📄 কৌতুক, রসিকতা ও বিনোদন
কৌতুক, রসিকতা ও বিনোদন: ভালোবাসা ও মমতায় ভরা পারিবারিক পরিবেশের উপলব্ধি শিশুর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শুধু কথায় নয়, বাস্তব কাজ-কর্মে, আচার-আচরণে এর প্রমাণ থাকতে হবে। কাজেই শিশুর সঙ্গে রসিকতা ও কৌতুক এবং তার নিকট বিনোদনমুখর পরিবেশ তৈরী করা অভিভাবকের কাছে একান্তভাবে কাম্য। তার অবস্থাবলি ও খেলাধুলা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদও এর অন্তর্ভুক্ত। আপনি যেন একজন বড় মানুষের সঙ্গে আলোচনা করছেন, তাকে এভাবে সম্মোধন করা। যেমন- আপনি যেন তাকে বলছেন, 'হে অমুকের বাপ, তুমি কেমন আছো?' অথবা হে অমুকের মা, ইত্যাদি।
আনাস বিন মালিক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মধ্যে প্রবেশ করে কৌতুকচ্ছলে আমার ছোট ভাইকে বললেন, 'হে আবু ওমায়ের, (নুগায়ের) কি করে ? আবু ওমায়ের রা. তখন সবেমাত্র দুগ্ধপান ছেড়ে দিয়েছেন। সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সঙ্গে রসিকতা করলেন ও তাকে হাসালেন। যেমন অপর বর্ণনায় এসছে 'এবং তাকে নুগায়ের সম্পর্কে প্রশ্ন করেছেন। ইবনে হাজার রহ. বলেন, 'এখানে কৌতুক ও রসিকতার পুনরাবৃত্তির অনুমতি দেয়া হয়েছে। এ বৈধতা কোন ছাড় নয় বরং এটা সুন্নত। যে শিশু ভালোমন্দ নির্ণয় করতে পারে না তার সঙ্গেও রসিকতা বৈধ।
উম্মে খালেদ বিনতে খালেد রা. থেকে বর্ণিত, 'একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট কিছু কাপড় আসল যার মধ্যে কালো রংয়ের ছোট একটি কাপড়ও ছিল। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমরা কী বলো, এটা কাকে পরিধান করাবো? তখন সকলে চুপ থাকলো। 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, উম্মে খালেদকে আমার নিকট নিয়ে এসো! তাকে উঠিয়ে নিয়ে আসা হলো। এরপর তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উক্ত কাপড়ের টুকরোটি হাতে নিয়ে তাকে পড়িয়ে দিয়ে বললেন, 'এটা তুমি ব্যবহার করে পুরাতন করে ফেল।' সেই কাপড়টির মধ্যে হলুদ অথবা সবুজ চিহ্ন বিদ্যমান ছিল, অতঃপর তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, 'হে খালেদের মা, এটা হলো ইথিওপিয়ানদের জাতীয় প্রতীক, আর তাদের প্রতীক সুন্দর। অতএব এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম 'খালেদের মা' বলে তাকে সম্মোধন করেছেন। অথচ সে ছিল তখন এক খুকী; এবং তাকে ইথিওপিয়ার ভাষায় সম্মোধন করেছিলেন। যেহেতু ইথিওপিয়া থেকে হিজরত করে আগমনকারী মুহাজিরদের মধ্যে সেও ছিল।
ছোট শিশুর সঙ্গে রসিকতার ক্ষেত্র এর চেয়ে আরো অনেক দূরে চলে গেছে। আব্দুল্লাহ বিন শাদ্দাদ বিন হাদ রা. তার পিতা হতে বর্ণনা করেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিকট দ্বিপ্রহরের কোন এক নামাজ যোহর অথবা আছরের জন্য তাঁর কোন এক নাতী হাসান অথবা হুসাইনকে কোলে নিয়ে বের হলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইমামতির জন্য আগে চলে গেলেন ও তাকে তাঁর ডান পায়ের নিকট রাখলেন; এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি লম্বা সিজদাহ করলেন। আমার পিতা (শাদ্দাদ) বলেন, 'মুসল্লীদের মধ্য হতে শুধুমাত্র আমি মাথা উত্তোলন করে দেখি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এখনো সিজদারত আছেন এবং বাচ্চাটি তাঁর পিঠের ওপর চড়ে আছে। তিনি গুনে গুনে আরো কয়েকটি সিজদা করলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাজ সমাপ্ত করলে লোকজন বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আজ নামাজে একটি এমন সিজদা করলেন যা ইতিপূর্বে আর কখনো করেননি। আপনাকে কি কোন নতুন বিষয়ের নির্দেশ কিংবা আপনাকে প্রত্যদেশ করা হয়েছে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'এর কোনটাই হয়নি, কিন্তু আমার নাতী আমার ওপর আরোহন করেছে, তাই আমি তার প্রয়োজন পূর্ণ হওয়ার পূর্বে তাড়াহুড়া পছন্দ করিনি। '
তিনি বললেন, আমাকে যেন একটি বাহন বানিয়ে আমার পিঠে সে আরোহন করেছে। আয়েশা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে বিবাহের শুভলগ্নে তার একটি থলে সাথে করে রেখে দিয়ে তা নিয়ে খেলা করছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে তাঁর বান্ধবীরাও ছিল। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত আর একটি হাদীসে তিনি বলেন, 'একদা আমার ঘরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রবেশ করলেন, তখন আমি খেলনা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্দা উঠালেন। বললেন, 'হে আয়েশা, এটা কি?' তখন আমি বললাম, 'এটা খেলনা হে আল্লাহর রাসূল, আবার তিনি বললেন, 'তোমাদের মধ্যে আমি ওটা কি দেখছি?' উত্তরে আমি বললাম, ঘোড়া হে আল্লাহর রাসূল, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'কাপড়ের একটি ঘোড়া তার আবার ডানাও আছে। আয়েশা রা. বলেন, 'আমি এর উত্তরে বললাম, 'নবী সুলাইমান বিন দাউদের ঘোড়ার কি অসংখ্য ডানা ছিলো না? উত্তর শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হেসে দিলেন। ' সে কারণে সাইয়্যেদা আয়েশা রা. বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ চাদর দ্বারা আমাকে আড়াল করে রাখতেন আর আমি মসজিদের মধ্যে কাফ্রিদের খেলাধুলা উপভোগ করতাম। দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত হয়ে যেতাম। কাজেই তোমরা ক্রীড়ামোদী কিশোরীদের খেলাধুলার প্রতি দৃষ্টি দেবে।
অতএব শিশুর সঙ্গে এ জাতীয় খেলাধুলা ও কৌতুক রসিকতা করা অভিভাবকের কর্তব্য। এক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়ে উভয়েই সমান। শিশুর জন্য একটি অবসর রেখে দেয়া যেখানে সে নিজে খেলাধুলা ও শরীর চর্চা করতে পারে, যাতে তার বিষণ্ণতা দূর হয়। ফিরে আসে উদ্যম। মুসলমানদের জাতীয় উৎসবগুলোতে বিষয়টা নিশ্চিতভাবে ফুটে উঠে। তবে খুব সতর্কতার সাথে লক্ষ রাখতে হবে, এ খেলাধুলার মধ্যে যেন শরিয়ত পরিপন্থী কোন বিষয় লুকিয়ে না থাকে। মুজাহিদ রহ. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, 'প্রতিটি জুয়া সুদ, এমনকি বাচ্চাদের আখরোট নিয়ে খেলা করাটাও। '
ইবনু আবি শাইবাহ রহ. হাম্মাদ বিন নুযাইদ রহ. থেকে বর্ণনা করেন, 'আমি ইবনে সিরীন রহ. কে দেখেছি ঈদের দিন মারবাদ নামক স্থানে একদল বালকের নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, যারা তখন বাদাম নিয়ে জুয়া খেলায় নিমগ্ন ছিলো। অতঃপর তিনি বললেন, হে বালকগণ, তোমরা জুয়া খেলো না, কারণ জুয়া হচ্ছে সুদ। ' শিশু ও বালকদের ওপর এই বয়সে কলম চালু হয়নি সত্য কথা। কিন্তু এর অর্থ কখনোই এটা নয় যে, তাদেরকে শরিয়ত পরিপন্থী বিষয় থেকেও নিষেধ করা যাবে না। সেটা এ জন্যে যে, যাতে তারা উক্ত কাজে অভ্যস্ত হয়ে না পড়ে ও পরিণত বয়সে তা পরিত্যাগ করতে তাদের জন্য অনেক কষ্ট না হয়। ইবনুল কাইয়্যুম রহ. বলেন, 'শিশু যদিও আদিষ্ট নয়, কিন্তু তার অভিভাবকতো অবশ্যই আদিষ্ট। তার জন্য শিশুকে নিষিদ্ধ কাজের সুযোগ দেয়া বৈধ নয়, কারণ সে তাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে ফলে পরে তার থেকে তা ছাড়ানো কঠিন হয়ে যাবে। এটা হলো জ্ঞানীদের সর্বাপেক্ষা বিশুদ্ধ মত।
শিশুর পছন্দনীয় খেলার প্রতি তার আগ্রহেরও মূল্যায়ন করতে হবে। সুতরাং তার ওপর এমন খেলা চাপিয়ে দেবেন না যা সে পছন্দ করে না। এমনিভাবে তার পছন্দনীয় খেলা থেকে তাকে নিষেধ করা যাবে না ; বিশেষ করে যদি সেটা খেলাধুলার জন্য নির্ধারিত করা হয়।
টিকাঃ
৫১ বুখারী-৫৬৬৪ ,نغیر হচ্ছে ছোট্ট পাখি, একবচন نغرة
৫২ ফাতহুল বারী-১০/৫৮৪
৫৩ বুখারী-৫৩৭৫
৫৪ মুস্তাদরেকে হাকেম-৩/১৮১
৫৫ বুখারী-৩৬০৫, মুসলিম-২৫৪৭
৫৬. ইবনে হিব্বান-১৩/১৭৪
৫৭ বুখারী-৪৮৩৫, মুসলিম-১৪৮১
৫৮. তাফসীরে তাবারী-২/৩৫৭
৫৯ মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ-৫/২৮-৮
৬০ তুহফাতুল মওদুদ ফি আহকামিল মওলুদ-২৪৩
📄 শিশুর প্রয়োজনে সাড়া দেয়া
শিশুর প্রয়োজনে সাড়া দেয়া: শিশুর রকমফের প্রত্যাশা থাকে যা সে অর্জন করতে চায়। সেখান থেকে কয়েকটা বিষয় এমনও রয়েছে যা গ্রহণযোগ্য প্রয়োজন হিসেবে বিবেচিত। যেমন: তার খাদ্য, পানীয়, বস্ত্র, তাকে গুরুত্ব প্রদান ও মূল্যায়নের অনুভূতি, তার প্রতি অনুগ্রহ ও পারিবারিক ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ ইত্যাদির সংস্থান। শিশুর এ সকল প্রয়োজনে সাড়া দেয়া ও তা পূরণে সচেষ্ট হওয়া উচিত। অনেক বিষয় এমন আছে যা গ্রহণযোগ্য নয়, যেমন: পূর্বে উল্লেখিত বিষয়ে অতিরঞ্জন যা ভারসাম্যের সীমা অতিক্রম করে যায়। আর কিছু বিষয় আছে যা শুধু উত্তমের পরিপন্থী অথবা অশোভন এর পর্যায় পড়ে। অতএব অভিভাবককে সকল প্রয়োজনের সঙ্গে একই ধরনের আচরণ করা অথবা সেটা গ্রহণ ও বর্জনের ক্ষেত্রে একই পথে চলা উচিত হবে না। বরং প্রত্যেকটাকে তার উপযুক্ত স্থানে রাখতে হবে।
উক্ত প্রয়োজনাবলির বিভিন্ন রকমের সাড়া শিশুর নিকট বিষয়গুলোর শুদ্ধাশুদ্ধের ইঙ্গিতবাহী হবে; যার কিছু হবে প্রশংসনীয় আর কিছু হবে দোষণীয়। তার প্রতিটি আবেদনে সাড়া দেয়াও উচিত হবে না। বিশেষ করে যেটা শরিয়তের দৃষ্টিতে ত্রুটিযুক্ত যার মধ্যে শিশুর ক্ষতি নিহিত আছে ও পার্থিব দিক থেকে শিশুর কাঁধকে ভারী করে দেবে। এ প্রেক্ষিতে শিশুকে কোন রকমের ক্রোধ প্রদর্শন, গালি ও প্রহার ইত্যাদি (যা অধিকাংশ অভিভাবক করে থাকেন বিশেষ করে শিশুর কঠিন জিদের সময়) না করে তাকে সঠিক পথের দিশা দিতে হবে।
📄 একাধিক সন্তান থাকলে তাদের মধ্যে সমতা বিধান করা
একাধিক সন্তান থাকলে তাদের মধ্যে সমতা বিধান করা: লিঙ্গের কারণে শিশুদের মধ্যে পার্থক্য না করা প্রতিপালনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আচার-ব্যবহার অথবা দানের ক্ষেত্রে ছেলেকে মেয়ের ওপর প্রাধান্য দেয়া হয়, এটা ঠিক নয়। অথবা মেয়ের তুলনায় ছেলের যত্ন ও বিকাশের দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। কারণ এসবই অবিচার। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন এক ব্যক্তিকে সম্বোধন করে বলেছিলেন যে তার এক সন্তানকে বিশেষভাবে সম্পদ দান করেছিল, 'তোমার প্রত্যেকটি সন্তানকে কি তার মত দান করেছো?' সে বলল, না। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তাহলে এটা ফিরিয়ে নিয়ে যাও!' অন্য বর্ণনায় এসছে- 'এ ছাড়া তোমার কি আর কোন সন্তান আছে?' সে বলল, হ্যাঁ; অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন- 'তাদের প্রত্যেককে কি তুমি এর মত দান করেছো?' সে বলল- না। তখন তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাহলে আমাকে সাক্ষী বানিও না। কারণ আমি অন্যায়ের সাক্ষ্য দেই না। ' সন্তান-সন্ততির মধ্যে সমতা বিধানের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নির্দেশ এসেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, 'তোমরা তোমাদের সন্তানদের মধ্যে সমতা বিধান কর! তোমরা তোমাদের সন্তানদের প্রতি ন্যায়বিচার কর!'
একই লিঙ্গের সকল ব্যক্তির মধ্যে সমতা বিধানের ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া উচিত, যেমনিভাবে এক সন্তানকে অপর সন্তানের চেয়ে অতি বেশি গুরুত্ব না দেয়া উচিত। অথবা অতিরিক্ত ভালবাসা প্রকাশ করা উচিত নয়। যেমন সায়্যেদুনা হযরত ইউসুফ আ. এর ঘটনা। তাঁকে অন্য সন্তানদের তুলনায় তার পিতা অপেক্ষাকৃত বেশি ভালোবাসার কারণে অন্য ভাইয়েরা তার সঙ্গে কিরূপ আচরণ করেছিলেন। আল্লাহ তাআ'লা ইরশাদ করেন-
إِذْ قَالُوا لَيُوسُفُ وَأَخُوهُ أَحَبُّ إِلَى أَبِينَا مِنَّا ...... ( يوسف - 8 )
'ইউসুফ ও তার ভাই আমাদের পিতার নিকট আমাদের চেয়ে বেশি প্রিয়.......। ' অতঃপর তাদের বাবাকেই তারা একথা বলে অপবাদ দিলো-
إِنَّ أَبَانَا لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ. (يوسف-8 )
'নিশ্চয়ই আমাদের পিতা সুস্পষ্ট ভ্রান্তির মধ্যে অবস্থান করছেন। '
এরপর তারা সমস্যার সমাধান চেয়েছেন একথা বলে -
اقتلوا يوسف أو اطرحوه ارضاً يخل لكم وجه ابيكم وتكونوا من بعده قوماً صالحين. (يوسف-9)
'তোমরা ইউসুফকে হত্যা কর অথবা তাকে কোন স্থানে ফেলে আস, ফলে তোমাদের পিতার দৃষ্টি শুধু তোমাদের প্রতিই নিবিষ্ট হবে এবং তার পর তোমরা ভালো লোক হয়ে যাবে। ' সুতরাং সকলকে রেখে বিশেষ কোন সন্তানের প্রতি ভালোবাসা ও গুরুত্বারোপ হিংসা ও বিদ্বেষের জন্ম দেয় যা তাদের কাউকে সেই প্রাধান্যপ্রাপ্ত সন্তানের বিরুদ্ধে চক্রান্তকরতে পর্যন্তউদ্যত করে থাকে। যাতে হিংসার যন্ত্রনা থেকে তারা পরিত্রাণ পেতে পারে। তবে কখনো কখনো এই প্রাধান্যদানের ক্ষেত্রে বাবার পক্ষ থেকে সত্যিকারার্থে অসংখ্য বৈধ কারণও থাকতে পারে। কিন্তু সন্তানরা সাধারণত তা ঝুঝতে পারে না। কাংক্ষিত সমতাবিধান পার্থিব বিষয়াদিতে অসম্ভব নয়, কিন্তু বিষয়টা হলো অপার্থিব বিষয়গুলোর মধ্যে তা সীমা অতিক্রম করে যায়। যেমন চেহারার প্রফুল্লতা, স্নেহেরদৃষ্টি ও স্মিতহাসি এমনকি তার আদিষ্ট কর্মসমূহ ও শিশুদের পার্থিব অপার্থিব সকল চাহিদার সুষম বণ্টন। অভিভাবক কর্তৃক শিশুদের মধ্যে সমতা বিধান তাদেরকে পরস্পরে এই নান্দনিক চরিত্র মাধুর্য বিতরণে উদ্বুদ্ধ করবে।
টিকাঃ
৬১ বুখারী-২৩৯৭
৬২. মুসলিম: ৩০৫৬
৬৩. আবু দাউদ: ৩০৭৭, সন্তান বলতে ছেলে মেয়ে উভয়কে বুঝায়।
৬৪. সুরা ইউসুফ: ৮
৬৫. সুরা ইউসুফ: ৮
৩. সুরা ইউসুফ, আয়াত-৯
📄 শিশুদের মধ্যে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান
শিশুদের মাঝে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান :
এমন কোন স্থান বা ঘর নেই যেখানে শিশুদের মধ্যে সমস্যা সৃষ্টি হয় না। কখনো দুই বা ততোধিক ভাই একে অপরের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে, যেমনিভাবে ভাই ও বোনের সঙ্গে বিরোধ হয়ে থাকে ইত্যাদি। অনেক অভিভাবক আছেন এক্ষেত্রে প্রথম বারেই আদেশ ও নিষেধাজ্ঞা, কঠোরতা ও অবয়ব বিকৃত করে চিৎকার করার দ্বারা ত্বরিত হস্তক্ষেপ করতে তৎপর হয়ে থাকেন। কারণ দ্রুত সন্দেহ নিরসনের বাসনা তার মধ্যে তখন জেঁকে বসে। এখন তার একটাই চিন্তা হয়ে গেছে, তাহলো সকল আওয়াজ নিস্তব্ধ করে দেয়া। যদিও এর একটা ভাল দিকও আছে, কিন্তু তারপরও সমস্যার পূর্ণ সমাধানে তা সহায়ক নয়। বরং অভিভাবক তাদের পর্যবেক্ষণ থেকে অনুপস্থিত থাকে তখন যে কোন সময় পুনরায় সেই লেজকাটা সমস্যাটি মাথাচারা দিয়ে উঠার আশঙ্কা রয়েই যায়। সুতরাং মূল সমস্যা ও তা মূলোৎপাটনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত না হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সমস্যা সমাধানে অভিভাবকের হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। তবে তিনি যদি সামান্য সুযোগ দিতে পারেন ও যখন অপেক্ষা করলে কোন বিপদাশঙ্কাও না থাকে, তাহলে সেক্ষেত্রে কোন হস্তক্ষেপ না করে বরং দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করতে থাকবেন। ফলে তিনি দেখতে পারবেন, কিভাবে শিশুরা নিজেদের সমস্যার সমাধান করে থাকে ও এ পর্যায়ে তাদের সামর্থ সম্পর্কে অবগত হতে পারবেন। ফলে অভিভাবকের জন্য এ জাতীয় সতর্ক পদক্ষেপ হবে যেন একটি খোলা জানালা; যেখান থেকে তিনি শিশুর চরিত্র, আচরণ ও সামর্থসমূহ দেখতে পারবেন। কিন্তু বিষয়টি যখন হস্তক্ষেপের পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে, সেখানে অপেক্ষা করার কোন সুযোগ নেই, তখন তাৎক্ষণিকভাবে হস্তক্ষেপ করা কর্তব্য।
কিন্তু কখনো ঘটনা এমনও ঘটে যেতে পারে যে, একপক্ষ এসে আপনার নিকট অপর পক্ষের বিরুদ্ধে আপনার সাহায্য ও সমর্থন চাইবে। তখন যদি সে অত্যাচারিত না হয়ে থাকে তাহলে তাকে সহায়তা প্রদান আপনার উচিত হবে না। এতটুকু বিবেচনা ব্যতিরেকে তাকে সাহায্য করলে অন্যরা মনে করবে আপনি একজন অত্যাচারী। আপনি সন্তানদের মধ্যে একজনের তুলনায় অন্যজনকে বেশি ভালোবাসেন।
পরিস্থিতি যদি এমন হয় যে, আপনি একজনকে সাহায্য করলেন, আর অপরজন মনে করল আপনি তার প্রতি অবিচার করেছেন। তাহলে সে স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিয়ে আপনাকে বলবে, 'আপনি আমার প্রতি অবিচার করেছেন।' এহেন পরিস্থিতিতে শুধু ঐ কথাটার জন্য এই ভিত্তিতে শাস্তি দেয়া যাবে না যে, সে বেয়াদবী করেছে। বরং এক্ষেত্রে হৃদয়ের উ'তা দিয়ে কথাটা গ্রহণ করা অভিভাবকের কর্তব্য ও তাকে স্পষ্ট করে দিতে হবে যে, আপনি তার প্রতি কোন অবিচার করেননি। আর এটাই হলো মার্জিত সমাধান। এ প্রসঙ্গে আপনার নিকট বিদ্যমান প্রমাণগুলো পেশ করতে পারেন। শিশুকে প্রহার করা বা শাস্তি দেয়া অভিভাবকের কর্মের ওপর তার সিদ্ধান্ত টলাতে পারবে না। পক্ষান্তরে তথ্য প্রমাণসহ বিবরণ সত্যটাকে ফুটিয়ে তুলতে ও অভিভাবকের পদক্ষেপে তাকে সন্তুষ্ট করতে সক্ষম হবে। উপরন্তু তার অন্তরে 'অত্যাচারিতকে সাহায্য করা উচিত' এ বিশ্বাস বদ্ধমূল করে দিতে পারে।