📄 অর্থবহ সত্য গল্পের মাধ্যমে দিক-নির্দেশনা
অর্থবহ সত্য গল্পের মাধ্যমে প্রতিপালন: যে সব পদ্ধতির ওপর নির্ভর করা যায় চিত্তাকর্ষক গল্পপদ্ধতি তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। অভিভাবক ও শিক্ষক একটি সত্য ও বাস্তবানুগ গল্প নির্বাচন করতে পারেন। অধিকাংশ সত্য ও বাস্তব গল্পের মাধ্যমে আমাদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে পারি। গল্পের বিভিন্ন শিক্ষণীয় দিক সম্বলিত অংশ বিশেষ থেকে আমাদের সন্তানদের প্রতিপালন ও পরিচর্যা করতে পারি। যেমন : সততা, আমানতদারী, কর্তব্য-পরায়ণতা, সাহসিকতা, অভাবীর সাহায্য, গরীবের প্রতি দয়া ও বড়দের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ইত্যাদি। সুতরাং অভিভাবক এক বা একাধিক এমন গল্প উপস্থাপন করবেন, যা তিনি শিশুকে যে আদবটির ওপর প্রতিপালন করতে চাচ্ছেন তা নিশ্চিত করবে। এর মধ্য দিয়েই তার অভীষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়িত হয়ে যাবে।
এক্ষেত্রে জীবনী বিষয়ক গ্রন্থাবলী থেকে সাহায্য নেয়া একজন অভিভাবকের নিকট অত্যন্ত উপকারী হিসেবে প্রমাণিত। কারণ, এখানে শিশুর পরিচর্যায় আমাদের প্রত্যশা ও প্রয়োজনের সমন্বয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ সত্য গল্পসম্ভার রয়েছে। বিশেষ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুদ্ধাভিযানসমূহ, সাহাবায়ে কেরামের রা. জীবনালেখ্য, তাদের বীরত্ব-গাঁথা ও নেতৃত্ব। আমাদের পূর্ব পুরুষগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ছোট ও বড় যুদ্ধাভিযান থেকে তাদের সন্তানদের প্রতিপালনের জন্য বড় ধরনের একটা উপাদান গ্রহণ করে থাকতেন। ইসমাঈল বিন মুহম্মদ বিন সা'দ রহ. বলেন, 'আমার পিতা আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুদ্ধ সম্পর্কিত ঘটনাবলীর বিবরণ শিক্ষা দিতেন। এবং গাযওয়াহ ও সারিয়াহ'র বর্ণনা দিতেন।' এবং বলতেন- 'হে বৎস, এ হলো তোমার বাপ-দাদার ঐতিহ্য; অতএব তোমরা এটা ভুলে যেও না।' আলী বিন সুহাইল থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ছোট বড় সকল যুদ্ধের ঘটনাবলী শিক্ষা করতাম যেভাবে আল-কুরআনের সুরাগুলো শিক্ষা করতাম।'
পক্ষান্তরে মনগড়া গল্পের মধ্যে কোন ক্রিয়া বা প্রভাব নেই। কারণ প্রথমটা হলো সূত্র নির্ভর, বাস্তবে যার সত্যতা সুপ্রমাণিত। এটাতো শুধু কল্পনা প্রসূত ঘটনা নয়। আল্লাহ তাআ'লাও পবিত্র কুরআনে সুন্দরতম গল্পের অবতারণা করেছেন।
যেমন তিনি বলেন- لَقَدْ كَانَ فِي قَصَصِهِمْ عِبْرَةٌ لِأُولِي الْأَلْبَابِ مَا كَانَ حَدِيثًا يُفْتَرَى 'তাদের কাহিনীতে রয়েছে বোধশক্তি সম্পন্ন মানুষদের জন্য শিক্ষা, এটা মিথ্যা রচনা নয়।
এ ধরনের কাহিনীতে শিক্ষামূলক অনেক বিষয় সান্নিবেশিত রয়েছে। এমনিভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তাঁর প্রিয় সাহাবীদেরকে রা. অসংখ্য গল্প বলেছেন। উম্মুল মুমিনীন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহধর্মিণী আয়েশা রা. আমাদের পূর্ববর্তী সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বামী- স্ত্রীর মাঝে বিদ্যমান সম্পর্ক সম্বলিত সংবাদ গল্পের আকারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- কে বলতেন। যেমন একবার তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে আবু যর আর উম্মে যর নামের স্বামী-স্ত্রীর প্রেমকাহিনী শুনালেন। কাহিনী শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- 'আমি তোমার জন্য আবু যর, আর তুমি হলে আমার জন্য উম্মে যর।' এখানে শিক্ষাগত দিক থেকে গল্পের যে বিরাট গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে তা স্পষ্ট হয়ে গেল। অতএব এটা শুধু মুখরোচক শ্রুতিমধুর গল্প বা সময়ের অপচয় করা নয়। বরং তা হচ্ছে আল্লাহর বাণী- لَقَدْ كَانَ فِي قَصَصِهِمْ عِبْرَةٌ لِأُولِي الْأَلْبَابِ مَا كَانَ حَدِيثًا يُفْتَرَى. ) 111- يوسف(
'তাদের কাহিনীতে বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে প্রচুর শিক্ষণীয় বিষয়। এটা কোন মনগড়া কথা নয়......।'এর দ্বারা অভিভাবকদের এই পদ্ধতিতে উপকৃত হওয়ার গুরুত্ব নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হল।
কখনো দেখা যায় কোন কোন অভিভাবক এক্ষেত্রে অবাস্তব কাহিনীর আশ্রয় নেন। কিন্তু এ জাতীয় কাহিনীর ক্ষেত্রে তার বাচনিক পদ্ধতিতে আমাদের ধর্মের প্রতিটি আহ্বান-বিশ্বাস, চরিত্র ও আচার-ব্যবহারের প্রতি পরোক্ষ উদ্দীপকের বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে। তবে যে সকল গল্প অনৈসلامী অভ্যাস ও আচরণকে উস্কে দেয় অথবা মুসলমানদের বিশ্বাসের পরিপন্থী বিশ্বাসের জন্ম দেয়, ঐ সকল কাহিনী পরিহার করা অবশ্য কর্তব্য। যদিও সেটা কোন উৎসাহ ও উদ্দীপনার ধারক হোক না কেন। এ অবস্থায় 'আমরা এর থেকে শুধুমাত্র উপকারী অংশটুকু গ্রহণ করব, অতঃপর পরে সুযোগমত শিশুর ভুল শুধরিয়ে দেব' এমন কথা বলার অবকাশ নেই। কারণ এ বয়সে একটি শিশু যেন একটি 'সাদা পৃষ্ঠা' এর মত থাকে। সেখানে অশুদ্ধ কোন কিছু অংকন করা কি শুদ্ধ হবে? যেহেতু এটা তার মেধাকে বিক্ষিপ্ত করতঃ শুদ্ধ অশুদ্ধ সব বিষয় তার নিকট একাকার করে দেবে।
এমন কাল্পনিক কাহিনী বলা থেকেও বিরত থাকতে হবে যা কখনোই বাস্তবে সংঘটিত হওয়া সম্ভব নয়। যথা: 'একলোক চড়ুই পাখির উদরে প্রবেশ করল। অতঃপর সে একস্থান থেকে অন্য স্থানে সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরি করার উদ্দেশ্যে তাদের প্রাসাদ কিংবা ঘর ইত্যাদিতে ঘুরে বেড়াতে লাগল, তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার জন্য।' এ গল্পটা একদিকে যেমন নিন্দিত চরিত্র গোয়েন্দাগিরির দিকে ইঙ্গিত করে, যা পৃথিবীতে আল্লাহ প্রদত্ত শৃঙ্খলার পরিপন্থী। সাথে সাথে তা একটি শিশুকে বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে ঠেলে দেয়। এবং এই বাস্তব পৃথিবীতে বাস্তবায়নের অযোগ্য বিষয়াদির সঙ্গে শিশুকে সম্পৃক্ত করে ফেলে। ফলে সে বাস্তব পৃথিবী রেখে অবাস্তব ও কাল্পনিক পৃথিবীতে হারিয়ে যায়। এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও কু-প্রভাব শিশুর জীবনে অবশ্যই পড়বে।
পক্ষান্তরে যে সব আশ্চর্যজনক কাল্পনিক কাহিনী এখনো সংঘটিত হয়নি কিন্তু সংঘটন সম্ভব এবং আল্লাহ প্রদত্ত প্রাকৃতিক নিয়মেরও পরিপন্থী না হওয়ার দরুণ তা অসম্ভবও নয়। উপরন্তু তা ইসলামের অবকাঠামোকে শক্তিশালী করে। এ জাতীয় কাহিনী থেকে উপকৃত হওয়া যায়।
টিকাঃ
২০. গাজওয়াহ: যে যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং উপস্থিত থেকে সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। সারিয়াহ্ যে যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সশরীরে উপস্থিত ছিলেন না কিন্তু তাঁর নির্দেশে কোন সাহাবীর রা. নেতৃত্বে যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে। অনুবাদক
২১. আর-জামে' লি আখলাকির-রাবী-২/১৫৯
২২ সূরা ইউসূফ, আয়াত ১১১
২৩ বুখারী, কিতাবুন-নিকাহ্-৪৭৯০
২৪ সুরা ইউসুফ-১১১
📄 কাংক্ষিত খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুর পরিচর্যা
অনুমোদিত খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুর পরিচর্যা: শিশুর অন্তকরণে আনন্দ সঞ্চার করা বা তার চিত্তবিনোদন নিঃসন্দেহে মুখ্য প্রতিপাদ্য। আর অর্থবহ খেলাধুলা হলো এর অন্যতম উপাদান। কিন্তু শুধুমাত্র বিনোদন ও আনন্দদানের মধ্যে খেলাধুলার ভূমিকাকে সীমাবদ্ধ করলে চলবে না। বরং খেলাধুলার অসংখ্য শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যও রয়েছে যা অনেক দিক থেকে একটি শিশুর ব্যক্তিত্ব বিনির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে থাকে। তার দেহ সুগঠিত করে, চিন্তার বিকাশ ঘটায়, সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রকে সম্প্রসারিত করে এবং সামাজিক কর্মসম্পাদনে অভ্যস্ত করে তোলে। সর্বোপরি তাকে কষ্টসহি' হতে ও কতগুলো বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে শিখায়।
পূর্বেকার মুসলমানরা যখন তাদের সন্তানদের রোজায় অভ্যস্ত করতে সংকল্প করতেন তখন এই খেলাধুলার সাহায্যেই তাদের সন্তানদের ক্ষুধা-পিপাসায় ধৈর্য ধারণে অভ্যস্ত করে থাকতেন। রাবি' বিনতে মুআ'ওয়াজ রা. বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আশুরা'র দিন সকাল বেলা আনসারদের এলাকায় এ সংবাদ পাঠিয়ে দিলেন- 'যে সকালে কিছু খেয়েছে সে যেন দিনের অবশিষ্ট সময় না খায়, আর যে সকালে কিছু খায়নি সে যেন রোজা রাখে।' এরপর থেকে আমরা রোজা রেখেছিলাম এবং আমাদের সন্তানদিগকেও রোজা রাখিয়েছিলাম। তাদের জন্যে সুতোর তৈরী পুতুল খেলনা রেখে দিতাম। যখন কেউ খাবারের জন্য কান্নাকাটি করতো তখন তাদেরকে এটা দিতাম। এমনি করে ইফতারীর সময় হয়ে যেত।' অন্য এক বর্ণনায় এভাবে এসেছে, 'তাদের জন্য সুতো দিয়ে খেলনা তৈরী করতাম এবং সঙ্গে করে নিয়ে যেতাম। যখনই তারা আমাদের নিকট খাবার চাইতো তখনই ঐ খেলনাটা তাদেরকে দিয়ে দিতাম, এর মাধ্যমে তাদেরকে ব্যস্ত রাখতাম। এভাবে রোজা পূর্ণ হয়ে যেত।
ছেলেদের অনুকরণে এমনিভাবে তারা খেলাধুলার সাহায্যে মেয়েদেরকেও শিক্ষা দিয়ে থাকতেন। উম্মুল মু'মিনীন আয়েশা রা. বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার নিকট আসলেন যখন আমি খেলনা নিয়ে খেলা করছিলাম। অতঃপর তিনি পর্দা উঠালেন এবং বললেন- 'হে আয়েশা রা., এটা কি? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, এটা খেলনা।
ইবনে হাজার রহ. বলেন, 'এ হাদীস থেকে মেয়েদের জন্য ছবি আঁকা ও পুতুল জাতীয় খেলনার বৈধতার প্রমাণ পাওয়া যায়। শুধু মেয়েদের তা দিয়ে খেলার জন্য এটার অনুমতি আছে। এটা ছবি তোলার ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত নয়।' কাজী ইয়াজের রহ. এটাই অভিমত। এই মত তিনি জমহুর থেকে বর্ণনা করেছেন। তারা শৈশব থেকেই সন্তান প্রতিপালন ও গৃহস্থালী কাজকর্ম প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য মেয়েদের নিকট পুতুল বিক্রির অনুমতি দিয়েছেন।'
সালাফে সালেহীন কিন্তু ছেলেদের খেলাধুলাকে খাটো করে দেখেননি। কাজেই তারা ছেলেদের খেলাধুলায় বাধা দিতেন না। বরং যারা নিষেধ করতেন তাদেরকে বাধা দিতেন। হাসান রা. থেকে বর্ণিত, 'তিনি তাঁর ঘরে প্রবেশ করেছেন যখন শিশুরা তাঁর ছাদের ওপর খেলা করছিল। তখন তার সঙ্গে তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহ ও ছিল, সে তাদেরকে নিষেধ করল। এটা দেখে হাসান রা. তাকে বললেন, 'ওদেরকে খেলতে দাও! খেলা-ধূলাই ওদের বিনোদন।'
বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খেলা-ধুলারত শিশুদের কাছে যেতেন, তাদেরকে সালাম করতেন। তাদের নিষেধ করতেন না। আনাস রা. থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খেলাধুলারত বালকদের নিকট আসলেন। অতঃপর তাদেরকে সালাম করলেন।'
এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলো, যে সকল খেলাধুলা ইসলামী ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, ইসলামী ব্যক্তিত্ব অথবা তার কোন শাখাকে অকার্যকর কিংবা দুর্বল করে দিতে সক্ষম, ঐ জাতীয় খেলাধুলা কখনোই চর্চা কিংবা তার দিকে ভ্রক্ষেপ করা যাবে না। তা যত আকর্ষণীয় ও সুন্দর হোক না কেন। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, খেলাধুলার ক্ষেত্রে অবশ্যই শিশুর শারীরিক নিরাপত্তার দিকে লক্ষ রাখা নেহায়েত প্রয়োজন। এমনিভাবে সময় অপচয় না করে সময়ের প্রতি যত্নবান হওয়া, শিশুর দৈনন্দিন অন্যান্য কাজের ওপর যেন প্রভাব না পড়ে সে দিকেও লক্ষ রাখা উচিত।
কম্পিউটার গেম্স খেলার ব্যাপারে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ তা শিশুর সিংহভাগ সময় খেয়ে ফেলে। মনিটরের সামনে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার কারণে শিশু স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে থাকে। এবং শিশু বয়সে তার মেরুদণ্ড বেঁকে যেতে পারে। এ বয়োঃস্তরে যে শিশুসুলভ চঞ্চলতা একান্ত কাম্য ছিল তাও ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে। উপরন্তু অনেক গেমস শরিয়ত বিরোধী বিশ্বাস, আচার, সংস্কৃতি ও চরিত্রে ভরা।
কিছু খেলাধুলা এমনও আছে যার জন্য প্রশস্ত জায়গার প্রয়োজন পড়ে। চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ স্থানে শিশুর পক্ষে তা চর্চা করা সম্ভব নয়। সকলের বাড়ীতে তো আর প্রশস্ত আঙ্গিনা থাকে না। এ প্রেক্ষিতে শিশুদের ঐ খেলাটা উপভোগের জন্য ঘরের বাহিরে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। তবে এ জাতীয় খেলাধুলা একজন অভিভাবকের সরাসরি পর্যবেক্ষণে অনুষ্ঠিত হলে ভাল। যেহেতু অভিভাবকের অ বর্তমানে যা ঘটে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তা আমরা জানি না। কুরআনুল কারীমে ইউসুফ আ. এর সঙ্গে তাঁর ভাইদের বর্ণিত ঘটনা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
أَرْسِلْهُ مَعَنَا غَدًا يَرْتَعْ وَيَلْعَبْ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ .( يوسف-12)
'আগামীকাল তাকে আমাদের সাথে প্রেরণ করুন-তৃপ্তিসহ খাবে এবং খেলাধুলা করবে। আর আমরা তার সুরক্ষা করব।
এখানে তাদের মনের মধ্যে ষড়যন্ত্র ছিল। এখানে একটি বিষয়ের দিকে একেবারে ইঙ্গিত না করলেই নয়। আর তা হলো, কতক শিশু অক্ষরের উচ্চারণের স্থান সম্পর্কে সন্দিহান থাকে। ফলে এক অক্ষরের স্থানে অন্য অক্ষর উচ্চারণ করে ফেলে। এক্ষেত্রে অনেক অভিভাবককে দেখা যায়- খেলাধুলা অথবা কৌতূকচ্ছলে শিশুর সম্মুখে ঐ অক্ষরগুলোর বারবার পুনরাবৃত্তি করে থাকেন। এটা নিঃসন্দেহে একটি ভুল পদ্ধতি। বিশেষত যখন এটা বেশি করা হবে। কারণ এতে দিন যত যাবে সমস্যা ততই প্রকট হবে। শিশুর সঙ্গে হাসি-তামাশা করার ক্ষেত্রে এ বিষয়টি মোটেও জরুরী নয়। বরং এ প্রেক্ষিতে একজন অভিভাবককে শিশুর সম্মুখে সঠিক পদ্ধতিতে অক্ষরটির বার বার উচ্চারণে তৎপর হওয়া উচিত। তাকে এমনিভাবে অভ্যস্ত করে নেবে যে, তার কথাবার্তা ঠিক হয়ে যায়। এ সকল পরিস্থিতিও কোন জটিল সমস্যা নয়, যদি তা একটি শিশুর মুষ্টিমেয় কয়েকটি অক্ষরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে ও শিশুর বয়স ৪/৫ বছর অতিক্রম না করে যায়। পক্ষান্তরে এ সমস্যা যদি বিপুল সংখ্যক অক্ষরের মধ্যে পরিলক্ষিত হয় এবং বয়সও উল্লেখিত সীমা অতিক্রম করে যায়। তখন তা শিশুর নিকট বড় সমস্যার সৃষ্টি করবে। এ অবস্থায় বিষয়টি নিয়ে উচ্চারণ ও বাক সমস্যা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে।
টিকাঃ
২৫. বুখারী-১৮২৪
২৬. মুসলিম-১৯১৯
২৭. ইবনে হিব্বান-১৩/১৭৩
২৮ বুখারী-কিতাবুস-সাওম-১৮-২৪
২৯ আল-ই'য়াল লি-ইবনি আবিদ্দুনিয়া-২/৭৯১
৩০ মুসলিম-৪৫৩৩
৩১. ইউসুফ-১২
📄 অভিজ্ঞতার মাধ্যমে পরিচর্যা
অভিজ্ঞতার মাধ্যমে পরিচর্যা: অনেকে মনে করেন, অভিজ্ঞতা শুধুমাত্র কর্মক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তা শুধু জ্ঞানগত আমলযোগ্য বিষয়াদি প্রমাণ করার জন্য ব্যবহৃত হয়, যা অনুমান করা যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রতিপালনের ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হওয়া যায় অপ্রকাশ্য বিষয়েও। আমাদের নিকট পূর্বেকার যুগের একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা আছে। ঘটনার নায়ক সেখানে অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হতে সক্ষম হয়েছেন। তার সন্তানদের অন্তরে 'একতাই শক্তি' এই বিশ্বাস অংকুরিত ও প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। অভিজ্ঞ পিতা ও অভিভাবক কাষ্ঠের একটি আঁটি নিয়ে আসলেন ও সেখান থেকে প্রত্যেককে একটি একটি করে কাষ্ঠ প্রদান করে তাদেরকে তা ভাঙ্গতে বললেন। অতঃপর তারা খুব সহজেই কর্মসম্পাদন করে ফেলল। সন্তানরা এ কাষ্ঠগুলো ভাঙ্গার পর পুনরায় আর এক আঁটি কাষ্ঠ আনালেন, যে আঁটিটা ভাঙ্গা হয়েছে হুবহু ওটার মতই। এবং সেটা ভালো করে বাঁধলেন ও আঁটিটা ভাঙ্গতে বললেন। সন্তানরা যখন এই নির্দেশ পালনে অপারগতা প্রকাশ করল। তখন অভিভাবক তাদেরকে কারণ নির্ণয়ের সুযোগ দিলেন। এই ফাঁকে মনে মনে দু'টো বিষয় নির্ধারণ করে ফেললেন –
তাদের অন্তরে ভ্রাত্বিত্বের মূল্যবোধ গেঁথে দেয়া। আর তা হল 'একতাই শক্তি'। দুর্বল ব্যক্তিও তার ভাইদের সঙ্গে দলবদ্ধ থাকলে শক্তিশালী হয়ে যায়।
• তাদেরকে এ ঘটনাস সম্পর্কে গবেষণা করতে অভ্যস্ত করা।
অভিজ্ঞ অভিভাবক নিরবচ্ছিন্নভাবে তার কাংক্ষিত প্রতিপালনের অবকাঠামো এ জাতীয় পরিস্থিতিতে বদ্ধমূল করতে সক্ষম হয়ে থাকেন। তবে এক্ষেত্রে বিপদজনক উপকরণসমূহ ব্যবহার বর্জন করা উচিত। কারণ অভিভাবকের অনুপস্থিতিতে শিশুটি সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি করতে চাইবে বৈকি। তখন ঘটে যেতে পারে যে কোন অনাকাংক্ষিত অঘটন।
📄 অভ্যাস পদ্ধতিতে প্রতিপালন
পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে কোন কাজ করা বা কোন কথা বলার অভ্যাস মানুষকে তার ব্যক্তিগত গুণাবলির একটি অংশ। সাধারণত মানুষ কোন কাজে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার পর সেটা করতে তার আর কষ্ট হয় না। বাস্তবিকই তা অনেক কষ্টসাধ্য কাজ হোক না কেন। কথা আছে মানুষ অভ্যাসের দাস।
সে কারণে কাংক্ষিত আচরণকে অভ্যাসে রূপান্তরিত করা প্রতিপালনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কাংক্ষিত আচরণকে অভ্যাসে রূপান্তরিত করতে হলে একজন অভিভাবকের অব্যাহত প্রচেষ্টা চালাতে হবে। বারবার তা পুনরাবত্তি এবং খুব কঠিনভাবে এর অনুশীলন করতে হবে। অতঃপর কালক্রমে তা শিশুর অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাবে। ফলে অভিভাবক থেকে ঐ কাজের কোনরূপ অনুরোধ ব্যতিরেকে উক্ত কাজের দাবী আসলেই সে তা সম্পন্ন করে ফেলবে। যেমন: কোন মুসলমান যদি হাঁচি দেয়ার পর 'আলহামদুলিল্লাহ' বলতে অভ্যস্ত থাকে, যদি সে কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গভীর চিন্তায় নিমজ্জিত থাকে বা খুব ব্যস্ত থাকে, তাহলেও সে হাঁচির পরই বলে উঠবে 'আল-হামদুলিল্লাহ।' কারণ, এটা তার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। এমনটিই হয়ে থাকে। সে কারণে হাদিসে এসছে-
الخير عادة والشر لجاجة من يرد الله به خيرا يفقهه فيالدين
'কল্যাণ ও মঙ্গল হলো অভ্যাস, অমঙ্গল ও অকল্যাণ হচ্ছে ঝগড়া-বিবাদ। আল্লাহ তাআলা যার মঙ্গল চান তাকে দীনে ইসলামের সঠিক জ্ঞান দান করেন।
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. বলেন, 'নামাজের ব্যাপারে তোমাদের সন্তানদের প্রতি যত্নবান হও! তাদেরকে কল্যাণ শিক্ষা দাও! অনন্তর কল্যাণই হচ্ছে অভ্যস।' মুয়াবিয়া রা. বলেন, 'তোমরা নিজেদেরকে কল্যাণের ওপর অভ্যস্ত করে নাও!' সুতরাং বাচ্চাদেরকে কল্যাণের ওপর অভ্যস্ত করতে অনুপ্রাণিত করাই ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অভিপ্রায়। এক ভদ্র মহিলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট একটি বাচ্চা উঁচিয়ে ধরে জিজ্ঞাসা করল- 'এর জন্যে কি হজ্জ আছে?' উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হ্যাঁ আছে, তবে এর বিনিময় পাবে তুমি। ' বাচ্চাটি ছোট, হজ্জের আহকাম সম্পর্কে সে কিছুই জানে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে উক্ত মহান ব্রতে অভ্যস্ত করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। আর 'এ দায়িত্ব পালন করলে তার জন্য পুরস্কার রয়েছে' বলে তার মাকেও উৎসাহিত করেছেন। যখন মুসলিম মহিলাগণ নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদে যেতেন অথচ অনেক বাচ্চা কান্নাকাটি করতো। এতদসত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে মসজিদে নিয়ে আসতে নিষেধ করেননি। বরং শিশুদের প্রতি লক্ষ রাখতেন এমনকি তাদের জন্য নামাজ সংক্ষিপ্ত করতেন। আমাদের দৃষ্টিতে এটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে মসজিদে আসতে অভ্যস্ত করার জন্যই করতেন।
টিকাঃ
৩২ ইবনে হিব্বان-২/৮
৩০ বাইহাক্বী-৩/৮৪
৩৪ মসনাদে শামিয়্যীন-৩/২৫০
৩৫. মুসলিম- ২৩৭৮
৩৬. এক্ষেত্রে অনেক লোক একটি হাদীস উল্লেখ করেন- 'তোমরা বাচ্চাদেরকে মসজিদ থেকে দূরে রেখ।' হাদীসটি দুর্বল হওয়ার ব্যাপারে হাদীস বিশারদগণ একমত।