📄 তরুণের অন্তরের সংরক্ষণ
তরুণের অন্তরের সংরক্ষণ
তরুণের বিভিন্ন দিকের পরিপূর্ণতা অর্জনের সাথে সাথে পরিবার, মসজিদ ও বিদ্যালয়ের মত পরিচিত গণ্ডির বাহির থেকেও জ্ঞান আহরণ ও গ্রহণ করার সামর্থ্য অর্জিত হয়ে থাকে। অতএব দুষ্ট লোকের দুষ্টামী যেন কল্যাণকামী লোকের কল্যাণের ওপর কার্যত দ্রুতগামী হতে না পারে। সমগ্র দেহের মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো হৃদপিণ্ড। হৃদপিণ্ড সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'হৃদপিণ্ড সুস্থ থাকলে গোটা দেহই সুস্থ থাকবে। পক্ষান্তরে তা অসুস্থ্য হয়ে পড়লে গোটা শরীরটাই অসুস্থ হয়ে পড়বে। সুতরাং এই হৃদপিণ্ডের সযত্ন পরিচর্যার জন্য যার মাধ্যমে হৃদপিণ্ড সুস্থ থাকতে পারবে ঐ বিষয়গুলোর দিকে দিকনির্দেশনা দিতে হবে। তার মধ্যে অন্যতম হলো : কিয়ামুল লাইলের প্রতি অনুপ্রাণিত করা। সাহাবায়ে কেরামের প্রাথমিক প্রজন্মগুলো কিয়ামুল লাইলের ওপর প্রশিক্ষিত ও প্রতিপালিত হয়েছিলেন- যাদের সৌজন্যে সেকালে ইসলামী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। আল্লাহ তাআলা কিয়ামুল লাইল সম্পর্কে ইরশাদ করেন-
إِنَّ نَاشِئَةَ اللَّيْلِ هِيَ أَشَدُّ وَطْئًا وَأَقْوَمُ قِيلًا. (المزمل - 6 )
'নিশ্চয় এবাদতের জন্য রাত্রিতে উঠা প্রবৃত্তি দলনে সহায়ক এবং স্পষ্ট উচ্চারণের অনুকূল।
ইবনে কাছির রহ. বলেন, 'উদ্দেশ্য হলো কিয়ামূল লাইল রসনা ও হৃদপিন্ডের মাঝে সুদৃঢ় বন্ধন স্থাপনকারী এবং কোরআন তেলাওয়াতে একাগ্রতা সৃষ্টিকারী। সেকারণে আল্লাহ তাআলা বলেন, 'هِي أَشَدُّ وَطَنَّا وَأَقْوَمُ قِيلًا অর্থাৎ তা কিয়ামুন্নাহারে কোরআন তেলাওয়াত ও তা অনুধাবন করার চেয়ে অন্তরে বেশি একাগ্রতা সৃষ্টিকারী। কারণ দিবস হলো মানুষের কাজের জন্য বেরিয়ে পড়া শব্দদূষণ ও জীবিকা নির্বাহের সময়। ১৮০ কতই না উত্তম সেই অভিভাবক যে নিজে কিয়ামুল লাইল আদায় করে ও তার তরুণ ছেলে মেয়েদেরকেও নামাজের জন্য জাগ্রত করে তাদেরকে নিয়ে যতটুকু সম্ভব এক সঙ্গে জামাত সহকারে সালাত আদায় করার চেষ্টা করে থাকেন। তাদের নিদ্রা ভঙ্গের জন্য যৎ কিঞ্চিত পানি ছিটানোর সহায়তা নেয়া যেতে পারে। এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে ইঙ্গিতও রয়েছে। যেভাবে তরুণ- তরুণীদের সামনে পরকালের তথা জান্নাতের আলোচনারও পুনরাবৃত্তি করতে পারে। জান্নাতে প্রবেশ করার করণীয় সম্পর্কে আলোচনা করতে পারেন। এমনিভাবে জাহান্নামের বিবরণ দিবেন। তাদের সামনে নবী ও রাসূলদের ইতিহাস, জীবনী ও আল্লাহর পথে তারা যে অবর্নণীয় দুঃখ কষ্ট ও অসহনীয় নির্যাতন ভোগ করেছেন। কিভাবে তারা এ সংকটময় পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ করেছেন। নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জন্য কি কি সাহায্য এসেছে তা পর্যালোচনা করতে পারেন।
টিকাঃ
১৭৮ বুখারী-৫০, মুসলিম-২৯৬৯
১৭৯ সুরা মুয্যাম্মিল: ৬
১৮০. তাফসীরে ইবনে কাছির إِنَّ نَاشِئَةَ اللَّيْلِ এর ব্যখ্যা
📄 কুরআন ও সুন্নাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আঁকড়ে ধরা
কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আঁকড়ে ধরা
পবিত্র কোরআন ও হাদীসে রাসূলের বিশুদ্ধতা এবং এতদুভয়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অথবা প্রতিদ্বন্দ্বী সকল কিছুর অসারতা মুসলিম উম্মাহর নিকট একটি জাজ্বল্যমান ও দিবালোকের ন্যায় প্রতিষ্ঠিত সত্য। অধিকাংশ মুসলমান এমনকি তাদের শিশুরা পর্যন্ত বিষয়টা সংক্ষিপ্তভাবে অনুধাবন করে থাকে। কিন্তু অনৈসলামী সমাজগুলো থেকে অসংখ্য দৃষ্টিভঙ্গি ও গবেষণা আমাদের সমাজের মধ্যে অনুপ্রবেশ করেছে। যার কোনোটা লেখনী আবার কোনোটা প্রচারমাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে থাকে। কোনোটা আবার কোন কোন মুসলিম দেশের শিক্ষাকারিকুলামকেও দংশন করতে সক্ষম হয়েছে। এ দৃশ্যপটে একজন অভিভাবকের কর্তব্য হলো, ঐ দৃষ্টিভঙ্গি ও গবেষণাগুলো সম্পর্কে সতর্ক হওয়া যা তার চতুর্পাশের পরিবেশের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়। সেগুলোর কোরআন ও সুন্নাহর পরিপন্থী হওয়ার বিবরণ দেয়া প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে এ বিষয়ের ওপর রচিত ছোট ছোট পুস্তিকার সহায়তা নেয়া যেতে পারে। যার মধ্যে অত্যন্ত সহজ সাবলীলভাবে উক্ত দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরা হয়েছে।
📄 জ্ঞানগর্ভ আলোচনা ও তরুণকে পরিতুষ্ট করা
জ্ঞানগর্ভ আলোচনা ও তরুণকে পরিতুষ্ট করা
এই বয়সে তরুণ-তরুণীদের বুদ্ধিমত্তা শরিয়তের বিধানাবলির ক্ষেত্রে সে নির্দেশপ্রাপ্ত হওয়ার প্রমাণে পরিপূর্ণতা অর্জন করে থাকে। এই অবস্থায় অভিভাবকের গবেষণাসমূহ, দৃষ্টিভঙ্গি ও পরিকল্পনা চর্চার প্রয়াস যদি অতৃপ্তিদায়ক হয়, তাহলে সেটা কখনোই ফলপ্রসূ হবে না। তরুণ-তরুণীদের নিকট তার কোন গ্রহণযোগ্যতা অথবা আহ্বান না থাকলে তা কখনোই ফলপ্রসূ হবে না। কাজেই আলোচনা, পরিতুষ্ট করা ও প্রমাণসহ দাবী উত্থাপণ ব্যতীত কোন গত্যন্তর নেই। কারণ, তরুণ-তরুণীরা এ বয়সে পৌঁছলে আলোচনা হৃদয়ঙ্গম করা ও অপরাপর বিষয়গুলো বোঝার মত আল্লাহ প্রদত্ত যোগ্যতা তাদের অর্জিত হয়ে থাকে। এমনকি তারা ভুল ও শুদ্ধ এবং এতদুভয়ের প্রমাণাদিও উপলব্ধি করতে পারে। কথোপকথন ও পরিতুষ্ট করণের দ্বারা উদ্দেশ্য এটা নয় যে, অভিভাবক যা বলবে সবকিছুই সে বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নেবে। কারণ দৃষ্টিভঙ্গি গবেষণা ও পরিকল্পনা সংক্রান্ত গবেষণামূলক বিষয়গুলো সাংঘর্ষিক ও নিষ্ক্ষেপযোগ্য। কোন প্রকারের চাপ অথবা বল প্রয়োগ না করে এ বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণনা করে যাবেন। তবে নিশ্চিত প্রমাণিত বিষয়, অধিকাংশ ওলামার বক্তব্য অথবা পার্থিব বিষয়ে অধিকাংশ বিজ্ঞানীদের মতামত কেবলমাত্র বাধ্যমূলক করা যাবে। কিন্তু তা নিরেট অভিভাবকের মত হতে পারবে না। এ সবই হলো জ্ঞানগত অথবা তথ্যগত বিষয়ে। যেমন: বিশ্বাস পরিকল্পনা ও গবেষণা।
পক্ষান্তরে অভিভাবকের জন্য কার্যগত বিষয়সমূহ সন্তানের জন্য বাধ্যতামূলক করা বৈধ, যেখানেই কর্ম সম্পাদনই হলো মূখ্য কাম্য। তবে অবশ্যই তা তরুণ-তরুণী সন্তানদের কল্যাণ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। উদাহরন স্বরূপ, বাবা যদি এক মহল্লা থেকে অন্য মহল্লায় অথবা এক বাড়ী থেকে অন্য বাড়ীতে স্থানান্তরিত হতে সংকল্প করে থাকেন, তাহলে বিষয়টা তিনি সন্তানদের সামনে উপস্থাপন করবেন এবং এ ব্যাপারে তাদের মতামত নেবেন। কিন্তু আলোচনার পরও যদি তারা কোনরূপ পরিতুষ্টি অর্জন করতে না পারে তাহলেও এক্ষেত্রে অভিভাবকের উক্ত কর্ম সম্পন্ন করা বৈধ হবে।
📄 প্রজ্ঞা অথবা কারণ বর্ণনাসহ উপদেশ দান
প্রজ্ঞা অথবা কারণ বর্ণনাসহ উপদেশ দান
আমাদের মধ্যে অনেকে আছেন তরুণদের উপদেশ দানের ক্ষেত্রে খুব সংক্ষিপ্ত করে থাকেন। অথচ উপদেশ হলো একটা গুরুত্বপূর্ণ অনিবার্য বিষয়। কিন্তু তা এককভাবে যথেষ্ট নয়; বিশেষতঃ এমন বিষয়ে যার পরিণতি সম্পর্কে সে অবগত। যেমনিভাবে শরিয়তের একটি বিধান এককভাবে আলোচনা করা এ অবস্থায় যথেষ্ট নয়। বরং এজাতীয় পরিস্থিতিতে উপদেশ ও বিধান বর্ণনার সাথে যদি কারণ নির্ণয় অথবা রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়; তাহলেই আল্লাহর ইচ্ছায় কেবল তা উপকারী হতে পারে। নিম্নের ঘটনা থেকে আমরা তার উদাহরণ পেশ করতে পারি। ইমাম আহমদ রহ. তার মুসনাদে আবু উমামা রা. থেকে বর্ণনা করেন, 'জনৈক উদীয়মান তরুণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বলল- 'হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে ব্যভিচারের অনুমতি দিন! উপস্থিত জনসাধারণ তাকে তিরস্কার করতে লাগলো। তারা বললো, থামো। চুপ করো। অতঃপর তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- 'তুমি আমার কাছে এসো! এরপর সে তাঁর একেবারে নিকটে চলে গেল। (হাদীস বর্ণনাকারী) বলেন, 'এরপর সে বসে পড়লে তিনি বলেন, 'এটা কি তুমি তোমার মায়ের জন্য পছন্দ করবে?' সে বলল না, আল্লাহর শপথ! আল্লাহ তাআলা যেন আপনার জন্য আমার জীবনের কুরবানী কবুল করেন। তিনি বললেন- 'কোন মানুষই তার মায়ের সঙ্গে এটা পছন্দ করতে পারে না।' আবার বললেন- 'তাহলে তোমার কন্যার জন্য তা পছন্দ করবে?' সে বলল না, আল্লাহর শপথ! হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহ তাআলা যেন আপনার জন্য আমার জীবনের কুরবানী কবুল করেন। তিনি বললেন- 'কোন মানুষই তার কন্যার জন্য এটা পছন্দ করতে পারে না।' আবার বললেন- 'তাহলে তোমার বোনের জন্য তা পছন্দ করবে? সে বলল না, আল্লাহর শপথ! আল্লাহ তাআলা যেন আপনার জন্য আমার জীবনের কুরবানী কবুল করেন। তিনি বললেন- 'কোন মানুষই তার বোনের জন্য এটা পছন্দ করতে পারে না।' তিনি আবার বললেন- 'তাহলে তোমার ফুফির জন্য তা তুমি পছন্দ করবে?' সে বলল না, আল্লাহর শপথ! আল্লাহ তাআলা যেন আপনার জন্য আমার জীবনের কুরবানী কবুল করেন। তিনি বললেন- 'কোন মানুষই তার ফুফির জন্য এটা পছন্দ করতে পারে না।' তিনি আবার বললেন- 'তাহলে তোমার খালার জন্য তা তুমি পছন্দ করবে?' সে বলল না, আল্লাহর শপথ! আল্লাহ তাআলা যেন আপনার জন্য আমার জীবনের কুরবানী কবুল করেন।' তিনি বললেন- 'কোন মানুষই তার খালার জন্য এটা পছন্দ করতে পারে না।” (হাদীস বর্ণনাকারী) বলেন, অতঃপর তিনি তাঁর হাত মুবারক তার গায়ে সস্নেহে বুলাতে বুলাতে বললেন- 'হে আল্লাহ, তুমি ওর পাপরাশি ক্ষমা করে দাও। ওর অন্তরকে পবিত্র ও নিষ্কলুষ করে দাও। এবং ওর লজ্জাস্থানকে তুমি সুসংহত কর।' এরপর সেই উদীয়মান তরুণটি আর কোন দিকে তাকায়নি। '
লক্ষ্য করুন, এখানে তরুণটির নিকট ব্যভিচার নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়টা গোপন ছিলো না। এ কারণেই সে অনুমতি প্রার্থনা করতে এসেছিল। 'আল্লাহকে ভয় কর! এটা হারাম অথবা বৈধ নয়' এখানে এই কথা বললে হয়তো বা তরשটির কোন উপকারে নাও হতে পারতো। তা ছাড়া এ বিধান তারও গোচরীভূত হওয়ার ফলে তার অন্য কোন বিষয়ের প্রয়োজন ছিল। সে কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সঙ্গে বিকল্প পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। তা হলো ব্যভিচার নিষিদ্ধ হওয়ার রহস্য উদ্ঘাটন। রহস্যটা হলো ভিকটিম নিশ্চয় কারো মা, কন্যা, বোন, ফুফি অথবা খালা হয়ে থাকবে। এছাড়া অন্য কিছু হওয়া সম্ভব নয়। তরণ যখন নিজের জন্য তা অনুমোদন করতে পারল না, তাহলে অন্যেরা নিজেদের জন্য তা পছন্দ করবে কিভাবে। কীভাবে এর বৈধতা দেবে? অতএব এই আত্মিক প্রমাণ ঐ উদীয়মান তরুণের অন্তর থেকে উক্ত কুকর্মের বাসনা চিরতরে দমন করে দিয়েছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পক্ষ থেকে সত্য ও সংযমের ওপর দৃঢ়পদ থাকার জন্য দোয়া করা হল।
অতএব এজাতীয় পরিস্থিতিতে আমরাও এরকম পদক্ষেপ নিতে পারি। মূল্যবোধ জাগ্রত করতে পারি। এ ধরনের কর্মের ক্ষেত্রে এরূপ বলা যেতে পারে: 'তুমি তার স্থানে যাও, এবং আমাকে বল তুমি কি করছ?' মানুষ যদি অসংখ্য ব্যাপারে এরূপ কর্ম করতে পারতো, তাহলে মানুষের মধ্যে অনেক সমস্যার সৃষ্টিই হত না। কোন মানুষ যদি নিজেকে তার স্থানে উপস্থান করে যে তার আচরণ ও কর্ম তৎপরতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাহলে কখনো কখনো সে ঐ পথটি অথবা তার নিকটবর্তী কোন পথ অবলম্বন করে থাকবে। সুতরাং কর্তব্য হলো তাকে এই পথের দিশা দেয়া।
টিকাঃ
১৮১ মুসনাদে আহমদ: ২১১৮৫