📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 তারবিয়াতের এই বিষয়টি কি আরেকটু সহজ হতে পারত না?

📄 তারবিয়াতের এই বিষয়টি কি আরেকটু সহজ হতে পারত না?


* কিন্তু তারবিয়াতের এই বিষয়টি কি আরেকটু সহজ ও সরল হতে পারত না? প্রত্যেক শিশুই তো ফিতরাত ও স্বভাবজাত প্রকৃতির ওপর জন্মগ্রহণ করে।[১৩] ইসলামের প্রথম দিকের প্রজন্ম কি এতসব 'কাঠিন্যের' ওপর বেড়ে উঠেছিলেন?
* প্রিয় বোন, মুসলিম বিশ্ব থেকে সামরিক ঔপনিবেশ যখন বিদায় নিচ্ছিল তখন সবচেয়ে ভয়ংকর যে বিষয়টি ঘটেছিল তা হলো, মুসলিমরা এই ধারণা করে বসলেন যে, তারা এখন মুক্ত ও স্বাধীন। তাদের এই ধারণার অবশ্য একটি কারণ ছিল। রাস্তায় রাস্তায় আর ভিনদেশী সৈনিকদের মহড়া দেখতে না পেয়েই মূলত তাদের এই চিন্তার উদয় ঘটেছিল। তারা যে চিন্তা ও মূল্যবোধগত ঔপনিবেশের শিকার, সে বিষয়টি তখন আর উপলব্ধি করতে পারেননি। যেহেতু তারা নিজেদের বন্দিই ভাবেননি, তাই স্বাভাবিকভাবে স্বাধীন হওয়ার আর চেষ্টাও চালাননি।
কবি সুন্দর বলেছেন :
وَأَقُولُ كُلُّ بِلَادِنَا مُحْتَلَةٌ ... لَا فَرَقَ إِنْ رَحِلَ الْعِدَا أَوْ رَانُوْا مَاذَا نُفِيْدُ إِذَا اسْتَقَلَّتْ أَرْضُنَا *** وَاحْتُلَتِ الْأَرْوَاحُ وَالْأَبْدَانُ سَتَعُوْدُ أَوْطَانِي إِلَى أَوْطَانِهَا *** إِنْ عَادَ إِنْسَانًا بِهَا الْإِنْسَانُ

শত্রু অবস্থান করুক কিংবা প্রস্থান, আমাদের ভূমি আজও বিরান।
যখন বন্দি আমাদের অন্তরাত্মা, কী কাজে আসবে দেশের স্বাধীনতা?
প্রকৃত স্বাধীনতা তো সেদিন হবে
যেদিন মানুষ মানুষ হয়ে উঠবে।

ইসলামের প্রথম দিকের প্রজন্ম ছিল স্বভাবজাত প্রকৃতি ও মানসিক ভারসাম্যের ওপর লালিত একটি প্রজন্ম। ব্যাপকভাবে আল্লাহর দাসত্ব বাস্তবায়ন করেই তারা জীবনযাপন করতেন। যেহেতু এটিই ছিল তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য, তাই এটি তাদের কর্মকাণ্ডেও যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছিল। তাদের সমস্ত কাজ নির্ভেজাল স্বভাব থেকে উৎসারিত হতো। এতে বিন্দু পরিমাণ কৃত্রিমতাও জড়িয়ে থাকত না।

তাদের অন্তর ছিল, ওহির শক্তিতে বলীয়ান। সীমাহীন আস্থায় পরিপূর্ণ। তারা জাহিলিয়াতের প্রতি ঘৃণা রাখতেন, সে পথে চালনাকারী সমস্ত উপায় ও মাধ্যমকে তারা মিটিয়ে দিতেন। আল্লাহ প্রদত্ত মানদণ্ডকে সামনে রেখে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া যেকোনো ধরনের মতবাদের ওপর তারা দ্বিতীয়বার চোখ বুলাতেন। পূর্বেকার জাহিলিয়াত তাদেরকে কিছু সময়ের জন্য আচ্ছন্ন করলে, তারা সাথে সাথেই এর স্বরূপ টের পেয়ে যেতেন। নব্য জাহিলিয়াত[১৪] থেকে মুক্তি পাওয়ার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাতেন। তারা গুনাহে পতিত হতেন, কিন্তু গুনাহকে গুনাহ বলেই জানতেন।

কিন্তু আজকের শিশুকে দেখুন। তারা ফিতরাত ও স্বভাবজাত প্রকৃতির ওপর জন্মগ্রহণ করে ঠিকই কিন্তু দখলদার ঔপনিবেশিক শক্তি তাদেরকে চিন্তাচেতনা ও মূল্যবোধগতভাবে হয় পশ্চিমা চিন্তাধারায় প্রভাবিত করে, না হয় পূর্বেকার চিন্তাধারায়। ধেয়ে আসা বিভিন্ন ফিতনা ও সংশয়ের প্লাবনে তাকে নিমজ্জিত রাখে। হকের সাথে বাতিলকে মিশিয়ে তার সামনে উপস্থাপন করে। অথচ এতসব কিছুর প্রতিরোধে 'আল্লাহর দাসত্ব' নামক যে চুম্বকের প্রয়োজন ছিল, তার কোনো দেখা নেই। তাই সন্তানদের গড়ে তোলার প্রক্রিয়া আজকের সময়টাতে এতটা কঠিন মনে হচ্ছে।

বিশৃঙ্খল আত্মাকে শৃঙ্খলায় আনতে পারে আল্লাহর দাসত্বের চুম্বক। যেহেতু এখন এটি অনুপস্থিত, তাই এই আত্মা জাহান্নামীদের হাতের খেলনায় পরিণত হয়েছে। কুরআন একসময় সকলে বুঝতে সক্ষম হতো। খুব সহজে মানবহৃদয়ে এটি গভীর প্রভাব বিস্তার করত। কিন্তু এখন খোদ অধিকাংশ আরবদেরর নিকটেই এই কুরআন দুর্বোধ্য।

প্রিয় বোন, এখন সময় আপনার। সন্তানের স্বভাবজাত প্রকৃতির ওপর আবর্জনার যে স্তর তৈরি হয়েছে সেটিকে এক ঝটকায় ঝেড়ে ফেলুন। তাদের সামনে এমন লক্ষ্য স্থাপন করুন, যা তাদের বিশৃঙ্খল হৃদয়কে সুশৃঙ্খল করবে, ওহির বাণীকে তাদের নিকট সহজবোধ্য করে তুলবে।

টিকাঃ
[১৩] ফিতরাত বা স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য হলো, সে সমস্ত অভ্যাস ও স্বভাব যার ওপর আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, শিশুরা মিথ্যা বলতে জানে না। কারণ আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন সত্য বলার ওপর। কিন্তু পরবর্তীতে পরিবেশ থেকে সে মিথ্যা বলা শিখে। ঠিক এভাবে, ভালো কাজকে পছন্দ করা, উপকারকারীর প্রতি কৃতজ্ঞতা, নোংরা জিনিসের প্রতি ঘৃণা ইত্যাদি। এই ফিতরাতের ক্ষেত্রে আস্তিক-নাস্তিক, কাফির-মুসলিম সকলে সমান। যেমন, আমানতদারিতাকে সবাই পছন্দ করে, পরনিন্দাকে সবাই ঘৃণা করে। ইসলাম হলো ফিতরাতের ধর্ম। যেহেতু ইসলামের প্রত্যেকটি বিধান ফিতরাত ও স্বভাবজাত প্রকৃতি থেকে উৎসারিত তাই এটি মানুষকে টানে। কিন্তু মানুষের ফিতরাতই যদি পালটে যায় তা হলে ভাবুন কেমন পরিস্থিতি হবে। তখন বিকৃত ফিতরাতের মানুষটিকে ইসলামের স্বচ্ছ ও নির্মল আবেদন আর আকর্ষণ করবে না। এই বইয়ের 'পচন যখন মূলে' শিরোনামের লেখাটিতে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে, ইন শা আল্লাহ।
[১৪] জাহিলিয়াত কোনো নির্দিষ্ট সময়ের নাম নয়। নবিজি-এর আগমন-পূর্ব-পৃথিবীই শুধু এর জন্য সীমাবদ্ধ নয়। বরং যারাই ওহির আদেশকে প্রত্যাখ্যান করবে, আল্লাহর আইনকে ছুঁড়ে ফেলে মানবরচিত সংবিধান অনুযায়ী চলবে তারা প্রত্যেকেই জাহিলিয়াতের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে। তাই উচিত জাহিলিয়াতকে প্রত্যাখ্যান করে নতুনভাবে আল্লাহর কিতাব ও তার রাসূল-এর সুন্নাহয় ফিরে আসা।

📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 এখন সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়েই আমার শংকা হচ্ছে!

📄 এখন সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়েই আমার শংকা হচ্ছে!


* এই কথাগুলো শুনে আমার তো এখন সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়েই শংকা হচ্ছে। বলতে গেলে, সন্তান নিতেই আর সাহস পাচ্ছি না।
* আমি আপনাকে বলবঃ আল্লাহ এই উম্মাহকে শেষমেশ বিজয় দেবেন বলেই প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছেন। রোম (ভ্যাটিকান) বিজয়ের আগাম সুসংবাদ, [১৫] প্রত্যেক ঘরে ঘরে ইসলাম প্রবেশের ভবিষ্যদ্বাণী আল্লাহ এই উম্মাহর সন্তানদের হাতেই বাস্তবায়ন করবেন। মুসলিমরা নিষ্কর্ম হয়ে বসে থাকবে আর ভিন্ন গ্রহের কেউ এসে এই দ্বীনকে সাহায্য করে যাবে এমনটা তো আর সম্ভব নয়। রাসূল -এর দেওয়া আগাম সুসংবাদগুলোর মূল উদ্দেশ্যই ছিল, আমাদের হৃদয়ে প্রশান্তির পরש বুলিয়ে দেওয়া। যেন জীবন চলার পথে আমরা সংগ্রাম চালিয়ে যাই। যেন সন্তানদের সঠিক তারবিয়াতের ওপর গড়ে তুলে তাদের হাতে যুদ্ধের পতাকা উঠিয়ে দিতে পারি। তারাই একসময় বিজয়ের এই পরিক্রমা সম্পন্ন করবে, ইন শা আল্লাহ।

وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ

“আর শেষ পরিণতি খোদাভীরুদেরই।”[১৬]

টিকাঃ
[১৫] হাকিম, আল-মুসতাদরাক, ৮৬৬২।
[১৬] সূরা আ'রাফ, ৭: ১২৮।

📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 সন্তানদের গড়ে তুলতে গিয়ে সবচেয়ে ভয়ংকর যে ব্যাপারটি ঘটে

📄 সন্তানদের গড়ে তুলতে গিয়ে সবচেয়ে ভয়ংকর যে ব্যাপারটি ঘটে


প্রিয় বোন, সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভয়ংকর যে ব্যাপারটি ঘটে তা হলো : তাদেরকে গড়ে তুলতে গিয়ে পিতামাতা একটি মহান উদ্দেশ্যকে সামনে রাখতে ভুলে যান। উদ্দেশ্যটি হলো, আল্লাহর দাসত্ব। সন্তান পিতামাতার অবাধ্য হওয়ার মূল কারণও মূলত এটি।
ভালোবেসে তরুণ-তরুণী বিয়ে করল। একসময় তারা সন্তান গ্রহণ করল। কারণ কী? কারণ, মানুষ করে তাই, এরচেয়ে বেশি কিছু নয়। কিংবা পিতৃত্ব ও মাতৃত্বের চাহিদা পূরণ করতে। অনেকে আবার ঘরে ছোটো শিশুদের কোলাহল শোনার উদ্দেশ্যে। তারপর কী? কিছুই না।
পুরুষ নিজ কামনা চরিতার্থ করল, পারিবারিক দায়িত্ব আদায় না করে নিজ চাহিদা পূরণে ব্যস্ত রইল। আর নারী সন্তানদের ছেড়ে নিজেকে প্রমাণ করতে এবং সাফল্যের গল্প লেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল。
এই ধরনের পিতামাতার সাথে কোনো একসময় সন্তানদের অবশ্যই কলহ সৃষ্টি হবে। পিতা নিজের চাহিদা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের পথে সন্তানদের কাঁটা হিসেবে দেখবেন। কেননা এই সন্তানেরা তার চাহিদার অংশ নয়। যখন সন্তান তার কিছুটা সময় নিয়ে নেবে, সে অস্থির হয়ে বিরক্তি প্রকাশ করবে। কারণ সে তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছে। আর এই অস্থিরতা ও আফসোস সন্তান প্রতিপালনে তার ব্যর্থতাকে দ্বিগুণ করবে।
একসময় বাবা-মায়ের তারবিয়াত ছাড়া বেড়ে-ওঠা-অবাধ্য এই সন্তানেরা বিভিন্ন অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়বে। আবার সন্তানদের সাথে বাবা-মায়ের সম্পর্কেও টানাপোড়েন সৃষ্টি হবে। এমনকি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার দাম্পত্য কলহ তৈরি হবে এই সন্তানদের কারণেই। একে অপরকে তারা এই করুণ পরিস্থিতির জন্য দোষারোপ করবে। 'সন্তানের বোঝা' একে অপরের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইবে! আর এসব ঘটবে সন্তানদের চোখের সামনেই। তাদের ভেতর দাগ কাটবে, তারা মনে রাখবে বাবা-মা কীভাবে তাদের কাছে টেনে না নিয়ে ভারী বোঝার মতো আচরণ করেছিল।

ভয়ংকর ঘুষ!
এই সময় অনেক মা-বাবাই আবার সন্তানদের সবচেয়ে ভয়ংকর ঘুষটা প্রদান করেন। তারা সন্তানদের জন্য ক্ষতিকর হবে জেনেও তাদের যত আবদার আছে সব একে একে পূরণ করতে থাকেন। যেন তারা এটি বলতে চান যে, 'ছেলে আমার, আমি এখন খুব ব্যস্ত। আমার বেশি সময় নষ্ট করো না। কী চাই তোমার? খাবার? নাও। ক্ষতিকর হবে জেনেও—চকলেট লাগবে? নাও। তাদের জন্য ধ্বংসাত্মক হবে জেনেও—অতিরিক্ত হাত খরচ লাগবে? নাও। মোবাইল? আইপ্যাড? প্লে স্টেশন? কী লাগবে, নাও। যা মনে চায় নাও আর কেটে পড়ো। বিরক্ত করো না।'
শূন্যতা আর মূর্খতায় হাহাকার করতে থাকা সন্তানের হৃদয়কে তারা এগুলোর মাধ্যমে অবশ করে রাখেন। লাভ-ক্ষতির তোয়াক্কা না করে এভাবে সব ধরনের চাহিদা পূরণ করে যাওয়াকে এককথায় অবশ করার ইনজেকশন বলা যায়।
একবোন কমেন্টে কিছু কথা লিখেছিলেন :
'আমার স্বামী ভালো। দায়িত্ববান। তবে সে সন্তানদের সব ধরনের চাহিদাপূরণ করা আর তাদের সাথে খেলাধুলা করা ছাড়া সন্তান প্রতিপালনের কোনো ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে না। তার কথা অনুযায়ী, অন্য সন্তানদের তুলনায় এদের মধ্যে কোনোরকম কমতি বা ঘাটতি সে দেখতে পাচ্ছে না।
আমিই একমাত্র তাদের সামনে লক্ষ্য স্থাপন করি, সালাতে উদ্বুদ্ধ করি, মৌলিক জ্ঞানার্জনে তাগিদ দিই, অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকতে বলি। কিন্তু এর কারণে তাদের সামনে আমি এখন মূর্তিমান আতঙ্কে পরিণত হয়েছি। এর একমাত্র কারণ হলো, স্বামীর যাচ্ছেতাই কোমলতা ও লাই দিয়ে যাওয়া। তবুও আমি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমি কি একাই এভাবে সংগ্রাম করে যাব? আর কয়দিন? অথচ তারা দিনদিন খেলাধুলায় মেতে উঠছে, আর আমার দেওয়া চাপকে বোঝা মনে করে আমার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।'
আমি বলি, 'হ্যাঁ, প্রিয় বোন, বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে চেষ্টা চালিয়ে যান। এর পাশাপাশি তাদের প্রতি গুরুত্ব প্রদর্শন করুন, ভালোবাসা দেখান। আল্লাহর নিকট আপনার এই কষ্টের বিরাট প্রতিদান পাবেন, ইন শা আল্লাহ।'

মাত্রাতিরিক্ত যত্ন ও বিরক্তিকর মমতা!
খেয়াল না রাখা আর অবহেলার বিপরীতে আরেকটি ক্ষতিকর বিষয় হলো, মাত্রাতিরিক্ত যত্ন বা গুরুত্ব।
কীভাবে সন্তানের যত্ন নিতে হয় সে ব্যাপারটি স্পষ্ট না করেই আমরা যখন নারীকে বলি : 'সন্তানের যত্ন নাও', তখন সাধারণভাবে নারী এই ধারণা করে বসেন যে, যত্ন নেওয়ার অর্থ হলো, সন্তানের জন্য নিজেকে ধ্বংস করে দেওয়া, নিজের গোশত-হাড্ডি সব একাকার করে ফেলা, মনপ্রাণ দিয়ে শুধু তাদের সাথেই লেগে থাকা। তারা ভাবেন, যথাযথ যত্ন বুঝি একেই বলে!
অনেক নারীই আবার ভাবেন, সন্তানকে ঘরের কাজ থেকে মুক্ত রেখে শুধু পড়াশোনায় ব্যস্ত রাখা, তাদের কাছ থেকে প্রাত্যহিক পড়া আদায় করা, হোমওয়ার্ক করতে বকাবকি করা, দায়িত্ব থেকে তাদের মুক্ত রাখা ইত্যাদি। তাদের এই যত্নের ফলাফল হলো সন্তানের স্বনির্ভরতার যোগ্যতা নিঃশেষ করে দেওয়া। তারা ধারণা করে এগুলোর মাধ্যমে সন্তানদের প্রতি নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য পরিপূর্ণভাবে আদায় হয়ে যাচ্ছে! অথচ বাস্তবে তিনি সন্তানদের থেকে দায়িত্ব, সচেতনতা একেবারেই ধ্বংস করে দিচ্ছেন। নিজেকে তো কষ্ট দিচ্ছেন সেইসাথে সন্তানদেরও কষ্টে ফেলছেন, অথচ তাদের ধারণা তারা যথাযথ গুরুত্ব দিয়েই তাদের সন্তানদের বড়ো করে তুলছেন!
যখন আমাদের উদ্দেশ্য আল্লাহর দাসত্ব করা, তখন সন্তানের এই যত্ন নেওয়া ও গুরুত্ব দেওয়াও হতে হবে আল্লাহর দেখিয়ে দেওয়া পন্থায়, শারীআত সমর্থিত তরীকায়। আর না হয় এই যত্ন আপনার জন্য তো বটেই, সন্তানের জন্যও যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
আপনি হয়তো বলতে পারেন: আমি চাই, আমার সন্তান জীবনে সফল হোক।... সফলতা দ্বারা আপনার কী উদ্দেশ্য? আর এর মাপকাঠিই-বা কী?
যদি আপনি সন্তানদের পড়াশোনায় সহযোগিতা করতে চান তা হলে আপনার উচিত, শিক্ষাকে তাদের সামনে প্রিয় করে তোলা। তাদের শিখিয়ে দিন কীভাবে তারা নিজেদের দৈনন্দিন রুটিন সাজাবে, কীভাবে চিন্তা করবে।
তাদের আপনি গতানুগতিকভাবে পড়ালেন। তারপর হোমওয়ার্ক করতে গিয়ে যখন তারা বিভিন্ন ত্রুটির শিকার হলো তখন চিৎকার চেঁচামেচিতে সারা ঘর মাথায় তুললেন, সমস্ত দোষ তাদের ওপর চাপিয়ে দিলেন। এতে শুধু তাদের সাথে আপনার সম্পর্কই খারাপ হবে। ঘরের প্রশান্তভাব নষ্ট হবে, পুরো বাড়ি দুশ্চিন্তা ও চেঁচামেচিতে ভরে উঠবে। আর এটা তেমন কোনো ফলও বয়ে আনবে না।
সন্তান প্রতিপালন কিংবা তারবিয়াতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পয়েন্ট হলো, মা তার 'বিরক্তিকর ও ক্ষতিকর' দয়া-মমতা থেকে বিরত থাকবেন। যেকোনো বিষয়ে অনাধিকার চর্চা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবেন। আপনাকে হতে হবে অনেক বেশি বুদ্ধিদীপ্ত, প্রশান্ত ও আত্মসচেতন।
এমন মায়ে পরিণত হবেন না, যিনি সন্তানদের যত্নের ব্যাপারে ভাবতে ভাবতে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার আগুনে নিজেকে নিঃশেষ করে দেন। সন্তানদের কথা ভেবে নিজের সবকিছুকে উজাড় করে দেন। মানসিকভাবে এতটা ভেঙে পড়েন যে, সামান্যতেই স্বামী ও সন্তানদের সামনে ক্রোধে ফেটে পড়েন। এমন অনেক নারী আছেন, যারা সন্তান সামান্য বড়ো হওয়ার পর আর 'স্ত্রী' থাকেন না, শুধুই মায়ে পরিণত হন। স্বামীর সাথে তার টানাপোড়েন তৈরি হয়। যে সন্তানদের জন্য তিনি নিজেকে একপ্রকার নিঃশেষ করে দিয়েছিলেন সে সন্তানেরাই তখন তাকে ব্যর্থ মা বলে গণ্য করা শুরু করে। যিনি নিজের সাথে তো বটেই, স্বামী ও সন্তানদের সাথেও সঠিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে ব্যর্থ, যিনি সবসময় বাড়তি কেয়ার করেন, সারাক্ষণ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ডুবে থাকেন।
তার এই অবস্থা সন্তানদের কাছে পরিবার ও জীবনের প্রতি এক হতাশার বার্তা প্রেরণ করে। তারা বৈধ বিয়ে থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এমনকি ইসলাম থেকেও, কারণ তা বিয়ের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে! তখন সন্তান অনৈতিক ও অবৈধ সম্পর্কের মাঝে ভালোবাসা ও প্রেম খুজতে শুরু করে। কারণ তারা চান না এই ব্যর্থ দাম্পত্যজীবনের অভিজ্ঞতা নিজের জীবনে প্রকাশ পাক!
'তুমি মোম হয়ে জ্বলো, সন্তানের পথ আলোকিত করো' এই শ্লোগানটি সম্পূর্ণ ভুল একটি শ্লোগান। আমাদের দ্বীন আমাদেরকে এর উল্টোটা শেখায়। তোমার ওপর তোমার নিজেরও অধিকার আছে। প্রত্যেককে আপন আপন হক ও প্রাপ্য অধিকার বুঝিয়ে দেওয়াই হলো ইসলামের শিক্ষা।
আপনিই যদি জ্বলে যান তা হলে সন্তানের পথ কীভাবে উজ্জ্বল করবেন? তখন তো আপনার জ্বলে-যাওয়া-ছাই তাদের জীবনকে অন্ধকার করে তুলবে। আপনার উচিত প্রশান্তি ও ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যমে তাদের জীবনকেও আলোকিত করা এবং সাথে সাথে নিজের প্রাপ্য অধিকার নিজেকে প্রদান করা। সুতরাং নিজের সাথে স্বাচ্ছন্দ্যময় হোন, যতটা সম্ভব উৎফুল্ল থাকুন। স্বামীর সাথেও সহজ হয়ে উঠুন, তার প্রাপ্য অধিকার তাকে দিন। দেখবেন আপনাতেই সন্তানের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, ইন শা আল্লাহ।
সমাজের কথা শুনে সন্তানের সফলতার পিছে দৌড়াবেন না। তাদের নিকট সফলতার অর্থই হলো, স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটির সার্টিফিকেট। লোকে কী বলবে সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করবেন না। সন্তানদের নিজের মতো করে গড়ে তুলুন, কল্যাণ দ্বারা তাদের পরিপূর্ণ করুন। নিজেকে তো বটেই, সন্তানদেরও তৈরি করুন এমনভাবে যেন তাদের জীবনে সবচেয়ে অগ্রগণ্য হয় 'আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা'। তাদের সামনে সুখ ও ভারসাম্যের উজ্জল দৃষ্টান্তে পরিণত হোন। আপনার এই প্রতিচ্ছবিই তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে প্রকৃত সফলতার পথ দেখাবে। তারা আপনাকে দেখে একটি সুখী ও ভারসাম্য পরিবার গঠনে উদ্বুদ্ধ হবে।

যদি আমি ব্যর্থ হই?
আচ্ছা আমি আল্লাহর দাসত্বকেই জীবনের মূল লক্ষ্যে পরিণত করলাম। শুরু থেকেই সন্তানদের আল্লাহর দাসত্ব ও আখিরাতের চিন্তার ওপর গড়ে তোলা আরম্ভ করলাম। কিংবা শুরু থেকে সতর্ক করতে না পারলেও তারা বড়ো হওয়ার পর বিষয়টির ওপর গুরুত্বারোপ করলাম। কিন্তু তারা আমার ডাকে সাড়া দেয় না। একপ্রকার ব্যর্থতার দায় থেকে তাদের চিন্তায় চিন্তায় আমি এখন প্রায় বিপর্যস্ত।
*শারীআহ আমাদের সন্তানদের দেখভাল করতে তো বলে ঠিকই; কিন্তু এমন যত্ন নেওয়া থেকেও বাধা দেয়, যা নিজের প্রতি যত্নকেও ছাড়িয়ে যাবে। হাহুতাশ করতে করতে নিজেকে নিঃশেষ করে দেওয়া থেকে শারীআত আমাদের নিষেধ করে। কারণ এতসব দুঃখ ও হাহুতাশ প্রথমে নিজেকেই গ্রাস করবে, তারপর তা সন্তানদের দিকে এগুবে। তখন তাদের রক্ষা করার যথাযথ শক্তি ও সামর্থ আপনি হারিয়ে ফেলবেন।
কুরআন আপনাকে উদ্দেশ্য করেই বলছে : إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَّشَاءُ
“আপনি যাকে ভালোবাসেন তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না। কিন্তু আল্লাহ যাকে চান তাকে সৎপথে আনেন।”[১৭]
আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, নূহ � নবি হওয়া সত্ত্বেও নিজ সন্তানকে রক্ষা করতে পারেননি। সে ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্ধারিত ফায়সালাই বাস্তবায়িত হয়েছিল। قَالَ يَا نُوْحُ إِنَّهُ لَيْسَ مِنْ أَهْلِكَ
“আল্লাহ বলেছিলেন, 'হে নূহ, নিশ্চয় সে তোমার পরিবারভুক্ত নয়।”[১৮]
এই কারণে সন্তানদের রক্ষা করার চিন্তায় চিন্তায় নিজেকে রক্ষা করার কথা ভুলতে বসবেন না। পুত্র বা কন্যা যদি উদাসীনতা ও গাফলতির জীবন বেছে নেয়, তা হলে হ্যাঁ, মা গভীরভাবে এই চিন্তা করতে পারেন যে, হঠাৎ কী হলো! কেন তাদের এই অবস্থা? তারপর তিনি যথাযথ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেন, যথাসম্ভব তাদের সংশোধনের চেষ্টা করবেন। কিন্তু হতাশ হওয়া! না সেটা হওয়া যাবে না। এই কাজে শয়তানের অনুপ্রবেশ থেকে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এর শুরুটা হয় আত্মসমালোচনা দিয়ে আর শেষটা হয় তীব্র মনঃকষ্ট ও যন্ত্রণার মাধ্যমে।

সবসময় স্বামী আর সন্তানের মাঝে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখার মানসিকতা আমার নেই!
আপনি যা বললেন তা আমার বোধবুদ্ধি মেনে নিলেও, মন এতে সায় দিচ্ছে না। সবসময় স্বামী আর সন্তানের মাঝে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখার মানসিকতা আমার নেই। অফিসের কাজ বা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেই মন পড়ে থাকে। যেকোনো কাজ হলেই হলো, এমনকি দাওয়াতের কাজও হতে পারে। এগুলোও কি মহান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না?
*প্রিয় বোন, আমাদের দ্বীন আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, একজন মুসলিম শুধু উপভোগ্য বলেই একটি কাজ করতে পারে না। বরং সে একমাত্র এমন কাজই করে যা করা তার ওপর কর্তব্য।
প্রবৃত্তি আপনাকে বলবে, আল্লাহর পছন্দের ওপর নিজের পছন্দকে প্রাধান্য দাও। আর আল্লাহ আপনাকে বলছেন:
وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى * فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى *
“যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সামনে দাঁড়ানোর ভয় করে এবং নিজ খেয়ালখুশি থেকে নিজেকে নিবৃত রাখে, জান্নাতই হবে তার আবাস।”[১৯]
আপনার প্রতি আল্লাহর নির্দেশ হলো, সন্তানকে সঠিক তত্ত্বাবধানে গড়ে তোলা এবং এই ব্যাপারে নিজ খেয়ালখুশিকে দমন করা। যদি এই তত্ত্বাবধান ও তারবিয়াতে আপনি কোনো 'আগ্রহ' খুঁজে না পান তা হলে জেনে রাখুন, যে আল্লাহ আপনাকে এই আদেশ দিয়েছেন, তিনিই আবার বার্ধক্যের সময় সন্তানকে আপনার সেবা করার নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি সন্তান যদি আপনার সেবা-যত্নের ক্ষেত্রে বা প্রয়োজনের সময় আপনার ডাকে সাড়া দিতে 'আগ্রহবোধ' না করে কিংবা তার নিকট যদি এসব 'বিরক্তিকর'ও ঠেকে তবুও এটি তার দায়িত্ব বলে নির্ধারণ করেছেন।
জিহাদের তাড়নায় উদ্দীপ্ত হয়ে মুআবিয়া সুলামি যখন রাসূল -এর নিকট এসেছিলেন তখন নবিজি তাকে বলেছিলেন, "এখন মায়ের পা আঁকড়ে ধরো। সেখানেই রয়েছে তোমার জান্নাত।”[২০]
হাদিসে জুরাইজ নামক এক বুযুর্গের কাহিনি এসেছে, যিনি মায়ের ডাক শুনতে পেয়েও সালাতে মগ্ন ছিলেন। আর এই কারণে আল্লাহ তাকে পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছিলেন।”[২১]
ওয়াইস কারানি রা. -এর ঘটনা তো সুপ্রসিদ্ধ। যিনি শুধুমাত্র মায়ের সেবা-যত্নে ব্যস্ত থাকার কারণে নবিজির সান্নিধ্যে সৌভাগ্য অর্জন করতে সক্ষম হননি।
জিহাদ, নফল সালাত ও নবিজির সান্নিধ্যের মতো সর্বত্তম আমলগুলোর ওপর আল্লাহ তাআলা মায়ের সেবাকে অগ্রগণ্য করে দিয়েছেন।
যে আল্লাহ আপনাকে সন্তান প্রতিপালনের নির্দেশ দিয়েছেন, এই ক্ষেত্রে তার দাসত্ব বাস্তবায়নের আদেশ করেছেন, সেই তিনিই আবার সন্তানদের ওপর বার্ধক্যের সময়ে আপনার শ্রদ্ধা করার নির্দেশ দিয়েছেন। আপনার প্রতি দয়া ও নম্র আচরণ করা তাদের জন্য বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ
“দয়া ও কোমলতা সহকারে তাদের সামনে বিনম্র থাকো।”[২২]
করোনার এই বিপর্যস্ত সময়ে ইউরোপের বৃদ্ধ মা-বাবারা যে অবহেলার শিকার হয়েছেন আমরা তা থেকে শিক্ষণীয় অর্জন করতে পারি। তাদের এই অবস্থা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে অনেক কিছুই দেখিয়ে দেয়।
প্রিয় বোন, বিশ্বাস করুন, নিজের পছন্দকে তুচ্ছ করে যখন আপনি আল্লাহর পছন্দকে মেনে নেবেন, যখন একটি মহান উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে আপনি সন্তানগঠনে মনোনিবেশ করবেন তখন আজকের বোঝা কালকে আগ্রহে পরিণত হবে। একসময় বিরক্তিকর এই বিষয়টিই আপনার হৃদয়ঙ্গম প্রশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

*****

বোন, এখন তো জানলেন তারবিয়াত কী? তারবিয়াতের এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় আপনাকে পদে পদে সবর ও ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হবে। তারবিয়াত হলো, সন্তানকে জাহান্নামের ইন্ধন হওয়া থেকে রক্ষা করে তাকে প্রভুর স্থায়ী সান্নিধ্যের পথ দেখানো, তাকে এই সৌভাগ্যের উপযুক্ত করে গড়ে তোলা। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوْا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ
“হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।” [২৩]
আপনার সন্তানসন্ততি হতে পারে আপনার জাহান্নাম থেকে মুক্তির উপায় :
مَنْ يَلِي مِنْ هُذِهِ الْبَنَاتِ شَيْئًا فَأَحْسَنَ إِلَيْهِنَّ كُنَّ لَهُ سِتْرًا مِّنَ النَّارِ
“যে ব্যক্তি কন্যাদের ব্যাপারে সমস্যার সম্মুখীন হয়েও তাদের সাথে উত্তম আচরণ করবে, তার কন্যারা তার জন্য জাহান্নামের অন্তরাল হয়ে দাঁড়াবে।” [২৪]
আপনার মৃত্যুর পর আপনার এই সন্তানেরাই আপনার উপকারে আসবে :
إِنَّ الرَّجُلَ لَتُرْفَعُ دَرَجَتُهُ فِي الْجَنَّةِ فَيَقُوْلُ أَنَّى هُذَا فَيُقَالُ بِاسْتِغْفَارِ وَلَدِكَ لَكَ
"জান্নাতে কোনো ব্যক্তির মর্যাদা বাড়িয়ে দেওয়া হবে। এ অবস্থা দেখে সে বলবে, 'আমার এমনটা কীভাবে হলো?' তখন বলা হবে, 'তোমার জন্য তোমার সন্তানসন্ততি ক্ষমা প্রার্থনা করার কারণে। [২৫]
সর্বোপরি দুনিয়ায় তারা আপনার চক্ষু শীতলতার কারণ হবে, যদি আপনি তাদের যথাযথভাবে গড়ে তোলেন।
তারবিয়াতের এই পথ বড়োই বন্ধুর; তবে এর ফলাফল পাহাড়সম। এই দুর্গম পথে আপনি হয়তো কখনো হোঁচট খাবেন, কখনো-বা হাঁপিয়ে উঠবেন; কিন্ত-
وَالَّذِيْنَ جَاهَدُوا فِيْنَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ *
“যারা আমার পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করি। নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সঙ্গে রয়েছেন।”[২৬]
আল্লাহ আপনার সঙ্গে থাকবেন। আপনাকে সহযোগিতা করবেন, আপনার অপূর্ণতাকে পূর্ণতা দিয়ে ঢেকে দেবেন, আপনার সব চাওয়া পূরণ করবেন।
فَسَدِّدُوا وَقَارِبُوا وَأَبْشِرُوا
“অতএব মধ্যমপন্থা অবলম্বন করো, নৈকট্যলাভের চেষ্টা চালিয়ে যাও আর সুসংবাদ গ্রহণ করো।”[২৭]
প্রিয় বোন, আল্লাহ তাআলা এক মহান মর্যাদা আপনার জন্য নির্ধারণ করে রেখেছেন। এমনকি লক্ষ করুন, এক ব্যক্তি এসে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে প্রশ্ন করেছিলেন, 'আমার কাছ থেকে উত্তম ব্যবহার পাওয়ার সর্বাধিক উপযুক্ত ব্যক্তি কে? 'আমাদের নবি জবাব দিয়েছিলেন,
'তোমার মা।'
'তারপর কে?'
'তোমার মা।'
'তারপর কে?'
'তোমার মা।'
'তারপর কে?'
'তোমার বাবা।' [২৮]
وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُلْ لَّهُمَا أُفٍ وَّلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُلْ رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
“আর আপনার রব আপনাকে আদেশ দিয়েছেন তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদাত না করতে এবং পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে। তাদের কেউ একজন বা উভয়ই আপনার জীবদ্দশায় যদি বার্ধক্যে উপনীত হয় তা হলে তাদেরকে 'উফ' বলবেন না এবং ধমক দেবেন না; আর তাদের সাথে সম্মানসূচক কথা বলুন। দয়া ও কোমলতা সহকারে তাদের সামনে বিনম্র থাকুন আর বলুন, 'হে আমার রব, তাঁদের প্রতি দয়া করুন যেভাবে শৈশবে তাঁরা আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন।” [২৯]

*****

সন্তানকে ইসলামের ওপর গড়ে তোলার সহজ পদ্ধতি হলো তাকে মর্যাদা ও ইজ্জতের ওপর গড়ে তোলা। এই মর্যাদা ও ইজ্জত তাকে শত্রুর ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্যে প্রভাবিত হওয়া থেকে মানসিকভাবে রক্ষা করবে। এই মর্যাদা তাকে আল্লাহর কিতাব ও নবিজির জীবনী শুনে গর্বিত হতে বাধ্য করবে। এই ইজ্জতের কারণেই সে শত্রুর অন্ধ অনুকরণ ও তাদের পরিকল্পনায় অংশগ্রহণ করা থেকে সচেতনভাবে বেঁচে থাকবে, তাদের সাম্রাজ্যবাদী চিন্তাচেতনার বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়াতে শক্তি জোগাবে। সর্বোপরি তার ভেতর তৈরি হওয়া আত্মসম্মানবোধ তার অন্তরে এক অঙ্গার সৃষ্টি করবে, যা তাকে উম্মাহ নিয়ে ভাবতে শেখাবে।

وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُوْلِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُوْنَ

“সম্মান তো কেবল আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনদেরই। কিন্তু মুনাফিকেরা তা জানে না।” [৩০]

টিকাঃ
[১৭] সূরা কাসাস, ২৮: ৫৬。
[১৮] সূরা হূদ, ১১:৪৬。
[১৯] সূরা নাজিআত, ৭৯: ৪০-৪১。
[২০] বিস্তারিত দেখুন—ইবনু মাজাহ, ২৭৬১
[২১] বিস্তারিত দেখুন—বুখারি, ১২০৬; মুসলিম, ২৫৫০
[২২] সূরা বনি ইসরাইল, ১৭:২৪১
[২৩] সূরা তাহরীম, ৬৬ : ৬。
[২৪] বুখারি, ৫৯৯৫。
[২৫] ইবনু মাজাহ, ৩/২১৪。
[২৬] সূরা আনকাবূত, ২৯: ৬৯。
[২৭] বুখারি, ৩৯; ইবনু হিব্বান, ৩৫১。
[২৮] মুসলিম, ২৫৪৮。
[২৯] সূরা বানী ইসরাঈল, ১৭: ২৩-২৪。
[৩০] সূরা মুনাফিকূন, ৬৩: ৮。

📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 মাত্রাতিরিক্ত যত্ন ও বিরক্তিকর মমতা!

📄 মাত্রাতিরিক্ত যত্ন ও বিরক্তিকর মমতা!


খেয়াল না রাখা আর অবহেলার বিপরীতে আরেকটি ক্ষতিকর বিষয় হলো, মাত্রাতিরিক্ত যত্ন বা গুরুত্ব。
কীভাবে সন্তানের যত্ন নিতে হয় সে ব্যাপারটি স্পষ্ট না করেই আমরা যখন নারীকে বলি : 'সন্তানের যত্ন নাও', তখন সাধারণভাবে নারী এই ধারণা করে বসেন যে, যত্ন নেওয়ার অর্থ হলো, সন্তানের জন্য নিজেকে ধ্বংস করে দেওয়া, নিজের গোশত-হাড্ডি সব একাকার করে ফেলা, মনপ্রাণ দিয়ে শুধু তাদের সাথেই লেগে থাকা। তারা ভাবেন, যথাযথ যত্ন বুঝি একেই বলে!
অনেক নারীই আবার ভাবেন, সন্তানকে ঘরের কাজ থেকে মুক্ত রেখে শুধু পড়াশোনায় ব্যস্ত রাখা, তাদের কাছ থেকে প্রাত্যহিক পড়া আদায় করা, হোমওয়ার্ক করতে বকাবকি করা, দায়িত্ব থেকে তাদের মুক্ত রাখা ইত্যাদি। তাদের এই যত্নের ফলাফল হলো সন্তানের স্বনির্ভরতার যোগ্যতা নিঃশেষ করে দেওয়া। তারা ধারণা করে এগুলোর মাধ্যমে সন্তানদের প্রতি নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য পরিপূর্ণভাবে আদায় হয়ে যাচ্ছে! অথচ বাস্তবে তিনি সন্তানদের থেকে দায়িত্ব, সচেতনতা একেবারেই ধ্বংস করে দিচ্ছেন। নিজেকে তো কষ্ট দিচ্ছেন সেইসাথে সন্তানদেরও কষ্টে ফেলছেন, অথচ তাদের ধারণা তারা যথাযথ গুরুত্ব দিয়েই তাদের সন্তানদের বড়ো করে তুলছেন!
যখন আমাদের উদ্দেশ্য আল্লাহর দাসত্ব করা, তখন সন্তানের এই যত্ন নেওয়া ও গুরুত্ব দেওয়াও হতে হবে আল্লাহর দেখিয়ে দেওয়া পন্থায়, শারীআত সমর্থিত তরীকায়। আর না হয় এই যত্ন আপনার জন্য তো বটেই, সন্তানের জন্যও যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়াবে。
আপনি হয়তো বলতে পারেন: আমি চাই, আমার সন্তান জীবনে সফল হোক।... সফলতা দ্বারা আপনার কী উদ্দেশ্য? আর এর মাপকাঠিই-বা কী?
যদি আপনি সন্তানদের পড়াশোনায় সহযোগিতা করতে চান তা হলে আপনার উচিত, শিক্ষাকে তাদের সামনে প্রিয় করে তোলা। তাদের শিখিয়ে দিন কীভাবে তারা নিজেদের দৈনন্দিন রুটিন সাজাবে, কীভাবে চিন্তা করবে。
তাদের আপনি গতানুগতিকভাবে পড়ালেন। তারপর হোমওয়ার্ক করতে গিয়ে যখন তারা বিভিন্ন ত্রুটির শিকার হলো তখন চিৎকার চেঁচামেচিতে সারা ঘর মাথায় তুললেন, সমস্ত দোষ তাদের ওপর চাপিয়ে দিলেন। এতে শুধু তাদের সাথে আপনার সম্পর্কই খারাপ হবে। ঘরের প্রশান্তভাব নষ্ট হবে, পুরো বাড়ি দুশ্চিন্তা ও চেঁচামেচিতে ভরে উঠবে। আর এটা তেমন কোনো ফলও বয়ে আনবে না。
সন্তান প্রতিপালন কিংবা তারবিয়াতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পয়েন্ট হলো, মা তার 'বিরক্তিকর ও ক্ষতিকর' দয়া-মমতা থেকে বিরত থাকবেন। যেকোনো বিষয়ে অনাধিকার চর্চা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবেন। আপনাকে হতে হবে অনেক বেশি বুদ্ধিদীপ্ত, প্রশান্ত ও আত্মসচেতন。
এমন মায়ে পরিণত হবেন না, যিনি সন্তানদের যত্নের ব্যাপারে ভাবতে ভাবতে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার আগুনে নিজেকে নিঃশেষ করে দেন। সন্তানদের কথা ভেবে নিজের সবকিছুকে উজাড় করে দেন। মানসিকভাবে এতটা ভেঙে পড়েন যে, সামান্যতেই স্বামী ও সন্তানদের সামনে ক্রোধে ফেটে পড়েন। এমন অনেক নারী আছেন, যারা সন্তান সামান্য বড়ো হওয়ার পর আর 'স্ত্রী' থাকেন না, শুধুই মায়ে পরিণত হন। স্বামীর সাথে তার টানাপোড়েন তৈরি হয়। যে সন্তানদের জন্য তিনি নিজেকে একপ্রকার নিঃশেষ করে দিয়েছিলেন সে সন্তানেরাই তখন তাকে ব্যর্থ মা বলে গণ্য করা শুরু করে। যিনি নিজের সাথে তো বটেই, স্বামী ও সন্তানদের সাথেও সঠিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে ব্যর্থ, যিনি সবসময় বাড়তি কেয়ার করেন, সারাক্ষণ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ডুবে থাকেন。
তার এই অবস্থা সন্তানদের কাছে পরিবার ও জীবনের প্রতি এক হতাশার বার্তা প্রেরণ করে। তারা বৈধ বিয়ে থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এমনকি ইসলাম থেকেও, কারণ তা বিয়ের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে! তখন সন্তান অনৈতিক ও অবৈধ সম্পর্কের মাঝে ভালোবাসা ও প্রেম খুজতে শুরু করে। কারণ তারা চান না এই ব্যর্থ দাম্পত্যজীবনের অভিজ্ঞতা নিজের জীবনে প্রকাশ পাক!
'তুমি মোম হয়ে জ্বলো, সন্তানের পথ আলোকিত করো' এই শ্লোগানটি সম্পূর্ণ ভুল একটি শ্লোগান। আমাদের দ্বীন আমাদেরকে এর উল্টোটা শেখায়। তোমার ওপর তোমার নিজেরও অধিকার আছে। প্রত্যেককে আপন আপন হক ও প্রাপ্য অধিকার বুঝিয়ে দেওয়াই হলো ইসলামের শিক্ষা。
আপনিই যদি জ্বলে যান তা হলে সন্তানের পথ কীভাবে উজ্জ্বল করবেন? তখন তো আপনার জ্বলে-যাওয়া-ছাই তাদের জীবনকে অন্ধকার করে তুলবে। আপনার উচিত প্রশান্তি ও ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যমে তাদের জীবনকেও আলোকিত করা এবং সাথে সাথে নিজের প্রাপ্য অধিকার নিজেকে প্রদান করা। সুতরাং নিজের সাথে স্বাচ্ছন্দ্যময় হোন, যতটা সম্ভব উৎফুল্ল থাকুন। স্বামীর সাথেও সহজ হয়ে উঠুন, তার প্রাপ্য অধিকার তাকে দিন। দেখবেন আপনাতেই সন্তানের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, ইন শা আল্লাহ。
সমাজের কথা শুনে সন্তানের সফলতার পিছে দৌড়াবেন না। তাদের নিকট সফলতার অর্থই হলো, স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটির সার্টিফিকেট। লোকে কী বলবে সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ করবেন না। সন্তানদের নিজের মতো করে গড়ে তুলুন, কল্যাণ দ্বারা তাদের পরিপূর্ণ করুন। নিজেকে তো বটেই, সন্তানদেরও তৈরি করুন এমনভাবে যেন তাদের জীবনে সবচেয়ে অগ্রগণ্য হয় 'আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা'। তাদের সামনে সুখ ও ভারসাম্যের উজ্জল দৃষ্টান্তে পরিণত হোন। আপনার এই প্রতিচ্ছবিই তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে প্রকৃত সফলতার পথ দেখাবে। তারা আপনাকে দেখে একটি সুখী ও ভারসাম্য পরিবার গঠনে উদ্বুদ্ধ হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00