📄 বিষয়টির গুরুত্ব
প্রিয় ভাইয়েরা, সন্তান হয়তো আপনার জান্নাতের দরজা নতুবা দুনিয়া ও আখিরাতে পরিতাপের কারণ। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوْا إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادِكُمْ عَدُوًّا لَّكُمْ فَاحْذَرُوهُمْ
“হে ঈমানদারগণ, তোমাদের স্ত্রী ও সন্তানসন্ততিদের মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের শত্রু। অতএব তাদের সম্পর্কে তোমরা সতর্ক থেকো।”[৩২]
কীভাবে সম্ভব, এমন কেউ আমার শত্রু হবে?!
সম্ভব। যদি আপনি তার শিক্ষাদীক্ষায় অবহেলা করেন। তখন সন্তানের মন্দকাজের কিছু অংশ আপনার ঘাড়েও এসে বর্তাবে কিংবা অবাধ্য সন্তান আপনার জন্য আযাবের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُعَذِّبَهُمْ بِهَا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا
“আল্লাহ তো এসবের মাধ্যমেই তাদের দুনিয়ার জীবনে শান্তি দিতে চান।”[৩৩]
এই কারণে বুঝতেই পারছেন বিষয়টি কতটা গুরুত্বের দাবি রাখে!
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যদি এই সময়ে এসে কাউকে জিজ্ঞেস করা হয়, তুমি বিয়ে কেন করেছ? সন্তান জন্মদানে তোমার উদ্দেশ্যই-বা কী? তার উত্তর থেকে যা প্রতীয়মান হয় তা হলো, সন্তান ব্যক্তিগত শোভার অংশ! প্রত্যেকেই যেহেতু সন্তান গ্রহণ করে, তাই আমিও বাধ্য!
প্রিয় ভাইয়েরা, এই যুগে এমন উদ্দেশ্যে সন্তান নেওয়া বেশ বিপজ্জনক একটি বিষয়। সময়টা কতটা কঠিন তা তো প্রত্যেকেরই জানা। হতে পারে আপনি জাহান্নামের এক টুকরো মাংসপিণ্ডই জন্ম দিচ্ছেন, আমরা আল্লাহর নিকট এর থেকে পানাহ চাই। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُوْدُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ
“হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনদের সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।”[৩৪] রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
مَا مِنْ عَبْدِ اسْتَرْعَاهُ اللهُ رَعِيَةً فَلَمْ يَحُطْهَا بِنَصِيْحَةٍ إِلَّا لَمْ يَجِدْ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ
“আল্লাহ যখন কোনো বান্দার নিকট কারও দায়িত্ব অর্পণ করেন, আর সে কল্যাণকামিতার সাথে তা ঢেকে না নেয়, তা হলে সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।” [৩৫]
নবিজি ﷺ-এর প্রকাশ ভঙ্গিমা লক্ষ করুন, 'যদি সে কল্যাণকামিতার সাথে তা ঢেকে না নেয়' আপনার প্রতি আদেশ হলো, সন্তানদের সব স্থানে সবসময় কল্যাণকামিতার সাথে ঢেকে নেওয়া। ঢেকে নেওয়ার অর্থ এই নয় যে, খুব বেশি উপদেশ আর সমালোচনায় তাদের ব্যস্ত করে রাখবেন। কল্পনা করুন, আপনার সন্তানের দিকে গুলিবৃষ্টি হচ্ছে, তখন আপনি কী করবেন? তাকে ঠিক সেভাবেই আপনি ঢেকে নেবেন যেভাবে নিরাপত্তারক্ষী ঢেকে নেয়। যদি এভাবে না করেন তা হলে আপনার শাস্তি কী?
إِلَّا لَمْ يَجِدْ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ তা হলে সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।
এবার নিশ্চয় বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে পারছেন。
টিকাঃ
[৩১] বুখারি, ১৩。
[৩২] সূরা তাগাবুন, ৬৪ : ১৪。
[৩৩] সূরা তাওবা, ৯ : ৫৫。
[৩৪] সূরা তাহরীম, ৬৬ : ৬。
[৩৫] বুখারি, ৭১৫০; মুসলিম, ১৪২。
📄 অসুস্থ সন্তান : কেমন হবে আমাদের আচরণ?
সন্তানের অসুস্থতার সময়টি প্রিয় ভাইয়েরা, অত্যন্ত কঠিন ও বিপদসংকুল। এই সময়টিতে ব্যক্তি হয়তো-বা আল্লাহর দরবারে উত্তম মর্যাদায় আসীন হয় কিংবা এই অসুস্থতা, তার ও তার সন্তানের কুফরের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একভাই সেদিন আমাকে সান্ত্বনামূলক একটি চিঠি পাঠালেন। বললেন:
'ভাই ইয়াদ, অনেক অপেক্ষার পর আমার একটি সন্তান জন্ম নিয়েছিল। তাকে আমার কলিজার টুকরো বললেও ভুল হবে, বলতে গেলে সে ছিল আমার প্রাণ। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস ছেলেটি আমার অসুস্থ হয়ে মারা যায়। সেদিন থেকে আমি সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছি। এখন আমি সবাইকে বিয়ে করতে নিষেধ করি, এমনকি সন্তান না নেওয়ারই পরামর্শ দিই!'
প্রিয় ভাইয়েরা, বিয়ে ও সন্তান জন্মদানের মধ্যে অন্তর্নিহিত মহান আল্লাহর নিগূঢ় প্রজ্ঞার প্রতি আমরা এভাবেই সন্দেহযুক্ত হয়ে পড়ি। আর এখান থেকেই তৈরি হয় সন্তানদের সাথে একপ্রকার অসুস্থ সম্পর্ক। আমার বন্ধু মনোবিজ্ঞানী ড. আবদুর রহমান যাকির বলেন, 'এই শ্রেণির মানুষ সাধারণত আল্লাহর ঘনিষ্ঠতা থেকে বঞ্চিত থাকেন। এমনকি তারা নিজেদের সাথেও স্বাচ্ছন্দ্যময় সময় কাটাতে পারেন না, তারা বাহ্যিক আবেগকে আঁকড়ে ধরে থাকেন। বিষয়টি আজ একপ্রকার অসুস্থতায় রূপ নিয়েছে।'
একদিকে সন্তানের প্রতি অতিরিক্ত আবেগ দেখানো যেভাবে কাম্য নয়, সেসাথে তাদের হাসিকান্না ও আহ্লাদে একেবারে প্রতিক্রিয়াহীন হয়ে পড়াটাও অনুচিত। বরং সন্তানকে যখন হেসেখেলে কথা বলতে দেখবেন তখন আপনার উচিত, আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা। তবে তাদের প্রতি ভালোবাসা যেন শিরকে আসগরের পর্যায়ে গিয়ে উপনীত না হয়, কিংবা আপনাকে দ্বীনের ব্যাপারে ছাড় প্রদানে উদ্বুদ্বুদ্ধ না করে。
সন্তান কোনোকিছুর আবদার জানাল, আর তারা আল্লাহর অবাধ্যতা হবে জেনেও আপনি তাদের সব আবদার পূরণ করলেন। যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এর অর্থ আবার এটাও নয় যে, তাদের প্রতি আবেগও প্রকাশ করা যাবে না। শিশুদের নিয়ে নবিজি -এর উচ্ছ্বাস দেখুন। হাদীসে এসেছে: আবদুল্লাহ ইবনু বুরাইদাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি আমার পিতা বুরাইদাহ কে বলতে শুনেছি,
‘রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের উদ্দেশে ভাষণ দিচ্ছিলেন। হঠাৎ হাসান ও হুসাইন লাল বর্ণের দুটি জামা পরিহিত অবস্থায় আছাড় খেতে খেতে হেঁটে আসছিলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ তখন মিম্বার থেকে নেমে এসে তাদের দুজনকে তুলে এনে নিজের সামনে বসালেন। তারপর বললেন,
(إِنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ ) فَنَظَرْتُ إِلَى هَذَيْنِ الصَّبِيَّيْنِ يَمْشِيَانِ : صَدَقَ اللهُ وَيَعْثُرَانِ فَلَمْ أَصْبِرْ حَتَّى قَطَعْتُ حَدِيْثِيْ وَرَفَعْتُهُمَا
“মহান আল্লাহ সত্যই বলেছেন, “তোমাদের সম্পদ ও সন্তানসন্ততি তো পরীক্ষা বিশেষ।”[৩৬] আমি তাকিয়ে দেখলাম এই শিশু দুটি আছাড় খেতে খেতে হেঁটে আসছে। তাই আমি আর নিজেকে সামলাতে পারিনি, এমনকি বক্তব্য বন্ধ করে তাদেরকে তুলে নিতে বাধ্য হয়েছি।”[৩৭]
কতটা উচ্ছ্বসিত আবেগ নিয়ে রাসূল এই কাজটি করলেন। অপর এক হাদীসে এসেছে: নবিজি দিনের এক অংশে বের হয়ে বললেন, এখানে খোকা (হাসান) আছেন কি? এখানে খোকা আছে কি? ফাতিমা তাকে তৈরি করে পাঠালে তিনি দৌড়িয়ে এসে নবিজিকে জড়িয়ে ধরলেন এবং চুমু খেলেন। তখন তিনি বললেন,
اللَّهُمَّ أَحْبِبْهُ وَأَحِبَّ مَنْ يُحِبُّهُ
“হে আল্লাহ, তুমি তাকে ভালোবাসো এবং তাকে যে ভালোবাসবে তাকেও ভালোবাসো।”[৩৮]
এভাবে বাক্যটি তিনি তিনবার বললেন। অন্য হাদীসে এসেছে, নবিজি তাঁর উভয় নাতিকে কাঁধে নিয়ে উপরিউক্ত দুআটি পড়তেন。
এমনিভাবে নিজ সন্তান ইব্রাহীম -এর নিকট গিয়ে নবিজি চুমু খেয়েছেন, গভীর ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন। যখন ইবরাহীম শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করছিল তখন নবিজি -এর চোখ দুটো অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েছিল। এই দৃশ্য দেখে আবদুর রহমান ইবনু আওফ বলেছিলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনিও? নবিজি উত্তর দিয়েছিলেন, “হে ইবনু আওফ, এটি তো রহমত। এরপর নবি ﷺ অশ্রুসিক্ত নয়নে বলেছিলেন,
إِنَّ الْعَيْنَ تَدْمَعُ، وَالْقَلْبَ يَحْزَنُ، وَلَا نَقُوْلُ إِلَّا مَا يَرْضَى رَبُّنَا، وَإِنَّا بِفِرَاقِكَ يَا إِبْرَاهِيمُ لَمَحْزُوْنُوْنَ
"চোখ অশ্রু ঝরাচ্ছে আর হৃদয় ব্যথিত হচ্ছে। তবে আমরা মুখে কেবল তা-ই বলব যা আমাদের রব পছন্দ করেন। হে ইব্রাহীম, তোমার বিচ্ছেদে আমরা গভীরভাবে শোকাহত, বিপর্যস্ত।”[৩৯]
এসব হাদীস ছোটোদের প্রতি নবি ﷺ-এর অগাধ ভালোবাসা ও আদরের কথা জানান দেয়। কিন্তু এতদসত্ত্বেও আল্লাহ তাআলা যখন একে একে তাঁর প্রত্যেক সন্তানকে তুলে নিয়ে যাচ্ছিলেন তখন রাসূল ﷺ কি কোনো রকম হাহুতাশ দেখিয়েছিলেন? আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর কোনো প্রকার উচ্চবাচ্য করেছিলেন? না। সন্তানদের তিনি ভালোবাসতেন বটে, কিন্তু সেসাথে আল্লাহর সিদ্ধান্তের সামনে ছিলেন পরিপূর্ণরূপে আত্মসমর্পণকারী।
যে ভাইটি আমাকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন তার উদ্দেশ্যে বলব, হ্যাঁ হতে পারে আপনি খুব মূল্যবান কিছু হারিয়ে ফেলেছেন; কিন্তু এর বিনিময় আল্লাহর নিকট তালাশ করুন। আপনাকে আমি রূঢ় হয়ে থাকতে বলছি না, বরং বলছি তাদের ভালোবাসুন। কিন্তু আপনার এই ভালোবাসা যেন আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার চেয়ে বেড়ে না যায়। এমনকি যদি আল্লাহ আপনার সন্তানকে তুলে নিতে চায় আপনি স্পষ্ট ভাষায় বলুন, 'আল্লাহ, সবই আপনার ইচ্ছা, আমার কিছু বলার নেই। আমার সবকিছুই আপনার।'
আগের সব কথার সারকথা হলো, সন্তানদের ভালোবাসুন অসুবিধা নেই। রাসূল ﷺ যতটা উচ্ছ্বসিত হয়ে আদর করেছেন আপনিও করুন। কিন্তু তার ওপর যখন বিপদ নেমে আসবে তখন নিজেই নিজেকে শান্ত রাখবেন। তখন মনকে এভাবে প্রবোধ দেবেন যে, আল্লাহকে আপনি সন্তানদের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন। সন্তান আপনার পক্ষ থেকে উপহারস্বরূপ আল্লাহর দরবারে ফিরে গিয়েছে। সে আপনার জন্য দয়া ও রহমতের কারণ হবে। নিজেকে হতাশা ও যন্ত্রণায় ডুবিয়ে মারবেন না, তাদের ব্যাপারে আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীরে প্রশ্ন উঠাতে যাবেন না。
টিকাঃ
[৩৬] সূরা তাগাবুন, ৬৪: ১৫。
[৩৭] তিরমিযি, ৩৭৭৪。
[৩৮] বুখারি, ২১২২; মুসলিম, ২৪২১。
[৩৯] বুখারি, ১৩০৩。
📄 যে মূল্যবোধগুলো সন্তানের হৃদয়ে গেঁথে দেবো
কিছু মূল্যবোধ তাদের হৃদয়ে আমাদের গেঁথে দেওয়া প্রয়োজন। এতে করে সন্তান যদি কখনো বিপদে আক্রান্ত হয়, সে ধৈর্য ধরতে সক্ষম হবে。
আমি মনে করি, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধটি হলো,
১. আল্লাহর প্রতি সম্মান। সেই সাথে তাঁর পথে নিজেকে উৎসর্গিত করার প্রস্তুতি। কিন্তু সন্তান কি এই কথাগুলো বুঝবে? হ্যাঁ অবশ্যই বুঝবে। এই বিষয়টি বুঝাতে আমি সন্তানদের একটি ঘটনা খুব বেশি বর্ণনা করি。
একলোক তার পুরো জীবনে কোনো ভালো কাজ করেনি। কোনো প্রকার সাওয়াবের কাজ তার দ্বারা হয়নি। একসময় তার মৃত্যুক্ষণ উপস্থিত হলে সে সব সন্তানকে একত্র করে বলল, 'আমি তোমাদের কেমন পিতা ছিলাম?' তারা বলল, 'খুবই উত্তম পিতা।' হতে পারে সন্তানদের তিনি খুবই আদর করতেন, তবে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ভালো ছিল না। তো বাবা তার সন্তানদের অসিয়ত করে গেলেন, 'মৃত্যুর পর তোমরা আমাকে পুড়িয়ে ফেলবে। তারপর আমার ছাই অর্ধেক বাতাসে উড়িয়ে দেবে আর অর্ধেক পানিতে নিক্ষেপ করবে। কারণ আল্লাহর কসম! আমাকে যদি তিনি আবার একত্র করেন, তা হলে এমন আযাব দেবেন, যা পৃথিবীর অন্য কাউকে কখনো দেননি।'
তার পর লোকটি যখন মৃত্যুবরণ করল সন্তানেরা তার অসিয়ত বাস্তবায়ন করল। তার ছাই কিছু উড়িয়ে দিলো আর কিছু পানিতে ফেলে দিলো। কিন্তু এসব তো আল্লাহর সামনে কোনো উপকারেই আসবে না। আল্লাহ তাআলা সব ছাই একত্র করে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আমার বান্দা, এমনটি কেন করতে গেলে?' লোকটি জবাব দিলো, 'আমার রব, আমি আপনাকে ভয় করি, নিজের অপরাধে শঙ্কিত হয়েই এমনটি করেছি।'
আপনিই বলুন, লোকটির ভেতর আল্লাহর প্রতি সম্মান ছিল কি না? হ্যাঁ হতে পারে সে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করেছে, অবাধ্যতায় জীবন কাটিয়েছে কিন্তু সম্মানবোধ থেকেই তো বলেছে, ইয়া রব! আপনাকে ভয় করি, নিজের অপরাধে আমি শঙ্কিত ছিলাম。
নবিজি বলেন, আল্লাহ লোকটিকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। [৪০]
এই ধরনের ঘটনাগুলো শুনিয়ে আমি সন্তানদের বলি, 'দেখ বৎস, এভাবে যদি তুমি আল্লাহর সম্মান নিয়ে আখিরাতে যেতে পারো, ওয়াল্লাহ! তোমার কল্যাণের আশা রাখা যায়।'
যদি এভাবে সে আল্লাহকে সম্মান করতে পারে তা হলে আল্লাহর পথে নিজেকে উৎসর্গিত করতে তার বিন্দুমাত্রও কুণ্ঠাবোধ হবে না। হাশাশী, ইসমাঈলী, কাদিয়ানিসহ তাদেরকে বিভিন্ন ভ্রান্ত দলের উদাহরণ দিন। এ সমস্ত লোকেরা ভ্রান্ত উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে জীবন বাজি রাখতে পারলে মহান আল্লাহর জন্য আমরা কেন পারব না?!
আপনি যদি চান সন্তান আপনার নিকট হতে আল্লাহর প্রকৃত সম্মান শিখুক, তা হলে আপনার উচিত হবে আল্লাহ ও আল্লাহ-সম্পর্কিত সবকিছুকেই সম্মান করা। আল্লাহকে তো করবেনই সেই সাথে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর কিতাব, আল্লাহর শারীআতসহ দ্বীনসংক্রান্ত সবকিছু এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। আপনি যদি এই বৃত্তের বাইরে অন্য কিছুকে মর্যাদা দেন তা হলে আপনি আপনার সন্তানের হৃদয়ে অনিষ্টের বীজ বপন করলেন। একসময় আপনার এই কাজ, আল্লাহর প্রতি সন্তানের শ্রদ্ধাবোধেরও ঘাটতি তৈরি করবে।
সন্তানকে বলুন, 'প্রিয় বৎস, আল্লাহকে সম্মান করো। আল্লাহর আদেশ-নিষেধকে সম্মান করো। আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত সবকিছুকে সম্মান করো। আর এ ব্যতীত অন্য যা কিছু আছে, সেগুলোকে সম্পূর্ণরূপে বয়কট করো। আর জেনে রেখো, আল্লাহকে সম্মান জানানো ছাড়া কেউ খাঁটি মুসলমান হতে পারে না।'
তাদের হৃদয়ে আল্লাহর পবিত্র বিধানগুলোর ব্যাপারে আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি করুন। যেন তারা মন্দ কাজকে ঘৃণা ও প্রতিহত করতে শেখে। ফলে তাদের জীবন পরিচালিত হবে এক মহান উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে। তাকে ঘিরেই তারা বাঁচবে। ব্যক্তিগত সমস্যা তখন তাদের কাছে তুচ্ছ হয়ে ধরা দেবে। আমার কন্যা সারাহর দ্বীনি আত্মমর্যাদাবোধ খুব বেশি ছিল। স্কুলে ভুল কিছু শুনলেই সে আমাকে এসে অভিযোগ জানাতো। 'বাবা, আজ ম্যাডام একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন, এটি কি জাল হাদীস?'
'হ্যাঁ মা, জাল হাদীস।'
'বাবা, তা হলে স্কুলে চিঠি পাঠিয়ে বোলো, আজ টিচার যে হাদীসটি শুনিয়েছেন সেটি ভুল ছিল।'
অনেক সময় সে স্কুল থেকে এসে জানাতো, 'বাবা, আমি আর পারছি না। ছাত্র-শিক্ষক সবাই আমার বিরুদ্ধে। আমি নাকি সব কিছুতেই ভুল ধরি। আসো আমাকে সাহায্য করো।'
তো সন্তানকে এভাবে অন্যায়ের প্রতিবাদ শিক্ষা দিন। ফলে লাভ যা হবে তা হলো, সে একটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বাঁচতে শিখবে। কখনো ব্যক্তিগত কোনো সমস্যা যদি দেখা দেয়, সে এগুলোকে খুব একটা বড়ো করে দেখবে না। বিপরীতে তাকে যদি আত্মকেন্দ্রিকতার ওপর গড়ে তুলেন, সে তখন নিজের কথাই শুধু ভাববে। এমনকি জুতোর ফিতা ছিঁড়ে গেলেও তাকে আতঙ্কিত ও উত্তেজিত দেখতে পাবেন, হতে পারে এরচেয়েও তুচ্ছ কিছু তার অস্তিত্বকে নাড়িয়ে দেবে। কারণ তার এছাড়া আর কোনো উদ্দেশ্যই নেই。
আমার মনে পড়ে, সারাহ, তার ভাইবোন এবং আমি সকলে মিলে বিভিন্ন কবিতা ও সংগীত আবৃত্তি করতাম। যাতে তাদের ভেতর একটি মহান উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বাঁচার অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করতে পারি। আপনারাও এমন কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন।
দ্বিতীয় যে মূল্যবোধটি আমরা তাদের ভেতর তৈরি করব, সেটি হলো,
২. আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা। আমরা আমাদের সন্তানদের প্রায় সময় যে বলি, 'আল্লাহ তোমাকে জাহান্নামে দেবে' প্রচলিত এই কথাটি সম্পূর্ণ ভুল। আল্লাহ শিশুদের কখনো জাহান্নামে ফেলবেন না, বরং তিনি শিশুদের ভালোবাসেন。
শেষ যে শিক্ষা তাদের দেবেন সেটি হলো,
৩. দুনিয়া প্রতিদান প্রাপ্তির জায়গা নয়, এটি বরং পরীক্ষার স্থান। এই ক্ষেত্রে আমরা একটি মারাত্মক ভুল করি। সন্তানদের সালাতে উদ্বুদ্ধ করতে গিয়ে বলি, 'যাও বাবা, সালাত আদায় করে এসো। সালাত পড়লে তুমি পরীক্ষায় ভালো করবে।' এভাবে বলে আমরা মূলত তাদের প্রতিদানের আশা দুনিয়ামুখী করে দিই। সে সালাত পড়ার পরও যখন দেখে যে, তার অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি, তখন খুব সম্ভবত সে আগের অবস্থাতেই ফিরে যাবে。
না, এভাবে নয়। এই পদ্ধতি বড়ো ভয়ানক। আমাদের বলতে হবে, 'বাবা, সালাত পড়ো, তা হলে আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবেন।'
* 'কীভাবে আল্লাহ আমাকে ভালোবাসবেন?'
* 'যদি তুমি বিপদগ্রস্ত হও, আল্লাহ তোমাকে ধৈর্যশীল বানাবেন। আর যদি তুমি সুখী হও, আল্লাহ তোমাকে কৃতজ্ঞ হওয়ার তাওফীক দেবেন। এভাবে সুখে-দুঃখে তিনি তোমাকে প্রশান্ত রাখবেন, আর আখিরাতে প্রতিদানস্বরূপ জান্নাত তো আছেই।'
এই বিষয়টি আপনি তাদের গল্প শুনিয়ে শেখাতে পারেন। প্রিয় ভাইয়েরা, সন্তানদের শিক্ষণীয় গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়ানো অত্যন্ত জরুরি ও ফলাফল সমৃদ্ধ একটি কাজ। যাক, বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে তাদের মস্তিষ্কে এই বিষয়টি স্থাপন করুন যে, দুনিয়া প্রতিদানের স্থান নয়, বরং পরীক্ষার জায়গা। তাকে বলুন, দুনিয়ায় শতভাগ যে প্রতিদানটি তুমি পাবে সেটি হলো, আত্মিক প্রশান্তি。
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوْا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنْتُمْ تُوْعَدُوْنَ
“নিশ্চয় যারা বলে, ‘আল্লাহ আমাদের পালনকর্তা’, তারপর এই কথার ওপর অবিচল থাকে, তাদের নিকট ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় পেয়ো না, চিন্তা করো না। আর সুসংবাদ গ্রহণ করো সেই জান্নাতের, যার প্রতিশ্রুতি তোমাদের দেওয়া হয়েছে।” [৪১]
টিকাঃ
[৪০] বিস্তারিত দেখুন-বুখারি, ৬৪৮১。
[৪১] সূরা ফুস্স্সিলাত, ৪১ : ৩০。
📄 সন্তান প্রতিপালন আমার উচ্চাকাঙ্ক্ষার পথে বাধা!
অপ্রাসঙ্গিকভাবে মাঝখানে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারণা করতে হলো। সন্তানকে সঠিক দীক্ষা দেওয়া কিংবা অসুস্থ সন্তানের পেছনে সময় ব্যয় করাকে অনেকেই আমরা নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পথে বাধা মনে করি। একটি কথা আপনাদের কাছ থেকে লুকোবো না, আমি رِحْلَةُ الْيَقِيْنِ নামক সংশয় নিরসনমূলক একটি সিরিজ শুরু করার সতেরো দিন পর সারাহর রোগ দেখা দিতে শুরু করে। বলতে বাধা নেই, এই সিরিজটিকে আমি আমার একজন সন্তান বলেই গণ্য করি। আলহামদুলিল্লাহ, অনেকেই এই সিরিজের মাধ্যমে হিদায়াতের আলোকিত পথ খুঁজে পেয়েছেন, ছুম্মাল-হামদুলিল্লাহ। তো তার রোগ প্রকাশ পাওয়ার পর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ডাক্তারের চাপে আমি মোটামুটি কাহিল। সেই সাথে চিকিৎসার পেছনে আমার অজস্র সময় ব্যয় হতে লাগল। একসময় আমি আল্লাহর কাছে দুআ করতে লাগলাম, 'হে আল্লাহ, সারাহকে দ্রুত সুস্থ করে দিন, যাতে একটু স্বস্তির সাথে তোমার দ্বীনের খেদমত করতে পারি।'
এই দুআর পেছনে মূল কারণ ছিল, মেয়ের দুশ্চিন্তায় আমার কোনো কাজে মন বসত না। কেমন যেন উদাস হয়ে ছিলাম। তা ছাড়া দৌড়াদৌড়ির অধিক চাপে প্রসন্নচিত্তে দাওয়াতের কাজ যে করব সে সুযোগটুকু ছিল না। সে পরিস্থিতিকে শুধুমাত্র বস্তুগত ভাবনায় চিন্তা করলে আমি এক কথায় 'সময় নষ্ট করছি'! আমার 'উচ্চাকাঙ্ক্ষা' অর্জনের পথে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছি!
কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল ভিন্ন। আমার মেয়ে আর সুস্থ হয়ে ওঠেনি তাই আমিও পরিকল্পিতভাবে সিরিজটির ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে সক্ষম হইনি। আল্লাহর ইচ্ছায় সে মৃত্যুবরণ করল, এমন এক সুন্দর মৃত্যু, যা ছিল শিক্ষা, উপদেশ ও দৃষ্টান্তে ভরপুর; আমার সে সিরিজটি থেকেও বেশি প্রভাবসমৃদ্ধ। একটু ভাবুন তো? যদি এমন হয় মানুষের ঈমান মজবুত করার কাজে আমি ব্যস্ত। পূর্ব-পশ্চিমের সকলে আমার কথায় হিদায়াতের দিশা পাচ্ছে, আর এদিকে আমার মেয়ে কিনা ঈমান হারিয়ে মৃত্যুবরণ করছে! কী ভয়ংকর অবস্থা! আল্লাহ রক্ষা করুন。
প্রিয় ভাইয়েরা, খোলাসা কথা হলো, সময়ের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বপালনে নিজেকে ব্যস্ত রাখাই হলো সর্বোত্তম কল্যাণের কাজ। আনুগত্যের সুরে আল্লাহর সব সিদ্ধান্তকে মেনে নেওয়ার মধ্যেই রয়েছে সমস্ত কল্যাণ। বাহ্যিকভাবে সময় নষ্ট মনে হলেও সেই কাজের মধ্যেই আল্লাহ বারাকাহ ঢেলে দেন। আমার মেয়ে শারীরিক ও মানসিক উভয় প্রকার সমর্থনের সার্বক্ষণিক মুখাপেক্ষী ছিল বিধায় আমার পুরোটা সময় তার জন্য নির্ধারিত ছিল। আমি ছাড়া অন্য কেউ এই দায়িত্ব পুরোপুরিভাবে পালন করতে পারত না। কিন্তু অপরদিকে আবার এমন এক শ্রেণির বাবাও আছেন যারা কোনো প্রয়োজন ছাড়াই অসুস্থ সন্তানের পাশে হতাশ হয়ে বসে। থাকেন, হাহুতাশ করেন। নাহ! এমন হওয়াও উচিত নয়। অতিরিক্ত সময়টি দাওয়াহ বা আপনার ব্যক্তিগত অন্যান্য কাজে ব্যয় করুন। মোটকথা, এই বিষয়ে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা জরুরি。
প্রিয় ভাই, আরেকটি জরুরি বিষয় হলো, কোনো কাজ ভালো হলেও নিজের পছন্দের ওপর আল্লাহর পছন্দনীয় কাজকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। অনেক সময় আমরা এমন কিছু নির্দিষ্ট ভালো কাজে জড়িয়ে পড়ি, যেখানে আমরা নিজেরাই উপলব্ধি করি যে, এই সময়ে আমার ভিন্ন আরেকটি ভালো কাজে জড়িত থাকা উচিত ছিল। দুটি উদাহারণ দিই :
১. এক সাহাবি এসে নবি -এর কাছে জিহাদের অনুমতি প্রার্থনা করল। তিনি তাকে বললেন, أَحَيُّ وَالِدَاكَ؟ “তোমার মাতাপিতা কি জীবিত আছেন?” সে বলল, 'হ্যাঁ। তারা জীবিত আছেন।' তখন তিনি তাকে বললেন, فَفِيْهِمَا فَجَاهِدْ “তাহলে তাদের খেদমতেই খুব আন্তরিকতার সাথে নিজেকে নিয়োজিত রাখো।”[৫১]
২. ওয়াইস কারানি আল্লাহর রাসূল -এর সাহাবি হওয়ার মর্যাদাকে বিসর্জন দিয়েছিলেন, শুধুমাত্র মায়ের খেদমতের দিকে তাকিয়ে। তার এই ভালো কাজটি এমন ছিল যে, রাসূল বলেছিলেন, “ওয়াইস হলো সর্বোত্তম তাবিয়ি। তোমরা যখন তাকে দেখবে, তার কাছে এই আবেদন করবে, সে যেন তোমাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করে।”[৫২]
দেখুন! আল্লাহর নিকট সাহাবিদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করবেন একজন তাবিয়ি? কেমন মর্যাদা!
উদাহরণগুলো থেকে আমরা কী শিক্ষা পাই? দুটিই তো ভালো কাজ, কিন্ত প্রাধান্য দেবো কোনটিকে? প্রাধান্য দেবো সেটিকেই, যেটি সে সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। যে কাজে আমার প্রয়োজনীয়তা অন্যদের চেয়ে বেশি, যে কাজ করলে আল্লাহর প্রতি অধিক আত্মসমর্পণ প্রকাশ পায়。
টিকাঃ
[৫১] বুখারি, ৩০০৪, ৫৯৭২; মুসলিম, ২৫৪৯。
[৫২] বিস্তারিত দেখুন-মুসলিম, ২৫৪২。