📄 সবসময় স্বামী আর সন্তানের মাঝে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখার মানসিকতা আমার নেই!
আপনি যা বললেন তা আমার বোধবুদ্ধি মেনে নিলেও, মন এতে সায় দিচ্ছে না। সবসময় স্বামী আর সন্তানের মাঝে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখার মানসিকতা আমার নেই। অফিসের কাজ বা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেই মন পড়ে থাকে। যেকোনো কাজ হলেই হলো, এমনকি দাওয়াতের কাজও হতে পারে। এগুলোও কি মহান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না?
*প্রিয় বোন, আমাদের দ্বীন আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, একজন মুসলিম শুধু উপভোগ্য বলেই একটি কাজ করতে পারে না। বরং সে একমাত্র এমন কাজই করে যা করা তার ওপর কর্তব্য。
প্রবৃত্তি আপনাকে বলবে, আল্লাহর পছন্দের ওপর নিজের পছন্দকে প্রাধান্য দাও। আর আল্লাহ আপনাকে বলছেন:
وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى * فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى *
“যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সামনে দাঁড়ানোর ভয় করে এবং নিজ খেয়ালখুশি থেকে নিজেকে নিবৃত রাখে, জান্নাতই হবে তার আবাস।”[১৯]
আপনার প্রতি আল্লাহর নির্দেশ হলো, সন্তানকে সঠিক তত্ত্বাবধানে গড়ে তোলা এবং এই ব্যাপারে নিজ খেয়ালখুশিকে দমন করা। যদি এই তত্ত্বাবধান ও তারবিয়াতে আপনি কোনো 'আগ্রহ' খুঁজে না পান তা হলে জেনে রাখুন, যে আল্লাহ আপনাকে এই আদেশ দিয়েছেন, তিনিই আবার বার্ধক্যের সময় সন্তানকে আপনার সেবা করার নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি সন্তান যদি আপনার সেবা-যত্নের ক্ষেত্রে বা প্রয়োজনের সময় আপনার ডাকে সাড়া দিতে 'আগ্রহবোধ' না করে কিংবা তার নিকট যদি এসব 'বিরক্তিকর'ও ঠেকে তবুও এটি তার দায়িত্ব বলে নির্ধারণ করেছেন。
জিহাদের তাড়নায় উদ্দীপ্ত হয়ে মুআবিয়া সুলামি যখন রাসূল -এর নিকট এসেছিলেন তখন নবিজি তাকে বলেছিলেন, "এখন মায়ের পা আঁকড়ে ধরো। সেখানেই রয়েছে তোমার জান্নাত।”২০।
হাদিসে জুরাইজ নামক এক বুযুর্গের কাহিনি এসেছে, যিনি মায়ের ডাক শুনতে পেয়েও সালাতে মগ্ন ছিলেন। আর এই কারণে আল্লাহ তাকে পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছিলেন।”২১
ওয়াইস কারানি রা. -এর ঘটনা তো সুপ্রসিদ্ধ। যিনি শুধুমাত্র মায়ের সেবা-যত্নে ব্যস্ত থাকার কারণে নবিজির সান্নিধ্যে সৌভাগ্য অর্জন করতে সক্ষম হননি。
জিহাদ, নফল সালাত ও নবিজির সান্নিধ্যের মতো সর্বত্তম আমলগুলোর ওপর আল্লাহ তাআলা মায়ের সেবাকে অগ্রগণ্য করে দিয়েছেন。
যে আল্লাহ আপনাকে সন্তান প্রতিপালনের নির্দেশ দিয়েছেন, এই ক্ষেত্রে তার দাসত্ব বাস্তবায়নের আদেশ করেছেন, সেই তিনিই আবার সন্তানদের ওপর বার্ধক্যের সময়ে আপনার শ্রদ্ধা করার নির্দেশ দিয়েছেন। আপনার প্রতি দয়া ও নম্র আচরণ করা তাদের জন্য বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ
“দয়া ও কোমলতা সহকারে তাদের সামনে বিনম্র থাকো।”২২
করোনার এই বিপর্যস্ত সময়ে ইউরোপের বৃদ্ধ মা-বাবারা যে অবহেলার শিকার হয়েছেন আমরা তা থেকে শিক্ষণীয় অর্জন করতে পারি। তাদের এই অবস্থা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে অনেক কিছুই দেখিয়ে দেয়。
প্রিয় বোন, বিশ্বাস করুন, নিজের পছন্দকে তুচ্ছ করে যখন আপনি আল্লাহর পছন্দকে মেনে নেবেন, যখন একটি মহান উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে আপনি সন্তানগঠনে মনোনিবেশ করবেন তখন আজকের বোঝা কালকে আগ্রহে পরিণত হবে। একসময় বিরক্তিকর এই বিষয়টিই আপনার হৃদয়ঙ্গম প্রশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে。
*****
বোন, এখন তো জানলেন তারবিয়াত কী? তারবিয়াতের এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় আপনাকে পদে পদে সবর ও ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হবে। তারবিয়াত হলো, সন্তানকে জাহান্নামের ইন্ধন হওয়া থেকে রক্ষা করে তাকে প্রভুর স্থায়ী সান্নিধ্যের পথ দেখানো, তাকে এই সৌভাগ্যের উপযুক্ত করে গড়ে তোলা। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوْا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ
“হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।” [২৩]
আপনার সন্তানসন্ততি হতে পারে আপনার জাহান্নাম থেকে মুক্তির উপায় :
مَنْ يَلِي مِنْ هُذِهِ الْبَنَاتِ شَيْئًا فَأَحْسَنَ إِلَيْهِنَّ كُنَّ لَهُ سِتْرًا مِّنَ النَّارِ
“যে ব্যক্তি কন্যাদের ব্যাপারে সমস্যার সম্মুখীন হয়েও তাদের সাথে উত্তম আচরণ করবে, তার কন্যারা তার জন্য জাহান্নামের অন্তরাল হয়ে দাঁড়াবে।” [২৪]
আপনার মৃত্যুর পর আপনার এই সন্তানেরাই আপনার উপকারে আসবে :
إِنَّ الرَّجُلَ لَتُرْفَعُ دَرَجَتُهُ فِي الْجَنَّةِ فَيَقُوْلُ أَنَّى هُذَا فَيُقَالُ بِاسْتِغْفَارِ وَلَدِكَ لَكَ
"জান্নাতে কোনো ব্যক্তির মর্যাদা বাড়িয়ে দেওয়া হবে। এ অবস্থা দেখে সে বলবে, 'আমার এমনটা কীভাবে হলো?' তখন বলা হবে, 'তোমার জন্য তোমার সন্তানসন্ততি ক্ষমা প্রার্থনা করার কারণে। [২৫]
সর্বোপরি দুনিয়ায় তারা আপনার চক্ষু শীতলতার কারণ হবে, যদি আপনি তাদের যথাযথভাবে গড়ে তোলেন。
তারবিয়াতের এই পথ বড়োই বন্ধুর; তবে এর ফলাফল পাহাড়সম। এই দুর্গম পথে আপনি হয়তো কখনো হোঁচট খাবেন, কখনো-বা হাঁপিয়ে উঠবেন; কিন্ত-
وَالَّذِيْنَ جَاهَدُوا فِيْنَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ *
“যারা আমার পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করি। নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সঙ্গে রয়েছেন।”[২৬]
আল্লাহ আপনার সঙ্গে থাকবেন। আপনাকে সহযোগিতা করবেন, আপনার অপূর্ণতাকে পূর্ণতা দিয়ে ঢেকে দেবেন, আপনার সব চাওয়া পূরণ করবেন。
فَسَدِّدُوا وَقَارِبُوا وَأَبْشِرُوا
“অতএব মধ্যমপন্থা অবলম্বন করো, নৈকট্যলাভের চেষ্টা চালিয়ে যাও আর সুসংবাদ গ্রহণ করো।”[২৭]
প্রিয় বোন, আল্লাহ তাআলা এক মহান মর্যাদা আপনার জন্য নির্ধারণ করে রেখেছেন। এমনকি লক্ষ করুন, এক ব্যক্তি এসে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে প্রশ্ন করেছিলেন, 'আমার কাছ থেকে উত্তম ব্যবহার পাওয়ার সর্বাধিক উপযুক্ত ব্যক্তি কে? 'আমাদের নবি জবাব দিয়েছিলেন,
'তোমার মা।'
'তারপর কে?'
'তোমার মা।'
'তারপর কে?'
'তোমার মা।'
'তারপর কে?'
'তোমার বাবা।' [২৮]
وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُلْ لَّهُمَا أُفٍ وَّلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُلْ رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
“আর আপনার রব আপনাকে আদেশ দিয়েছেন তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদাত না করতে এবং পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে। তাদের কেউ একজন বা উভয়ই আপনার জীবদ্দশায় যদি বার্ধক্যে উপনীত হয় তা হলে তাদেরকে 'উফ' বলবেন না এবং ধমক দেবেন না; আর তাদের সাথে সম্মানসূচক কথা বলুন। দয়া ও কোমলতা সহকারে তাদের সামনে বিনম্র থাকুন আর বলুন, 'হে আমার রব, তাঁদের প্রতি দয়া করুন যেভাবে শৈশবে তাঁরা আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন।” [২৯]
*****
সন্তানকে ইসলামের ওপর গড়ে তোলার সহজ পদ্ধতি হলো তাকে মর্যাদা ও ইজ্জতের ওপর গড়ে তোলা। এই মর্যাদা ও ইজ্জত তাকে শত্রুর ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্যে প্রভাবিত হওয়া থেকে মানসিকভাবে রক্ষা করবে। এই মর্যাদা তাকে আল্লাহর কিতাব ও নবিজির জীবনী শুনে গর্বিত হতে বাধ্য করবে। এই ইজ্জতের কারণেই সে শত্রুর অন্ধ অনুকরণ ও তাদের পরিকল্পনায় অংশগ্রহণ করা থেকে সচেতনভাবে বেঁচে থাকবে, তাদের সাম্রাজ্যবাদী চিন্তাচেতনার বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়াতে শক্তি জোগাবে। সর্বোপরি তার ভেতর তৈরি হওয়া আত্মসম্মানবোধ তার অন্তরে এক অঙ্গার সৃষ্টি করবে, যা তাকে উম্মাহ নিয়ে ভাবতে শেখাবে。
وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُوْلِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُوْنَ
“সম্মান তো কেবল আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনদেরই। কিন্তু মুনাফিকেরা তা জানে না।” [৩০]
টিকাঃ
[১৯] সূরা নাজিআত, ৭৯: ৪০-৪১。
[২০] বিস্তারিত দেখুন—ইবনু মাজাহ, ২৭৬১
[২১] বিস্তারিত দেখুন—বুখারি, ১২০৬; মুসলিম, ২৫৫০
[২২] সূরা বনি ইসরাইল, ১৭:২৪১
[২৩] সূরা তাহরীম, ৬৬ : ৬。
[২৪] বুখারি, ৫৯৯৫。
[২৫] ইবনু মাজাহ, ৩/২১৪。
[২৬] সূরা আনকাবূত, ২৯: ৬৯。
[২৭] বুখারি, ৩৯; ইবনু হিব্বান, ৩৫১。
[২৮] মুসলিম, ২৫৪৮。
[২৯] সূরা বানী ইসরাঈল, ১৭: ২৩-২৪。
[৩০] সূরা মুনাফিকূন, ৬৩: ৮。