আগ থেকে প্রস্তুত হয়ে থাকুন। হতে পারে প্রথম দিকে ভয় করবে, অসহায় হয়ে পড়বেন কিন্তু আল্লাহকে আঁকড়ে ধরুন। তাঁর আশ্রয়ে নিজেকে সঁপে দিন। বলুন, 'হে আল্লাহ, এটা অনেক বেশি। আমার জন্য কঠিন হয়ে যায়।'
এরপর যখন আল্লাহ আপনাকে অতটা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি করবেন না তখন দেখবেন আপনাতেই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে আপনি বলে উঠছেন, আলহামদুলিল্লাহ。
সর্বশেষ একটি কথা বলি, আমি মনে করি, আমার মেয়ে আমার ভেতর এখনো জীবিত। কল্পনার জগতের কথা বলছি না। তাকে জীবিত বলার কারণ আল্লাহ তাকে অত্যন্ত সুন্দর একটি মৃত্যু দান করেছেন। এই কারণে আমি বলি সারাহর মৃত্যু হয়নি, সে মূলত সফর করেছে। এই বিচ্ছেদের পর আমি আশা রাখি আমাদের আবার দেখা হবে। কিছু কাজ আমার এখনো বাকি রয়ে গেছে, এসব সম্পাদিত করে তার সাথে মিলিত হব, ইন শা আল্লাহ। এই প্রশান্তির অনুভূতি আপনার ভেতর তখন তৈরি হবে যখন আপনার প্রিয় মানুষটি নিরাপদে আছে বলে আপনি নিশ্চিত হবেন。
ঠিক একই অনুভূতি আমার তখন হয়েছিল যখন আমার সম্মানিত বাবা মৃত্যুবরণ করেছিলেন। আমি বেশ দৃঢ় ও প্রশান্ত ছিলাম। কিন্তু আমার পাশে বসে থাকা বন্ধু কাঁদতে আরম্ভ করল!
☆ 'তোমার আবার কী হলো আবদুল মাজীদ!'
* 'আমার বাবা-মা সালাত আদায় করেন না। হায়! তারা যদি সেই অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করেন!'
এই বলে সে আবার ডুকরে কেঁদে উঠল。
এ যেন এক তিক্ত অনুভূতি। প্রিয়জন ইহলোক ত্যাগ করবে পথভ্রষ্ট হয়ে মানা যায়?! এর চেয়েও কষ্টের অনুভূতি হয়েছিল রাসূলুল্লাহ -এর, যখন চোখের সামনে চাচা আবূ তালিবকে কালিমা না পড়ে মৃত্যুবরণ করতে দেখেছিলেন। অতএব প্রিয় ভাইয়েরা, এ থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি হলো, আপনার প্রিয়জন যেন আল্লাহর আনুগত্যের ওপর মৃত্যুবরণ করতে পারে সে বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে দেখবেন। এর জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা-মেহনত করবেন, হৃদয় দিয়ে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর কাছে দুআ করবেন। প্রিয়জনের যখন সুন্দর সমাপ্তি হয় তখন ভাবনাটা অনেক সহজ হয়ে যায়। আমার প্রিয়জন অমুক স্থানে চলে গিয়েছে, দাঁড়াও হাতের কাজ শেষ করে আমিও আসছি। তখন চিন্তা-ভাবনা-পেরেশানি অনেকটা লাঘব হয়, নিজেকে সান্তনা দেওয়া যায়。