📘 সন্তান লালন পালন ও তালীম তরবিয়ত > 📄 সন্তানকে অভিশাপ বা বদ-দোআ’ করা

📄 সন্তানকে অভিশাপ বা বদ-দোআ’ করা


সন্তানকে অভিশাপ বা বদ-দোয়া করা
মা-বাবা কর্তৃক সন্তানের জন্য সামগ্রিক কল্যাণের দোয়া করা যা নবী রাসূলগণের আমলে ঈমানদারদের সুন্নত ছিলো। দেখুন ইবরাহীম আ. যিনি বলতেন-
رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَوةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي. (إبراهيم -40 )
'হে আমার প্রতিপালক, আমাকে সালাত কায়েমকারী কর এবং আমার বংশধরদের মধ্য হতেও।'
যাকারিয়া আ. বলতেন-
رَبِّ هَبْ لِي مِنْ لَدُنْكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً. (آل عمران - 38 )
'আমাকে তুমি তোমার নিকট হতে সৎ বংশধর দান কর।'
একজন ঈমানদারের প্রার্থনা-
وَأَصْلِحْ لِي فِي ذُرِّيَّتِي. (الأحقاف - 15 )
'আমার জন্য আমার সন্তান-সন্ততিদিগকে সৎকর্মপরায়ণ কর।'
ঈমানদারগণের প্রার্থনা-
هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ. (الفرقان - 74 )
'আমাদের জন্য এমন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দান কর যারা হবে আমাদের জন্য নয়নপ্রীতিকর। '
সন্তানের সৌভাগ্যের অন্যতম সোপান মা-বাবার দোয়া। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী- 'তিনটি দোয়া আল্লাহর নিকট নিশ্চিত কবুল যোগ্য।' সেখানে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সন্তানের জন্য বাবার দোয়াকেও উল্লেখ করেছেন। ১৬৯ কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, অনেক মানুষ এই দোয়াকে সন্তানের উপকারের জন্য ব্যবহার করার পরিবর্তে তারা বিষয়টাকে সম্পূর্ণরূপে উল্টিয়ে দিতে অভ্যস্ত। যখন তারা ওদের ওপর ক্রোধান্বিত হয় অথবা সন্তানরা এমন কাণ্ড ঘটিয়ে বসে যা তাদের অসন্তুষ্টির কারণ হয়, তখন তারা ওদেরকে অভিশাপ দেয়, বদ-দোয়া করে থাকে। বলে থাকে- 'আল্লাহ, ওকে ধ্বংস করে ফেল, ওকে শাস্তি দাও অথবা ওর ওপর অভিসম্পাত কর! কেন মৃত্যু তোকে চোখে দেখে না। কত মানুষকে আল্লাহ নিয়ে নেয়, তোকে নিতে পারে না?' এগুলো বলার স্থলে তারা বলতে পারেন: হে আল্লাহ, ওকে হেদায়েত দাও, ওকে সংশোধন করে দাও, ওকে পরিপাটি করে দাও এবং ওর তাওবা কবুল কর ইত্যাদি। কারণ এটা হলো উত্তম ও সর্বোৎकृष्ट পদ্ধতি। এর মধ্যে কারো জন্য কোন ক্ষতি নেই, বরং এতে সন্তান ও বাবা উভয়ের জন্য কেবল কল্যাণ আর কল্যাণই নিহিত রয়েছে। এমন দোয়া করা উচিত নয়, যদি তা বাস্তবায়িত হয়ে যায়, তাহলে মা-বাবা দুঃখ ও অনুতাপে তার হাতের আঙ্গুল কাটবে। ফলে সে হবে নিতান্ত লজ্জিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সন্তানদেরকে অভিশাপ দিতে নিষেধ করেছেন। কারণ এর মধ্যে এমন বিপদ নিহিত যেখানে কোন ধরনের উপকারিতা নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- 'তোমরা তোমাদের নিজেদের, তোমাদের সন্তানদের ও তোমাদের সম্পদের ওপর অভিশম্পাত কর না। তোমরা ঐ সময়ের ব্যাপারে আল্লাহর সঙ্গে ঐক্যমত্যে যেওনা যখন আল্লাহর নিকট কোন দান প্রার্থনা করলে তিনি তা তোমাদের জন্য কবুল করে থাকেন।

টিকাঃ
১৬৫. সূরা ইবরাহীম, আয়াত - ৪০
১৬৬ সূরা আলে ইমরান, আয়াত- ৩৮
১৬৭ সূরা আহকাফ, আয়াত ১৫
১৬৮ সুরা ফোরকান: ৭৪
১৬৯ তিরমিজী- কিতাবুদ দাওয়াত। আবু দাউদ- কিতাবুস সালাত। ইবনে মাজা কিতাবুদ দাওয়াত
১৭০ মুসলিম: ৫৩২৮

📘 সন্তান লালন পালন ও তালীম তরবিয়ত > 📄 জরিমানা করা অথবা ছোট ভাই-বোনদের সামনে তাকে লজ্জিত করা

📄 জরিমানা করা অথবা ছোট ভাই-বোনদের সামনে তাকে লজ্জিত করা


জরিমানা অথবা ছোট ভাই-বোনদের সামনে তাকে লজ্জিত করা
তরণ-তরুণীদের এ বয়সে আত্মমর্যাদাবোধ প্রবলভাবে উজ্জীবিত হয়ে থাকে। এই পথ অথবা পদ্ধতি তাদের উভয়কেই ভীষণভাবে আঘাত করে। যার ফলে অনেক সময় অভিভাবকদের সাথে তাদের শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়ে যেতে পারে। উপরন্তু এই পদ্ধতির বারংবার প্রয়োগ তাকে অবাধ্যতা ও তার কর্মকাণ্ডের বিশুদ্ধতার স্বপক্ষে যুক্তি প্রমাণ উপস্থাপন ও অভিভাবকের ভুলত্রুটিগুলো খুঁজে বের করতে সচেষ্ট হতে উদ্যত করবে। অথচ অন্য দিকে অভিভাবকগণ কেবলমাত্র এতটুকু করেই ক্ষ্যন্ত থাকেন না। বরং তাদেরকে অপরিচিত ব্যক্তি অথবা সহপাঠি ও বন্ধুদের মত নিকটতম লোকদের সম্মুখে লজ্জা দেন ও তিরস্কার করে থাকেন। অথচ এর অবশ্যম্ভাবী অশুভ পরিণতি সম্পর্কে তার কোনই ভ্রুক্ষেপ নেই।

📘 সন্তান লালন পালন ও তালীম তরবিয়ত > 📄 অবমূল্যায়ন ও তুচ্ছ জ্ঞান করা

📄 অবমূল্যায়ন ও তুচ্ছ জ্ঞান করা


অবমূল্যায়ন ও তুচ্ছ জ্ঞান করা
ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত উভয় প্রকারের ভুল-ত্রুটি থেকে কেউই মুক্ত নয়। কোন কোন অভিভাবক রয়েছেন যারা চান যে, তার সন্তান হবে একেবারে নিষ্কলুষ ও নিষ্পাপ। ফলে কোন পদস্खলনকেই তারা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে পারেন না। বরং ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়েও কঠিন হিসাব নিয়ে থাকেন। এ কারণে অনেক সময় তরশ সন্তানটি অভিভাবককে তুচ্ছজ্ঞান ও অবমূল্যায়ন করতে পারে। যার বহিঃপ্রকাশ কয়েকভাবে ঘটতে পারে। যেমন কথাবার্তা অথবা কোন সময় কর্মের মাধ্যমে তার বহিঃপ্রকাশ। যথা, ছোটদেরকে তার ওপর প্রাধান্য দেয়া, তার উর্ধ্বতনের স্থানে তাকে স্থাপন করা, বড়কে উপেক্ষা ও তার দিকে কোনরূপ ভ্রক্ষেপ না করে ছোটদের সঙ্গে পরামর্শ করা ও তার মত অনুযায়ী কর্ম প্রস্তুতি গ্রহণ করা যেন সে অনুপস্থিত প্রভৃতি।

📘 সন্তান লালন পালন ও তালীম তরবিয়ত > 📄 কোন অপরাধ বা অবাধ্যতা হালকাভাবে দেখা

📄 কোন অপরাধ বা অবাধ্যতা হালকাভাবে দেখা


কোন অপরাধ বা বিরোধিতাকে হালকা করে দেখা
একদিকে যেমন এমন অভিভাবক রয়েছেন যারা সামান্য অপরাধে কঠিন শাস্তি দিয়ে থাকেন। অপর দিকে বড় বড় অপরাধের ক্ষেত্রেও শাস্তি দানকে তুচ্ছ জ্ঞান করে থাকেন এমন অভিভাবকের সংখ্যাও একেবারে কম নয় অথচ উভয় কাজই নিন্দনীয়। তরুণ- তরুণীদের থেকে কোন ত্রুটি সংঘটিত হয়ে গেলে তা হালকা করে দেখা অথবা এক্ষেত্রে এমন দৃষ্টিভঙ্গি লালন করা যে, 'এ বয়সে এটা একটা স্বাভাবিক ব্যাপার' উচিত নয়। যদি সে স্বীয় অপরাধ স্বীকার করে নিয়ে ওখান থেকে মুক্তির পথ অনুসন্ধানরত অবস্থায় তাওবা করে ফিরে আসে তবুও। কারণ, এ অবস্থায় তাকে যদি কোন ভর্ৎসনা তিরস্কার ও লজ্জা দেয়া না হয় 'সে অপরাধ স্বীকার করে তাওবা করে ফিরে এসেছে' শুধুমাত্র এ কারণে, তাহলে সে বিষয়টিকে হাল্কা মনে করে তাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়তে পারে। ঐ লোকটির দিকে লক্ষ করুন, যে, পবিত্র রমজান মাসে স্ত্রী সম্ভোগ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট ফতওয়া জিজ্ঞাসা করার জন্য এসেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সহধর্মিনী উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বলেন- 'পবিত্র রমাদান মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাক্ষাতে এক লোক মসজিদে নববীতে এসে বলে- 'হে আল্লাহর রাসূল, আমি দগ্ধ হয়ে গেছি, আমি ধ্বংস হয়ে গেছি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে প্রশ্ন করলেন- 'তোমার কি হয়েছে?' উত্তরে সে বললো- 'আমি স্ত্রীর সাথে মিলন করে ফেলেছি।' তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- 'সদকা কর।' এরপর সে বললো- 'হে আল্লাহর নবী, আমার তো কোন সম্পদই নেই। সুতরাং আমি সদকা করতে সক্ষম নই।' তিনি বললেন- 'তুমি বসো!' তখন লোকটি বসে রইল। ইতিমধ্যে খাদ্য সামগ্রী বোঝাই গাধা হাঁকিয়ে এক ব্যক্তি আগমন করলো। এবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- 'একটু আগে যে দগ্ধলোকটি এসেছিল সে কোথায়?' তখন লোকটি দাঁড়িয়ে গেলে পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- 'যাও এটা নিয়ে সদকা করা গিয়ে।' অতঃপর সে বললো, 'আমাদের ছাড়া অন্য কাউকে?' আল্লাহর শপথ! আমরা ক্ষুধার্ত ও কপর্দকশূন্য।' এরপর তিনি বললেন- 'তাহলে তোমরাই তা আহার করো! '১৭১ ভদ্রলোক তার অপরাধ স্বীকার ও তাওবা করে সমাধান জানার জন্য এসেছে। এর প্রমাণ তার কথা 'আমি দগ্ধ হয়ে গেছি, আমি পুড়ে গেছি' যার অর্থ তার কৃত অপরাধ বোধ ও তার অবগতি। যদিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার তাওবার দিকে তাকিয়ে তাকে কোন শাস্তি দেননি। আর তা ছাড়া তার কর্মটি দণ্ডবিধির আওতায় পড়ে এমন অপরাধও নয়। এতদসত্ত্বেও তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার অপরাধটিকে খাটো করে না দেখে বললেন- 'একটু আগে যে দগ্ধ লোকটি এসছিলো সে কোথায়?' যা থেকে প্রতিভাত হয় যে, তার সে অপরাধকে তুচ্ছ জ্ঞান করা যাবে না। অনন্তর পাপের বৈশিষ্ট্য হলো তা আগুনের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যায় যা মানুষকে ভষ্মীভূত করে দেয়।
এই হলো পদ্ধতি, তরশ-তরশীদের এ জাতীয় দণ্ডবিধিমুক্ত অপরাধে নিমজ্জিত হওয়ার পর যা অভিভাবকের প্রয়োগ করা একান্ত কর্তব্য। ইমাম বুখারী রহ. এ বিষয়ের ওপর একটি অধ্যায় রচনা করেছেন। 'পর্ব: যে ব্যক্তি দণ্ডবিধির আওতাধীন নয় এমন কোন অপরাধ করলো, অতঃপর তা রাষ্টধান বা বিচারপতিকে অবহিত করা হলো। যদি অপরাধী তাওবা বা আত্মসমর্পণ করে সমাধান জানার জন্য আসে তাহলে তার ওপর শাস্তি প্রযোজ্য হবে না।
তরণ ও তরণীদের থেকে অপরাধ সংঘটিত হলে তা তুচ্ছ করে না দেখার অর্থ এ নয় যে, অভিভাবক তাকে অব্যাহতভাবে লজ্জা দিতেই থাকবে। যখন সে আলোচনা করবে, কোন কথা অথবা কোন কাজ করবে তখনই তাকে বলা হবে: তুমি হলে এই, এই। কারণ, এই পদ্ধতি সংশোধন নয় তাকে কেবল ধ্বংস করতে পারবে। সুনানে আবু দাউদের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে: التعبير হলো বর্তমানকালে কারো পূর্ব সংঘটিত অপরাধের জন্য তিরস্কার ও দোষারোপ করা, চাই তার তাওবা জ্ঞাত হোক বা অজ্ঞাত। তবে অন্যায়ে লিপ্ত হওয়ার সময় বা তার পরক্ষণে লজ্জা দেয়ার যার সামর্থ আছে তার ওপর এটা কর্তব্য। আবার কখনো বা দণ্ডবিধি অথবা শান্তি বিধান করা অবশ্যক হয়ে যায়। এসবই সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধের পর্যায়ভুক্ত।

টিকাঃ
১৭১ বুখারী: ৬৩২২, মুসলিম: ১৮৭৪
১৭২ বুখারী, কিতাবুল হুদুদ
১৭০ আউনুল মা'বুদ-১১/৯৪-৯৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00