📄 পরিপক্কতা- পরিপূর্ণতা
একটি শিশুর এ স্তরে রূপান্তরিত হলেই তার মধ্যে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়; চাই সেটা তার দেহ, বুদ্ধি, গবেষণা অথবা অনুভূতিতেই হোক না কেন, যা অবশ্যই তাকে পূর্ববর্তী স্তর থেকে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হবে। এখন আর তাকে শিশু অথবা বাচ্চা বলে নামকরণ করা শুদ্ধ হবে না। বরং সে এখন একজন পুরুষ। নব যৌবনের দিকে ইঙ্গিত করার জন্য তাকে বলা হবে: তরশ অথবা বালক। তরুণের নিকট পরিপক্ক ও পূর্ণাঙ্গতার বিভিন্ন প্রকরণ হয়ে থাকে।
সুতরাং শিশুর বুদ্ধিগত সামর্থ্য ও গভীরতা তার অনিবার্য পূর্ণতাপ্রাপ্তি পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে অগ্রসর ও বিকাশ লাভ করতে থাকে। যদ্বারা প্রমাণ সাব্যস্ত হয়ে থাকে ও শরিয়তের বিধানাবলি কার্যকর হয়। ফলে বিরুদ্ধাচারণ ও শৈথিল্য প্রদর্শনে তাকে নিশ্চিত জবাবদিহী করা হবে। এ বয়সে শিশুর নিকট নিরেট চিন্তা ভাবনার (যা কোন অনুধাবনযোগ্য বিষয় সংশ্লিষ্ট নয়) সামর্থ্য পরিলক্ষিত হয়। অনুরূপ পরোক্ষ বিষয়, একটি মোকদ্দমার অসংখ্য দূরত্ব ও বিভিন্নদিক সে উপলব্ধি করতে সক্ষম ও সামগ্রিক বিষয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি সম্প্রসারিত হয়ে থাকে। ফলে সে আর এক কোণে আবদ্ধ হয়ে থাকবে না। উপরন্তু সে প্রবিষ্ট করণ, বিন্যাস, অবগঠন অথবা পরিক্ষণের মত উচ্চতর গবেষণার অভিজ্ঞতা চর্চায় সক্ষম। এমনিভাবে উপস্থিত বিষয় দ্বারা অনুপস্থিত বিষয়ের ওপর প্রমাণ উপস্থাপন, একাধিক প্রাথমিক তথ্য একত্রিত করে তা বাস্তবায়নের জন্য সে দিকে দৃষ্টিপাত করা ও এর ওপর আবর্তিত সম্ভাব্য ফলাফল পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম হওয়া এসব কিছুই সে পারে। যেভাবে সে শিক্ষামূলক গবেষণা পরিচালনা করতে পারে। যেহেতু সে সমস্যা উপলব্ধি করতে ও আলোচ্য বিষয় সংজ্ঞায়িত করতে প্রয়াস পায়। ফলে এখান থেকেই এই সমস্যাটা ব্যাখ্যার উপযোগী তথ্যাবলি একত্রিত করে থাকে। অতঃপর একটি একটি করে তথ্যগুলো নিরীক্ষা করতে থাকে কাংক্ষিত তথ্যটি আবিস্কার করা পর্যন্ত যা উল্লেখিত সমস্যার সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারে। ১৪৬ এই বুদ্ধিগত সামর্থ্যের মাধ্যমে সেই তরশ সত্যের সন্ধান, সত্য চর্চা করতে ও শৈশব অথবা শিশু বয়সে দীক্ষালব্ধ আনুগত্য নির্ভর ঈমানকে যুক্তিযুক্ত শ্রুতিনির্ভর প্রমাণাদি লব্ধ বিশ্বাসগত ঈমানে
সুনিশ্চিত রূপান্তরিত করতে সক্ষম হবে। এটা নিঃসন্দেহে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বুদ্ধিগত সামর্থ লব্ধ ফলাফল নিশ্চিত করতে হলে তরুণ-তরুণীদেরকে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সার কথা হলো, এই যোগ্যতা ও তা অর্জনের পর্যাপ্ত সামর্থ্য আল্লাহর ইচ্ছাই তার মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, এর অর্থ কখনোই এটা নয় যে, সকল প্রাপ্ত বয়স্করাই কার্যতঃ এই অবস্থানে রয়েছে। এমন না হলে তো সকল মানুষই মর্যাদা ও সম্মানের দিক থেকে সমপর্যায়ের হতো।
এমনিভাবে দেহটাও দ্রুত বিকাশ লাভ করে, কিন্তু সেটা হলো শরীরের সকল অঙ্গ-প্রত্তঙ্গের মধ্যে একটা ভারসাম্যপূর্ণ ক্রমাগত বিকাশ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ. (التين -4 )
'আমি তো সৃষ্টি করেছি মানুষকে সুন্দরতম গঠনে।
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন,
الَّذِي خَلَقَكَ فَسَوَّاكَ فَعَدَلَكَ . فِي أَيَّ صُورَةٍ مَا شَاءَ رَكَّبَكَ (الإنفطار - 7-8 )
'যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাকে সুঠাম করেছেন এবং সুসামঞ্জস্য করেছেন, যে আকৃতিতে চেয়েছেন, তিনি তোমাকে গঠন করেছেন। '
তা কোন অসামঞ্জস্য অথবা দোদুল্যমান বিকাশ নয়, যার ফলে মেজাজের দোদুল্যপনা, আবেগ, উত্তেজনা, কষ্টানুভূতি, অবাধ্যতা অথবা চলার পথে পদস্খলন সৃষ্টি হতে পারে। ফলশ্রুতিতে সে হয়ে পড়বে হতবিহ্বল ও নির্বোধের ন্যায়। যেমনিভাবে কোন কোন শিক্ষা তাকে এ দিকে ধাবিত করে থাকে বৈকি। এ সুগঠিত বর্ধনশীল দেহ দ্বারাই তো বান্দা শক্তি অর্জন করে নামাজ রোজা ও জিহাদ ইত্যাকার গুরুত্বপূর্ণ শরিয়তের বিধানাবলি পালনে সামর্থ লাভ করে থাকে।
এই সময়ই আবেগ ও উচ্ছাসগুলো পরিপক্ক হয়, যে ঘটনা ও অনুঘটনগুলো তরুণের সম্মুখে সংঘটিত হয় অথবা সে শুনতে পায় তাই তার আবেগকে উত্তেজিত করে। কিন্তু সেই আবেগ প্রবঞ্চিত হওয়া অথবা না হওয়া অথবা প্রশংসা ও ভর্ৎসনাকে অতিক্রম করে এমন এক অনুভূতির দিকে ধাবিত হয় যা কোন মহৎ কর্ম-তৎপরতার প্রেরণা যোগাতে সক্ষম হয়। যদি হয়, তাহলে এটা হবে ইতিবাচক আবেগ।
এক্ষেত্রে একজন তরুণ প্রত্যক্ষ অথবা বাহ্যিক ভূমিকার ওপর তুষ্ট থাকতে পারবে না। বরং তার ভেতরে সৃষ্ট এ ইতিবাচক আবেগই এই সৎ তরুণকে সৎ কাজের নির্দেশ ও গর্হিত কর্ম থেকে বিরত রাখতে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে থাকবে। ফলে এমনকি যদি সেই কর্ম সম্পাদনে তাকে বিপদের সম্মুখীনও হতে হয় তুবও সে এ ব্যাপারে আপোষহীন থাকবে। কারণ তার রয়েছে উচ্চ আত্ম-বিশ্বাস। লক্ষ করুন, দুই আনসারী বালক যখন আবু জাহল কর্তৃক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালি দেয়া সম্পর্কে জানতে পারল, তখন তারা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লো এবং তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে যার পূর্ণ বিবরণ আব্দুর রহমান বিন আউফ রা. এর যবানীতে তিনি বলেন, 'আমি বদরের দিন যুদ্ধের সাড়িতে দণ্ডায়মান অবস্থায় অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে ডানে বামে তাকাচ্ছিলাম। হঠাৎ আমি আনসারদের দুই বালককে দেখতে পেলাম যাদের সবেমাত্র দাঁত উঠেছে। আমি উভয়ের মধ্যে কে বেশী শক্তিশালী তা প্রত্যক্ষ করছিলাম, তখন তাদের মধ্যে একজন আমাকে চেপে ধরে বললো: চাচাজান, আপনি কি আবু জাহলকে চেনেন? আমি বললাম, হ্যাঁ, হে ভ্রাতুস্পুত্র, তার কাছে তোমার কি প্রয়োজন? তারা বলল, আমরা জানতে পেরেছি, সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালি দেয়। ঐ সত্ত্বার শপথ! যার হাতে আমাদের প্রাণ, আমরা যদি তাকে দেখতে পাই তাহলে আমাদের মধ্যে একজন নিহত না হয়ে একজনের ছায়া অন্য জন থেকে পৃথক হবে না। ফলে আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম। অতঃপর অপর জন আমার হাত ধরে অনুরূপ কথাই বললো। এরপর কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই আমি আবু জাহলকে লোকের ভেতর ঘোরাফেরা করতে দেখে বললাম: এই হলো তোমাদের শিকার যার সম্পর্কে তোমরা আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলে। অতঃপর উভয়ে তাদের তরবারী কোষমুক্ত করে তাকে হত্যা করে ফেললো। এরপর তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট গিয়ে ঘটনার বিস্ত ারিত বিবরণ দিল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- 'তোমাদের দু'জনের মধ্যে কে তাকে হত্যা করেছে? উভয়ে বললো- 'আমিই তাকে হত্যা করেছি।' অতঃপর তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- 'তোমরা কি তোমাদের তলোয়ার মুছে ফেলেছো? তারা উভয়ে বললো, না। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উভয় তলোয়ারের দিকে লক্ষ করে বললেন- 'তোমরা দু'জনেই তাকে হত্যা করেছো।' তবে তার পরিত্যক্ত সম্পদ পাবে মুয়ায বিন আমর বিন আল- জামুহ। এ তরশ দুজনের নাম ছিল, মুআয বিন আফরা ও মুআয বিন আমর বিন আল-জামুহ। '
আরেকটি ঘটনা আমিরুল মু'মিনীন উমার বিন আব্দুল আজিজ রহ. এর ছেলে আব্দুল মালেকের। তখন তার বয়স ছিলো উনিশ বছর। যখন তিনি স্বীয় পিতাকে দেখলেন, তিনি জন সাধারণকে সুন্নতের অনুসরণের প্রতি অনুপ্রাণিত করছেন। তার বাবা তাদেরকে পুরোপুরি সুন্নাতের ওপর উঠাক এটা তারও একান্ত ইচ্ছা ছিল। তার নিকট এসে তিনি তার সম্মানিত পিতাকে বললেন: 'হে আমিরুল মু'মিনীন, আপনি কি কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাহর আলোকে দেশ পরিচালনা করছেন না? অতঃপর আল্লাহর শপথ! আমার ও আপনার চুলায় পাতিল জ্বলা না জ্বলার আমি কোন ভ্রুক্ষেপ করি না।' এরপর তিনি তার ছেলেকে বললেন- 'আমি জনগণকে কষ্টসাধ্য কাজের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। আমি সুন্নাতের কোন অধ্যায় থেকে বেরিয়ে গেলে সেখানে প্রত্যাশার পর্ব রেখে দেই। তারা যদি সুন্নাতের জন্য বেরিয়ে পড়ে তাহলে প্রত্যাশার প্রশান্তি পাবে। আমি যদি পঞ্চাশ বছর বয়স পেতাম তাহলেও আমি মনে করতাম যে, আমার সকল প্রত্যাশা আমি তাদের কাছে পৌঁছাতে পারিনি। কারণ আমি বেঁচে থাকলে আমার প্রয়োজনও বেড়ে যাবে; আর যদি মৃত্যু বরণ করি। তাহলে আল্লাহ তাআ'লাই আমার নিয়্যত সম্পর্কে সম্যক অবগত। '
পরিপক্কতা ও পূর্ণতা তার বাহককে স্থিরতা ও ভারসাম্যতা, সত্যকে গ্রহণ ও মিথ্যা বর্জনের দিকে আহবান করে। কিন্তু যে পরিবেশে সে বসবাস করে সেখানে এমন ভ্রান্ত বিশ্বাসসমূহ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে যা দ্ব্যর্থহীনভাবে বিবেক সম্মত প্রমাণাদির সঙ্গে সাংঘর্ষিক অথবা যা সংঘটিত হয়েছে অথবা হওয়া উচিত। তখনই প্রকাশ পাবে, অস্থিরতা দোদুল্যপনা বিষণ্ণতা নৈরাশ্য ও যুক্তি বিবর্জিত ক্রোধ তাড়িত আবেগ। এটা কিছু কাল পর্যন্ত বলবৎ থাকবে যা কখনো দীর্ঘ আবার কখনো নাতিদীর্ঘও হতে পারে। অনেক সময় অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্ববিরোধী বিষয়গুলো গ্রহণ করে তার সঙ্গে বসবাস করতে ও তাকে ভালোবাসতে হয়। ফলে সেগুলো সে ভালোবাসবে অথবা সেগুলোর বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তা পরিবর্তন করে ফেলবে।
অনুরূপভাবে পূর্ববর্তী স্তরগুলোতে যদি একটি তরুণের বিশুদ্ধ পরিচর্যা ও প্রতিপালন না হয়, তাহলে এখন অনেক সমস্যা প্রকাশিত হয়ে পড়বে। কারণ তরুণটি তখন তার মা-বাবা ও শিক্ষকবৃন্দ থেকে গবেষণাগত ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা অনুভব করতে শিখবে। আর এর অবশ্যম্ভাবলী ফসল হলো বন্ধু নির্বাচন, অবসর সময় কাটানোর পদ্ধতির ক্ষেত্রে স্বাধীনতা। এমনিভাবে অভিভাবক কর্তৃক প্রদত্ত দিক-নির্দেশনা ও উপদেশাবলি গ্রহণ না করলে অসংখ্য সমস্যা দেখা দেবে। একটি তরুণ চায় প্রত্যেকটি বিষয়ে তার একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি থাকুক। এতে সে যদি প্রসিদ্ধ ও পরিচিত পথ থেকে বেরিয়েও যায় তবুও।
টিকাঃ
১. ড. মুহম্মদ সায়্যেদ মুহম্মদ যা'বালাভী কৃত তারবিয়াতুল মারাহিকু বাইনাল ইসলামে ওয়া ইলমিন-নাফসি-পৃষ্ঠা ৮০-৮১
১৪৭ আত-তীন-৪
১৪৮.আল-ইন্কিতার-৭-৮
৩. ড. মহম্মদ সায়্যেদ মুহম্মদ যা'বালাভী কৃত তারবিয়াতুল মুরাহিকু বাইনাল ইসলামি ওয়া ইলমিন- নাফসি, পৃষ্ঠা ৪১-৫৭ এ প্রাসাঙ্গিক ঘটনা ও উত্তর দ্রষ্টব্য।
১৫০ বুখারী: ২৯০৮, মুসলিম: ৩২৯৬
১. আল-মারুযি কৃত আস্-সুন্নাহ: ১/৩১, ইমাম আহমদ কৃত আয-যুহদ: ১/৩০০
📄 শরীয়তের নির্দেশ পালনে উপযুক্ত হওয়া
تكليف বা শরিয়তের নির্দেশ পালনে আদিষ্ট হওয়া
একটি তরুণের এই স্তরে পৌঁছলে তার মধ্যে কয়েক প্রকারের বিকাশ সাধিত হয়ে থাকে যেগুলো ইতিপূর্বে হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। এটা কোন অহেতুক বিকাশ নয়, বরং এর পেছনে মহান উদ্দেশ্য লুক্কায়িত রয়েছে। তা হলো, আল্লাহপাক তার বান্দাদেরকে এই স্তরে পৌঁছার সাথে সাথে আদিষ্ট করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি ঈমান আনয়ন করে সৎকাজ করবে তার জন্য রয়েছে জান্নাত। পক্ষান্তরে যে অস্বীকার করবে তার জন্য জাহান্নাম। (আল্লাহ তাআলার দয়া ও অনুগ্রহে আমরা এর থেকে মুক্তি ও পরিত্রাণ চাই।) ফলে এর বিকাশ বান্দার বিরুদ্ধে প্রমাণ উপস্থাপন করবে। তবে কখনোই তা বান্দার জন্য আল্লাহ তাআলার বিরুদ্ধে প্রমাণ হবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন,
لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ. (النساء - 165 )
'যাতে রাসূল আসার পর আল্লাহর কাছে মানুষের কোন অভিযোগ না থাকে। '
অতএব দৈহিক বিকাশ বিধানাবলি পালনে সামর্থ্য লাভের জন্য অবশ্যম্ভাবী। বুদ্ধিগত বিকাশ, প্রমাণ অনুধাবনে সামর্থ অর্জন ভ্রষ্টতার পথগুলো ও হেদায়েতের প্রমাণাদি স্পষ্টভাবে বর্ণনা করতে পারে। আবেগ ও উচ্ছাসের মধ্যে বিকাশ সাধন, জনসাধারণের জন্য সত্য গ্রহণ ও অসত্য অপনোদন সর্বোপরি আল্লাহর পথে সমূহ কষ্ট যথাসম্ভব সহ্য করতে সহায়ক হবে। অতএব দৈহিক বিকাশ বলতে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অসম ও শৃঙ্খলাহীন বিকাশ নয়; যার কারণে তরুণ তার মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলবে। তার স্বাভাবিক জীবন প্রবাহ বাধাগ্রস্থ হয়ে পড়বে। অন্য দিকে বুদ্ধির বিকাশের অর্থ এই নয় যে, সে তার মা-বাবা ও শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিরোধ করবে ও তার বিরোধীদের মতামতকে নির্বুদ্ধিতা ঠাওরাবে। যেমনিভাবে লিঙ্গগত পরিপক্কতার অর্থ এই নয় যে, একটি তরুশ অদৃশ্য আহ্বানকারী যোগাযোগকারী ও বিপরীত লিঙ্গ নিয়ে সদা তৎপর থাকবে। আবেগের বিকাশ বলতে একগুয়েমী স্বভাব, ক্রুদ্ধ প্রভাবান্বিত, অপারগতা ও রাগান্বিত হওয়া নয়, যার ফলে সে অপরের সঙ্গে কোন দুর্ঘটনা ঘটায় ও মারামারি করতে উদ্যত হয়।
সুতরাং একজন তরুণের সুষ্ঠ বিকাশ যা আল্লাহ তাআলা তাকে দান করেছেন তাহলো: আল্লাহ তাআলার অবশ্যপালনীয় বিধান পালনে সামর্থ্য অর্জনের জন্য। সেই বিকাশকে তার উদ্দেশ্যের বিপরীত খাতে প্রবাহিত করা হলে দেখা দেবে বহু রোগ ব্যাধি ও ত্রুটি বিচ্যুতি। অথচ এই ত্রুটি বিচ্যুতিগুলো এই
বয়োঃস্তরের বৈশিষ্ট্যাবলির অন্তর্ভুক্ত ছিল না। কারণ, যে মহান সত্ত্বা তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি তো এর জন্য তাদেরকে সৃষ্টি করেননি। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ. (الذاريات - 56)
'আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এই জন্য যে, তারা আমারই ইবাদত করবে।'
সে কারনেই অভিভাবককে প্রকাশিত লক্ষণগুলোর সাথে আচরণ করতে হবে এমনভাবে, যেন সেগুলো হলো কতগুলো রোগ- যার চিকিৎসা একান্ত প্রয়োজন। এগুলো 'এই বয়সেরই অপ্রতিরোধ্য প্রতিক্রিয়া, 'তরুণটি এ ব্যাপারে অনন্যোপায় এখানে তার কোন ইচ্ছাশক্তিই কাজ করে না' ভেবে কখনোই তাদের সঙ্গে সে অনুযায়ী আচরণ করা যাবে না।
অনন্তর মানুষ একটি অবসর জীবন পায়নি, বরং মানুষ জীবনকে জন্মগত অভ্যাসপূর্ণ অবস্থায় পেয়েছে- যে অভ্যাসের ওপর আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর মা-বাবা, অভিভাবকবৃন্দের তৎপরতা অথবা পরিবেশের কারণে তার পরিবর্তন ঘটে থাকে। পক্ষান্তরে সে যদি তার স্বভাবজাত প্রকৃতির ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে ও তার কোন কিছুরই পরিবর্তন সাধিত না হয়। তাহলে সে ইসলামকে সাদরে গ্রহণ করবে, যা তাকে সামগ্রিক কল্যাণ ও প্রতিটি সুন্দরতম নান্দনিক চরিত্রে নির্দেশ করবে। সকল অকল্যাণ ও নিন্দনীয় মন্দ চরিত্র থেকে তাকে বিরত রাখবে। অতএব একজন তরুণ যখন জন্মগত স্বভাবের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে ও ইসলামী পরিবেশে প্রতিপালিত হবে, তখন উল্লেখিত কর্মকাণ্ডগুলো তাকে স্পর্শ করতে পারে এমন সাধ্য কি তার আছে? বরং তা আসে একটি স্বভাববিকৃত পরিবেশ থেকে। 'অতঃপর তার মা-বাবা তাকে ইয়াহুদী, খৃষ্টান অথবা অগ্নিপূজক বানায়।' অথবা তার প্রতিপালন আল্লাহ তাআলার বিধানের আলোকে করা হয় না। সর্বোপরি কথা হলো যার মধ্যে ত্রুটি রয়েছে সেখান থেকে পরিত্রাণ লাভ করতে হবে। তবে অবশ্যই তা 'এ বয়সের বৈশিষ্ট্য নয়' কথাটা সব সময় মাথায় রাখতে হবে।
টিকাঃ
১৫২-নিসা-১৬৫
১৫৩. আয-যারিয়াত: ৫৬
১৫৪. বুখারী: ১২৭০, মুসলিম: ৪৮০৩
📄 সাহসিকতা, অগ্রগামিতা ও কষ্টসাধ্য কর্মসম্পাদন
এই বয়োঃস্তরে তরুণের শরীরে যে ক্রমবর্ধমান অগ্রগতি সাধিত হয় ও তার নিকট গবেষণা করার যে ক্ষমতা অর্জিত হয়, তা-ই নিজের কাছেও ঐ শক্তি ও সামর্থের অনুভূতির জন্ম দেয়।
আল্লাহ তাআ'লা ইরশাদ করেন-
اللهُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ ضَعْفٍ ثُمَّ جَعَلَ مِنْ بَعْدِ ضَعْفٍ قُوَّةً ثُمَّ جَعَلَ مِنْ بَعْدِ قُوَّةٍ ضَعْفًا وَشَيْبَةً. (الروم: 54)
'আল্লাহ, তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেন দুর্বল অবস্থায়, দুর্বলতার পর তিনি দেন শক্তি; শক্তির পর আবার দেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং তিনিই সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।'
শৈশবের দুর্বলতা থেকে ক্রমান্বয়ে তারণ্য ও যৌবনের শক্তির দিকে সে রূপান্তরিত হয়। শক্তি ও সামর্থের অনুভূতি তাকে অগ্রগামিতা ও কষ্টসাধ্য কর্মসম্পাদনে অনুপ্রাণিত করে। সেহেতু অধিকাংশ সময় সে কোন প্রতিকূলতার প্রতি ভ্রুক্ষেপই করে না। এটা তার ভালো একটি দিক যদি তরশটি সত্যাশ্রয়ী হয়। পক্ষান্ত রে আবেগতাড়িত হয়ে যদি সঠিক দিক-নির্দেশনা থেকে দূরে সরে যায় তাহলে এটা হবে তরশটির ধ্বংস ও মন্দ দিক। অতএব অভিভাবককে এক্ষেত্রে খুবই সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে যাতে তিনি তরুণটিকে কল্যাণের পথে নেতৃত্ব দিতে পারেন।
সর্বকালেই এর অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে : একাধিক সাহাবায়ে কেরাম জিহাদে অংশ গ্রহণ করেছেন অথচ এরপর তারা তারুণ্যে গমন করেছেন। তারা এক্ষেত্রে যার পর নাই উদগ্রীবও ছিলেন বটে। এমনকি তারা যুদ্ধে অংশ গ্রহণের জন্য নিজেদের বয়স বেশী দেখানোর কৌশল অবলম্বন করতেন। সামুরাহ বিন যুনদুব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমার মা বিধবা হওয়ার পর তিনি মদীনায় চলে আসলে লোকেরা তাকে বিবাহের প্রস্তাব দেয়। এরপর তিনি বলেন, 'এই অনাথের দায়িত্বভার যে ব্যক্তি গ্রহণ করতে রাজি হবে আমি শুধুমাত্র তার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারি। অতঃপর তাকে এক আনসারী বিবাহ করলো। তিনি (হাদিসের বর্ণনাকারী) বলেন, 'প্রতি বছর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট আনসারী বালকদেরকে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার জন্য পেশ করা হতো। তখন তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাদের বয়স হয়েছে তাদেরকে মুসলিম মুজাহিদ বাহিনীতে তালিকাভুক্ত করে নিতেন। তিনি (হাদীসের বর্ণনাকারী) বলেন, 'আমাকে এক বছর পেশ করা হলো। তখন এক বালককে ভর্তি করা হলো আর আমাকে ফিরিয়ে দিলেন। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহ রাসূল, আপনি ওকে ভর্তি করে নিলেন আর আমাকে প্রত্যাখ্যান করলেন। অথচ আমি তার সঙ্গে কুস্তি ধরে তাকে ধরাশায়ী করতে পারি। অতঃপর তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- 'তাহলে দেরি করছো কেন? কুস্তি ধরেই দেখাও না।' অতঃপর আমি কুস্তি ধরে তাকে ধরাশায়ী করে ফেলি। ফলে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে অন্তর্ভুক্ত করে নেন।' আব্দুল্লাহ বিন উমার রা. থেকে বর্ণিত, 'অহুদের দিন তাকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট উপস্থাপিত করা হলো, অথচ সে তখন চৌদ্দ বছরের কঁচি বালক। তাকে অনুমতি দেয়া হয়নি। অতঃপর দ্বিতীয় বার আমাকে খন্দকের দিন পেশ করা হলো, অবশ্য তখন আমার বয়স পনের বছর পূর্ণ হয়েছিলো। তখন আমাকে অনুমতি দেয়া হলো।' (হাদীস বর্ণনাকারী) নাফে' বলেন, 'আমি উমার বিন আব্দুল আজিজের দরবারে গেলাম, যখন তিনি মুসলিম জাহানের সম্রাট। অতঃপর এই হাদীসটি তার নিকট বর্ণনা করলে তিনি সকল প্রাদেশিক গভর্নরদের নিকট শাহী ফরমান লিখে পাঠালেন- 'পনের বছর পূর্ণ হয়েছে এমন বালকদের জন্য সেনাবাহিনীর তহবিল থেকে ভাতা নির্ধারণ করে দেয়া হোক।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উসামা বিন যায়েদ রা. এর হাতে আঠারো অথবা বিশ বছর বয়সে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব ন্যস্ত করেছিলেন। এর বিপরীতে আমরা দেখতে পাই অসংখ্য অপরাধ যা এমন লোকদের দ্বারা সংঘটিত হচ্ছে যারা জীবনের এই ঈর্ষণীয় ও প্রসন্ন বয়সে উপনীত। এই প্রেক্ষাপটে এই বৈশিষ্ট্য মণ্ডিত বয়সকে যথাযথ ব্যবহার করে শ্রমসাধ্য কল্যাণকর কর্ম সম্পাদনের জন্য তরুণকে প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে এখান থেকে উপকৃত হওয়া অভিভাবকের কর্তব্য। সাথে সাথে না দেখে না বুঝে কোন কাজে আসক্ত হওয়া ও নির্ভয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া হতে তাকে সতর্ক করতে হবে।
টিকাঃ
১৫৫. আর-রুম-৫৪
১৫৬ .মুস্তাদরেকে হাকেম-২/৬৯
১৫৭ বখারী-২৪৭০, মুসলিম-৩৪৭৩