📄 প্রজ্ঞা অথবা কারণ বর্ণনাসহ উপদেশ দান
প্রজ্ঞা অথবা কারণ বর্ণনাসহ উপদেশ দান
আমাদের মধ্যে অনেকে আছেন তরুণদের উপদেশ দানের ক্ষেত্রে খুব সংক্ষিপ্ত করে থাকেন। অথচ উপদেশ হলো একটা গুরুত্বপূর্ণ অনিবার্য বিষয়। কিন্তু তা এককভাবে যথেষ্ট নয়; বিশেষতঃ এমন বিষয়ে যার পরিণতি সম্পর্কে সে অবগত। যেমনিভাবে শরিয়তের একটি বিধান এককভাবে আলোচনা করা এ অবস্থায় যথেষ্ট নয়। বরং এজাতীয় পরিস্থিতিতে উপদেশ ও বিধান বর্ণনার সাথে যদি কারণ নির্ণয় অথবা রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়; তাহলেই আল্লাহর ইচ্ছায় কেবল তা উপকারী হতে পারে। নিম্নের ঘটনা থেকে আমরা তার উদাহরণ পেশ করতে পারি। ইমাম আহমদ রহ. তার মুসনাদে আবু উমামা রা. থেকে বর্ণনা করেন, 'জনৈক উদীয়মান তরুণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বলল- 'হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে ব্যভিচারের অনুমতি দিন! উপস্থিত জনসাধারণ তাকে তিরস্কার করতে লাগলো। তারা বললো, থামো। চুপ করো। অতঃপর তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- 'তুমি আমার কাছে এসো! এরপর সে তাঁর একেবারে নিকটে চলে গেল। (হাদীস বর্ণনাকারী) বলেন, 'এরপর সে বসে পড়লে তিনি বলেন, 'এটা কি তুমি তোমার মায়ের জন্য পছন্দ করবে?' সে বলল না, আল্লাহর শপথ! আল্লাহ তাআলা যেন আপনার জন্য আমার জীবনের কুরবানী কবুল করেন। তিনি বললেন- 'কোন মানুষই তার মায়ের সঙ্গে এটা পছন্দ করতে পারে না।' আবার বললেন- 'তাহলে তোমার কন্যার জন্য তা পছন্দ করবে?' সে বলল না, আল্লাহর শপথ! হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহ তাআলা যেন আপনার জন্য আমার জীবনের কুরবানী কবুল করেন। তিনি বললেন- 'কোন মানুষই তার কন্যার জন্য এটা পছন্দ করতে পারে না।' আবার বললেন- 'তাহলে তোমার বোনের জন্য তা পছন্দ করবে? সে বলল না, আল্লাহর শপথ! আল্লাহ তাআলা যেন আপনার জন্য আমার জীবনের কুরবানী কবুল করেন। তিনি বললেন- 'কোন মানুষই তার বোনের জন্য এটা পছন্দ করতে পারে না।' তিনি আবার বললেন- 'তাহলে তোমার ফুফির জন্য তা তুমি পছন্দ করবে?' সে বলল না, আল্লাহর শপথ! আল্লাহ তাআলা যেন আপনার জন্য আমার জীবনের কুরবানী কবুল করেন। তিনি বললেন- 'কোন মানুষই তার ফুফির জন্য এটা পছন্দ করতে পারে না।' তিনি আবার বললেন- 'তাহলে তোমার খালার জন্য তা তুমি পছন্দ করবে?' সে বলল না, আল্লাহর শপথ! আল্লাহ তাআলা যেন আপনার জন্য আমার জীবনের কুরবানী কবুল করেন।' তিনি বললেন- 'কোন মানুষই তার খালার জন্য এটা পছন্দ করতে পারে না।” (হাদীস বর্ণনাকারী) বলেন, অতঃপর তিনি তাঁর হাত মুবারক তার গায়ে সস্নেহে বুলাতে বুলাতে বললেন- 'হে আল্লাহ, তুমি ওর পাপরাশি ক্ষমা করে দাও। ওর অন্তরকে পবিত্র ও নিষ্কলুষ করে দাও। এবং ওর লজ্জাস্থানকে তুমি সুসংহত কর।' এরপর সেই উদীয়মান তরুণটি আর কোন দিকে তাকায়নি। '
লক্ষ্য করুন, এখানে তরুণটির নিকট ব্যভিচার নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়টা গোপন ছিলো না। এ কারণেই সে অনুমতি প্রার্থনা করতে এসেছিল। 'আল্লাহকে ভয় কর! এটা হারাম অথবা বৈধ নয়' এখানে এই কথা বললে হয়তো বা তরשটির কোন উপকারে নাও হতে পারতো। তা ছাড়া এ বিধান তারও গোচরীভূত হওয়ার ফলে তার অন্য কোন বিষয়ের প্রয়োজন ছিল। সে কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সঙ্গে বিকল্প পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। তা হলো ব্যভিচার নিষিদ্ধ হওয়ার রহস্য উদ্ঘাটন। রহস্যটা হলো ভিকটিম নিশ্চয় কারো মা, কন্যা, বোন, ফুফি অথবা খালা হয়ে থাকবে। এছাড়া অন্য কিছু হওয়া সম্ভব নয়। তরণ যখন নিজের জন্য তা অনুমোদন করতে পারল না, তাহলে অন্যেরা নিজেদের জন্য তা পছন্দ করবে কিভাবে। কীভাবে এর বৈধতা দেবে? অতএব এই আত্মিক প্রমাণ ঐ উদীয়মান তরুণের অন্তর থেকে উক্ত কুকর্মের বাসনা চিরতরে দমন করে দিয়েছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পক্ষ থেকে সত্য ও সংযমের ওপর দৃঢ়পদ থাকার জন্য দোয়া করা হল।
অতএব এজাতীয় পরিস্থিতিতে আমরাও এরকম পদক্ষেপ নিতে পারি। মূল্যবোধ জাগ্রত করতে পারি। এ ধরনের কর্মের ক্ষেত্রে এরূপ বলা যেতে পারে: 'তুমি তার স্থানে যাও, এবং আমাকে বল তুমি কি করছ?' মানুষ যদি অসংখ্য ব্যাপারে এরূপ কর্ম করতে পারতো, তাহলে মানুষের মধ্যে অনেক সমস্যার সৃষ্টিই হত না। কোন মানুষ যদি নিজেকে তার স্থানে উপস্থান করে যে তার আচরণ ও কর্ম তৎপরতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাহলে কখনো কখনো সে ঐ পথটি অথবা তার নিকটবর্তী কোন পথ অবলম্বন করে থাকবে। সুতরাং কর্তব্য হলো তাকে এই পথের দিশা দেয়া।
টিকাঃ
১৮১ মুসনাদে আহমদ: ২১১৮৫
📄 নৈকট্য অর্জন ও পরস্পর বন্ধুত্ব স্থাপন
নৈকট্য অর্জন ও পরস্পর বন্ধুত্ব স্থাপন
এই বয়সে তরশ অথবা তরণীরা গবেষণা ও পরিকল্পনায় অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকে। অবশ্য এটা তারা উপলব্ধি করতে পারে না। বরং তারা মনে করে গভীর গবেষণা করার সামর্থ্য তাদের রয়েছে যার মাধ্যমে প্রাথমিক তথ্য থেকে ফলাফল চয়ন করা যায় ও গবেষণার উক্ত বিষয়কে তার অংশসমূহের মধ্যে বিভক্ত করা যায়- যার দ্বারা বিষয়টা গঠিত হয়েছে। ফলে তার অন্তর্নিহিত তথ্য উদঘাটিত হয়ে যাবে। ফলশ্রুতিতে সে যখন কোন সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকবে তখন তার চেয়ে যে অভিজ্ঞ ও বড় তার মত দ্বারা আলোকিত অথবা কোন পরামর্শ ব্যতিরেকে অথবা যে কোন পরামর্শের উপযুক্ত নয় এমন ব্যক্তির সঙ্গে পরামর্শ করে সমাধানের প্রচেষ্টা চালাবে। তবে তরুণ, অভিভাবক, মা-বাবা ও শিক্ষকের মধ্যে ভালো সম্পর্ক থাকতে হবে। যেখানে থাকবে ভক্তি, শ্রদ্ধা ও মূল্যায়ন। থাকবে না কোন তাচ্ছিল্য ও অবমূল্যায়ন। সেখানে শুধু থাকবে তরুש সন্তানদের প্রতি উৎসাহ, স্নেহ ও মমতা। তাহলে সে এজাতীয় পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে অবশ্যই অভিভাবকের নিকট বিষয়টা উপস্থাপন করবে নিশ্চয়। তার পরামর্শ নেবে, তিনি যে দিকনির্দেশনা ও উপদেশ দেবেন তা সাদরে গ্রহণ করবে। কাজেই এই পরিস্থিতিতে তরুণের নৈকট্য অর্জন ও তার মধ্যে সুসম্পর্কের বীজ বপণ করা এবং যে সমস্যা তার ভেতরে সৃষ্টি হওয়া সম্ভব সে সম্পর্কে খুব কাছ থেকে জানতে সচেষ্ট থাকা মা-বাবা ও শিক্ষকের একান্ত কর্তব্য।
📄 পবিত্রতা বিষয়ক একটি প্রশিক্ষণ
পবিত্রতা বিষয়ক একটি প্রশিক্ষণ
তরুণ-তরুণীরা বয়োঃসন্ধিক্ষণে উপস্থিত হলে প্রত্যেকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পবিত্রতা অর্জনের বিধানাবলি সংক্রান্ত বিশেষ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। কারণ এ স্তরে নতুন এমন অনেক সমস্যা সৃষ্টি হয় যা ইতোপূর্বে ছিলো না। যে কোন মসজিদে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তাহারাতের বিধানাবলি বিষয়ক একটি প্রশিক্ষণের আয়োজন করা উচিত। সেখানে একজন বিজ্ঞ শিক্ষক দরস পরিবেশন করবেন। অপর দিকে একই সাথে তরণীদের জন্য কোন মহিলা শিক্ষক ক্লাশ নেবেন। এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে সমস্যার প্রকৃত সমাধান। বিশেষ করে আলোচনাটা কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি নয় বরং দলকে সম্মোধন করে হতে হবে। প্রকৃতপক্ষে এর মধ্যে কোন সমস্যা নেই। বরং মসজিদে এজাতীয় প্রশিক্ষণের অনুষ্ঠান আলোচ্য বিষয়ের ভাবগাম্ভীর্য ও মর্যাদাটাকে একটু বৃদ্ধি করে বৈকি। সুতরাং এ বিষয়ে কোন অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য অথবা অযৌক্তিক মন্তব্য করার আর কোন অবকাশ থাকল না। বরং সকলেই অনুভব করতে পারবেন যে, এই হলো প্রকৃত দ্বীন। কারণ এখানে তো একজন বিজ্ঞ আলেমের পক্ষ থেকে দ্বীন অথবা তালেবে ইলম সম্পর্কে আলোচনা হয়ে থাকে। তা আবার এমন স্থানে বসে যেটা কোরআন তেলাওয়াত ও সালাতের মত সৎ কর্ম সম্পাদনের জন্য নির্ধারিত।
📄 শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে নম্রতা ও অনুগ্রহ প্রদর্শন এবং কঠোরতা আরোপ না করা
নম্রতা, অনুগ্রহ প্রদর্শন ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে কঠোরতা আরোপ না করা
ছাত্রের উচ্চ স্থান অর্জনের আগ্রহ কখনো কখনো অভিভাবককে তার করণীয় পর্যন্ত ভুলিয়ে দিয়ে থাকে। ফলে তা শিক্ষার্থীর জন্য দুঃসাধ্য হয়ে যায়। এমনকি শিক্ষার্থী এতে বেশ বিরক্ত হয়েও উঠে। কিন্তু তাদের ধারণ ক্ষমতার দিকে সযত্ন দৃষ্টি রাখলে তবে প্রশিক্ষণ ও প্রতিপালন ফলপ্রসূ হতে পারে। আমাদের প্রাণাধিক প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট সমবয়স্ক একদল যুবক আসল। তারা তাঁর নিকট বিশটি রাত অবস্থান করল। অতঃপর যখন তিনি অনুধাবন করলেন যে, তাদের নিজ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টা তাদের নিকট একটু কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে, তখন তাদেরকে অন্তিম উপদেশ দিলেন। এ প্রসঙ্গে আমাদের নিকট হযরত মালেক বিন হুওয়াইরিছ রা. হাদীস বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, 'আমরা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট আগমন করলাম, তখন আমরা সমবয়স্ক টগবগে যুবক ছিলাম। আমরা তাঁর নিকট বিশ দিন বিশ রাত অবস্থান করলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন কোমলহৃদয় ও বিনম্র প্রকৃতির মানুষ। এরপর যখন তিনি বুঝতে পারলেন আমরা নিজেদের পরিবারের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করছি এবং আমাদের কষ্ট হচ্ছে। আমরা যাদের পেছনে রেখে এসেছি তাদের সম্পর্কে আমাদেরকে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন। তখন আমরা তার নিকট সবকিছু খুলে বললাম। তিনি বললেন- 'তোমরা তোমাদের পরিবারের নিকট ফিরে যাও এবং তাদের মধ্যে অবস্থান করো। তাদেরকে শিক্ষা দাও। তাদেরকে আদেশ করো।' আরো কিছু বিষয় উল্লেখ করেছেন যা আমি মনে রাখতে পেরেছি অথবা আমার মনে নেই। 'তোমরা সালাত আদায় করো যেভাবে তোমরা আমাকে সালাত আদায় করতে দেখেছ। অতএব যখন নামাজের সময় উপস্থিত হবে তখন তোমাদের মধ্যে একজন আযান দেবে ও তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বিজ্ঞজন নামাজে তোমাদের ইমামতি করবে। '
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তাদের পরিবারের দিকে আগ্রহ লক্ষ্য করলেন তখন তাদেরকে সেদিকে ফিরিয়ে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে অনেক মূল্যবান উপদেশ দিলেন। এই হাদীস থেকে এ বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, শিক্ষার্থীর সঙ্গে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া ও তার প্রয়োজন সম্পর্কে অবহিত হওয়া তাদের প্রতি বিনম্র হওয়া ও মানবিক দুর্বলতাকে অবজ্ঞা না করা শিক্ষক ও অভিভাবকবৃন্দের একান্ত কর্তব্য। সুতরাং তাদের সঙ্গে এরূপ আচরণ করবেন না যাতে তাদের কষ্ট হয়। তারা ফেরেস্তা নয়, বরং তারাও অন্য মানুষের মতই মানুষ।
টিকাঃ
১৮২. বুখারী: ৫৯৫