📄 দোষ-ত্রুটি অনুসন্ধান-পর্যবেক্ষণ ও তার অজুহাত অগ্রাহ্য কিংবা অবিশ্বাস করণ
দোষ-ত্রুটি অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণ করা ও অজুহাত পেশ অগ্রাহ্য কিংবা অবিশ্বাস করার ফলে কখনো কখনো তরুণ-তরুণীদের থেকে এমন অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে যা কেউ দেখেনি অথবা কেউ টের পায়নি। সে কারণে অভিভাবক অনুসন্ধান ও ছিদ্রান্বেষণ করতে থাকে তার কোন অপরাধ সংঘটিত হয়ে যেতে পারে এ আশংকায়। অতঃপর সেটা নিয়ে তার মুখোমুখি হয়। অথচ কেবলমাত্র কিছু অলীক কল্পনা ও নিছক আশঙ্কা ছাড়া তার কাছে কোন গ্রহণযোগ্য প্রমাণ নেই। এতে সম্পর্ক ছিন্ন করা, সন্দেহের বীজ বপন ও আস্থা হীনতা ব্যতীত অন্য কোন উপকারিতা নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- 'রাষ্টপ্রধান যদি প্রজা সাধারণের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি করে দেন, তাহলে তিনি যেন তাদেরকে ধ্বংস করে দিলেন। ১৭৪ কখনো কখনো তরশ-তরশীদের থেকে এমন কিছু কর্মও সংঘটিত হয়ে থাকে যাকে ভুল হিসেবে আখ্যায়িত করা যায় যদি এ ব্যপারে সে কোন ওজর পেশ করে তবুও। বাস্ত বেও যদি সেটা যুক্তিসঙ্গত অপারগতার উপযুক্ত হয় তবুও অভিভাবকের এই কথা বলে তাকে দিকনির্দেশনা উচিত হবে না তুমি মিথ্যাবাদী ইত্যাদি। এমনকি এ মর্মে একাধিক আলামত তার নিকট প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ঐ বাহানা প্রকাশ তার জন্য বিশুদ্ধ নয়। কারণ এভাবে পরিত্রাণের প্রচেষ্টাই প্রমাণ করে যে, তার কর্মকাণ্ডের মন্দানুভূতি তার হয়েছে। কেবল এই অনুভূতিই তাকে সে কর্ম থেকে দূরে রাখতে সক্ষম। 'সে বলেছে অথবা করেছে' অভিভাবক কর্তৃক এ মর্মে চাপ প্রয়োগ অভিভাবকের অন্তরের রুক্ষতা ও কাঠিন্য প্রমাণ ভিন্ন অন্য কোন ফল দেবে না। কারণ, সে যতক্ষণ বিশ্বাস করবে যে, তার এ কর্ম সম্পর্কে কেউ অবহিত নয়, তা গোপন রাখতে ও কারো নিকট প্রকাশ না করতে সে আপ্রাণ চেষ্টা করবে। এটাই তার কল্যাণের দিকে ধাবিত হওয়ার সঠিক পথ। পক্ষান্তরে যখন জানতে পারবে যে, জনসাধারণ তার ঐ কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জেনে গেছে তখন এ ধারণাটাই তাকে উক্ত অপরাধ লুক্কায়িত না রাখতে ও জন সম্মুখে তা প্রকাশ করে দিতে উস্কানি দেবে। সাধারণত এটা অকল্যাণ ও মন্দের পথ। এ
প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- 'আমার প্রত্যেক উম্মতকে ক্ষমা করা হবে তবে যারা নিজেদের অপরাধ প্রকাশ করে দেয় তাদের নয়।'
এ প্রেক্ষিতে অভিভাবককে অতি সূক্ষ্ম পদ্ধতিসমূহ অবলম্বন করতে হবে যা তরশ তরুণীদের মধ্যে 'অভিভাবকের নিকট তাদের কোন কৌশল প্রকাশিত হয়নি' এ উপলব্ধি জন্ম দিতে সক্ষম হবে। যদিও তিনি ঐ মুহূর্তে তাদেরকে কোন দিক-নির্দেশনা দিচ্ছেন না। অভিভাবকের বিচক্ষণতা সম্পর্কে তার অবগতির কারণে এ পদ্ধতি উক্ত অপরাধের মূলোৎপাটন ও ঘটনার সত্যতা স্বীকার করতে ও দ্বিতীয় বার ঐ ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটাতে সহায়ক হবে।
পক্ষান্তরে তরুণের অজুহাত যদি একেবারে নিঃশর্তভাবে গ্রহণ কখনো কৌশলটি তার নিকট প্রকাশিত হয়ে গেছে মর্মে ইঙ্গিত করে থাকে তাহলে তা তাকে আরো ঔদ্ধ্যত্যপনা ও অপরাধ করতে উস্কানি দিয়ে থাকবে। আবার কখনো কখনো অস্বীকৃতি ও মিথ্যা প্রতিপন্নতার দ্বারা তাদেরকে সম্মোধন করলে বিষয়টা দুঃখজনক পরিস্থিতির অথবা মিথ্যা শপথের দিকে পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে। অবশ্য এরূপ ঘটনা খুব স্বল্প সংখ্যক লোকের বেলায় ঘটে থাকে। এমনটি হতেই পারে।
আমরা সেই ঘটনার দিকে লক্ষ করলে দেখতে পাবো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিভাবে তার সমাধান দিয়েছেন। যায়েদ বিন আসলাম রা. থেকে বর্ণিত, খাওয়াত বিন যুবাইর রা. বলেন, 'আমরা মাত্রায-যাহরান১৭৬ নামক স্থানে অবতরণ করি। (হাদীস বর্ণনাকারী) বলেন, 'আমি আমার তাবু থেকে বের হলাম। দেখলাম কয়েকজন মহিলাকে পরস্পর কথাবার্তা বলছে। আমার ভাল লাগল। অতঃপর আমি আমার সফরের ব্যাগটা বের করি। এরপর সেখান থেকে একজোড়া কাপড় বের করে পরিধান করি। অতঃপর আমি গিয়ে তাদের সঙ্গে বসে পড়ি। ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর তাবু থেকে বের হয়ে এসে বলেন, 'হে আব্দুল্লাহর বাপ, তুমি মহিলাদের আসরে বসলে কি কারণে? আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখে তাঁর ব্যক্তিত্বে অভিভূত ও কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে গেছি। আমি বললাম- 'হে আল্লাহর রাসূল, আমার একটি উট ছুটে গেছে, আমি তাকে বাঁধতে চাই। অতঃপর তিনি সামনে চললেন। আমি তাঁর অনুসরণ করলাম। এক পর্যায়ে তিনি আমার নিকট তার চাদর নিক্ষেপ করলেন ও বৃক্ষরাজির আড়ালে চলে গেলেন। আমি বৃক্ষের শষ্য শ্যামলিমার মধ্যে যেন তাঁর মেরুদণ্ডের শুভ্রতা প্রত্যক্ষ করছিলাম। অতঃপর তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজন সম্পন্ন করলেন ও অজু করে সামনে আসলেন। তখনো অজুর পানি তার দাড়িগুচ্ছ থেকে গড়িয়ে বক্ষদেশ স্পর্শ করছিলো। অতঃপর তিনি বললেন- 'হে আব্দুল্লাহর পিতা, তোমার ছুটে যাওয়া উট সম্পর্কে কী করলে?' অতঃপর আমরা পথ চলা শুরু করলাম, এরপর পথিমধ্যে কেবল বলতেন 'হে আব্দুল্লাহর পিতা, তোমার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক, সেই পলাতক উটটির কি হলো?' যখন 'আমি ধরা খেয়েছি' অনুভব করলাম তখন দ্রুত মদীনায় ফিরে গেলাম। মসজিদ ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মজলিস থেকে দূরে থাকলাম। যখন এ অবস্থা দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকল, এক সময় আমি মসজিদে না যাওয়ায় নিজের মধ্যে শূন্যতা অনুভব করলাম। এরপর আমি মসজিদে গিয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর একটি কক্ষ থেকে হঠাৎ বের হয়ে সংক্ষিপ্ত আকারে দুই রাকাআত সালাত আদায় করে নিলেন। তবে আমি সালাত দীর্ঘ করি এই আশায় যে, তিনি আমাকে ছেড়ে চলে যান। কিন্তু তিনি বললেন- 'আব্দুল্লাহর বাপ, তোমার যতক্ষণ মন চায় সালাত দীর্ঘ কর। তবে আমি তোমার সালাত শেষ না করা পর্যন্ত দাঁড়াচ্ছি না। তখন আমি মনে মনে সংকল্প করলাম- 'অবশ্যই আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট গিয়ে আমার ভুল স্বীকার করব ও আমার ব্যাপারে তাঁর পবিত্র অন্তরকে সংশয়মুক্ত করবই। এরপর যখন তিনি বললেন- 'হে আব্দুল্লাহর বাপ, তোমার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। তোমার সেই ছুটে যাওয়া উঁটটি সম্পর্কে কী করলে? অতঃপর আমি বললাম- 'সেই সত্ত্বার শপথ! যিনি আপনাকে সত্যের আহবান নিয়ে প্রেরণ করেছেন। ইসলাম গ্রহণ করার পর থেকে ঐ উটটি আর কখনো হারিয়ে যায়নি। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- 'আল্লাহ তাআলা তোমার প্রতি রহম করুন।' কথাটি তিনবার বলেছেন। এরপর কখনো তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার পেছনের কোন বিষয় পুনরাবৃত্তি করেননি। ১৭৭ এখানে বাহ্যিক অবস্থা দৃষ্টেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, তার অজুহাত পেশ শুদ্ধ নয়। তা সত্ত্বেও তিনি তাকে তাৎক্ষণিকভাবে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করার প্রয়াস পাননি। কিন্তু যখনই তার সঙ্গে সাক্ষাত হতো প্রশ্নের পুনরাবৃত্তির করার মাধ্যমে ঐ কর্মটি উল্লেখ করতেন। ফলে অনন্যোপায় হয়ে কৃতকর্ম স্বীকার করতে বাধ্য হতো। যখন তার পক্ষ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় হয়ে যাবে তখন তাকে ডাকবে ও দ্বিতীয় বার সেই প্রশ্নটির পুনরাবৃত্তি করবে না। কারণ স্বীকারোক্তির পর লজ্জা দেয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শের পরিপন্থী।
টিকাঃ
১৭৫. বুখারী: ৫৬০, মুসলিম: ৫৩০৬
১۹۶ مرالظهران হেয়াজের একটি উপত্যকার নাম। যা খনন করেছিলেন যমুহ বাহরাহ্ প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ।
১৭৪ আল-মু'জামুল আওসাত্ব-লিত্তিবরানী: ৮/৫৯
১৭৭ আল-মু'জামুল কাবীর-লিত-তাবারানী: ৪/২০৩