📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 শিক্ষাব্যবস্থা কি তারবিয়াতের এই উদ্দেশ্যগুলো বাস্তবায়ন করতে সক্ষম?

📄 শিক্ষাব্যবস্থা কি তারবিয়াতের এই উদ্দেশ্যগুলো বাস্তবায়ন করতে সক্ষম?


এখন প্রশ্ন করতে পারেন: স্কুলে এই উদ্দেশ্যগুলোর কতটুকুই বা বাস্তবায়ন করা হয়? নাকি তারা এগুলোকে বাস্তবায়ন করবে দূরে থাক ধ্বংস করতে উঠেপড়ে লেগেছে?

* প্র্যাকটিক্যালি আপনারা একটি কাজ করতে পারেন। যখন সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করাতে যাবেন তখন ওপরে বর্ণিত তারবিয়াত সংবলিত একটি তালিকা সাথে করে নিয়ে যাবেন। কর্তৃপক্ষকে বিনয়ের সাথে জিজ্ঞেস করবেন: 'এই উদ্দেশ্যের কয়টি আপনারা পূরণ করছেন আমাকে কি বলা যায়? আর এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে কোন কোন পদক্ষেপ বা কোন কার্যপ্রণালি আপনারা হাতে নিয়েছেন?'

কয়েক বছর পূর্বে এক সরকারি হাসপাতালের দুই ডাক্তারের দুর্নীতি হাতেনাতে ধরা পড়ে। তারা কোনো ক্যান্সার রোগী আসলে তার কাছ থেকে ওষুধ খরচ বাবদ উপর্যুপরি টাকা উসুল করে নিত কিন্তু সে ওষুধগুলো রোগীকে না দিয়ে কালোবাজারে বিক্রয় করত। তাদের এই অপকর্মের সাথে হাসপাতালের কিছু নার্সও জড়িত ছিল। আর রোগীকে এই ওষুধগুলোর পরিবর্তে ইনজেকশন ও নরমাল স্যালাইন দেওয়া হতো। সোজা কথায়, পানি আর লবণ গুলিয়ে খাওয়ানো হতো!

বেশ ভয়ংকর বিষয় তাই না? অথচ এই ভয়ংকর ঘটনাই প্রতিনিয়ত ঘটছে অধিকাংশ মুসলিম সন্তানদের সাথে। তাদের প্রয়োজন মূর্খতা ও প্রবৃত্তি রোগের চিকিৎসা। কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষাব্যবস্থায় তাদের জন্য যা রাখা আছে তা হয়তো নরমাল স্যালাইন না হয় বিষ! আর বাবা-মা তাদের সন্তানদের এই স্কুলগুলোতেই পাঠিয়ে ভাবতে শুরু করেন, যাক, শেষমেশ দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে আদায় করতে সক্ষম হলাম!

রোগীকে চিকিৎসাহীন অবস্থায় ফেলে রাখা ততটা ভয়ংকর নয়, যতটা ভয়ংকর তার শরীরে নরমাল স্যালাইন বা বিষ দেওয়ার পর চিকিৎসা হচ্ছে ভেবে বসে থাকা।

📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 আপনার কথামতো তা হলে তো প্রত্যেক মায়েরই উচ্চশিক্ষিতা বা আলিমা হতে হবে?

📄 আপনার কথামতো তা হলে তো প্রত্যেক মায়েরই উচ্চশিক্ষিতা বা আলিমা হতে হবে?


হয়তো প্রশ্ন আসতে পারে : তারবিয়াতের ক্ষেত্রে আপনি নারীর যে ভূমিকার কথা বলছেন তা মোটামুটি অসম্ভব। কারণ আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে প্রত্যেক মায়েরই উচ্চশিক্ষিতা বা আলিমা হতে হবে।

প্রিয় বোন, আপনার সন্তানদের অন্তরে আপনি শুধুমাত্র মূলভিত্তিটিই তৈরি করে দেবেন। তাদেরকে সঠিক পথটি দেখিয়ে দেবেন। তাদের অন্তরে, তারা যা জেনেছে সে অনুযায়ী কাজ করার উদ্দীপনা সৃষ্টি করে দেবেন।

এরপর আপনার ভূমিকা হলো, শুধুমাত্র তাকে সহযোগিতা করা আর সাহস জোগানো মাত্র। যেমন, কারও কাছ থেকে কিছু একটা শোনার পর তার অন্তরে সংশয়-সন্দেহের দানা বাঁধল। তখন আপনার ভূমিকা কী হবে? তাকে বলবেন : 'বৎস, চল একসাথে আমরা এর উত্তর অনুসন্ধান করি।' আপনি তাকে নির্ভরযোগ্য বই বা উৎসের সাথে পরিচিত করাবেন। তাকে এমন মানুষের নিকট নিয়ে যাবেন যার নিকট তার এই প্রশ্নের উত্তর আছে, এমন ব্যক্তি যার কথা সে মনোযোগ দিয়ে শুনবে।

তেমনিভাবে আপনার সন্তানকে কোনো মানসিক সমস্যায় জর্জরিত হতে দেখলে তাকে বলবেন, 'কীভাবে এই সমস্যা থেকে উত্তরণ পাওয়া যায়, চলো আমরা পরামর্শ করি।' এই বিষয়গুলো যথাযথভাবে করতে আশা করি খুব বেশি উচ্চশিক্ষিতা হওয়ার প্রয়োজন নেই।

📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 আপনি তো দেখি তারবিয়াতের সকল বোঝা নারীর ওপরই চাপিয়ে দিলেন!

📄 আপনি তো দেখি তারবিয়াতের সকল বোঝা নারীর ওপরই চাপিয়ে দিলেন!


প্রথমত, বোঝা নয়, বলুন সম্মান। সন্তান প্রতিপালন, চরিত্র সংশোধন ও মানবগঠন... এগুলো নবিদের দায়িত্ব। আর কর্মীর মর্যাদা কর্মের বড়োত্ব দ্বারাই মাপা হয়।

যেহেতু খরচের দায়িত্ব পুরুষের ঘাড়েই চাপে তাই এই দায়িত্ব পালনে স্বাভাবিকভাবেই তার ঘরের বাইরে কিছুটা সময় কাটাতে হয়। জানা কথা, সন্তানের সাথে আপনিই বেশি সময় অতিবাহিত করেন। তাই তারবিয়াতের সুযোগ আপনারই বেশি। তারপরও বলতে হয়, তারবিয়াত বা সন্তান প্রতিপালন পিতামাতার যৌথ দায়িত্ব। আর এতবড়ো দায়িত্ব নিশ্চয় উভয়ের পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই কেবল আঞ্জাম দেওয়া সম্ভব।

আমার একটি ভিডিয়োর কমেন্ট সেকশনে অনেক ভাই আপত্তি জানিয়েছেন এই বলে যে,

'আপনি কি তা হলে এটা বলতে চান যে, আমরা বাইরে কাজকর্ম শেষে যখন ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে ঘরে ফিরব তখন ঘরে বেকার (!) বসে-থাকা স্ত্রীরা আমাদের ওপর ছড়ি ঘুরাবে!? ঘরের বাইরে এত কাজ করার পরও আপনি বলছেন যে, ঘরে গিয়ে স্ত্রীকে সাহায্য করব?!'

আমরা বলি, 'প্রিয় ভাই, আপনার নিকট আমাদের দাবি হলো, স্ত্রীকে যথাসম্ভব সাহায্য করুন, তার নিকট চাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিন। যাতে তিনি একটি মহান দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সে সুযোগ তৈরি করে দিন। মহান সে দায়িত্বটা কী? মানবগঠন। আপনারও উচিত এই দায়িত্ব পালনে তাকে সহযোগিতা করা। বিভিন্ন অজুহাত সামনে এনে তারবিয়াতের এই মহান দায়িত্বে মোটেও ত্রুটি করবেন না। এই কথা বলবেন না যে, 'আমি তো তোমাদের জন্যই ব্যবসা-বাণিজ্য করি। এসবে আমি সময় দিতে পারব না। তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করো, আর আমি আমারটা।' এমনকি দেখা যায়, বাড়িতেও আপনি যে সময়টা অতিবাহিত করছেন তাতে সন্তানদের সময় দেন না বরং মোবাইল ও নেট দুনিয়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

ইসলাম পুরুষের ওপর অভিভাবকত্বের যে দায়িত্ব অর্পণ করেছে সে দায়িত্বের একটি অংশ হলো, সমতা রক্ষা করা আর প্রত্যেককেই প্রাপ্য অধিকার প্রদান করা। মনে রাখতে হবে, ওপরে বর্ণিত হাদীসে আল্লাহর রাসূল ﷺ হুমকি দিয়েছেন যে, যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন না করলে জান্নাতের ঘ্রাণও পাওয়া যাবে না, তা শুধু নারীকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়নি, পুরুষও এর মধ্যে শামিল। আর সন্তানদের তারবিয়াত বা তাদেরকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এমন অনেক বিষয় আছে যা শুধু পুরুষেরই দায়িত্বে পড়ে, নারীর নয়।

بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ

“যেহেতু আল্লাহ তাদের একজনকে অন্যজনের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।”[১২]

যে দায়িত্ব নারীর নয় তার কাছ থেকে তা প্রত্যাশা করা, তাকে জুলুম করার নামান্তর। অতএব প্রিয় ভাই, তারবিয়াতের এই প্রকল্পের নেতৃত্ব আপনারই দিতে হবে। এর সামনে তৈরি হওয়া প্রতিবন্ধকতা আপনাকেই ভাঙতে হবে।

সত্য বলতে, সন্তানদের গড়ে তোলার এই যাত্রা শুরু হয় মূলত উপযুক্ত স্বামী ও উপযুক্ত স্ত্রী নির্বাচনের মাধ্যমে। ফলে তারা এই মহান লক্ষ্য বাস্তবায়নে একে অপরকে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে।

প্রিয় বোন, ধরুন আপনার স্বামী তারবিয়াতের ক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা রাখছে না। আপনি তাকে চাপ দিয়েছেন, আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়েছেন... কিন্তু সে নিরুত্তাপ। তখন আপনিও কি সন্তানদের মাঝপথে ছেড়ে দেবেন?

যদি আপনার স্বামী সন্তানদের পোলিও, হাম, ফক্স বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় টিকা দিতে কেন্দ্রে নিয়ে না যায় তখন কি আপনি বলবেন, 'সে যেহেতু গুরুত্ব দিচ্ছে না আমিই-বা আর একাকী দায়িত্ব পালন করতে যাব কেন?' নাকি আপনার ভেতর থাকা মাতৃত্বের মায়া তাদেরকে টিকাকেন্দ্রে নিয়ে যেতে বাধ্য করবে? অবশ্যই আপনি তাকে নিয়ে যাবেন।

যদি তার শরীরের ক্ষেত্রে আপনার এতই তাড়না থেকে থাকে তা হলে অন্তরের বিষয়ে কেন নয়?

কবি আল-বুসতি সুন্দর বলেছেন,

أَقْبِلْ عَلَى النَّفْسِ وَاسْتَكْمِلْ فَضَابِلَهَا فَأَنْتَ بِالنَّفْسِ لَا بِالْجِسْمِ إِنْسَانُ

অন্তরের দিকে মনোযোগ দাও, উত্তম গুণাবলিতে তা সাজাও। কেননা শরীরের কারণে নয়, তুমি মানুষ হয়েছ সুস্থ হৃদয় দিয়ে।

তারবিয়াতের এই দায়িত্ব কখনোই সহজ দায়িত্ব নয়। কিন্তু যথাসম্ভব চেষ্টা চালিয়ে গেলে আল্লাহ তাআলার সামনে জবাবদিহি করার সুযোগ পাবেন; কিন্তু কোনো চেষ্টাই না করলে তাঁর সামনে দাঁড়ানোর কোনো পথ থাকবে না। আর তারবিয়াতের ক্ষেত্রে বাবার ঘাটতি পূরণ করতে চাইলে আপনি বিভিন্ন প্রশিক্ষণকেন্দ্র, সৎসঙ্গ বা কর্মশালার সহযোগিতাও নিতে পারেন।

টিকাঃ
[১২] সূরা নিসা, ৪: ৩৪।

📘 সন্তানের ভবিষ্যৎ > 📄 তারবিয়াতের অনেক বিষয় তো আমি নিজেই ধারণ করতে পারিনি!

📄 তারবিয়াতের অনেক বিষয় তো আমি নিজেই ধারণ করতে পারিনি!


*আচ্ছা, স্পষ্ট করেই বলি, আপনি ওপরে তারবিয়াতের যে বিষয়গুলো উল্লেখ করলেন তার মধ্যে অনেক বিষয় তো আমার নিজের মধ্যেই নেই। আমি সেগুলো নিজেই ধারণ করতে পারিনি। তা হলে সন্তানদের কীভাবে এর ওপর গড়ে তুলব? যা আমার নিজের মধ্যেই নেই, তা কীভাবে অন্যকে প্রদান করব?
* ঠিক বলেছেন। আমাদের উচিত হবে, তারবিয়াতের সব বিষয় নিজে ধারণ করে তবেই সন্তানদের এর ওপর গড়ে তোলা। জীবনের পথচলা এমনই হয়। সবকাজেই ধারাবাহিক শিক্ষা, কঠোর পরিশ্রম আর সবশেষে আল্লাহর সাহায্য চাইতে হয়。
আমি আমার জীবনে যত লেখালেখি করেছি, যত লেকচার প্রদান করেছি সেগুলো মূলত নিজের ভেতর তারবিয়াতের বিষয়গুলো ধারণ করার উদ্দেশ্যেই করেছি। আর তা ছাড়া অনেক অনেক মুরব্বীরও শরণাপন্ন হয়েছি, যারা আমার ভুলত্রুটিগুলো ধরিয়ে দিয়েছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দান করে জীবনপথে চলার ম্যাপ সুচারুরূপে এঁকে দিয়েছেন।
আমরা এখন এক লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছি। এই লড়াই মানসিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার লড়াই। নফস ও মস্তিষ্ক, ফিতরাত ও স্বভাবকে প্রভাবমুক্ত করার লড়াই। জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ফিরিয়ে আনার লড়াই। এই লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়ে আপনি এক অদ্ভুত বিষয় আবিষ্কার করবেন। দেখবেন, সন্তানদের গড়ে তুলতে গিয়ে যেন আপনি নিজেকেই স্বয়ং গড়ে তুলছেন। আপনার ভেতরের আত্মা যাকে আপনি দেখতে পান না, সন্তানদের তারবিয়াত দিতে গিয়ে আপনি তাকে দেখতে পাবেন। নিজের ভেতরের দোষত্রুটি, বোধবুদ্ধি আপনার নিকট স্বচ্ছ হয়ে ধরা দেবে। সর্বোপরি তারবিয়াতের সৌন্দর্যে আপনি বিমোহিত হয়ে পড়বেন।
তারবিয়াতের এই পথচলায় আমরা যেন ধীরে ধীরে নিজেদেরই আবিষ্কার করতে থাকব। আল্লাহর দেওয়া মানবহৃদয়ের এই সৌন্দর্য আমাদের অভিভূত করবে। মানবহৃদয়ে প্রথমে বীজ বপন, তারপর ওহির পানিতে সিঞ্চন, সর্বশেষ ফসল উত্তোলন। এ যেন এক সুখের আবেশ। আপনি স্পষ্ট দেখতে পাবেন, অন্তর কীভাবে ধীরে ধীরে ঔপনিবেশিক ও ধর্মহীনতার প্রভাব থেকে মুক্তি পাচ্ছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00