📄 তৃতীয় অধ্যায় : উপকরণ ও পদ্ধতিসমূহ
একটি তরুণ এই বয়োঃস্তরে পৌঁছেই আদিষ্ট হয়ে থাকে। অর্থাৎ আল্লাহর দ্বীনের ওপর দৃঢ়তা অবলম্বনই হবে তার একমাত্র কাজ ও এটাই তার কাছ থেকে কাম্য। প্রথম পদক্ষেপেই সংঘটিত শিথীলতার জন্য তাকে জবাবদিহী করতে হবে। এর অর্থ হলো তার ওপর বাঞ্চনীয় কর্ম সম্পাদনে প্রচেষ্টা চালানো তার কর্তব্য। যেমন: ইল্ম, আমল ও আদব। সুতরাং তখন তরুণের প্রতিপালনের মহৎ কর্মটি তরুণ ও তার অভিভাবকের মধ্যে যৌথভাবে শিক্ষা দিতে হবে উপদেশ ও উদাহরণ উপস্থাপনের মাধ্যমে। সৎ কাজের
আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করার মাধ্যমে- যা কোরআনে কারীম বিরুদ্ধাচারীদের বিরুদ্ধে প্রমাণ উপস্থাপনের জন্য অসংখ্যবার প্রয়োগ করেছে। আল্লাহ তাআলা এই উদাহরণ প্রসঙ্গে বলেন,
وَتِلْكَ الْأَمْثَالُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ وَمَا يَعْقِلُهَا إِلَّا الْعَالِمُونَ. (العنكبوت - 43 )
'এই সকল দৃষ্টান্ত আমি মানুষের জন্য দেই; কিন্তু কেবল জ্ঞানী ব্যক্তিরাই এটা বুঝে।'
যেমনিভাবে একটি তরুণের অনুসন্ধিৎসা ও রহস্য উদ্ঘাটনের আগ্রহ থেকে তার প্রতিপালন ও জ্ঞানের বিকাশের ক্ষেত্রে উপকৃত হওয়া সম্ভব। চাই তা অভিজ্ঞতা, পঠন, অধ্যয়ন অথবা শিক্ষা সফর ইত্যাদি প্রয়োগ করেই হোক না কেন। আল্লাহ তাআলা মিথ্যাবাদীদেরকে ভ্রমণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। যাতে তারা জানতে পারে তিনি কিভাবে সৃষ্টি আরম্ভ করেছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআ'লা বলেন,
قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ بَدَأَ الْخَلْقَ (العنكبوت 20 )
'বল, 'তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর এবং অনুধাবন কর কিভাবে তিনি সৃষ্টি আরম্ভ করেছেন?' এবং তিনি তাদের মৃত্যু সংবাদ দিলেন যারা তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণতি থেকেও কোন শিক্ষা গ্রহণ করেননি। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
أَوَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَيَنْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ كَانُوا مِنْ قَبْلِهِمْ (غافر-21)
'তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না? তাহলে দেখতে পেতো তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কি হয়েছিলো। '
জ্ঞান অন্বেষনের জন্য ভ্রমণ আলেম-উলামাদের নিকট প্রসিদ্ধ। তাদের লেখনীতে এ বিষয়ের ওপর 'অধ্যায়: জ্ঞান অন্বেষণে ভ্রমণ' নামে স্বতন্ত্র পরিচ্ছেদ লিপিবদ্ধ করেছেন। এই ভ্রমণকাহিণীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ মুসা আ. এর শিক্ষা সফর। যখন তিনি খিযির আ.-এর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করলেন। তার সাক্ষাতের আবেদন করলেন, যাতে তার নিকট থেকে জ্ঞান আহরণ করতে পারেন। কারণ মুসা আ. জানতে পেরেছেন, তার নিকট এমন জ্ঞান রয়েছে যা তিনি জানেন না।
টিকাঃ
১৫৮. সূরা আন-কাবুত: ৪৩
২. আ. ড. আঃ আজিজ বিন মুগম্মদ নুগাইমিশী কৃত আল-মুরাহিকুন দেরাসাহ নাফিসাহ ইসলামিয়াহ, পৃষ্ঠা: ১১৭-১২৪ দ্রষ্টব্য।
১.আল-আনকাবুত-২০
২.গাফের-২১
📄 চতুর্থ অধ্যায় : পুরস্কার ও শাস্তি
পুরস্কার
তরণ যদিও সে এখন পুরুষের স্তরে উপনীত হয়েছে তথাপি পুরস্কারের প্রয়োজনীয়তা থেকে সে উর্ধ্বে উঠতে পারেনি। কোরআনে কারীমের অসংখ্য আয়াত রয়েছে যেখানে প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ ও মহিলার নেক আমলের বিনিময় পুরস্কার সংক্রান্ত বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। সুতরাং তরুণ ও তরুণীদের ব্যাপারে এটাকে গুরুত্বহীন ভাবা কোন অবস্থাতেই ঠিক হবে না। বিশেষ করে কষ্টসাধ্য কর্ম সম্পাদনে এবং যে কাজের জন্য বিরাট সাহসিকতার প্রয়োজন হয়। খন্দক যুদ্ধের ঘটনা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলিম সৈন্যদের মধ্য হতে এমন কাউকে চাচ্ছিলেন, যে শত্রু সৈন্যদের অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশ করে তাদের তথ্য সংগ্রহ করে নিয়ে আসতে পারবে। সে জন্য তিনি এই পদ্ধতি প্রয়োগ করেন। এ প্রসঙ্গে আমাদেরকে হুজায়ফাহ রা. হাদীস বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, 'আহযাব যুদ্ধের রজনী, আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাথে দেখতে পেলেন। (প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়া) তীব্র ও শীতল বায়ু আমাদেরকে স্পর্শ করে গেলো। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে বললেন- 'এমন কেউ আছো কি? যে শত্রুবাহিনীর খবরাখবর এনে আমাকে দিতে সক্ষম, তাহলে আল্লাহ তাআ'লা কিয়ামতের দিন তাকে আমার সঙ্গী করে উঠাবেন। তখন আমরা সকলে চুপ হয়ে গেলাম। আমাদের মধ্যে কেউ কোন উত্তর দিলো না। অতঃপর (দ্বিতীয় বার) তিনি সাল্লাল্লাহু আমাদেরকে বললেন- 'এমন কেউ কি নেই? যে শত্রুবাহিনীর খবরাখবর এনে আমাকে দিতে পারবে তাহলে আল্লাহ তাআ'লা কিয়ামতের দিন তাকে আমার সঙ্গী করে উঠাবেন। তখন আমরা সকলে চুপ হয়ে গেলাম। আমাদের মধ্যে কেউ কোন উত্তর দিলো না। অতঃপর (তৃতীয় বার) তিনি আমাদেরকে বললেন- 'এমন কেউ কি নেই? যে আমাকে শত্রুবাহিনীর খবরাখবর এনে দিতে পারবে তাহলে আল্লাহ তাআ'লা কিয়ামতের দিন তাকে আমার সঙ্গী করে উঠাবেন। তখন আমরা সকলে চুপ হয়ে গেলাম। আমাদের মধ্যে কেউ কোন উত্তর দিলো না। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই বললেন- 'হুজাইফা, তুমি দাঁড়াও, যাও তুমি গিয়ে শত্রুবাহিনীর খবরাখবর নিয়ে এসো।' আমার নাম ধরে আহ্বান করার পর আমি কোন উপায়ান্তর না দেখে অগত্যা দাঁড়িয়ে গেলাম। তিনি বললেন- 'যাও শত্রুবাহিনীর খবর নিয়ে এসো! তাদেরকে তোমার পরিচয় বুঝতে দিও না।'১৬২ সেই রাতে প্রচণ্ড ও তীব্র শীতল ঝড়ো হাওয়া প্রবাহিত হচ্ছিলো। সে কারণে উক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য দুর্দান্ত সাহসিকতা ও শক্তির প্রয়োজন ছিলো। এই কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই দুঃসাহসিক কর্ম সম্পাদনের জন্য পুরস্কারের ঘোষণা দিয়ে ছিলেন। কাজেই যে তার ইচ্ছা পূরণ করবে তার সম্পর্কে তিনি বললেন, 'আল্লাহ তাআলা তাকে কিয়ামতের দিন আমার সঙ্গী করবেন।' তিনি কাউকে শুরুতেই এ ব্যাপারে নির্দেশ করেননি। কল্যাণকর কাজে সাহাবীদের আগ্রহ ও তা বাস্তবায়নে তাদের চূড়ান্ত প্রয়াস। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সঙ্গে এই মহান মর্যাদার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও তিনি তা তিনবার পুনরাবৃত্তি করা পর্যন্ত কেউ দাঁড়ায়নি। যা সেই দিনের তীব্র শীত ও প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়ার দরুণ সৃষ্ট দুর্বিসহ পরিস্থিতিতে দুঃসাহসিক দায়িত্ব পালনের দিকেই ইঙ্গিত করে। সে কারণে রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রয়োজন হয়েছে, তিনি নিজেই সেনাপ্রধান হিসেবে নির্দেশ করেন। সকল দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি উপেক্ষা করে যার আনুগত্য অপরিহার্য কর্তব্য। তিনি এই দুঃসাহসিক কাজের দায়িত্ব হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান রা. কে অর্পণ করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরূপ ভূমিকা অহুদের যুদ্ধেও নিয়েছিলেন যখন তাঁকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও কতিপয় সাহাবীকে মুশরিকরা অবরোধ করে ফেলেছিলো। আনাস বিন মালেক রা. থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অহুদের দিন সাত জন আনসারী ও দুই কোরাইশকে নিয়ে একাকী হয়ে পড়লেন। অতঃপর তারা যখন সন্ধিক্ষণে উপস্থিত হলো, তখন তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- 'কে আছে যে আমাদের পক্ষ হয়ে শত্রুদের প্রতিহত করবে, ফলে বিনিময়ে তার জন্য রয়েছে জান্নাত অথবা সে জান্নাতে আমার সঙ্গী হবে। '১৬০ এমনিভাবে অভিভাবকের কর্তব্য হলো প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা করা। আর যে কাজটি আল্লাহ তাআলা আবশ্যক করেছেন তার প্রতিদান তো সেটাই যার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ তাআলা তার সংযমী বান্দাদের সঙ্গে করেছেন।
টিকাঃ
১৬২.মুসলিম-৩৩৪৩
📄 পঞ্চম অধ্যায় : নির্দেশনা ও উপদেশাবলী
পঞ্চম অধ্যায়: নির্দেশনা ও উপদেশাবলি
(পূর্ববর্তী পরিচ্ছেদে আলোচিত দিকনির্দেশনা ও উপদেশবালির সঙ্গে পার্থক্য নির্ণয়সহ একটি সংযোজন।)