📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 প্র্যাকটিক্যাল বা প্রায়োগিক শিক্ষার মাধ্যমে

📄 প্র্যাকটিক্যাল বা প্রায়োগিক শিক্ষার মাধ্যমে


আমার বিভিন্ন বিপদ ও সমস্যার কথা শুনে যখন সারাহ আমার কাছে আসত, সে দেখতে পেত বাবা তার ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীতে স্বাভাবিকভাবে হেসেখেলে তার সাথে কথা বলছে। এভাবে সন্তান যখন আপনার নিকট কয়েক দফা এমন আচরণ দেখতে পাবে সে নিজ থেকেই বলবে, আমার বাবা আল্লাহর পথে কত কষ্ট স্বীকার করছেন; কিন্তু তিনি কতটা স্বাভাবিক, আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর কেমন সন্তুষ্ট। আর এভাবেই সন্তান আপনার কাজ দেখে প্রতিটি পরিস্থিতিতে ইতিবাচক থাকার শিক্ষা পাবে। [৪২]

টিকাঃ
[৪২] নির্ভেজাল একত্ববাদ ও সঠিক ইসলামের দাওয়াত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় দিয়ে যাওয়ার কারণে ড. ইয়াদ কুনাইবি বেশ কয়েকবার গ্রেফতার হন। কিন্তু সব বিপদে তিনি ছিলেন পাহাড়সম দৃঢ় এবং সন্তানদেরও তিনি মর্যাদা ও দৃঢ়তার যথাযথ শিক্ষা দিয়েছিলেন। সে সময় একটি ছবি নেট দুনিয়ায় বেশ নাড়া দিয়েছিল। কারাগারের সামনে সারাহ একটি প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে আছে। আর সেখানে লেখা: 'বাবা, এই মোবারক পথ থেকে পিছু হটবেন না। দৃঢ় পায়ে এগিয়ে চলুন আর বলতে থাকুন: 'আমার উম্মাহ আমার সন্তানদের চেয়েও অধিক গুরুত্বের।'

📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 গল্প বলার মাধ্যমে

📄 গল্প বলার মাধ্যমে


বিশেষ করে ঘুমানোর আগে গল্প বলার উপকারিতা অনেক বেশি। আপনাদের এই বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ রইল।

গল্প কীভাবে তৈরি করবেন?
আমি সাধারণত বিশ-ত্রিশটি গল্প তৈরি করে রেখেছিলাম। গল্পের মাধ্যমে কিছু শিক্ষা সন্তানের মস্তিষ্কে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্য আপনার অবশ্যই থাকতে হবে। আমার অভিজ্ঞতা থেকে সবচেয়ে সফল একটি ফর্মুলা আপনাদের বলি। সেটি হলো, গল্প শুরু করবেন একটি বাস্তবিক ঘটনা দিয়ে। সন্তানকে বলুন, আমি তোমাদের আজ একটি বাস্তব ঘটনা শোনাতে যাচ্ছি। এরপর বাড়তি কিছু যোগ করে গল্পটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবেন। এই বাড়তি অংশটিতে কোনো শিক্ষা থাকবে না তবে তাদেরকে গল্পের দিকে আকর্ষণ করার উদ্দেশ্য থাকবে। তারপর তাদের বুঝতে না দিয়ে ধীরে ধীরে যে শিক্ষা আপনি দিতে চান সেটি তাদের ভেতরে এমনভাবে প্রবেশ করাবেন যেন তারা যখন কোনো আয়াত বা হাদীস পড়বে নিজ থেকেই গল্পের সাথে এটিকে মিলিয়ে নেবে। একসময় সে নিজ থেকেই বলে উঠবে, 'বাবা দেখ, ঠিক এই বিষয়টিই অমুকের সাথে ঘটেছিল।'
আমার অধিকাংশ গল্প ছিল, একদিকে বস্তুবাদী জীবনের প্রাণহীনতা ও অশান্তি, অপরদিকে আল্লাহর সাথে সম্পর্কের সুখ ও তৃপ্তি সম্পর্কে। গল্পের মাধ্যমে সমাজে যে ভুল ও কুফরি মূল্যবোধ প্রচলিত আছে সেগুলোও খণ্ডন করুন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, অসাম্প্রদায়িকতা। বিভিন্ন কৌশলে শিশুমনে তৈরি করা হচ্ছে, 'সব ধর্মের সহাবস্থান' বা 'প্রত্যেকটিই সঠিক' ইত্যাদি কুফরি মানসিকতা。
এমনই একটি গল্প হলো: সিরিয়ার একটি পরিবার অভিবাসী হয়ে সুইডেনে স্থানান্তরিত হলো। সেখানে স্থানীয় এক ধনকুবের তাদের সন্তানকে নিজের সন্তান দাবি করে ছিনিয়ে নিল। বাবা বহু দেন-দরবার করেও সন্তানকে ফিরে পেলেন না। লম্বা ঘটনা, আমি ছোটো করে বলছি। তো এক খ্রিষ্টান ব্যক্তি সন্তান ফিরে পেতে তাকে বেশ সাহায্য করল, অবশেষে সন্তানকে সে ফিরে পেতে সক্ষম হলো। এবার বাবা তার সাহায্যকারীকে এই উপকারের প্রতিদানস্বরূপ ইসলামে দাওয়াত দিলেন। একপ্রকার লেগেই রইলেন তার সাথে। একসময় গিয়ে খ্রিষ্টান লোকটিও ইসলাম গ্রহণ করেছিল。
তো দেখুন, সিরিয়ান বাবা ধন্যবাদস্বরূপ বলতে পারতেন, 'তুমি খ্রিষ্টান হলেও তুমি আর আমি এক। সব ধর্ম সমান। আমাদের ধর্ম আমাদের মাঝে দেওয়াল হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।' এভাবে মুখরোচক কথা বলে সন্তুষ্ট করতে পারতেন। কিন্তু লোকটি তার উপকারকারীকে উত্তম প্রতিদান দিয়েছেন। তো এই গল্পের গভীর প্রভাব সন্তানদের হৃদয় ছুঁয়ে যাবে。
এভাবে আরেকটি ঘটনা আপনাদের কাছে শেয়ার করি, ফুসফুসে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ায় আমার কন্যা সারাহর প্রায় সময় ছোটোখাটো অপারেশন লেগেই থাকত। বেচারি খুব চঞ্চল ছিল বিধায় এই অপারেশনগুলো তার জন্য ছিল বেশ বিরক্তিকর। খেলা ছেড়ে দিয়ে, মাথার চুল কামিয়ে হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা। আগেই বলে রাখি, আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর আপত্তি তোলা কিংবা তাতে অসন্তুষ্টি আমার মেয়ে কখনো প্রকাশ করেনি। মূলত আল্লাহর ওপর আপত্তি তোলার এই চিন্তাটাই তার মস্তিষ্কে ব্লক করা ছিল, ওয়াল-হামদুলিল্লাহ! তো একদিন সে জেদ ধরে বলল, 'না বাবা, আমি আর অপারেশনে যাব না। এসব আমার ভালো লাগে না। কাঁদোকাঁদো সুর। আমি বললাম, 'দেখ মা, আমি তোমাকে 'সহীহ বুখারি' থেকে একটি গল্প শোনাই। একবার নবিজি এক অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে গেলেন। তাকে বললেন, “চিন্তা করো না, ইন শা আল্লাহ সুস্থ হয়ে যাবে।” কিন্তু লোকটি বলল, 'আপনি বলছেন সুস্থ হয়ে যাব? কক্ষনো না। জ্বর তীব্রতর হচ্ছে, আমাকে কবর দেখিয়ে ছাড়বে।' তখন নবিজি কী জবাব দিয়েছিল জানো? বললেন, “তবে তা-ই হোক।" [৪৩]
হতে পারত নবি -এর দুআয় লোকটি আরোগ্য লাভ করত। কিন্তু যখন এতসব কথা সে বলা শুরু করল তখন বললেন, 'আচ্ছা, তবে তা-ই হোক।' বর্ণনাকারী বলেন, 'লোকটি সে রাতেই মারা যায়!'
এই ঘটনা উল্লেখ করে আমি সারাহকে বললাম, ‘মা, দেখ, লোকটি যদি এই সামান্য সময় ধৈর্য ধরত তা হলে কত বড়ো প্রতিদান সে পেত।’ দেখলাম সে আমার এই কথায় একেবারে চুপ হয়ে গেল। যেন কথাগুলো তার অন্তরে যথাযথ স্থানে গিয়ে বসেছে। পরবর্তী সময়ে শুনি, ঘটনাটি সে তার ভাইবোনদেরও বেশ আগ্রহের সাথে শুনিয়েছে。
প্রিয় ভাইয়েরা, আসলে ঘটনা বর্ণনা করা এবং গল্প শোনানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। এমনকি মহান আল্লাহ পূর্ববর্তীদের ঘটনা শুনিয়ে নবি-কে সান্তনা দিতেন,
وَكُلًّا نَقُصُّ عَلَيْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الرُّسُلِ مَا نُثَبِّتُ بِهِ فُؤَادَكَ
“আর আমি রাসূলদের ঘটনাগুলো আপনার কাছে বর্ণনা করছি, যার মাধ্যমে আমি আপনার হৃদয়কে মজবুত করে থাকি।”[৪৪]
নবিদের ওপর যদি ঘটনার প্রভাব পড়ে তা হলে ভাবুন সন্তানদের ওপর কেমন প্রভাব পড়বে!

টিকাঃ
[৪৩] বুখারি, ৩৬১৬。

📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 কুরআনের সাথে তাদের সম্পৃক্ত করে তোলার মাধ্যমে

📄 কুরআনের সাথে তাদের সম্পৃক্ত করে তোলার মাধ্যমে


প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে পরিবারের সকলে মিলে সমস্বরে কুরআন তিলাওয়াত করুন। সন্তানদের কুরআনি জিজ্ঞাসার উত্তর দিন।

📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 তাদের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক তৈরি করার মাধ্যমে

📄 তাদের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক তৈরি করার মাধ্যমে


এটা বিভিন্নভাবে হতে পারে। সবচেয়ে ফলপ্রসূ পদ্ধতি হলো, তাদের সাথে খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করা। খেলাধুলার এই সময়টাকে বৃথা মনে করবেন না, বরং আল্লাহর কাছে এর বিনিময় পাওয়ার আশা রাখুন। আমি অবশ্য সরল খেলাধুলাগুলোই করতাম। বিশেষ করে এই সময়ে মোবাইলে ডুবে থাকার প্রবণতা খুব বেশি। এসব না করে সন্তানদের সময় দিন。
এছাড়া সম্পর্ক দৃঢ় করার আরেকটি পদ্ধতি হলো, নিজ দায়িত্বে সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দেওয়া। এর অনেকগুলো লাভের মধ্যে যেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো, তাদের স্কুলজনিত কোনো সমস্যার ত্বরিত সমাধান করা সম্ভব হয়। তাই প্রত্যেক বাবা-মায়ের প্রতি আমার পরামর্শ থাকবে যদ্দুর সম্ভব সন্তানদের স্কুলে আনা-নেওয়ার কাজ নিজে আঞ্জাম দেওয়ার চেষ্টা করুন。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00