📄 বেশ-ভূষা, পরিচ্ছন্নতা ও শিশুর স্বাস্থ্যের প্রতি যত্ন দৃষ্টি রাখা
বেশভূষা, পরিচ্ছন্নতা ও শিশুর স্বাস্থ্যের প্রতি সযত্নদৃষ্টি রাখা: শিশুরা এই ছোট বয়সে অন্যদের থেকে রোগব্যধিতে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। ওরা তাৎক্ষণিকভাবে সাধারণত নিজেদের স্বাস্থ্যগত বিষয়গুলো ও স্বাস্থ্যের প্রতি ভালোকরে যত্ন নিতে জানে না। সুতরাং অনুসন্ধান করে তাদের স্বাস্থ্যগত ত্রুটিগুলো খুঁজে বের করা অভিভাবকের কর্তব্য। এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিশুটির শীর্ণকায়তার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন ও তাদের ওপর বদ নজরের প্রতিক্রিয়া দূর করার জন্য ঝাড় ফুঁকের পরামর্শ দিলেন। যখন তিনি নিশ্চিতভাবে অবগত হতে পারলেন যে, তাদের এ দূরাবস্থা কুদৃষ্টির কারণেই হয়েছে। এমনিভাবে তাদের বেশভূষা ও পরিচ্ছন্নতার প্রতি গুরুত্ব দেয়ার কথাও বললেন।
আব্দুল্লাহ বিন জাফর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জাফর রা. পরিবারের তিন ব্যক্তিকে তাদের ওখানে যাবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের নিকট আগমন করে বললেন, 'আজকের পর আমার ভাইয়ের ওপর কেউ ক্রন্দন করবে না।' অতঃপর বললেন, 'আমার ভাইয়ের সন্তানের জন্য তোমরা দোয়া কর!' এরপর আমাদেরকে আনা হলো যেন 'আমরা পাখির ছানা'। অতঃপর তিনি বললেন, 'তোমরা আমার কাছে একজন নাপিত ডেকে পাঠাও!' এরপর তাঁর নির্দেশে তিনি আমাদের মাথা মুণ্ডন করে দিলেন।
তাদেরকে পাখির ছানার সঙ্গে তুলনা করার কারণ, তাদের কেশগুচ্ছ ঠিক পাখির পালকের মত, তা হলো পাখির সর্বপ্রথম গজানো পালক। সে কারণে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নাপিত আসার পর তাকে মাথামুণ্ডন করতে নির্দেশ করলেন। হজ ও উমারাহ ব্যতীত চুল রাখা উত্তম হওয়া সত্ত্বেও তাদের মাথা মুণ্ডন করিয়ে ছিলেন। তাদের মা আসমা বিনতে ওমাইস রা. এর স্বামী জা'ফর রা. যুদ্ধে নিহত হওয়ার কারণে তার অপূরনীয় ক্ষতি হয়ে ছিল, যার দরুন সে তাদের কেশগুচ্ছ চিরদণী করার প্রতি অমনোযোগী হয়ে পড়েছিল। বিষয়টা লক্ষ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের মাথায় ময়লা ও উঁকুনের আশঙ্কা করে ছিলেন।
শিশুর পোশাক ও শরীরের অবয়বের প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে। সুতরাং অভিভাবককে ভালো পরিচ্ছদ ও পরিচ্ছন্নতার দিক থেকে দেখার সৌন্দর্য বর্ধনের প্রতিও সচেষ্ট হতে হবে। কারণ আল্লাহ তাআ'লা নিজে সুন্দর ও সুন্দরকে তিনি ভালোবাসেন, পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতাকে তিনি পছন্দ করেন। সুন্দর অভিব্যক্তি ও সৌন্দর্য অর্জনের প্রয়াস, দুর্বোধ্য ও অনভিপ্রেত কবিতা আবৃত্তি থেকে বিরত রাখবে। যা রুচির বিকৃতি ও অপরিচিত বিষয়বস্তু উপস্থাপনের দিকে ইঙ্গিত করে থাকে।
সেকালের একটি গল্প যার নাম 'কযা'। আর তা হলো মাথার চুলের একাংশ কেটে অন্য অংশ রেখে দেয়া। এর একাধিক পদ্ধতি রয়েছে। চুল কাটার এই প্রক্রিয়া তখন থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত অব্যাহতভাবে অনুসৃত হয়ে আসছে। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা হতে নিষেধ করেছেন।
ইবনে উমার রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম 'কযা' হতে নিষেধ করেছেন।' ইবনে উমার রা. বলেন, 'আমি নাফে কে জিজ্ঞাসা করলাম-'কযা' কি? তিনি রা. বললেন, 'শিশুর মাথার একাংশ মুণ্ডন করা আর অন্য অংশ রেখে দেয়া। ' শিশুর যত্ন ও প্রতিপালনের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তির এ ধরনের চুল কাটার কাজে ছাড় দেয়া ঠিক হবে না এই যুক্তিতে যে, সে ছোট ও শরিয়ত কর্তৃক আদিষ্ট নয়।
শিশুর জন্য উৎকৃষ্ট মানের পোশাকের ব্যবস্থা করা উচিত। তবে কোন অবস্থাতেই রেশম ও স্বর্ণ পরিধান করানো যাবে না। কারণ অধিকাংশ সাহাবী ও আলেমগণ তা হতে নিষেধ করেছেন। যাবের রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমরা তা বালকদের থেকে খুলে নিয়ে বালিকাদের জন্য ছেড়ে দিয়েছি।' ইসমাঈল বিন আব্দুর রহমান বিন আউফ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি আব্দুর রহমানের রা. এর সঙ্গে উমার রা. এর কাছে প্রবেশ করলেন। তখন তার গায়ে রেশমের জামা ও হাতে একজোড়া কংকন ছিল। উমার জামাটি ছিঁড়ে ফেললেন ও কংকন জোড়া খুলে ফেলে বললেন, 'তুমি তোমার মায়ের কাছে যাও!' ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত- 'তার ছেলে রেশমের জামা পরিধান করে তার কাছে আসল, অবশ্য বালকটি তার এই পোশাকে প্রফুল্লতা অনুভব করছিল। অতঃপর যখন তাঁর একেবারে নিকটবর্তী চলে আসল তখন জামাটি তিনি ছিঁড়ে ফেলে বললেন, 'তোমার মায়ের কাছে চলে যাও! এবং গিয়ে তাকে বলো তোমাকে যেন অন্য আর একটি জামা পরিয়ে দেয়। '
ইবনু আবি শাইবাহ্ রহ. বিষয়টিকে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে এই শব্দে উল্লেখ করেছেন, 'ইবনে মাসউদ রা. যখন তার এক ছেলেকে রেশমের পোশাক পরিহিত অবস্থায় দেখতে পেলেন, সঙ্গে সঙ্গে তিনি তা ছিঁড়ে ফেলে বললেন, 'এটা মেয়েদের জন্য নির্ধারিত। ৭৬ সাঈদ বিন যুবায়ের রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'হুযাইফাহ ইবনুল য়ামান রা. দীর্ঘ ভ্রমণ থেকে নিজ গৃহে প্রত্যবর্তন করে তার সন্তানগণকে রেশমের পোশাক পরিহিত অবস্থায় দেখতে পেলেন। অতঃপর তিনি সকল সন্তানের মধ্য হতে ছেলেদের গা হতে তা খুলে ফেলেন ও মেয়েদেরটা রেখে দেন। ' ৭৭ অতএব চুল কাটার উল্লেখিত পদ্ধতি, রেশমের পোশাক পরিধান অথবা স্বর্ণ ব্যবহার একটি শিশুর বিকাশ ভুল পথে পরিচালিত হওয়ার অন্যতম মাধ্যম। কারণ, সে তখন বাহ্যিক বেশভূষায় মেয়েদের কাছকাছি চলে যায়, যা তাকে অনাকাংক্ষিত পরিণতির দিকে ধাবিত করে।
টিকাঃ
৭০. আবু দাউদ-৩৬৬০, নাসাঈ-৫১৩২,
৭১ আউনুল মা'বুদ-১১/১৬৪
৭২. মুসলিম-৩৯৫৯
৭৩. আবু দাউদ: ৩৫৩৭, এখানে ننزعه এর সর্বনাম الحرير এর দিকে এবং كنا এর সর্বনাম তার সঙ্গিদের দিকে ফিরেছে আর সঙ্গি হচ্ছে সাহাবায়ে কেরাম রা.।
৭৪. শরহে মাআ'নিল আছার ৪/২৪৮, ইবনু আবি শাইবাহ্ ৫/১৫২
৭৫. মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক ১১/৭৭, মু'জামুল কাবীর; ৯/১৫৭
৭৬. মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ্: ৫/১৫২
৭৭. মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ-৫/১৫২