📘 সন্তান লালন পালন ও তালীম তরবিয়ত > 📄 শরীয়তের নির্দেশ পালনে উপযুক্ত হওয়া

📄 শরীয়তের নির্দেশ পালনে উপযুক্ত হওয়া


تكليف বা শরিয়তের নির্দেশ পালনে আদিষ্ট হওয়া
একটি তরুণের এই স্তরে পৌঁছলে তার মধ্যে কয়েক প্রকারের বিকাশ সাধিত হয়ে থাকে যেগুলো ইতিপূর্বে হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। এটা কোন অহেতুক বিকাশ নয়, বরং এর পেছনে মহান উদ্দেশ্য লুক্কায়িত রয়েছে। তা হলো, আল্লাহপাক তার বান্দাদেরকে এই স্তরে পৌঁছার সাথে সাথে আদিষ্ট করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি ঈমান আনয়ন করে সৎকাজ করবে তার জন্য রয়েছে জান্নাত। পক্ষান্তরে যে অস্বীকার করবে তার জন্য জাহান্নাম। (আল্লাহ তাআলার দয়া ও অনুগ্রহে আমরা এর থেকে মুক্তি ও পরিত্রাণ চাই।) ফলে এর বিকাশ বান্দার বিরুদ্ধে প্রমাণ উপস্থাপন করবে। তবে কখনোই তা বান্দার জন্য আল্লাহ তাআলার বিরুদ্ধে প্রমাণ হবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন,
لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ. (النساء - 165 )
'যাতে রাসূল আসার পর আল্লাহর কাছে মানুষের কোন অভিযোগ না থাকে। '
অতএব দৈহিক বিকাশ বিধানাবলি পালনে সামর্থ্য লাভের জন্য অবশ্যম্ভাবী। বুদ্ধিগত বিকাশ, প্রমাণ অনুধাবনে সামর্থ অর্জন ভ্রষ্টতার পথগুলো ও হেদায়েতের প্রমাণাদি স্পষ্টভাবে বর্ণনা করতে পারে। আবেগ ও উচ্ছাসের মধ্যে বিকাশ সাধন, জনসাধারণের জন্য সত্য গ্রহণ ও অসত্য অপনোদন সর্বোপরি আল্লাহর পথে সমূহ কষ্ট যথাসম্ভব সহ্য করতে সহায়ক হবে। অতএব দৈহিক বিকাশ বলতে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অসম ও শৃঙ্খলাহীন বিকাশ নয়; যার কারণে তরুণ তার মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলবে। তার স্বাভাবিক জীবন প্রবাহ বাধাগ্রস্থ হয়ে পড়বে। অন্য দিকে বুদ্ধির বিকাশের অর্থ এই নয় যে, সে তার মা-বাবা ও শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিরোধ করবে ও তার বিরোধীদের মতামতকে নির্বুদ্ধিতা ঠাওরাবে। যেমনিভাবে লিঙ্গগত পরিপক্কতার অর্থ এই নয় যে, একটি তরুশ অদৃশ্য আহ্বানকারী যোগাযোগকারী ও বিপরীত লিঙ্গ নিয়ে সদা তৎপর থাকবে। আবেগের বিকাশ বলতে একগুয়েমী স্বভাব, ক্রুদ্ধ প্রভাবান্বিত, অপারগতা ও রাগান্বিত হওয়া নয়, যার ফলে সে অপরের সঙ্গে কোন দুর্ঘটনা ঘটায় ও মারামারি করতে উদ্যত হয়।
সুতরাং একজন তরুণের সুষ্ঠ বিকাশ যা আল্লাহ তাআলা তাকে দান করেছেন তাহলো: আল্লাহ তাআলার অবশ্যপালনীয় বিধান পালনে সামর্থ্য অর্জনের জন্য। সেই বিকাশকে তার উদ্দেশ্যের বিপরীত খাতে প্রবাহিত করা হলে দেখা দেবে বহু রোগ ব্যাধি ও ত্রুটি বিচ্যুতি। অথচ এই ত্রুটি বিচ্যুতিগুলো এই
বয়োঃস্তরের বৈশিষ্ট্যাবলির অন্তর্ভুক্ত ছিল না। কারণ, যে মহান সত্ত্বা তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি তো এর জন্য তাদেরকে সৃষ্টি করেননি। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ. (الذاريات - 56)
'আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এই জন্য যে, তারা আমারই ইবাদত করবে।'
সে কারনেই অভিভাবককে প্রকাশিত লক্ষণগুলোর সাথে আচরণ করতে হবে এমনভাবে, যেন সেগুলো হলো কতগুলো রোগ- যার চিকিৎসা একান্ত প্রয়োজন। এগুলো 'এই বয়সেরই অপ্রতিরোধ্য প্রতিক্রিয়া, 'তরুণটি এ ব্যাপারে অনন্যোপায় এখানে তার কোন ইচ্ছাশক্তিই কাজ করে না' ভেবে কখনোই তাদের সঙ্গে সে অনুযায়ী আচরণ করা যাবে না।
অনন্তর মানুষ একটি অবসর জীবন পায়নি, বরং মানুষ জীবনকে জন্মগত অভ্যাসপূর্ণ অবস্থায় পেয়েছে- যে অভ্যাসের ওপর আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর মা-বাবা, অভিভাবকবৃন্দের তৎপরতা অথবা পরিবেশের কারণে তার পরিবর্তন ঘটে থাকে। পক্ষান্তরে সে যদি তার স্বভাবজাত প্রকৃতির ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে ও তার কোন কিছুরই পরিবর্তন সাধিত না হয়। তাহলে সে ইসলামকে সাদরে গ্রহণ করবে, যা তাকে সামগ্রিক কল্যাণ ও প্রতিটি সুন্দরতম নান্দনিক চরিত্রে নির্দেশ করবে। সকল অকল্যাণ ও নিন্দনীয় মন্দ চরিত্র থেকে তাকে বিরত রাখবে। অতএব একজন তরুণ যখন জন্মগত স্বভাবের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে ও ইসলামী পরিবেশে প্রতিপালিত হবে, তখন উল্লেখিত কর্মকাণ্ডগুলো তাকে স্পর্শ করতে পারে এমন সাধ্য কি তার আছে? বরং তা আসে একটি স্বভাববিকৃত পরিবেশ থেকে। 'অতঃপর তার মা-বাবা তাকে ইয়াহুদী, খৃষ্টান অথবা অগ্নিপূজক বানায়।' অথবা তার প্রতিপালন আল্লাহ তাআলার বিধানের আলোকে করা হয় না। সর্বোপরি কথা হলো যার মধ্যে ত্রুটি রয়েছে সেখান থেকে পরিত্রাণ লাভ করতে হবে। তবে অবশ্যই তা 'এ বয়সের বৈশিষ্ট্য নয়' কথাটা সব সময় মাথায় রাখতে হবে।

টিকাঃ
১৫২-নিসা-১৬৫
১৫৩. আয-যারিয়াত: ৫৬
১৫৪. বুখারী: ১২৭০, মুসলিম: ৪৮০৩

📘 সন্তান লালন পালন ও তালীম তরবিয়ত > 📄 সাহসিকতা, অগ্রগামিতা ও কষ্টসাধ্য কর্মসম্পাদন

📄 সাহসিকতা, অগ্রগামিতা ও কষ্টসাধ্য কর্মসম্পাদন


এই বয়োঃস্তরে তরুণের শরীরে যে ক্রমবর্ধমান অগ্রগতি সাধিত হয় ও তার নিকট গবেষণা করার যে ক্ষমতা অর্জিত হয়, তা-ই নিজের কাছেও ঐ শক্তি ও সামর্থের অনুভূতির জন্ম দেয়।
আল্লাহ তাআ'লা ইরশাদ করেন-
اللهُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ ضَعْفٍ ثُمَّ جَعَلَ مِنْ بَعْدِ ضَعْفٍ قُوَّةً ثُمَّ جَعَلَ مِنْ بَعْدِ قُوَّةٍ ضَعْفًا وَشَيْبَةً. (الروم: 54)
'আল্লাহ, তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেন দুর্বল অবস্থায়, দুর্বলতার পর তিনি দেন শক্তি; শক্তির পর আবার দেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং তিনিই সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।'
শৈশবের দুর্বলতা থেকে ক্রমান্বয়ে তারণ্য ও যৌবনের শক্তির দিকে সে রূপান্তরিত হয়। শক্তি ও সামর্থের অনুভূতি তাকে অগ্রগামিতা ও কষ্টসাধ্য কর্মসম্পাদনে অনুপ্রাণিত করে। সেহেতু অধিকাংশ সময় সে কোন প্রতিকূলতার প্রতি ভ্রুক্ষেপই করে না। এটা তার ভালো একটি দিক যদি তরশটি সত্যাশ্রয়ী হয়। পক্ষান্ত রে আবেগতাড়িত হয়ে যদি সঠিক দিক-নির্দেশনা থেকে দূরে সরে যায় তাহলে এটা হবে তরশটির ধ্বংস ও মন্দ দিক। অতএব অভিভাবককে এক্ষেত্রে খুবই সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে যাতে তিনি তরুণটিকে কল্যাণের পথে নেতৃত্ব দিতে পারেন।
সর্বকালেই এর অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে : একাধিক সাহাবায়ে কেরাম জিহাদে অংশ গ্রহণ করেছেন অথচ এরপর তারা তারুণ্যে গমন করেছেন। তারা এক্ষেত্রে যার পর নাই উদগ্রীবও ছিলেন বটে। এমনকি তারা যুদ্ধে অংশ গ্রহণের জন্য নিজেদের বয়স বেশী দেখানোর কৌশল অবলম্বন করতেন। সামুরাহ বিন যুনদুব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমার মা বিধবা হওয়ার পর তিনি মদীনায় চলে আসলে লোকেরা তাকে বিবাহের প্রস্তাব দেয়। এরপর তিনি বলেন, 'এই অনাথের দায়িত্বভার যে ব্যক্তি গ্রহণ করতে রাজি হবে আমি শুধুমাত্র তার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারি। অতঃপর তাকে এক আনসারী বিবাহ করলো। তিনি (হাদিসের বর্ণনাকারী) বলেন, 'প্রতি বছর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট আনসারী বালকদেরকে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার জন্য পেশ করা হতো। তখন তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাদের বয়স হয়েছে তাদেরকে মুসলিম মুজাহিদ বাহিনীতে তালিকাভুক্ত করে নিতেন। তিনি (হাদীসের বর্ণনাকারী) বলেন, 'আমাকে এক বছর পেশ করা হলো। তখন এক বালককে ভর্তি করা হলো আর আমাকে ফিরিয়ে দিলেন। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহ রাসূল, আপনি ওকে ভর্তি করে নিলেন আর আমাকে প্রত্যাখ্যান করলেন। অথচ আমি তার সঙ্গে কুস্তি ধরে তাকে ধরাশায়ী করতে পারি। অতঃপর তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- 'তাহলে দেরি করছো কেন? কুস্তি ধরেই দেখাও না।' অতঃপর আমি কুস্তি ধরে তাকে ধরাশায়ী করে ফেলি। ফলে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে অন্তর্ভুক্ত করে নেন।' আব্দুল্লাহ বিন উমার রা. থেকে বর্ণিত, 'অহুদের দিন তাকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট উপস্থাপিত করা হলো, অথচ সে তখন চৌদ্দ বছরের কঁচি বালক। তাকে অনুমতি দেয়া হয়নি। অতঃপর দ্বিতীয় বার আমাকে খন্দকের দিন পেশ করা হলো, অবশ্য তখন আমার বয়স পনের বছর পূর্ণ হয়েছিলো। তখন আমাকে অনুমতি দেয়া হলো।' (হাদীস বর্ণনাকারী) নাফে' বলেন, 'আমি উমার বিন আব্দুল আজিজের দরবারে গেলাম, যখন তিনি মুসলিম জাহানের সম্রাট। অতঃপর এই হাদীসটি তার নিকট বর্ণনা করলে তিনি সকল প্রাদেশিক গভর্নরদের নিকট শাহী ফরমান লিখে পাঠালেন- 'পনের বছর পূর্ণ হয়েছে এমন বালকদের জন্য সেনাবাহিনীর তহবিল থেকে ভাতা নির্ধারণ করে দেয়া হোক।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উসামা বিন যায়েদ রা. এর হাতে আঠারো অথবা বিশ বছর বয়সে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব ন্যস্ত করেছিলেন। এর বিপরীতে আমরা দেখতে পাই অসংখ্য অপরাধ যা এমন লোকদের দ্বারা সংঘটিত হচ্ছে যারা জীবনের এই ঈর্ষণীয় ও প্রসন্ন বয়সে উপনীত। এই প্রেক্ষাপটে এই বৈশিষ্ট্য মণ্ডিত বয়সকে যথাযথ ব্যবহার করে শ্রমসাধ্য কল্যাণকর কর্ম সম্পাদনের জন্য তরুণকে প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে এখান থেকে উপকৃত হওয়া অভিভাবকের কর্তব্য। সাথে সাথে না দেখে না বুঝে কোন কাজে আসক্ত হওয়া ও নির্ভয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া হতে তাকে সতর্ক করতে হবে।

টিকাঃ
১৫৫. আর-রুম-৫৪
১৫৬ .মুস্তাদরেকে হাকেম-২/৬৯
১৫৭ বখারী-২৪৭০, মুসলিম-৩৪৭৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00