📘 সন্তান লালন পালন ও তালীম তরবিয়ত > 📄 অভিজ্ঞতার মাধ্যমে পরিচর্যা

📄 অভিজ্ঞতার মাধ্যমে পরিচর্যা


অভিজ্ঞতার মাধ্যমে পরিচর্যা: অনেকে মনে করেন, অভিজ্ঞতা শুধুমাত্র কর্মক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তা শুধু জ্ঞানগত আমলযোগ্য বিষয়াদি প্রমাণ করার জন্য ব্যবহৃত হয়, যা অনুমান করা যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রতিপালনের ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হওয়া যায় অপ্রকাশ্য বিষয়েও। আমাদের নিকট পূর্বেকার যুগের একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা আছে। ঘটনার নায়ক সেখানে অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হতে সক্ষম হয়েছেন। তার সন্তানদের অন্তরে 'একতাই শক্তি' এই বিশ্বাস অংকুরিত ও প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। অভিজ্ঞ পিতা ও অভিভাবক কাষ্ঠের একটি আঁটি নিয়ে আসলেন ও সেখান থেকে প্রত্যেককে একটি একটি করে কাষ্ঠ প্রদান করে তাদেরকে তা ভাঙ্গতে বললেন। অতঃপর তারা খুব সহজেই কর্মসম্পাদন করে ফেলল। সন্তানরা এ কাষ্ঠগুলো ভাঙ্গার পর পুনরায় আর এক আঁটি কাষ্ঠ আনালেন, যে আঁটিটা ভাঙ্গা হয়েছে হুবহু ওটার মতই। এবং সেটা ভালো করে বাঁধলেন ও আঁটিটা ভাঙ্গতে বললেন। সন্তানরা যখন এই নির্দেশ পালনে অপারগতা প্রকাশ করল। তখন অভিভাবক তাদেরকে কারণ নির্ণয়ের সুযোগ দিলেন। এই ফাঁকে মনে মনে দু'টো বিষয় নির্ধারণ করে ফেললেন –
তাদের অন্তরে ভ্রাত্বিত্বের মূল্যবোধ গেঁথে দেয়া। আর তা হল 'একতাই শক্তি'। দুর্বল ব্যক্তিও তার ভাইদের সঙ্গে দলবদ্ধ থাকলে শক্তিশালী হয়ে যায়।
• তাদেরকে এ ঘটনাস সম্পর্কে গবেষণা করতে অভ্যস্ত করা।
অভিজ্ঞ অভিভাবক নিরবচ্ছিন্নভাবে তার কাংক্ষিত প্রতিপালনের অবকাঠামো এ জাতীয় পরিস্থিতিতে বদ্ধমূল করতে সক্ষম হয়ে থাকেন। তবে এক্ষেত্রে বিপদজনক উপকরণসমূহ ব্যবহার বর্জন করা উচিত। কারণ অভিভাবকের অনুপস্থিতিতে শিশুটি সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি করতে চাইবে বৈকি। তখন ঘটে যেতে পারে যে কোন অনাকাংক্ষিত অঘটন।

📘 সন্তান লালন পালন ও তালীম তরবিয়ত > 📄 অভ্যাস পদ্ধতিতে প্রতিপালন

📄 অভ্যাস পদ্ধতিতে প্রতিপালন


পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে কোন কাজ করা বা কোন কথা বলার অভ্যাস মানুষকে তার ব্যক্তিগত গুণাবলির একটি অংশ। সাধারণত মানুষ কোন কাজে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার পর সেটা করতে তার আর কষ্ট হয় না। বাস্তবিকই তা অনেক কষ্টসাধ্য কাজ হোক না কেন। কথা আছে মানুষ অভ্যাসের দাস।
সে কারণে কাংক্ষিত আচরণকে অভ্যাসে রূপান্তরিত করা প্রতিপালনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কাংক্ষিত আচরণকে অভ্যাসে রূপান্তরিত করতে হলে একজন অভিভাবকের অব্যাহত প্রচেষ্টা চালাতে হবে। বারবার তা পুনরাবত্তি এবং খুব কঠিনভাবে এর অনুশীলন করতে হবে। অতঃপর কালক্রমে তা শিশুর অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাবে। ফলে অভিভাবক থেকে ঐ কাজের কোনরূপ অনুরোধ ব্যতিরেকে উক্ত কাজের দাবী আসলেই সে তা সম্পন্ন করে ফেলবে। যেমন: কোন মুসলমান যদি হাঁচি দেয়ার পর 'আলহামদুলিল্লাহ' বলতে অভ্যস্ত থাকে, যদি সে কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গভীর চিন্তায় নিমজ্জিত থাকে বা খুব ব্যস্ত থাকে, তাহলেও সে হাঁচির পরই বলে উঠবে 'আল-হামদুলিল্লাহ।' কারণ, এটা তার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। এমনটিই হয়ে থাকে। সে কারণে হাদিসে এসছে-
الخير عادة والشر لجاجة من يرد الله به خيرا يفقهه فيالدين
'কল্যাণ ও মঙ্গল হলো অভ্যাস, অমঙ্গল ও অকল্যাণ হচ্ছে ঝগড়া-বিবাদ। আল্লাহ তাআলা যার মঙ্গল চান তাকে দীনে ইসলামের সঠিক জ্ঞান দান করেন।
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. বলেন, 'নামাজের ব্যাপারে তোমাদের সন্তানদের প্রতি যত্নবান হও! তাদেরকে কল্যাণ শিক্ষা দাও! অনন্তর কল্যাণই হচ্ছে অভ্যস।' মুয়াবিয়া রা. বলেন, 'তোমরা নিজেদেরকে কল্যাণের ওপর অভ্যস্ত করে নাও!' সুতরাং বাচ্চাদেরকে কল্যাণের ওপর অভ্যস্ত করতে অনুপ্রাণিত করাই ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অভিপ্রায়। এক ভদ্র মহিলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট একটি বাচ্চা উঁচিয়ে ধরে জিজ্ঞাসা করল- 'এর জন্যে কি হজ্জ আছে?' উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হ্যাঁ আছে, তবে এর বিনিময় পাবে তুমি। ' বাচ্চাটি ছোট, হজ্জের আহকাম সম্পর্কে সে কিছুই জানে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে উক্ত মহান ব্রতে অভ্যস্ত করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। আর 'এ দায়িত্ব পালন করলে তার জন্য পুরস্কার রয়েছে' বলে তার মাকেও উৎসাহিত করেছেন। যখন মুসলিম মহিলাগণ নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদে যেতেন অথচ অনেক বাচ্চা কান্নাকাটি করতো। এতদসত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে মসজিদে নিয়ে আসতে নিষেধ করেননি। বরং শিশুদের প্রতি লক্ষ রাখতেন এমনকি তাদের জন্য নামাজ সংক্ষিপ্ত করতেন। আমাদের দৃষ্টিতে এটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে মসজিদে আসতে অভ্যস্ত করার জন্যই করতেন।

টিকাঃ
৩২ ইবনে হিব্বان-২/৮
৩০ বাইহাক্বী-৩/৮৪
৩৪ মসনাদে শামিয়্যীন-৩/২৫০
৩৫. মুসলিম- ২৩৭৮
৩৬. এক্ষেত্রে অনেক লোক একটি হাদীস উল্লেখ করেন- 'তোমরা বাচ্চাদেরকে মসজিদ থেকে দূরে রেখ।' হাদীসটি দুর্বল হওয়ার ব্যাপারে হাদীস বিশারদগণ একমত।

📘 সন্তান লালন পালন ও তালীম তরবিয়ত > 📄 আদর্শের মাধ্যমে প্রতিপালন

📄 আদর্শের মাধ্যমে প্রতিপালন


নীতি ও আদর্শের মাধ্যমে প্রতিপালন: উপদেশ, বক্তৃতা ও আলোচনার চেয়ে বাস্তবানুগ পদক্ষেপ শিক্ষার্থীর ওপর অপেক্ষাকৃত বেশি প্রভাব বিস্ত ার করে। কারণ সংঘটন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে তার সত্যায়নের প্রমাণ মেলে। অতএব অভিভাবককে প্রশিক্ষণের অবকাঠামো শক্তভাবে ধারণ করা- যার দিকে তিনি শিক্ষার্থীকে আহ্বান করবেন- বাস্তবে অনুশীলন ব্যতিরেকে প্রশিক্ষণের গুরুত্ব বিষয়ক আলোচনা ও তার দিকে আহ্বানের চেয়ে বেশী কার্যকর। সুতরাং শিশুর সম্মুখে অভিভাবকের সকল কর্মকাণ্ডে কঠিনভাবে সততা অবলম্বন না করতে পারলেও শুধু সততার গুরুত্ব ও মূল্যায়ন বিষয়ক আলোচনার চেয়ে শিশুর জন্য ফলপ্রসু হতে পারে।
ইমাম শাফেয়ী রহ. 'আদর্শ' হওয়ার গুরুত্বের ওপর সতর্ক করেছেন, যখন তিনি বাদশা হারুনুর রশিদের সন্তানদেরকে শিষ্টাচার শিক্ষাদানরত অবস্থায় আব্দুস সামাদের পিতার নিকট আগমন করলেন। তিনি বললেন, 'আমিরুল মু'মিনীনের সন্তানদের সংশোধনের সূচনা করার পূর্বে নিজের সংশোধন করে নেয়া উচিত।' যেহেতু তাদের চক্ষু তোমার চক্ষুর সঙ্গে আবদ্ধ। অতএব তাদের নিকট তা-ই সুন্দর যা তুমি সুন্দর মনে করে থাকবে আর মন্দ যা তুমি মন্দ মনে করে থাকবে।
ইবনে জাওযী রহ. 'অভিভাবকের কথা অনুযায়ী নিজের আমলের গুরুত্ব বিষয়ক' বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, 'জ্ঞানের স্তরের বিভিন্নতা ভেদে অসংখ্য মাশায়েখের সঙ্গে দেখা করেছি। তবে তাদের মধ্যে আমার নিকট তার সাহচর্য সর্বাপেক্ষা বেশি ফলপ্রসূ ও উপকারী প্রমাণিত হয়েছে, যিনি তার জ্ঞান অনুযায়ী আমল করে থাকতেন। যদিও অন্যরা তার চেয়ে অনেক বেশি জ্ঞান রাখেন। আমি একদল হাদীস বিশারদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছি যারা হাদীস সম্পর্কে যথেষ্ট ব্যুৎপত্তি রাখেন ও হাদীস সুসংহত করেন। কিন্তু হাদীসের সূত্র সমালোচনা ও পর্যালোচনা গবেষণার জায়গায় রেখে তা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতেন এবং হাদীস অধ্যায়নের ওপর বিনিময় গ্রহণ করে থাকতেন। তাদের মর্যাদা যাতে ক্ষুণ্ণ না হয় সে জন্য উত্তরদান ত্বরান্বিত করতেন, যদিও তাতে ভুল হোক না কেন। আমি আব্দুল ওয়াহাব আনমাতি রহ. এর সঙ্গে সাক্ষাত করেছি, যিনি সালাফে সালেহীনদের আদর্শের ওপর পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তার মজলিসে কখনো কোন পরনিন্দা শোনা যায় নি এবং হাদীস শ্রবণের জন্য কোন পারিশ্রমিক চাওয়া হয়নি। আমি যখন তার নিকট দাসত্ব বিষয়ক হাদীসসমূহ পাঠ করছিলাম তখন তিনি কেঁদে ফেললেন এবং ক্রমান্বয়ে কাঁদতে থাকলেন। আমি তখন খুব অল্প বয়সী থাকার দরুণ তার ক্রন্দন আমার অন্তরে গভীরভাবে রেখাপাত করে ও আমার হৃদয়ে সুদৃঢ় ভীত নির্মাণ করে। তিনি শায়েখদের পদাঙ্কের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন যাদের গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্যগাঁথা বিভিন্ন বর্ণনায় পেয়েছি।
শায়খ আবুল মানসুর জাওলিকীর সঙ্গেও সাক্ষাত করেছি। তিনি ছিলেন অত্যাধিক নীরবতা পালনকারী, দৃঢ়তার সাথে নিশ্চিতভাবে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে কথা বলতেন। কোন প্রকাশ্য মাসআলা সম্পর্কে তাকে প্রশ্ন করা হলে উত্তর দেয়ার জন্য তার ছাত্রগণই উদ্যত হতো, সেক্ষেত্রেও তিনি নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন। তিনিও অত্যধিক নীরবতা অবলম্বন করতেন ও রোজা রাখতেন। আমি এই দুই মনীষীর নিকট থেকে অপরাপর সকলের চেয়ে বেশী উপকৃত হয়েছি। অতএব আমি বুঝে নিয়েছি কথার চেয়ে কর্মের মাধ্যমে দিকনির্দেশনা বেশী কার্যকর ও টেকসই দিশারী।
একজন অভিভাবক যখন সর্বাবস্থায় কাজের মাধ্যমে তার সকল কথার সত্যায়ন করতে পারবেন তখন শিক্ষার্থীর জন্য এটা বেশ ফলপ্রসূ হতে বাধ্য। যদিও এটা কোন পার্থিব বিষয় সংক্রান্তই হোক না কেন। যেমন : আমাদের বর্তমানকালের লাল রঙের রোড সিগনালের নিকট এসে যদি অভিভাবক নিজে থেমে যায়। তাহলে শিশু সে আদর্শ অনুসরণ করবে। আর যদি অভিভাবক সেটা না করে রেড সিগনাল উপেক্ষা করেন তাহলে শিশু তা-ই করবে। এবং তাকে এটা না করতে সতর্ক করা হলেও সে বলবে আমি আব্বাকে দেখেছি তিনি এটা উপেক্ষা করতেন। অতএব বাস্তব কর্ম শিশুদের শিক্ষার জন্য অধিকতর কার্যকরী উপদেশ ও প্রশিক্ষণের চেয়ে। একটি শিশু তার অভিভাবককে যখন নিঃস্বদের প্রতি অনুগ্রহ ও দুর্বলদের প্রতি সাহায্য করতে দেখতে পাবে, তখন নিঃসন্দেহে এটা শিশুকে তার আনুগত্য ও অনুসরণ করতে উদ্বুদ্ধ করবে। নিজের মধ্যে প্রতিফলন না ঘটিয়ে শুধু দানের তাৎপর্য ও গুরুত্বের ওপর আলোচনা করার চেয়ে এটা হবে অনেক বেশি ফলপ্রসূ। উপরন্তু এক্ষেত্রে শিশুকে যথাযথভাবে অনুপ্রাণিত করা অভিভাবকের একান্ত কর্তব্য। যেমন : সে অভাবীকে যে টাকাটা দিতে চায় তা পকেট থেকে বের করে নেবে, এরপর শিশুটিকে বলবে এটা নিয়ে অভাবীকে দিয়ে আস। তিনি এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিপালনের লক্ষ্য বেশ বাস্তবায়ন করতে পারবেন। সুতরাং ঐ লোকটিকে দান করার কারণ সে-ই শিশুটিকে বলে দেবে। আর তা হলো নিঃস্ব ও অসহায়কে সাহায্য করা। সে অভাবী নয় এমন লোকদের জন্য নিজের সম্পদ ব্যয় করতে ও দানশীলতায় নিজেকে অভ্যস্ত করতে সক্ষম হবে। ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন, 'তাকে দান ও ব্যয় করতে অভ্যস্ত করাবে, অভিভাবক যদি কিছু দান করার পরিকল্পনা করেন। তাহলে নিজে না করে শিশুর হাত দিয়ে দান করাবেন যাতে সে দানের স্বাদ আস্বাদন করতে পারে। '
এমনিভাবে এই আচরণ তাকে সাহসিকতা ও অপরের সঙ্গে সুন্দর ব্যবহারের শিক্ষা দেবে। আব্দুল্লাহ বিন উমার রা. এর কর্মপদ্ধতিও ছিল এরকম। ইবনে উমার রা. এর নিকট জনৈক ভিক্ষুক আসলে তিনি তাঁর ছেলেকে বললেন: ওকে একটি দিনার দিয়ে দাও!' ৩৮ কখনো বা এমন ঘটনাও সংঘটিত হতে দেখা যায় যে, শিশু নিজেই তার বাবার কর্ম প্রত্যক্ষ করার পর বাবার নিকট চলে এসে অভাবীকে দান করার জন্য কিছু চায়। অভিভাবকের এ অবস্থায় তাকে বারণ করা উচিত হবে না। এমন কি অভিভাবক ভিক্ষুককে ঐ দানের উপযুক্ত মনে না করলেও। যেহেতু আমরা এখন শিশুটির জন্য এই চরিত্রটা বিনির্মাণের স্তরেই রয়েছি। এই ভিক্ষুক দান পাবার যোগ্য কি যোগ্য নয়, এই বিবেচনা এখানে সঙ্গত নয়।
অতএব শিশুর যত্ন ও প্রতিপালনের ক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- 'এমন অবকাঠামোর দ্বারা তার আচার-আচরণ গড়তে হবে যার সঙ্গে শিশুর চরিত্রবান হওয়া আমাদের কাম্য। কারণ এটা শূধুমাত্র গবেষণামূলক দৃষ্টিভঙ্গি নয়, কার্যত বাস্তব আচরণ।

টিকাঃ
৩৭. তুহফাতুল মাওদুদ ফি আহকামিল মাওলুদ-২৪১
৩৮. আত-তামহীদ-৪/২৫৬

📘 সন্তান লালন পালন ও তালীম তরবিয়ত > 📄 কুইজ প্রতিযোগিতা ও প্রশ্নের মাধ্যমে প্রতিপালন

📄 কুইজ প্রতিযোগিতা ও প্রশ্নের মাধ্যমে প্রতিপালন


কুইজ প্রতিযোগিতা ও প্রশ্নকরণের মাধ্যমে প্রতিপালন:
এ বিষয়ে ব্যবহৃত সফল প্রণালীসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো প্রশ্নকরণ প্রণালী অথবা শিশুদের মধ্যে কুইজ প্রতিযোগিতা যার উত্তর দানে তারা সক্ষম। উক্ত প্রশ্নের উত্তরে কোন বিশ্বাসগত, বুদ্ধিগত অথবা কোন আচরণগত বিষয় ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু এ সকল কুইজ প্রতিযোগিতা ও প্রশ্নকরণের ক্ষেত্রে অবশ্যই অভিভাবককে শিশুর বয়োঃস্তরের দিক লক্ষ রেখে সে অনুযায়ী কুইজ নির্ধারণ করতে হবে। তখন প্রশ্নগুলো তাদের বয়োঃস্তরের অনুকূল হবে এবং তাদের বুদ্ধি ও স্মৃতিশক্তি অনুযায়ী হবে। কারণ প্রশ্নমালা তাদের বয়োঃস্তর অতিক্রম করলে তাতে কোন উপকার নেই। বরং তাতে শিশুর তন্দ্রাচ্ছন্নতা ও এমন অনুভূতি সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে যা তার মন ও আচরণে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। উপরন্তু শিশুর নিকট এর বিপরীতে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরী হয়ে যাবে।
পক্ষান্তরে প্রশ্নগুলো যদি তার বয়োঃস্তর ও বুদ্ধির অনুকূল হয় তাহলে এর অসংখ্য উপকারিতা রয়েছে। কারণ তখন সে এর উত্তর দিতে পেরে সফলতার আনন্দ উপভোগ করতে সক্ষম হবে। বুঝতে ও শিখতে পারা এবং তথ্য অর্জন তার মধ্যে এমন ক্রমবর্ধমান উদ্যম সৃষ্টি করবে যা তাকে আরো অসংখ্য বিজয় ও সফলতা পাইয়ে দিতে সাহায্য করবে। এটা অভিভাবকের প্রজ্ঞার পরিচয় হবে যে, তিনি নির্ধারিত আলোচনার পর প্রশ্ন উত্থাপন করবেন। এর মধ্যে একটি বুদ্ধিমান শিশুর জন্য ইঙ্গিত রয়েছে যে তার উত্তরটি হবে ঐ আলোচনা সংশ্লিষ্ট। এক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভূমিকা লক্ষ করুন! আব্দুল্লাহ বিন উমার রা. বলেন, 'আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সকাশে অবস্থান করছিলাম, ইত্যবসরে যুম্মার আনা হলো (যুম্মার হচ্ছে খর্জুর বৃক্ষের নরম অংশ, এবং খর্জুর বৃক্ষের ভিতরের ভক্ষণযোগ্য যা কোমল হয়ে থাকে) অতঃপর তিনি বললেন, 'কিছু বৃক্ষ এমন রয়েছে যার উদাহরণ হচ্ছে মুসলমানের মত।' আমি (হাদীস বর্ণনাকারী) বলে দিতে চাচ্ছিলাম যে, সেটি হলো খর্জুর বৃক্ষ। তা সত্ত্বেও উপস্থিত সকলের মধ্যে বয়সে ছোট হওয়ার দরুণ চুপ থাকলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'সেটি হচ্ছে খর্জুর বৃক্ষ।' ইবনে হাজার রহ. বললেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট যুম্মার উপস্থিত করার সময় মাসআলাটা উল্লেখ করলেন, তাহলে বুঝা গেল প্রশ্নকৃত বিষয়টি হলো খর্জুর বৃক্ষ।' সুতরাং বোধ-বুঝ হলো একটি প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, যার মাধ্যমে তার বাহক আলোচনার সংশ্লিষ্ট কথা ও কাজ অনুধাবন করতে পারে।
তবে সে কুইজ প্রতিযোগিতা যদি শিক্ষার্থীর স্তরের উপযোগী না হয়, অথবা সেখানে সচেতন শিশুকে উত্তরের দিকে কোন ইঙ্গিতকারক না থাকে, সেক্ষেত্রে হীতে বিপরীত হতে পারে। কারণ তখন সন্তানরা তার থেকে দূরে সরে যাবে। অথবা প্রশ্নমালার সঙ্গে নিজেদের সামর্থহীনতার কারণে তাদের এক ধরনের স্থবিরতা স্পর্শ করে থাকবে। কখনো অভিভাবক বা শিক্ষকের এ জাতীয় কুইজ প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে সময় সংকীর্ণ হয়ে থাকে। এ প্রেক্ষাপটে খাবারের জন্য অপেক্ষা করার ফাঁকে, গাড়িতে অথবা অন্য কোন সুযোগ বুঝে তা উপস্থাপন করা সম্ভব। অভিভাবকের কর্তব্য হলো, এই কাজের জন্য তার সময় থেকে একটা অংশ আলাদা করে নেবে। অপরের ওপর এ দায়িত্ব ছেড়ে দেবে না। কারণ, সে কখনোই তার মূল্যবান সময় এ কাজে ব্যয় করতে চায় না।
প্রতিটি অগ্রসরমান প্রক্রিয়া থেকে শিশুর যত্ন ও প্রতিপালন বিষয়ক ব্যবহারযোগ্য বিষয়গুলো সম্পর্কে আধুনিক প্রযুক্তি থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ উপকৃত হওয়া উচিত। সুতরাং আল কুরআনুল কারীম হেফজ ও উৎকৃষ্টমানের উচ্চারণের ক্যাসেট সামগ্রী কার্যকর সহায়তা করে থাকে। বিশেষ করে কোন ক্যাসেটতো এমনও আছে যেখানে উস্তাদের তেলাওয়াত শ্রবণ করার পর শিশুর কেরাআ'তও রেকর্ড করা হয়েছে। অতঃপর সে মনোযোগ দিয়ে নিজের তেলাওয়াত শুনবে। এমনিভাবে সে উভয়ের তেলাওয়াতের মধ্যে পার্থক্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে।
আর ভিডিও সামগ্রী যা কোন শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান সম্বলিত যা একটি শিশুর মধ্যে নান্দনিক আচরণ ও সুন্দর আচার-ব্যবহারের বিকাশ ঘটাতে সক্ষম তা কাজে লাগানো যেতে পারে। এমনিভাবে কম্পিউটার প্রোগ্রামেরও নিজস্ব একটি ভূমিকা রয়েছে। এ প্রোগ্রামগুলো শিশুর বিশুদ্ধ ভাষা শিক্ষাদানের ক্ষেত্রেও বিরাট অবদান রাখতে পারে, যদি তা সে আদলে তৈরী করা হয়ে থাকে। কারণ শিশুর দৃশ্যমান ব্যক্তিত্বের প্রতি একটা বিশেষ রকমের ঝোক থাকে। চাই তা শুধু তার কথা মালায় অথবা উচ্চারণ প্রক্রিয়ায়ই হোক না কেন।
অভিজ্ঞতা এটা সপ্রমাণ করেছে যে, শিশুরা উক্ত অনুষ্ঠানগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে শুনে তাদের ভাষা যারা এ অভিজ্ঞতার কাজে লাগায় না তাদের চেয়ে উৎকৃষ্ট মানের হয়ে থাকে। কিন্তু এক্ষেত্রে কোনটি উত্তম তা নির্বাচন করতে হবে অভিভাবককেই। বিষয়টি শুধুমাত্র বাজারে সহজলভ্যতা ও শিশুর আগ্রহের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। কারণ এখানে শিশুদের অনুরাগে সাড়া দেয়া বা কালক্ষেপণ নয়, বরং পরিচর্যা ও প্রতিপালনই হলো আসল লক্ষ্য। এ প্রেক্ষিতে এ জাতীয় ক্যাসেট, সিডি অথবা অনুষ্ঠানমালা প্রোডাক্টের জন্য সম্মিলিতভাবে কোন একক ইনষ্টিটিউট স্থাপন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এবং তা এমন কোন ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না যেখানে প্রধান ও প্রথম উদ্দেশ্য থাকবে কেবল বাণিজ্য।

টিকাঃ
৩৯. বুখারী-৭০, মুসলিম-৫০২৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00