📄 তারবিয়াত কী? সন্তানদের গড়ে তোলার অর্থই-বা কী?
*****
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন আমরা প্রায় সবকিছুতেই আল্লাহর দাসত্বের সেই মহান উদ্দেশ্যকে ভুলতে বসি। প্রিয় বোন, এই পর্বে আলোচনা হবে তারবিয়তের ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা সম্পর্কে। তাই আজকের কথা আপনাকে ঘিরেই।
তারবিয়াত বা সন্তান প্রতিপালন হলো স্বামী-স্ত্রীর যৌথ দায়িত্ব। আচ্ছা, স্বামী যদি তার দায়িত্ব পালনে ত্রুটি করে, অন্যমনস্ক থাকে, তখন? এর উত্তর আমরা দেবো। তার আগে বোন, আপনার উদ্দেশ্যে এখন কিছু কথা বলা প্রয়োজন।
অধিকাংশ নারী যখন তারবিয়াত বা সন্তান প্রতিপালন শব্দটি শোনেন, তখন এটি তাদের অনুভূতিতে বড়োসড়ো কোনো চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে না।-তারবিয়াত!? আমার সন্তান তো স্কুলে যায়। আমি তাকে তুলনামূলক নিরাপদ ও রক্ষণশীল স্কুলে ভর্তি করিয়েছি...! যেভাবে আমি বেড়ে উঠেছি সেও ঠিক সেভাবে বেড়ে উঠবে...! এরচেয়ে বেশি কী করার আছে আমার?
আচ্ছা তা হলে আসুন, তারবিয়াত বলতে আসলে কী বুঝায় আমরা জেনে আসি। এরপর না হয় ব্যাখ্যা করব আপনার সন্তান এই পরিবেশ কিংবা স্কুল থেকে তা যথাযথভাবে অর্জন করতে পারছে কি না?
তারবিয়াত কী? সন্তানদের গড়ে তোলার অর্থই-বা কী?
১. তারবিয়াত হলো: ইজ্জত-সম্মান, লাজুকতা, দয়া-মমতা, মানবিকতা, আত্মমর্যাদাবোধ, জুলুমের প্রতিরোধ, আল্লাহর জন্য ক্রোধ, ঈমানি আত্মমর্যাদাবোধ, সৎকাজে আদেশ দান, অসৎকাজে বাধা প্রদান, ব্যক্তিত্বের প্রভাব ইত্যাদি গুণের ওপর সন্তানদের গড়ে তোলা। বিভিন্ন উপায়ে আজকের পৃথিবীতে এই গুণগুলো ধ্বংস করার অপচেষ্টা চলছে। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা, গণমাধ্যম, ফিল্ম, কার্টুন ও গেইমসের মাধ্যমে সুচিন্তিতভাবে লজ্জাশীলতাকে ধ্বংস করা হচ্ছে। যার ফলে শিশুমনে কঠোরতা ও সহিংসতা জন্ম নিচ্ছে।
২. সন্তানদের গড়ে তোলার অর্থ হলো: তাদেরকে চিন্তা-গবেষণার পদ্ধতি শিক্ষা দেওয়া। কীভাবে সে সঠিক প্রশ্ন করবে, মনের ভাব ব্যক্ত করবে, বিকৃত ও সঠিক জ্ঞানের মাঝে পার্থক্য করবে, হঠাৎ উদিত হওয়া বিভিন্ন চিন্তার কীভাবে যথাযথ খণ্ডন করবে, বিভিন্ন তথ্য কীভাবে যাচাই করবে, কীভাবে সে দ্বীনের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টিকারী ভ্রান্ত ব্যক্তিদের সাথে আলোচনা করবে, তাদের প্রতারণা সম্পর্কে জ্ঞাত হবে ইত্যাদি বিষয় তাদের শিখিয়ে দেওয়া।
৩. তারবিয়াত হলো: নিজেকে আবিষ্কার করার পথে সন্তানদের সহযোগিতা করা। তাদের প্রতিভাকে সঠিক খাতে ব্যয় করা। সন্তানের সক্ষমতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এমন লক্ষ্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গ দেওয়া। জীবনের যে উদ্দেশ্যই সে বেছে নিক না কেন, যেন উম্মাহর মর্যাদার সুদীর্ঘ অধ্যায়ে সেও অংশগ্রহণ করে। সন্তানদের এই বলে শিক্ষা দিন: “নিজের মতো হও। নিজেকে গ্রহণ করো। অন্যের ব্যক্তিত্বকে ধারণ করবে না। কাউকে যদি তুমি এমন কোনো কাজ করতে দেখো যা তুমি নিজে বাস্তবায়ন করতে পারো না, তখন নিজেকে ব্যর্থ ভাববে না। তোমার সাথে খাপ খায় না এমন কোনোকিছুকে লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করবে না। প্রত্যেকেরই নিজস্ব ব্যক্তিত্ব রয়েছে।” মনে রাখবেন, এসব কথা ছাড়া আপনার সন্তান কখনোই পরিতৃপ্ত ও সুখী হবে না।
৪. তারবিয়াত হলো: সন্তানদের নিকট অস্তিত্ববিষয়ক প্রশ্নগুলোর উত্তর স্পষ্ট করা। আমি কে? আমার সৃষ্টিকর্তা কে? আমার শেষ পরিণতি কী? আমার অস্তিত্বের উদ্দেশ্য কী? আমি মুসলিম কেন? কুরআন আল্লাহর পক্ষ হতে অবতীর্ণ হওয়ার প্রমাণ কী?
নবি ﷺ-এর নুবুওয়াতের দলীল কী? যে কুরআন ও সুন্নাহর ওপর ভিত্তি করে আমি সারাটি জীবন কাটাবো সেগুলো কীভাবে সংরক্ষিত হয়ে এসেছে? এরকমভাবে সন্তানদের দ্বীনের সমস্ত মৌলিক বিষয়াদি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দেওয়া।
৫. তারবিয়াত মানে এই নয় যে, কোনো ২২ বছর বয়সী যুবক ১৮ বছর বিভিন্ন স্কুল ও ইউনিভার্সিটিতে কাটিয়ে দেবে অথচ সে উপরিউক্ত প্রশ্নগুলোর উত্তর জানবে না। কীভাবে চিন্তা করতে হয় সে ব্যাপারে তার কোনো ধারণা থাকবে না। একটি শব্দ তাকে তার প্রশ্নের উত্তর দেয় তো অন্য আরেকটি শব্দ তাকে ঈমানহারা করে ছাড়ে। নিম্নমানের কোনো একটি লেখা কিংবা ছোট্ট একটি ভিডিয়ো ক্লিপ খুব সহজে তার ঈমান হরণ করে নেয়! সঠিক চিন্তা-ভাবনা, বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা বা বৈজ্ঞানিক কোনো পর্যালোচনা ছাড়া সে খুব সরলভাবে তর্ক জুড়ে দেয়। এরপর নিজেকে কখনো শিক্ষিত, কখনো ইঞ্জিনিয়ার, কখনো ডাক্তার এমনকি কখনো-বা প্রফেসর হিসেবে পরিচয় দেয়!
৬. তারবিয়াত হলো : ইসলামি ইতিহাসের প্রকৃত বীরদের সাথে সন্তানদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া। উম্মাহর বীরত্বের ইতিহাস তাদেরকে জানানো। যাতে তারা বুঝতে পারে, তাদেরও গভীর শেকড় রয়েছে। তখন তারা ব্যভিচারী, মাদকাসক্ত কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার বিভ্রান্ত সেলিব্রিটিদের পোশাক-আশাক, ছোটোবড়ো চুল এবং অন্যান্য কর্মকাণ্ড দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার পরিবর্তে উম্মাহর পরিচয়ে গর্ববোধ করবে।
৭. তারবিয়াত হলো : সন্তানদের প্রতিটি কাজে এই প্রশ্ন করতে অভ্যস্ত করে তোলা যে, আমি এই কাজটি কেন করব? মনে রাখবেন এই একটি প্রশ্ন তাকে অন্ধ অনুকরণ করা থেকে রক্ষা করবে।
৮. তারবিয়াত হলো : অনুপ্রবেশ করা বিভিন্ন মতাদর্শ সম্পর্কে সন্তানদের মধ্যে সতর্কতা ও সচেতনতা সৃষ্টি করা। যাতে গণমাধ্যমগুলো মানসিকতা ও মূল্যবোধ পরিবর্তনের যে অপচেষ্টা চালাচ্ছে তারা তা খুব সহজেই ধরে ফেলতে সক্ষম হয়। আমার মনে পড়ে, আব্বাজান এরকম কিছু বিষয় থেকে সতর্ক করার উদ্দেশে আমাদের সাথে প্রায়ই আলোচনা করতেন। তার সেই আলোচনা আমাদের বেশ প্রভাবিত করেছিল, সঠিক পথ চিনে নিতে আমাদের চোখ খুলে দিয়েছিল।
৯. তারবিয়াত হলো: সন্তানদের মধ্যে জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ তৈরি করে দেওয়া। সেটা দ্বীনি জ্ঞান হোক বা অন্যান্য জাগতিক জ্ঞান। তারা যেন বিভিন্ন বই ও সিরিজের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করে রাখে। তাদের বলুন, 'উপকারী যত জ্ঞান রয়েছে, তা জানতে আগ্রহী হও, বেশ পরিশ্রম করো।' এর মাধ্যমে তারা বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস গেইমসে মগ্ন থাকা, অশ্লীল ভিডিয়োতে আসক্ত হওয়া এবং বিভিন্ন ইউটিউবারদের গুরুত্বহীন কথাবার্তা থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে সক্ষম হবে। যখন পড়াশোনায় তাদের মন ও মস্তিষ্ক পরিপূর্ণরূপে ব্যস্ত থাকবে তখন এসব অনর্থক বিষয় তাদের স্পর্শও করতে পারবে না, তাদের সে সুযোগও হবে না।
১০. তারবিয়াত হলো: যুগের প্রয়োজনীয় সব বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের প্রতি সন্তানদের মাঝে উদ্দীপনা সৃষ্টি করা। ফলে সে প্রভাব বিস্তারকারী একজন সফল মুসলিমে পরিণত হতে পারবে। টেকনোলজির ব্যবহার, অর্থ ব্যবস্থাপনা, আশ্বস্ত করতে পারা, নেতৃত্ব দেওয়া, দলবদ্ধ হয়ে কাজ করা ইত্যাদি বিষয়ে তাকে দক্ষতা অর্জনে সহযোগিতা করতে হবে।
১১. তারবিয়াত হলো: সন্তানের জন্য সৎসঙ্গের ব্যবস্থা করা। প্রিয় বোন, আপনার সন্তানের জন্য একজন উত্তম বন্ধু তালাশ করুন। এমনকি যদি প্রয়োজন পড়ে তা হলে বিভিন্ন দ্বীনদার ও শিক্ষিত অভিভাবকের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলুন।
১২. তারবিয়াত হলো: সন্তানকে পরিবারের প্রত্যেকের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য শিখিয়ে দেওয়া। যেন সে ভাইয়ের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক রাখে আর বোনের প্রতি হয় স্নেহশীল।
১৩. তারবিয়াত হলো: সন্তানদের দৃঢ়তা শিক্ষা দেওয়া। যেকোনো ধরনের ফলাফল গ্রহণ করে নিতে প্রস্তুত করা। জীবনে দুঃখ-কষ্ট যা আসবে তার মোকাবিলা করা এবং খারাপ ফলাফল সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করে নেওয়ার শিক্ষা দেওয়া। তাদেরকে বুঝাতে হবে যে, তারা এখানে প্রশান্তি কিংবা নাজ-নিয়ামাতে ডুবে থাকতে আসেনি। এই দুনিয়া প্রতিদান পাওয়ার স্থান নয়, বরং পরীক্ষার স্থান।
১৪. তারবিয়াত হলো: সন্তানদের কুরআনের সাথে সম্পৃক্ত করা। তাদের মাঝে কুরআন বুঝার সক্ষমতা এবং এর মাধ্যমে প্রমাণ পেশ করার যোগ্যতা তৈরি করা। আর এটি তখনই সম্ভব হবে যখন তাদের ভেতর আরবির প্রতি ভালোবাসা তৈরি করে দেওয়া যাবে।
১৫. তারবিয়াত হলো: সন্তানদের এই শিক্ষা দেওয়া যে, একমাত্র আল্লাহ তাআলার বিধান অনুসারেই মুমিন তার জীবন পরিচালনা করবে। এই বিধান ছাড়া অন্য কোনো সংবিধানকে যেন তারা স্বীকার না করে। বিশেষ করে এই সময়ে তাদেরকে আরও বেশি সচেতন করতে হবে, যখন দ্বীন বলতে কেবল নির্ধারিত ও সীমাবদ্ধ কতিপয় অনুষ্ঠান পালনকে বুঝানো হচ্ছে, যখন সম্মান ও মর্যাদা নির্ধারিত হচ্ছে জনগণের চাহিদা ও প্রবৃত্তির ওপর ভিত্তি করে।
১৬. তারবিয়াত হলো : সন্তানের নিকট আল্লাহর একত্ববাদ, আল্লাহর সম্মান এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত করা। এই ভালোবাসা যেন সমস্ত ভালোবাসাকে হার মানায়। তাওহীদকে দূষিত করে এমন সব বিষয় থেকে তারা যেন নিজেদের রক্ষা করে চলে।
১৭. তারবিয়াত হলো : সন্তানের নিকট উম্মাহর পরিচয়কে বড়ো করে তোলা। যেন সে উম্মাহর বর্তমান অবস্থাকে গুরুত্বের সাথে দেখে। হতাশাকে ঝেড়ে ফেলে ইতিবাচক কাজ করতে সক্ষম হয়।
১৮. তারবিয়াত হলো : সন্তানদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা। ভালোবাসা, আস্থা, গুরুত্ব ও সততার প্রমাণ দেওয়ার মাধ্যমেই এই সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব। তাদের সকল সমস্যা মনোযোগ দিয়ে শোনার মাধ্যমে তাদের নৈকট্য অর্জন করতে হবে। এসব করা ছাড়া উপরিউক্ত উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব।
১৯. তারবিয়াত হলো : বয়সের প্রতিটি স্তরের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সন্তানদের পরিচিত করে তোলা। এই ক্ষেত্রে তাদের সাথে গল্প করা, খেলায় অংশ নেওয়া বা বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের আশ্রয় নিয়ে তাদের নিকট ব্যাপারটি খোলাসা করা যেতে পারে।
২০. তারবিয়াত হলো : ব্যক্তিত্ব গঠনের পথে সন্তানদের সামনে যেসব জটিলতা বাধা হয়ে দাঁড়াবে সেগুলোর সমাধানে তাদেরকে সহযোগিতা করা। সেই সাথে তাদের শারীরিক রোগবালাইয়ের দিকেও খেয়াল রাখা জরুরি।
২১. তারবিয়াত হলো : সন্তানদের আদেশ দেওয়ার পূর্বে নিজে ইসলামে অভ্যস্ত হওয়া, শারীআতের প্রতিটি আমল পালন করা। ধীরে ধীরে তাদের সামনে উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে পরিণত হওয়া।
প্রিয় বোন, কুরআন তিলাওয়াতের সময় কিংবা রাসূল-কে স্মরণ করার মুহূর্তে আপনার চোখ থেকে বেয়ে-পড়া অকৃত্রিম এক ফোঁটা অশ্রু সন্তানের হৃদয়ে যে প্রভাব সৃষ্টি করবে তা মাদরাসায় দেওয়া হাজারো পাঠকে হার মানাবে। স্কুলে পাঠানোর ব্যাপারে আপনার দৃঢ়তা অপেক্ষা সালাতের ব্যাপারে আপনার জিদের পরিমাণ যখন সে বেশি দেখতে পাবে তখন তার ভেতরে আপনাতেই আল্লাহর সম্মান তৈরি হবে, বাস্তব জীবনে সবকিছুর আগে আল্লাহর আদেশকে প্রাধান্য দিতে শিখবে। স্বামীর অনুপস্থিতিতেও আপনি যখন নিজ ভূমিকা পালন করতে থাকবেন তখন সন্তানেরা এ থেকে আল্লাহর সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের কথা শিক্ষা পাবে। সোশ্যাল মিডিয়ার খণ্ড খণ্ড আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থেকে আপনি যখন আপনার সন্তানদের সামনে নিয়মিত বই পড়তে থাকবেন তখন এটি তাদের মধ্যে পড়ার প্রতি আগ্রহ ও ভালোবাসা তৈরি করবে। এরপর আপনার পুরো সময়টা আর তাদের শিক্ষা দেওয়ার পেছনে ব্যয় করতে হবে না।
সারকথা, তারবিয়াত হলো এমন একজন মানুষ তৈরি করা, যে একটি মহান লক্ষ্যকে সামনে রেখে বাঁচবে। কোন সে লক্ষ্য? লক্ষ্যটি হলো, নিজ জীবনে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণসাধনে ব্যাপক অর্থের দাসত্ব বাস্তবায়ন করা।
*****
প্রিয় বোন, এখন বুঝতে পেরেছেন তারবিয়াত কী? মানবগঠন বলতে আসলে কী বুঝায়? আপনি রাসূল-এর এই বাণীর মর্মার্থ কী বুঝতে পেরেছেন:
وَهِيَ مَسْئُولَةٌ عَنْ رَعِيَّتِهَا
"নারী তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।”[৮]
নবি-এর এক ভয়ংকর হাদীস শুনুন; যা আপনাকে নিজ দায়িত্বের মহত্ত্ব জানান দেবে:
مَا مِنْ عَبْدِ اسْتَرْعَاهُ اللهُ رَعِيَةٌ فَلَمْ يَحُطَهَا بِنَصِيْحَةٍ إِلَّا لَمْ يَجِدْ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ
"আল্লাহ যখন কোনো বান্দার নিকট কারও দায়িত্ব অর্পণ করেন, আর সে কল্যাণকামিতার সাথে তা ঢেকে না নেয়, তা হলে সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।”[৯]
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রকাশভঙ্গির প্রতি লক্ষ করুন, 'যদি কল্যাণকামিতার সাথে তা ঢেকে না নেয়।' আপনার প্রতি আদেশ হলো, সন্তানদের সবসময় কল্যাণকামিতার সাথে ঢেকে নেওয়া। এর অর্থ এই নয় যে, খুব বেশি উপদেশ আর সমালোচনায় তাদের ব্যস্ত করে রাখবেন। তখন আবার সন্তানদের ভেতর আপনার প্রতি বিরক্তভাব সৃষ্টি হবে। তা হলে তাদেরকে ঢেকে নেবেন কীভাবে? প্র্যাকটিক্যাল শিক্ষার মাধ্যমে, প্রয়োজনের সময় বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেওয়ার মাধ্যমে, ক্ষতি থেকে রক্ষা করার মাধ্যমে, সর্বোপরি সবকিছুতে ভালোবাসা ও স্নেহ-যত্নের আশ্রয় নেওয়ার মাধ্যমে। তাদের ঢেকে নেবেন যাতে চতুর্দিক থেকে ধেয়ে আসা প্রবৃত্তি ও সংশয়ের তির তাদের আক্রান্ত করতে না পারে।
প্রিয় বোন, আপনিই সন্তানকে গড়ে তোলার অধিক উপযুক্ত। ব্যবহারিক আচরণের মাধ্যমে তাদের অন্তরে 'আমানত'কে পাকাপোক্ত করার ক্ষমতা আপনারই আছে। হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান � থেকে বর্ণিত, নবি ﷺ বলেছেন,
أَنَّ الأَمَانَةَ نَزَلَتْ فِي جَذْرِ قُلُوْبِ الرِّجَالِ، ثُمَّ عَلِمُوْا مِنَ الْقُرْآنِ ثُمَّ عَلِمُوْا مِنَ السُّنَّةِ
“প্রথমে মানুষের অন্তরের গভীরে 'আমানত' অবতীর্ণ হয়। তার পর তারা তা কুরআন থেকে শেখে, তার পর সুন্নাহ থেকে শেখে।”[১০]
আমানত কী? আমানত হলো, নিজের সাথে সততা। সন্তানের হৃদয়ে আপনি যদি এই আমানতকে পাকাপোক্ত করতে পারেন তখনই কেবল কুরআন ও সুন্নাহর জ্ঞান তাদের কাজে আসবে। আর যদি তাদের ভেতর এর বীজ বুনতে সক্ষম না হন তা হলে কোনোকিছুই তাদের উপকার পৌঁছাবে না। নিফাকের স্রোতে ভেসে যাওয়া থেকে তাকে রক্ষা করা আর সম্ভবপর হয়ে উঠবে না।
সুফইয়ান সাওরি ؒ-কে তার মা বলেছিলেন: 'প্রিয় বৎস, ইলম অর্জন করতে থাকো। আমিই তোমার জন্য যথেষ্ট। প্রিয় বৎস, যখন তুমি দশটি হাদীস লিখবে তখন নিজের দিকে তাকাবে। এগুলো তোমার হাঁটা-চলা, ধৈর্য ও গাম্ভীর্যে কোনো বৃদ্ধি ঘটিয়েছে কি না দেখবে। যদি দেখো তোমার কোনো পরিবর্তনই হয়নি, তা হলে জেনে নিয়ো, এই ইলম তোমার কেবল ক্ষতিই করেছে, কোনো উপকার করতে পারেনি। [১১]
এই মহীয়সী মা সন্তানকে এই কথা বলেননি, এমন কিছু করো যাতে গৌরবে আমি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারি। পাশের বাসার চাচাতো ভাইকে দেখো, তোমাকে কিন্তু তাকে ছাড়িয়ে যেতে হবে। বরং তিনি বলেছিলেন, আমি চাই, তোমার ইলম যেন তোমার চরিত্রে প্রভাব ফেলে। মা তার সন্তানকে ইলমের আমানত শিখাতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল ও ইমাম শাফিয়ি ইয়াতীম অবস্থায় বেড়ে উঠেছিলেন। তাদের তারবিয়াতের সবটুকু দায়িত্ব তাদের মায়েরাই আঞ্জাম দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তারাই তো হয়ে উঠেছিলেন, উম্মাহর ইলম ও আমলের নাবিক।
আপনিই এতসব খেয়াল রেখে তাদের যোগ্য করে গড়ে তোলার উপযুক্ত। কেননা তারা আপনারই সন্তান। শত স্কুল, ডে-কেয়ার, টিউটর আপনার বিকল্প হতে পারে না। অতএব ইসলাম যখন মাকে সম্মান দেয়, যখন তার পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত বলে ঘোষণা করে তখন এতে অবাক হবেন না। একজন মায়ের দায়িত্ব শুধু এটুকুই নয় যে, তিনি সন্তান প্রসব করে সন্তানকে কেবল রক্ত, গোশত আর হাড়ে বড়ো করে তুলবেন। মায়ের দায়িত্ব ব্যাপক। ওপরে বর্ণিত সবগুলো বিষয়ই তাকে খেয়াল রাখতে হয়, যথাযথভাবে আঞ্জাম দিতে হয়। ইসলাম মায়ের যে বিশাল মর্যাদা দিয়েছে তার একটি অন্যতম কারণ হলো মায়ের এই মহৎ দায়িত্ব পালন।
*****
সমাজে বেশ প্রচলিত একটি বাক্য হলো, 'তারবিয়াত শেখার কী আছে? এটাতে এত গুরুত্ব দিতে হবে না। সন্তান পরিচর্যা নিজ থেকেই তো শেখা হয়ে যায়।'
একদিকে তো এই কথা বলছি, অন্যদিকে সার্টিফিকেট অর্জনের পেছনে অন্ততপক্ষে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিশটি বসন্ত আমরা ব্যয় করছি। এমন দ্বিমুখী আচরণের কারণে আমাদের কাছ থেকে সন্তানদের নিকট একটি নেতিবাচক মেসেজ পৌঁছে। তারা ভাবতে শুরু করে, আল্লাহর দাসত্ব করা জীবনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নয়। আমাদের আচরণের কারণে দিনের পর দিন তারা উদাসীনতার পথে হাঁটতে থাকে।
ঠিক এই সমস্যার কথা জানিয়ে কমেন্ট করেছিলেন একবোন। তিনি বলেন:
'আমি মনে করি, এই চিন্তার সবচেয়ে বড়ো শিকার হতে হয়েছে আমাকে। আমার তারবিয়াত ছিল অনেকটা এমন: তুমি শুধু পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকবে। আমরা চাই, তুমি বইয়ের ভেতর ডুবে থাকো। এভাবেই ভালো গ্রেড অর্জন করা যায়। আর ভালো গ্রেড পেলে তবেই তো উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অ্যাডমিশন নিতে পারবে।
আমি তাদের আশা পূরণ করেছি। ভালোমানের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিও হয়েছি। তার পর আমার বিয়ে হয়ে গেল। অথচ ঘর পরিচালনা করার ন্যূনতম জ্ঞানও তখন আমার ছিল না। এমনকি স্বামীর সাথে কী আচরণ করতে হয় কিংবা সন্তানদের কীভাবে গড়ে তুলতে হয় সে ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না। সেই সাথে এই তীব্র অনুশোচনাবোধও নিজের ভেতর কাজ করছিল যে, হায়, অনার্সের পর আমি আর উচ্চশিক্ষা পরিপূর্ণ করতে পারলাম না!
পরিবারের কাছ থেকে আমি এই মেসেজ পেয়েছিলাম যে, কর্মক্ষেত্রে তুমি যা অর্জন করবে, অফিসে যে পদে তুমি উন্নীত হবে তার মাধ্যমেই তোমার মূল্য নির্ধারিত হবে। আর এই ঘরবাড়ি, এগুলো তো স্বাভাবিক বিষয়। প্রত্যেক নারীরই এসব থাকে। কীভাবে থাকে কিংবা ফলাফল কী এসব গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমরা তোমাকে নিয়ে গর্ব করতে পারছি কি না সেটাই।'
'এই ঘরবাড়ি তো স্বাভাবিক বিষয়। প্রত্যেক নারীরই এসব থাকে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমরা তোমাকে নিয়ে গর্ব করতে পারছি কি না সেটাই!' এই কথাগুলো একটু গভীরভাবে ভাবুন, নিজের সাথে মেলানোর চেষ্টা করুন।
অন্য আরেক বোন কমেন্টে জানিয়েছিলেন,
'তার স্বামী তাকে এই কথা বলে লজ্জা দেন যে, 'তুমি তো আর অমুক নারীর মতো হতে পারলে না। দেখো, সে চাকরি করে অনেক টাকা কামাই করে। আর তুমি কিনা ছেলে-সন্তান আর ঘরের দোহাই দিয়ে যাচ্ছ? এগুলো তো সব নারীরই থাকে!' কল্পনা করতে পারেন! 'গৃহিণী' শব্দটিকে কীভাবে আমাদের সামনে বিকৃত করা হয়েছে। বর্তমানে এই শব্দটি আমাদের মস্তিষ্কে কিছু বস্তুগত অর্থে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। গৃহিণী কী করে? রান্নাবান্না করে, থালাবাসন পরিষ্কার করে, কাপড় কাচে, ঘর ঝাড়ু দেয়!
এখন এই কথা খুব ঘনঘন কানে আসে যে, অমুক রক্ষণশীল পরিবারের সন্তান নাস্তিক হয়ে গেছে কিংবা সমকামিতার দিকে ঝুঁকে পড়েছে আর তাদের পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজন হতভম্ব হয়ে পড়েছেন। কীসের কারণে হতভম্ব হচ্ছেন? তারা কি তাদের সন্তানদের যথাযথভাবে রক্ষা করেছিলেন? নবি আমাদের যেভাবে আদেশ করেছিলেন, তাকে কি ঠিক সেভাবে কল্যাণকামিতার সাথে তাদের ঢেকে রেখেছিলেন? নাকি তাদের অবহেলা আর উদাসীনতার সুযোগে শত্রু আরামসে তাদেরকে নিজ দলে ভিড়িয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিল?
টিকাঃ
[৮] বুখারি, ২৫৫৪; মুসলিম, ১৮২৯।
[৯] বুখারি, ৭১৫০; মুসলিম, ১৪২।
[১০] বুখারি, ৬৪৯৭।
[১১] সফওয়াতুস সফওয়া, ২/১১০।
📄 শিক্ষাব্যবস্থা কি তারবিয়াতের এই উদ্দেশ্যগুলো বাস্তবায়ন করতে সক্ষম?
এখন প্রশ্ন করতে পারেন: স্কুলে এই উদ্দেশ্যগুলোর কতটুকুই বা বাস্তবায়ন করা হয়? নাকি তারা এগুলোকে বাস্তবায়ন করবে দূরে থাক ধ্বংস করতে উঠেপড়ে লেগেছে?
* প্র্যাকটিক্যালি আপনারা একটি কাজ করতে পারেন। যখন সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করাতে যাবেন তখন ওপরে বর্ণিত তারবিয়াত সংবলিত একটি তালিকা সাথে করে নিয়ে যাবেন। কর্তৃপক্ষকে বিনয়ের সাথে জিজ্ঞেস করবেন: 'এই উদ্দেশ্যের কয়টি আপনারা পূরণ করছেন আমাকে কি বলা যায়? আর এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে কোন কোন পদক্ষেপ বা কোন কার্যপ্রণালি আপনারা হাতে নিয়েছেন?'
কয়েক বছর পূর্বে এক সরকারি হাসপাতালের দুই ডাক্তারের দুর্নীতি হাতেনাতে ধরা পড়ে। তারা কোনো ক্যান্সার রোগী আসলে তার কাছ থেকে ওষুধ খরচ বাবদ উপর্যুপরি টাকা উসুল করে নিত কিন্তু সে ওষুধগুলো রোগীকে না দিয়ে কালোবাজারে বিক্রয় করত। তাদের এই অপকর্মের সাথে হাসপাতালের কিছু নার্সও জড়িত ছিল। আর রোগীকে এই ওষুধগুলোর পরিবর্তে ইনজেকশন ও নরমাল স্যালাইন দেওয়া হতো। সোজা কথায়, পানি আর লবণ গুলিয়ে খাওয়ানো হতো!
বেশ ভয়ংকর বিষয় তাই না? অথচ এই ভয়ংকর ঘটনাই প্রতিনিয়ত ঘটছে অধিকাংশ মুসলিম সন্তানদের সাথে। তাদের প্রয়োজন মূর্খতা ও প্রবৃত্তি রোগের চিকিৎসা। কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষাব্যবস্থায় তাদের জন্য যা রাখা আছে তা হয়তো নরমাল স্যালাইন না হয় বিষ! আর বাবা-মা তাদের সন্তানদের এই স্কুলগুলোতেই পাঠিয়ে ভাবতে শুরু করেন, যাক, শেষমেশ দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে আদায় করতে সক্ষম হলাম!
রোগীকে চিকিৎসাহীন অবস্থায় ফেলে রাখা ততটা ভয়ংকর নয়, যতটা ভয়ংকর তার শরীরে নরমাল স্যালাইন বা বিষ দেওয়ার পর চিকিৎসা হচ্ছে ভেবে বসে থাকা।
📄 আপনার কথামতো তা হলে তো প্রত্যেক মায়েরই উচ্চশিক্ষিতা বা আলিমা হতে হবে?
হয়তো প্রশ্ন আসতে পারে : তারবিয়াতের ক্ষেত্রে আপনি নারীর যে ভূমিকার কথা বলছেন তা মোটামুটি অসম্ভব। কারণ আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে প্রত্যেক মায়েরই উচ্চশিক্ষিতা বা আলিমা হতে হবে।
প্রিয় বোন, আপনার সন্তানদের অন্তরে আপনি শুধুমাত্র মূলভিত্তিটিই তৈরি করে দেবেন। তাদেরকে সঠিক পথটি দেখিয়ে দেবেন। তাদের অন্তরে, তারা যা জেনেছে সে অনুযায়ী কাজ করার উদ্দীপনা সৃষ্টি করে দেবেন।
এরপর আপনার ভূমিকা হলো, শুধুমাত্র তাকে সহযোগিতা করা আর সাহস জোগানো মাত্র। যেমন, কারও কাছ থেকে কিছু একটা শোনার পর তার অন্তরে সংশয়-সন্দেহের দানা বাঁধল। তখন আপনার ভূমিকা কী হবে? তাকে বলবেন : 'বৎস, চল একসাথে আমরা এর উত্তর অনুসন্ধান করি।' আপনি তাকে নির্ভরযোগ্য বই বা উৎসের সাথে পরিচিত করাবেন। তাকে এমন মানুষের নিকট নিয়ে যাবেন যার নিকট তার এই প্রশ্নের উত্তর আছে, এমন ব্যক্তি যার কথা সে মনোযোগ দিয়ে শুনবে।
তেমনিভাবে আপনার সন্তানকে কোনো মানসিক সমস্যায় জর্জরিত হতে দেখলে তাকে বলবেন, 'কীভাবে এই সমস্যা থেকে উত্তরণ পাওয়া যায়, চলো আমরা পরামর্শ করি।' এই বিষয়গুলো যথাযথভাবে করতে আশা করি খুব বেশি উচ্চশিক্ষিতা হওয়ার প্রয়োজন নেই।
📄 আপনি তো দেখি তারবিয়াতের সকল বোঝা নারীর ওপরই চাপিয়ে দিলেন!
প্রথমত, বোঝা নয়, বলুন সম্মান। সন্তান প্রতিপালন, চরিত্র সংশোধন ও মানবগঠন... এগুলো নবিদের দায়িত্ব। আর কর্মীর মর্যাদা কর্মের বড়োত্ব দ্বারাই মাপা হয়।
যেহেতু খরচের দায়িত্ব পুরুষের ঘাড়েই চাপে তাই এই দায়িত্ব পালনে স্বাভাবিকভাবেই তার ঘরের বাইরে কিছুটা সময় কাটাতে হয়। জানা কথা, সন্তানের সাথে আপনিই বেশি সময় অতিবাহিত করেন। তাই তারবিয়াতের সুযোগ আপনারই বেশি। তারপরও বলতে হয়, তারবিয়াত বা সন্তান প্রতিপালন পিতামাতার যৌথ দায়িত্ব। আর এতবড়ো দায়িত্ব নিশ্চয় উভয়ের পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই কেবল আঞ্জাম দেওয়া সম্ভব।
আমার একটি ভিডিয়োর কমেন্ট সেকশনে অনেক ভাই আপত্তি জানিয়েছেন এই বলে যে,
'আপনি কি তা হলে এটা বলতে চান যে, আমরা বাইরে কাজকর্ম শেষে যখন ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে ঘরে ফিরব তখন ঘরে বেকার (!) বসে-থাকা স্ত্রীরা আমাদের ওপর ছড়ি ঘুরাবে!? ঘরের বাইরে এত কাজ করার পরও আপনি বলছেন যে, ঘরে গিয়ে স্ত্রীকে সাহায্য করব?!'
আমরা বলি, 'প্রিয় ভাই, আপনার নিকট আমাদের দাবি হলো, স্ত্রীকে যথাসম্ভব সাহায্য করুন, তার নিকট চাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিন। যাতে তিনি একটি মহান দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সে সুযোগ তৈরি করে দিন। মহান সে দায়িত্বটা কী? মানবগঠন। আপনারও উচিত এই দায়িত্ব পালনে তাকে সহযোগিতা করা। বিভিন্ন অজুহাত সামনে এনে তারবিয়াতের এই মহান দায়িত্বে মোটেও ত্রুটি করবেন না। এই কথা বলবেন না যে, 'আমি তো তোমাদের জন্যই ব্যবসা-বাণিজ্য করি। এসবে আমি সময় দিতে পারব না। তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করো, আর আমি আমারটা।' এমনকি দেখা যায়, বাড়িতেও আপনি যে সময়টা অতিবাহিত করছেন তাতে সন্তানদের সময় দেন না বরং মোবাইল ও নেট দুনিয়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
ইসলাম পুরুষের ওপর অভিভাবকত্বের যে দায়িত্ব অর্পণ করেছে সে দায়িত্বের একটি অংশ হলো, সমতা রক্ষা করা আর প্রত্যেককেই প্রাপ্য অধিকার প্রদান করা। মনে রাখতে হবে, ওপরে বর্ণিত হাদীসে আল্লাহর রাসূল ﷺ হুমকি দিয়েছেন যে, যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন না করলে জান্নাতের ঘ্রাণও পাওয়া যাবে না, তা শুধু নারীকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়নি, পুরুষও এর মধ্যে শামিল। আর সন্তানদের তারবিয়াত বা তাদেরকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এমন অনেক বিষয় আছে যা শুধু পুরুষেরই দায়িত্বে পড়ে, নারীর নয়।
بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ
“যেহেতু আল্লাহ তাদের একজনকে অন্যজনের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।”[১২]
যে দায়িত্ব নারীর নয় তার কাছ থেকে তা প্রত্যাশা করা, তাকে জুলুম করার নামান্তর। অতএব প্রিয় ভাই, তারবিয়াতের এই প্রকল্পের নেতৃত্ব আপনারই দিতে হবে। এর সামনে তৈরি হওয়া প্রতিবন্ধকতা আপনাকেই ভাঙতে হবে।
সত্য বলতে, সন্তানদের গড়ে তোলার এই যাত্রা শুরু হয় মূলত উপযুক্ত স্বামী ও উপযুক্ত স্ত্রী নির্বাচনের মাধ্যমে। ফলে তারা এই মহান লক্ষ্য বাস্তবায়নে একে অপরকে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে।
প্রিয় বোন, ধরুন আপনার স্বামী তারবিয়াতের ক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা রাখছে না। আপনি তাকে চাপ দিয়েছেন, আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়েছেন... কিন্তু সে নিরুত্তাপ। তখন আপনিও কি সন্তানদের মাঝপথে ছেড়ে দেবেন?
যদি আপনার স্বামী সন্তানদের পোলিও, হাম, ফক্স বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় টিকা দিতে কেন্দ্রে নিয়ে না যায় তখন কি আপনি বলবেন, 'সে যেহেতু গুরুত্ব দিচ্ছে না আমিই-বা আর একাকী দায়িত্ব পালন করতে যাব কেন?' নাকি আপনার ভেতর থাকা মাতৃত্বের মায়া তাদেরকে টিকাকেন্দ্রে নিয়ে যেতে বাধ্য করবে? অবশ্যই আপনি তাকে নিয়ে যাবেন।
যদি তার শরীরের ক্ষেত্রে আপনার এতই তাড়না থেকে থাকে তা হলে অন্তরের বিষয়ে কেন নয়?
কবি আল-বুসতি সুন্দর বলেছেন,
أَقْبِلْ عَلَى النَّفْسِ وَاسْتَكْمِلْ فَضَابِلَهَا فَأَنْتَ بِالنَّفْسِ لَا بِالْجِسْمِ إِنْسَانُ
অন্তরের দিকে মনোযোগ দাও, উত্তম গুণাবলিতে তা সাজাও। কেননা শরীরের কারণে নয়, তুমি মানুষ হয়েছ সুস্থ হৃদয় দিয়ে।
তারবিয়াতের এই দায়িত্ব কখনোই সহজ দায়িত্ব নয়। কিন্তু যথাসম্ভব চেষ্টা চালিয়ে গেলে আল্লাহ তাআলার সামনে জবাবদিহি করার সুযোগ পাবেন; কিন্তু কোনো চেষ্টাই না করলে তাঁর সামনে দাঁড়ানোর কোনো পথ থাকবে না। আর তারবিয়াতের ক্ষেত্রে বাবার ঘাটতি পূরণ করতে চাইলে আপনি বিভিন্ন প্রশিক্ষণকেন্দ্র, সৎসঙ্গ বা কর্মশালার সহযোগিতাও নিতে পারেন।
টিকাঃ
[১২] সূরা নিসা, ৪: ৩৪।