📄 কাংক্ষিত খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুর পরিচর্যা
অনুমোদিত খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুর পরিচর্যা: শিশুর অন্তকরণে আনন্দ সঞ্চার করা বা তার চিত্তবিনোদন নিঃসন্দেহে মুখ্য প্রতিপাদ্য। আর অর্থবহ খেলাধুলা হলো এর অন্যতম উপাদান। কিন্তু শুধুমাত্র বিনোদন ও আনন্দদানের মধ্যে খেলাধুলার ভূমিকাকে সীমাবদ্ধ করলে চলবে না। বরং খেলাধুলার অসংখ্য শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যও রয়েছে যা অনেক দিক থেকে একটি শিশুর ব্যক্তিত্ব বিনির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে থাকে। তার দেহ সুগঠিত করে, চিন্তার বিকাশ ঘটায়, সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রকে সম্প্রসারিত করে এবং সামাজিক কর্মসম্পাদনে অভ্যস্ত করে তোলে। সর্বোপরি তাকে কষ্টসহি' হতে ও কতগুলো বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে শিখায়।
পূর্বেকার মুসলমানরা যখন তাদের সন্তানদের রোজায় অভ্যস্ত করতে সংকল্প করতেন তখন এই খেলাধুলার সাহায্যেই তাদের সন্তানদের ক্ষুধা-পিপাসায় ধৈর্য ধারণে অভ্যস্ত করে থাকতেন। রাবি' বিনতে মুআ'ওয়াজ রা. বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আশুরা'র দিন সকাল বেলা আনসারদের এলাকায় এ সংবাদ পাঠিয়ে দিলেন- 'যে সকালে কিছু খেয়েছে সে যেন দিনের অবশিষ্ট সময় না খায়, আর যে সকালে কিছু খায়নি সে যেন রোজা রাখে।' এরপর থেকে আমরা রোজা রেখেছিলাম এবং আমাদের সন্তানদিগকেও রোজা রাখিয়েছিলাম। তাদের জন্যে সুতোর তৈরী পুতুল খেলনা রেখে দিতাম। যখন কেউ খাবারের জন্য কান্নাকাটি করতো তখন তাদেরকে এটা দিতাম। এমনি করে ইফতারীর সময় হয়ে যেত।' অন্য এক বর্ণনায় এভাবে এসেছে, 'তাদের জন্য সুতো দিয়ে খেলনা তৈরী করতাম এবং সঙ্গে করে নিয়ে যেতাম। যখনই তারা আমাদের নিকট খাবার চাইতো তখনই ঐ খেলনাটা তাদেরকে দিয়ে দিতাম, এর মাধ্যমে তাদেরকে ব্যস্ত রাখতাম। এভাবে রোজা পূর্ণ হয়ে যেত।
ছেলেদের অনুকরণে এমনিভাবে তারা খেলাধুলার সাহায্যে মেয়েদেরকেও শিক্ষা দিয়ে থাকতেন। উম্মুল মু'মিনীন আয়েশা রা. বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার নিকট আসলেন যখন আমি খেলনা নিয়ে খেলা করছিলাম। অতঃপর তিনি পর্দা উঠালেন এবং বললেন- 'হে আয়েশা রা., এটা কি? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, এটা খেলনা।
ইবনে হাজার রহ. বলেন, 'এ হাদীস থেকে মেয়েদের জন্য ছবি আঁকা ও পুতুল জাতীয় খেলনার বৈধতার প্রমাণ পাওয়া যায়। শুধু মেয়েদের তা দিয়ে খেলার জন্য এটার অনুমতি আছে। এটা ছবি তোলার ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত নয়।' কাজী ইয়াজের রহ. এটাই অভিমত। এই মত তিনি জমহুর থেকে বর্ণনা করেছেন। তারা শৈশব থেকেই সন্তান প্রতিপালন ও গৃহস্থালী কাজকর্ম প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য মেয়েদের নিকট পুতুল বিক্রির অনুমতি দিয়েছেন।'
সালাফে সালেহীন কিন্তু ছেলেদের খেলাধুলাকে খাটো করে দেখেননি। কাজেই তারা ছেলেদের খেলাধুলায় বাধা দিতেন না। বরং যারা নিষেধ করতেন তাদেরকে বাধা দিতেন। হাসান রা. থেকে বর্ণিত, 'তিনি তাঁর ঘরে প্রবেশ করেছেন যখন শিশুরা তাঁর ছাদের ওপর খেলা করছিল। তখন তার সঙ্গে তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহ ও ছিল, সে তাদেরকে নিষেধ করল। এটা দেখে হাসান রা. তাকে বললেন, 'ওদেরকে খেলতে দাও! খেলা-ধূলাই ওদের বিনোদন।'
বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খেলা-ধুলারত শিশুদের কাছে যেতেন, তাদেরকে সালাম করতেন। তাদের নিষেধ করতেন না। আনাস রা. থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খেলাধুলারত বালকদের নিকট আসলেন। অতঃপর তাদেরকে সালাম করলেন।'
এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলো, যে সকল খেলাধুলা ইসলামী ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, ইসলামী ব্যক্তিত্ব অথবা তার কোন শাখাকে অকার্যকর কিংবা দুর্বল করে দিতে সক্ষম, ঐ জাতীয় খেলাধুলা কখনোই চর্চা কিংবা তার দিকে ভ্রক্ষেপ করা যাবে না। তা যত আকর্ষণীয় ও সুন্দর হোক না কেন। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, খেলাধুলার ক্ষেত্রে অবশ্যই শিশুর শারীরিক নিরাপত্তার দিকে লক্ষ রাখা নেহায়েত প্রয়োজন। এমনিভাবে সময় অপচয় না করে সময়ের প্রতি যত্নবান হওয়া, শিশুর দৈনন্দিন অন্যান্য কাজের ওপর যেন প্রভাব না পড়ে সে দিকেও লক্ষ রাখা উচিত।
কম্পিউটার গেম্স খেলার ব্যাপারে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ তা শিশুর সিংহভাগ সময় খেয়ে ফেলে। মনিটরের সামনে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার কারণে শিশু স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে থাকে। এবং শিশু বয়সে তার মেরুদণ্ড বেঁকে যেতে পারে। এ বয়োঃস্তরে যে শিশুসুলভ চঞ্চলতা একান্ত কাম্য ছিল তাও ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে। উপরন্তু অনেক গেমস শরিয়ত বিরোধী বিশ্বাস, আচার, সংস্কৃতি ও চরিত্রে ভরা।
কিছু খেলাধুলা এমনও আছে যার জন্য প্রশস্ত জায়গার প্রয়োজন পড়ে। চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ স্থানে শিশুর পক্ষে তা চর্চা করা সম্ভব নয়। সকলের বাড়ীতে তো আর প্রশস্ত আঙ্গিনা থাকে না। এ প্রেক্ষিতে শিশুদের ঐ খেলাটা উপভোগের জন্য ঘরের বাহিরে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। তবে এ জাতীয় খেলাধুলা একজন অভিভাবকের সরাসরি পর্যবেক্ষণে অনুষ্ঠিত হলে ভাল। যেহেতু অভিভাবকের অ বর্তমানে যা ঘটে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তা আমরা জানি না। কুরআনুল কারীমে ইউসুফ আ. এর সঙ্গে তাঁর ভাইদের বর্ণিত ঘটনা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
أَرْسِلْهُ مَعَنَا غَدًا يَرْتَعْ وَيَلْعَبْ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ .( يوسف-12)
'আগামীকাল তাকে আমাদের সাথে প্রেরণ করুন-তৃপ্তিসহ খাবে এবং খেলাধুলা করবে। আর আমরা তার সুরক্ষা করব।
এখানে তাদের মনের মধ্যে ষড়যন্ত্র ছিল। এখানে একটি বিষয়ের দিকে একেবারে ইঙ্গিত না করলেই নয়। আর তা হলো, কতক শিশু অক্ষরের উচ্চারণের স্থান সম্পর্কে সন্দিহান থাকে। ফলে এক অক্ষরের স্থানে অন্য অক্ষর উচ্চারণ করে ফেলে। এক্ষেত্রে অনেক অভিভাবককে দেখা যায়- খেলাধুলা অথবা কৌতূকচ্ছলে শিশুর সম্মুখে ঐ অক্ষরগুলোর বারবার পুনরাবৃত্তি করে থাকেন। এটা নিঃসন্দেহে একটি ভুল পদ্ধতি। বিশেষত যখন এটা বেশি করা হবে। কারণ এতে দিন যত যাবে সমস্যা ততই প্রকট হবে। শিশুর সঙ্গে হাসি-তামাশা করার ক্ষেত্রে এ বিষয়টি মোটেও জরুরী নয়। বরং এ প্রেক্ষিতে একজন অভিভাবককে শিশুর সম্মুখে সঠিক পদ্ধতিতে অক্ষরটির বার বার উচ্চারণে তৎপর হওয়া উচিত। তাকে এমনিভাবে অভ্যস্ত করে নেবে যে, তার কথাবার্তা ঠিক হয়ে যায়। এ সকল পরিস্থিতিও কোন জটিল সমস্যা নয়, যদি তা একটি শিশুর মুষ্টিমেয় কয়েকটি অক্ষরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে ও শিশুর বয়স ৪/৫ বছর অতিক্রম না করে যায়। পক্ষান্তরে এ সমস্যা যদি বিপুল সংখ্যক অক্ষরের মধ্যে পরিলক্ষিত হয় এবং বয়সও উল্লেখিত সীমা অতিক্রম করে যায়। তখন তা শিশুর নিকট বড় সমস্যার সৃষ্টি করবে। এ অবস্থায় বিষয়টি নিয়ে উচ্চারণ ও বাক সমস্যা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে।
টিকাঃ
২৫. বুখারী-১৮২৪
২৬. মুসলিম-১৯১৯
২৭. ইবনে হিব্বান-১৩/১৭৩
২৮ বুখারী-কিতাবুস-সাওম-১৮-২৪
২৯ আল-ই'য়াল লি-ইবনি আবিদ্দুনিয়া-২/৭৯১
৩০ মুসলিম-৪৫৩৩
৩১. ইউসুফ-১২
📄 অভিজ্ঞতার মাধ্যমে পরিচর্যা
অভিজ্ঞতার মাধ্যমে পরিচর্যা: অনেকে মনে করেন, অভিজ্ঞতা শুধুমাত্র কর্মক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তা শুধু জ্ঞানগত আমলযোগ্য বিষয়াদি প্রমাণ করার জন্য ব্যবহৃত হয়, যা অনুমান করা যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রতিপালনের ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হওয়া যায় অপ্রকাশ্য বিষয়েও। আমাদের নিকট পূর্বেকার যুগের একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা আছে। ঘটনার নায়ক সেখানে অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হতে সক্ষম হয়েছেন। তার সন্তানদের অন্তরে 'একতাই শক্তি' এই বিশ্বাস অংকুরিত ও প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। অভিজ্ঞ পিতা ও অভিভাবক কাষ্ঠের একটি আঁটি নিয়ে আসলেন ও সেখান থেকে প্রত্যেককে একটি একটি করে কাষ্ঠ প্রদান করে তাদেরকে তা ভাঙ্গতে বললেন। অতঃপর তারা খুব সহজেই কর্মসম্পাদন করে ফেলল। সন্তানরা এ কাষ্ঠগুলো ভাঙ্গার পর পুনরায় আর এক আঁটি কাষ্ঠ আনালেন, যে আঁটিটা ভাঙ্গা হয়েছে হুবহু ওটার মতই। এবং সেটা ভালো করে বাঁধলেন ও আঁটিটা ভাঙ্গতে বললেন। সন্তানরা যখন এই নির্দেশ পালনে অপারগতা প্রকাশ করল। তখন অভিভাবক তাদেরকে কারণ নির্ণয়ের সুযোগ দিলেন। এই ফাঁকে মনে মনে দু'টো বিষয় নির্ধারণ করে ফেললেন –
তাদের অন্তরে ভ্রাত্বিত্বের মূল্যবোধ গেঁথে দেয়া। আর তা হল 'একতাই শক্তি'। দুর্বল ব্যক্তিও তার ভাইদের সঙ্গে দলবদ্ধ থাকলে শক্তিশালী হয়ে যায়।
• তাদেরকে এ ঘটনাস সম্পর্কে গবেষণা করতে অভ্যস্ত করা।
অভিজ্ঞ অভিভাবক নিরবচ্ছিন্নভাবে তার কাংক্ষিত প্রতিপালনের অবকাঠামো এ জাতীয় পরিস্থিতিতে বদ্ধমূল করতে সক্ষম হয়ে থাকেন। তবে এক্ষেত্রে বিপদজনক উপকরণসমূহ ব্যবহার বর্জন করা উচিত। কারণ অভিভাবকের অনুপস্থিতিতে শিশুটি সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি করতে চাইবে বৈকি। তখন ঘটে যেতে পারে যে কোন অনাকাংক্ষিত অঘটন।
📄 অভ্যাস পদ্ধতিতে প্রতিপালন
পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে কোন কাজ করা বা কোন কথা বলার অভ্যাস মানুষকে তার ব্যক্তিগত গুণাবলির একটি অংশ। সাধারণত মানুষ কোন কাজে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার পর সেটা করতে তার আর কষ্ট হয় না। বাস্তবিকই তা অনেক কষ্টসাধ্য কাজ হোক না কেন। কথা আছে মানুষ অভ্যাসের দাস।
সে কারণে কাংক্ষিত আচরণকে অভ্যাসে রূপান্তরিত করা প্রতিপালনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কাংক্ষিত আচরণকে অভ্যাসে রূপান্তরিত করতে হলে একজন অভিভাবকের অব্যাহত প্রচেষ্টা চালাতে হবে। বারবার তা পুনরাবত্তি এবং খুব কঠিনভাবে এর অনুশীলন করতে হবে। অতঃপর কালক্রমে তা শিশুর অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাবে। ফলে অভিভাবক থেকে ঐ কাজের কোনরূপ অনুরোধ ব্যতিরেকে উক্ত কাজের দাবী আসলেই সে তা সম্পন্ন করে ফেলবে। যেমন: কোন মুসলমান যদি হাঁচি দেয়ার পর 'আলহামদুলিল্লাহ' বলতে অভ্যস্ত থাকে, যদি সে কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গভীর চিন্তায় নিমজ্জিত থাকে বা খুব ব্যস্ত থাকে, তাহলেও সে হাঁচির পরই বলে উঠবে 'আল-হামদুলিল্লাহ।' কারণ, এটা তার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। এমনটিই হয়ে থাকে। সে কারণে হাদিসে এসছে-
الخير عادة والشر لجاجة من يرد الله به خيرا يفقهه فيالدين
'কল্যাণ ও মঙ্গল হলো অভ্যাস, অমঙ্গল ও অকল্যাণ হচ্ছে ঝগড়া-বিবাদ। আল্লাহ তাআলা যার মঙ্গল চান তাকে দীনে ইসলামের সঠিক জ্ঞান দান করেন।
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. বলেন, 'নামাজের ব্যাপারে তোমাদের সন্তানদের প্রতি যত্নবান হও! তাদেরকে কল্যাণ শিক্ষা দাও! অনন্তর কল্যাণই হচ্ছে অভ্যস।' মুয়াবিয়া রা. বলেন, 'তোমরা নিজেদেরকে কল্যাণের ওপর অভ্যস্ত করে নাও!' সুতরাং বাচ্চাদেরকে কল্যাণের ওপর অভ্যস্ত করতে অনুপ্রাণিত করাই ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অভিপ্রায়। এক ভদ্র মহিলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট একটি বাচ্চা উঁচিয়ে ধরে জিজ্ঞাসা করল- 'এর জন্যে কি হজ্জ আছে?' উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হ্যাঁ আছে, তবে এর বিনিময় পাবে তুমি। ' বাচ্চাটি ছোট, হজ্জের আহকাম সম্পর্কে সে কিছুই জানে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে উক্ত মহান ব্রতে অভ্যস্ত করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। আর 'এ দায়িত্ব পালন করলে তার জন্য পুরস্কার রয়েছে' বলে তার মাকেও উৎসাহিত করেছেন। যখন মুসলিম মহিলাগণ নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদে যেতেন অথচ অনেক বাচ্চা কান্নাকাটি করতো। এতদসত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে মসজিদে নিয়ে আসতে নিষেধ করেননি। বরং শিশুদের প্রতি লক্ষ রাখতেন এমনকি তাদের জন্য নামাজ সংক্ষিপ্ত করতেন। আমাদের দৃষ্টিতে এটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে মসজিদে আসতে অভ্যস্ত করার জন্যই করতেন।
টিকাঃ
৩২ ইবনে হিব্বان-২/৮
৩০ বাইহাক্বী-৩/৮৪
৩৪ মসনাদে শামিয়্যীন-৩/২৫০
৩৫. মুসলিম- ২৩৭৮
৩৬. এক্ষেত্রে অনেক লোক একটি হাদীস উল্লেখ করেন- 'তোমরা বাচ্চাদেরকে মসজিদ থেকে দূরে রেখ।' হাদীসটি দুর্বল হওয়ার ব্যাপারে হাদীস বিশারদগণ একমত।
📄 আদর্শের মাধ্যমে প্রতিপালন
নীতি ও আদর্শের মাধ্যমে প্রতিপালন: উপদেশ, বক্তৃতা ও আলোচনার চেয়ে বাস্তবানুগ পদক্ষেপ শিক্ষার্থীর ওপর অপেক্ষাকৃত বেশি প্রভাব বিস্ত ার করে। কারণ সংঘটন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে তার সত্যায়নের প্রমাণ মেলে। অতএব অভিভাবককে প্রশিক্ষণের অবকাঠামো শক্তভাবে ধারণ করা- যার দিকে তিনি শিক্ষার্থীকে আহ্বান করবেন- বাস্তবে অনুশীলন ব্যতিরেকে প্রশিক্ষণের গুরুত্ব বিষয়ক আলোচনা ও তার দিকে আহ্বানের চেয়ে বেশী কার্যকর। সুতরাং শিশুর সম্মুখে অভিভাবকের সকল কর্মকাণ্ডে কঠিনভাবে সততা অবলম্বন না করতে পারলেও শুধু সততার গুরুত্ব ও মূল্যায়ন বিষয়ক আলোচনার চেয়ে শিশুর জন্য ফলপ্রসু হতে পারে।
ইমাম শাফেয়ী রহ. 'আদর্শ' হওয়ার গুরুত্বের ওপর সতর্ক করেছেন, যখন তিনি বাদশা হারুনুর রশিদের সন্তানদেরকে শিষ্টাচার শিক্ষাদানরত অবস্থায় আব্দুস সামাদের পিতার নিকট আগমন করলেন। তিনি বললেন, 'আমিরুল মু'মিনীনের সন্তানদের সংশোধনের সূচনা করার পূর্বে নিজের সংশোধন করে নেয়া উচিত।' যেহেতু তাদের চক্ষু তোমার চক্ষুর সঙ্গে আবদ্ধ। অতএব তাদের নিকট তা-ই সুন্দর যা তুমি সুন্দর মনে করে থাকবে আর মন্দ যা তুমি মন্দ মনে করে থাকবে।
ইবনে জাওযী রহ. 'অভিভাবকের কথা অনুযায়ী নিজের আমলের গুরুত্ব বিষয়ক' বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, 'জ্ঞানের স্তরের বিভিন্নতা ভেদে অসংখ্য মাশায়েখের সঙ্গে দেখা করেছি। তবে তাদের মধ্যে আমার নিকট তার সাহচর্য সর্বাপেক্ষা বেশি ফলপ্রসূ ও উপকারী প্রমাণিত হয়েছে, যিনি তার জ্ঞান অনুযায়ী আমল করে থাকতেন। যদিও অন্যরা তার চেয়ে অনেক বেশি জ্ঞান রাখেন। আমি একদল হাদীস বিশারদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছি যারা হাদীস সম্পর্কে যথেষ্ট ব্যুৎপত্তি রাখেন ও হাদীস সুসংহত করেন। কিন্তু হাদীসের সূত্র সমালোচনা ও পর্যালোচনা গবেষণার জায়গায় রেখে তা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতেন এবং হাদীস অধ্যায়নের ওপর বিনিময় গ্রহণ করে থাকতেন। তাদের মর্যাদা যাতে ক্ষুণ্ণ না হয় সে জন্য উত্তরদান ত্বরান্বিত করতেন, যদিও তাতে ভুল হোক না কেন। আমি আব্দুল ওয়াহাব আনমাতি রহ. এর সঙ্গে সাক্ষাত করেছি, যিনি সালাফে সালেহীনদের আদর্শের ওপর পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তার মজলিসে কখনো কোন পরনিন্দা শোনা যায় নি এবং হাদীস শ্রবণের জন্য কোন পারিশ্রমিক চাওয়া হয়নি। আমি যখন তার নিকট দাসত্ব বিষয়ক হাদীসসমূহ পাঠ করছিলাম তখন তিনি কেঁদে ফেললেন এবং ক্রমান্বয়ে কাঁদতে থাকলেন। আমি তখন খুব অল্প বয়সী থাকার দরুণ তার ক্রন্দন আমার অন্তরে গভীরভাবে রেখাপাত করে ও আমার হৃদয়ে সুদৃঢ় ভীত নির্মাণ করে। তিনি শায়েখদের পদাঙ্কের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন যাদের গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্যগাঁথা বিভিন্ন বর্ণনায় পেয়েছি।
শায়খ আবুল মানসুর জাওলিকীর সঙ্গেও সাক্ষাত করেছি। তিনি ছিলেন অত্যাধিক নীরবতা পালনকারী, দৃঢ়তার সাথে নিশ্চিতভাবে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে কথা বলতেন। কোন প্রকাশ্য মাসআলা সম্পর্কে তাকে প্রশ্ন করা হলে উত্তর দেয়ার জন্য তার ছাত্রগণই উদ্যত হতো, সেক্ষেত্রেও তিনি নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন। তিনিও অত্যধিক নীরবতা অবলম্বন করতেন ও রোজা রাখতেন। আমি এই দুই মনীষীর নিকট থেকে অপরাপর সকলের চেয়ে বেশী উপকৃত হয়েছি। অতএব আমি বুঝে নিয়েছি কথার চেয়ে কর্মের মাধ্যমে দিকনির্দেশনা বেশী কার্যকর ও টেকসই দিশারী।
একজন অভিভাবক যখন সর্বাবস্থায় কাজের মাধ্যমে তার সকল কথার সত্যায়ন করতে পারবেন তখন শিক্ষার্থীর জন্য এটা বেশ ফলপ্রসূ হতে বাধ্য। যদিও এটা কোন পার্থিব বিষয় সংক্রান্তই হোক না কেন। যেমন : আমাদের বর্তমানকালের লাল রঙের রোড সিগনালের নিকট এসে যদি অভিভাবক নিজে থেমে যায়। তাহলে শিশু সে আদর্শ অনুসরণ করবে। আর যদি অভিভাবক সেটা না করে রেড সিগনাল উপেক্ষা করেন তাহলে শিশু তা-ই করবে। এবং তাকে এটা না করতে সতর্ক করা হলেও সে বলবে আমি আব্বাকে দেখেছি তিনি এটা উপেক্ষা করতেন। অতএব বাস্তব কর্ম শিশুদের শিক্ষার জন্য অধিকতর কার্যকরী উপদেশ ও প্রশিক্ষণের চেয়ে। একটি শিশু তার অভিভাবককে যখন নিঃস্বদের প্রতি অনুগ্রহ ও দুর্বলদের প্রতি সাহায্য করতে দেখতে পাবে, তখন নিঃসন্দেহে এটা শিশুকে তার আনুগত্য ও অনুসরণ করতে উদ্বুদ্ধ করবে। নিজের মধ্যে প্রতিফলন না ঘটিয়ে শুধু দানের তাৎপর্য ও গুরুত্বের ওপর আলোচনা করার চেয়ে এটা হবে অনেক বেশি ফলপ্রসূ। উপরন্তু এক্ষেত্রে শিশুকে যথাযথভাবে অনুপ্রাণিত করা অভিভাবকের একান্ত কর্তব্য। যেমন : সে অভাবীকে যে টাকাটা দিতে চায় তা পকেট থেকে বের করে নেবে, এরপর শিশুটিকে বলবে এটা নিয়ে অভাবীকে দিয়ে আস। তিনি এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিপালনের লক্ষ্য বেশ বাস্তবায়ন করতে পারবেন। সুতরাং ঐ লোকটিকে দান করার কারণ সে-ই শিশুটিকে বলে দেবে। আর তা হলো নিঃস্ব ও অসহায়কে সাহায্য করা। সে অভাবী নয় এমন লোকদের জন্য নিজের সম্পদ ব্যয় করতে ও দানশীলতায় নিজেকে অভ্যস্ত করতে সক্ষম হবে। ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন, 'তাকে দান ও ব্যয় করতে অভ্যস্ত করাবে, অভিভাবক যদি কিছু দান করার পরিকল্পনা করেন। তাহলে নিজে না করে শিশুর হাত দিয়ে দান করাবেন যাতে সে দানের স্বাদ আস্বাদন করতে পারে। '
এমনিভাবে এই আচরণ তাকে সাহসিকতা ও অপরের সঙ্গে সুন্দর ব্যবহারের শিক্ষা দেবে। আব্দুল্লাহ বিন উমার রা. এর কর্মপদ্ধতিও ছিল এরকম। ইবনে উমার রা. এর নিকট জনৈক ভিক্ষুক আসলে তিনি তাঁর ছেলেকে বললেন: ওকে একটি দিনার দিয়ে দাও!' ৩৮ কখনো বা এমন ঘটনাও সংঘটিত হতে দেখা যায় যে, শিশু নিজেই তার বাবার কর্ম প্রত্যক্ষ করার পর বাবার নিকট চলে এসে অভাবীকে দান করার জন্য কিছু চায়। অভিভাবকের এ অবস্থায় তাকে বারণ করা উচিত হবে না। এমন কি অভিভাবক ভিক্ষুককে ঐ দানের উপযুক্ত মনে না করলেও। যেহেতু আমরা এখন শিশুটির জন্য এই চরিত্রটা বিনির্মাণের স্তরেই রয়েছি। এই ভিক্ষুক দান পাবার যোগ্য কি যোগ্য নয়, এই বিবেচনা এখানে সঙ্গত নয়।
অতএব শিশুর যত্ন ও প্রতিপালনের ক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- 'এমন অবকাঠামোর দ্বারা তার আচার-আচরণ গড়তে হবে যার সঙ্গে শিশুর চরিত্রবান হওয়া আমাদের কাম্য। কারণ এটা শূধুমাত্র গবেষণামূলক দৃষ্টিভঙ্গি নয়, কার্যত বাস্তব আচরণ।
টিকাঃ
৩৭. তুহফাতুল মাওদুদ ফি আহকামিল মাওলুদ-২৪১
৩৮. আত-তামহীদ-৪/২৫৬