📘 সন্তান লালন পালন ও তালীম তরবিয়ত > 📄 তৃতীয় অধ্যায় : উপায় ও উপকরণসমূহ

📄 তৃতীয় অধ্যায় : উপায় ও উপকরণসমূহ


ইবাদতের মূল হচ্ছে নির্ভরশীলতা, শরিয়তের উৎসমূল থেকে গ্রহণ ঠিক যে পদ্ধতি এসেছে সেভাবেই তার আনুগত্য করা।
পক্ষান্তরে শরিয়তের অনুমতি সাপেক্ষে মানবিক ইচ্ছাশক্তিই হল অভ্যাসগত বিষয়ের মূল প্রতিপাদ্য। যার প্রতিটি কাজ ক্ষতিমুক্ত ও উপকারী হবে। অথবা ক্ষতিকারক বটে কিন্তু কোন একদিক থেকে উপকার অথবা বড় রকমের উপকার তার মধ্যে নিহিত থাকতে হবে।
এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিক্ষা ও প্রতিপালনের ক্ষেত্রে সর্বোত্তম পদ্ধতিটাই প্রয়োগ করেছেন। তবে উপকরণগুলো স্থান, কাল, পাত্রভেদে সমাজের প্রতিটি ব্যক্তি, তাদের সামাজিক মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই স্থান-কাল-পাত্র ভেদে এর বিভিন্নতা পরিলক্ষিত হতে পারে। সুতরাং যুগের প্রগতি, অগ্রগতি ও উন্নতির অনুকূল উপকরণকে অপর এক পদ্ধতির বাস্তবায়ন কিংবা আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্যে প্রয়োগের ক্ষেত্রে এখন আর কোন নিষেধাজ্ঞা থাকলো না।
শিশুর এই বয়োঃস্তরে একজন শিক্ষক ও অভিভাবকের এমন কতিপয় পদ্ধতি ও উপকরণের প্রয়োজন পড়বে। শিশুর শিক্ষানবীশ কালে যা অবলম্বন করার সামর্থ্য তার রয়েছে। তবে যদি উপকরণ অথবা পদ্ধতি শিক্ষানির্ভর নিরেট অনুকরণ হয়, যার কোন বিকল্প নেই বা যেটা খুব কমই ফলপ্রসূ হয়। বিশেষ করে এই ছোট্ট বয়সে শিশুর চিন্তাশক্তি স্মরণ, মুখস্থকরণ ও পুনরাবৃত্তির ওপর সীমাবদ্ধ থাকে। যেহেতু সে গঠন, বিন্যাস ও উম্মোচণের মত উচ্চ পর্যায়ের চিন্তা করতে সামর্থ নয়। কিন্তু এতদসত্ত্বেও এখানে কতিপয় প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয় উপকরণ ও পদ্ধতি উল্লেখ করলাম-

ইবাদতের মূল হচ্ছে নির্ভরশীলতা, শরিয়তের উৎসমূল থেকে গ্রহণ ঠিক যে পদ্ধতি এসেছে সেভাবেই তার আনুগত্য করা।
পক্ষান্তরে শরিয়তের অনুমতি সাপেক্ষে মানবিক ইচ্ছাশক্তিই হল অভ্যাসগত বিষয়ের মূল প্রতিপাদ্য। যার প্রতিটি কাজ ক্ষতিমুক্ত ও উপকারী হবে। অথবা ক্ষতিকারক বটে কিন্তু কোন একদিক থেকে উপকার অথবা বড় রকমের উপকার তার মধ্যে নিহিত থাকতে হবে।
এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিক্ষা ও প্রতিপালনের ক্ষেত্রে সর্বোত্তম পদ্ধতিটাই প্রয়োগ করেছেন। তবে উপকরণগুলো স্থান, কাল, পাত্রভেদে সমাজের প্রতিটি ব্যক্তি, তাদের সামাজিক মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই স্থান-কাল-পাত্র ভেদে এর বিভিন্নতা পরিলক্ষিত হতে পারে। সুতরাং যুগের প্রগতি, অগ্রগতি ও উন্নতির অনুকূল উপকরণকে অপর এক পদ্ধতির বাস্তবায়ন কিংবা আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্যে প্রয়োগের ক্ষেত্রে এখন আর কোন নিষেধাজ্ঞা থাকলো না।
শিশুর এই বয়োঃস্তরে একজন শিক্ষক ও অভিভাবকের এমন কতিপয় পদ্ধতি ও উপকরণের প্রয়োজন পড়বে। শিশুর শিক্ষানবীশ কালে যা অবলম্বন করার সামর্থ্য তার রয়েছে। তবে যদি উপকরণ অথবা পদ্ধতি শিক্ষানির্ভর নিরেট অনুকরণ হয়, যার কোন বিকল্প নেই বা যেটা খুব কমই ফলপ্রসূ হয়। বিশেষ করে এই ছোট্ট বয়সে শিশুর চিন্তাশক্তি স্মরণ, মুখস্থকরণ ও পুনরাবৃত্তির ওপর সীমাবদ্ধ থাকে। যেহেতু সে গঠন, বিন্যাস ও উম্মোচণের মত উচ্চ পর্যায়ের চিন্তা করতে সামর্থ নয়। কিন্তু এতদসত্ত্বেও এখানে কতিপয় প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয় উপকরণ ও পদ্ধতি উল্লেখ করলাম-

📘 সন্তান লালন পালন ও তালীম তরবিয়ত > 📄 চতুর্থ অধ্যায় : পুরস্কার ও শাস্তি

📄 চতুর্থ অধ্যায় : পুরস্কার ও শাস্তি


ভীতিপ্রদর্শন ও উৎসাহ প্রদান এমন একটি অধ্যায় যার মাধ্যমে শরিয়তের অবশ্য পালনীয় বিষয়াদি সম্পর্কে একজন মুসলিমকে অনুপ্রাণিত ও উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব হয়। এবং শরিয়তের বর্জনীয়, নিষিদ্ধ ও অবাঞ্চিত বিষয়াদি থেকে তাকে বিরত ও নিষেধ করা যায়। আর পুরস্কার ও শাস্তি হলো ভীতিপ্রদর্শন ও অনুপ্রেরণা দানের মাধ্যম। সেটা প্রতিপালন ও প্রশিক্ষণের অন্যতম একটি উপকরণও বটে। যেহেতু পুরস্কার ও শাস্তির সূত্র ধরেই শিক্ষার্থীদের কাংক্ষিত প্রতিপালন সাধিত হয়। অত্যধিক গুরুত্বের কারণে বিষয়টি সম্পর্কে নিম্নে এককভাবে আলোকপাত করছি -
পুরস্কার: একটি শিশু থেকে কাম্য কোন কথা বা কাজের প্রতি উৎসাহ প্রদানের জন্য নিঃসন্দেহে একটি কার্যকর মাধ্যম ছোট শিশুর পুরস্কারের আয়োজন। অনুপ্রেরণা দানকারীর সম্মুখে তার ইচ্ছাশক্তি ও ধারণ ক্ষমতার দুর্বলতার কারণে অনুশীলন, পদক্ষেপ গ্রহণ ও তা বাস্তবয়নের জন্য শিশুর কোন উদ্বুদ্ধকারীর প্রয়োজন হয়ে থাকে।
পুরস্কার দানের পদ্ধতিসমূহের মধ্যেও প্রকারভেদ রয়েছে। একটা পরোক্ষ ও অন্যটা বৈষয়িক পুরস্কার, তবে উভয়টাই কাম্য। একটা গ্রহণ করে অন্যটা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই; বিশেষ করে শিশুর এই বয়োঃস্তরে।
অভিভাবক কখনো কোন প্রতিদান বা পুরস্কারের অঙ্গীকার করলে তার কর্তব্য হলো পুরস্কার সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি পূরণ করা। কারণ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে শিশুটি অভিভাবকের অঙ্গীকারের ওপর আর কোন আস্থা রাখবে না। ফলে এ দিক থেকে শিশুর বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। অন্য দিকে তার আনুগত্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়বে। সুতরাং যা বাস্তবে পূরণ সম্ভব নয় বা যার বাস্তবায়ন কঠিন এমন বিষয়ের অঙ্গীকার না করাই তার অঙ্গীকার পূরণের জন্য সহায়ক। যেমনিভাবে এমন কোন অঙ্গীকার করবে না যা চাহিদার সঙ্গে সামাঞ্জস্যশীল নয়। যেমন বিপুল সম্পদ প্রদান অথবা বিমান ভ্রমণের অঙ্গীকার যা পূরণ করা কম লোকের পক্ষেই সহজ।
কোন কোন অভিভাবক শিশুকে এ বয়সে মিথ্যা বলার ক্ষেত্রে ছাড় দিয়ে থাকেন। যেমন: তাদের ওয়াদানুযায়ী কোন কাজ করা বা ছেড়ে দিতে উদ্যত হওয়া। কিন্তু এটা অভিভাবকের নিশ্চিত ভুল; কারণ এর দ্বারা তার ওপর মিথ্যা অবধারিত হয়ে যায়। সে মিথ্যা বলা যায় বলে শিক্ষা পায় এবং শিক্ষার্থী তার অভিভাবকের ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ দিকেই ইঙ্গিত করেছেন। আব্দুল্লাহ বিন আমের রা. বর্ণনা করেন- 'একদা আমার মা আমাকে ডাক দিলেন অথচ তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের ঘরে উপবিষ্ট ছিলেন। অতঃপর ভদ্রমহিলা বলল, 'এই বৎস, আস তোমাকে একটা জিনিস দেব। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তুমি তাকে কি দিতে চাও? সে বলল, 'আমি তাকে খেজুর দিতে চাই।' অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, 'তুমি যদি তাকে কোন কিছুই না দিতে তাহলে তোমার আমলনামায় একটি মিথ্যা লিখা হতো। ' তিনি এও বলেছেন, 'যে ব্যক্তি কোন শিশুকে বলবে এই দিকে এসো, আমি তোমাকে কিছু দেব, অতঃপর তাকে কিছু দেয় না তাহলে এটা হবে মিথ্যা।
কোন কোন অভিভাবক মিথ্যা ও অঙ্গীকার ভঙ্গের প্যাঁচ থেকে বেরিয়ে যেতে চায় এভাবে যে, যে কোন অবস্থায় সে মিথ্যা ব্যবহার করে কোন কাজ করা বা পরিত্যাগে শিশুকে অনুপ্রাণিত করবে। অতঃপর আলোচনার শেষে একথা বলে দিবে, ইনশা আল্লাহর (যদি আল্লাহ চাহে তো) এই ভিত্তিতে যে, তেমনটি যদি সে নাও করে থাকে তাহলে সে মিথ্যাবাদী অথবা ওয়াদাভঙ্গকারী হচ্ছে না। কিন্তু শিশুর ওপর এরও একটি বিরূপ প্রভাব রয়েছে। কারণ তার স্মৃতিতে প্রত্যাশা বাস্তবায়ন না হওয়ার এই সুন্দর কথাটি বদ্ধমূল হয়ে থাকবে। এমনকি কিছুদিন পর যখন আপনি তার সঙ্গে কোন অঙ্গীকার করে বলবেন, ইনশা আল্লাহ। তখন উত্তরে সে বলবে, ইনশা আল্লাহ ছাড়া কথা বলুন।
অভিভাবকের মনের মধ্যে যখন কোন কাজ করার দৃঢ় সংকল্প থাকবে শুধুমাত্র তখনই এই বাক্যটি বলা উচিত। এরপর উক্ত কাজ সম্পন্ন করা যদি সম্ভব নাও হয়, তাহলেও তার কোন অসুবিধা নেই। সে ওয়াদাভঙ্গকারী হিসেবে গণ্য হবে না। সুতরাং এটা কোন ঝুলন্ত বিষয়ে নয়, নিশ্চিত বিষয়ের ক্ষেত্রে বলবে। আর এই অভিমতের ওপর ভিত্তি করে যে, বাক্যটি সম্পর্কে শিশুর মনে কোন অসঙ্গত ধারণা আসবে না। বরং সে জানতে পারবে ইনশা আল্লাহ বাক্যটি শুধুমাত্র ভবিষ্যতে অনুষ্ঠিতব্য বিষয়াবলী সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে। কারণ আল্লাহ তাআ'লাই হলেন সকল কর্মের একচ্ছত্র বিধাতা ও নিয়ামক। কোন কিছুই তাঁর ইচ্ছা ব্যতিরেকে সংঘটিত হয় না, হতে পারে না।
এ বয়োঃস্তরে শিশুর নিকট বৈষয়িক বস্তুর পর্যাপ্ততা অধিকাংশ সময় পরোক্ষ ও অদৃশ্য বস্তুর পর্যাপ্ততা থেকে শ্রেয় হয়ে থাকে। যদিও এটা পরোক্ষ বিষয়াদির প্রতি গুরুত্বারোপের পরিপন্থ নয়। কিন্তু দৃশ্যমান বা বৈষয়িক পুরস্কারকে অদৃশ্য পুরস্কারের ওপর প্রাধান্য দেয়া উত্তম। কারণ একটি শিশু প্রকাশ্য বিষয়ের সঙ্গেই থাকে বেশি ঘনিষ্ট। প্রতিদানের ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন উচিত নয়; তাহলে শিশু কর্মসম্পাদন বা আহ্বানে সাড়া দিতে কোন শর্ত জুড়ে দেয়ার সুযোগ পেতে পারে।
শাস্তিপ্রদান :
মানুষ চাই সে ছোট হোক বা বড়, অবাঞ্চিত কাজ করা থেকে কেউই মুক্ত নয়। যেমনিভাবে 'শিশু শরীয়ত কর্তৃক আদিষ্ট নয়' যুক্তিতে তাদের সকল ভুলত্রুটি ও অন্যায় কাজে শৈথিল্য প্রদর্শন করলে তাদের ভালোভাবে শিক্ষা-দীক্ষা সম্ভব হবে না। এমনিভাবে তার থেকে সংঘটিত প্রতিটি ভুলের জন্য শাস্তি দেয়া অথবা ভুল-ত্রুটির মাঝে বিদ্যমান নিশ্চিত পার্থক্য ও প্রকরণ উপেক্ষা করে সকল ভুলত্রুটিকে একই মাপকাঠিতে বিচার করা অথবা একই দৃষ্টিতে দেখা এবং শাস্তি প্রদান অভিভাবকদের প্রথম টার্গেট বানানো উচিত নয়। যখন শিশুকে শাস্তি প্রদান তথা শারীরিক শাস্তি প্রদানই উত্তম বলে সিদ্ধান্ত হবে, তখন তাকে শাস্তি দেয়া যেতে পারে। যাই হোক ছোট্ট বয়সে শিশুর শারীরিক শাস্তি কাম্য নয়। তাছাড়া এর অনেক ক্ষতিও রয়েছে।
ইবনে খালদুন রহ. তার আল-মুকাদ্দিমা-তে এ দিকেই ইঙ্গিত করেছেন- 'ছাত্রদের ওপর কঠোরতা আরোপ তাদের জন্য ক্ষতিকারক। কারণ শিক্ষার ক্ষেত্রে শাস্তি প্রদানে সীমালংঘন শিক্ষার্থীর জন্য ভীষণ ক্ষতিকারক। বিশেষ করে ছোট ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে। কারণ এটা হলো মন্দ প্রবণতা। যে অভিভাবক প্রতিপালনের ক্ষেত্রে কঠোরতা ও রুক্ষভাব প্রদর্শন করে থাকেন তার ছাত্র, অধীনস্থ ও গৃহ পরিচারিকাদের প্রতি। তাহলে সে কঠোরতা শিশুকে আক্রান্ত করবে ও তার ওপর আধিপত্য বিস্তার করে বসবে। ফলশ্রুতিতে শিশুর মন সংকীর্ণ হয়ে যাবে ও উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে। কাপুরুষতা ও অলসতার দিকে তাকে ধাবিত করবে, মিথ্যা ও দুষ্টামির দিকে তাকে উদ্যত করবে।
ফলে তার প্রতি কঠোরতার হাত সম্প্রসারিত হতে পারে এই আশঙ্কায় অন্তরে যা আছে তার বিপরীত সে প্রকাশ করে থাকবে। এটা তাকে প্রহসন ও প্রতারণা শিক্ষা দেবে। এক পর্যায় গিয়ে এটা তার অভ্যাস ও চরিত্রে পরিণত হয়ে যাবে। ফলে মানবতার মর্মবাণী ধ্বংস প্রাপ্ত হবে; যার জন্য একটি সমাজ ও সভ্যতা গড়ে উঠে।
পরিবার হল তার প্রাণ ও গৃহের প্রতিরক্ষা। এক্ষেত্রে সে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। বরং উত্তম গুণাবলি ও নান্দনিক চরিত্র অর্জনে সে হবে ব্যর্থ এবং মানবতার দাবী পূরণে অসমর্থ। অতঃপর সে এত নীচে নেমে যাবের যে, সৃষ্টির মধ্যে সর্বাপেক্ষা নিম্ন শ্রেণী থেকেও অনেক নীচে চলে যাবে।
এমনটি ঘটেছে প্রতিটি জাতির বেলায় যারা আধিপত্যবাদের কবলে চলে গেছে। ফলে সেখান থেকে শুধু অত্যাচার-অবিচার ও নিপীড়নই চলেছে অব্যাহতভাবে। একে আপনি পরাধীন গণ্য করতে পারেন। শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে শিক্ষকের ও সন্তানের ক্ষেত্রে পিতার কর্তব্য হলো তাদেরকে শিষ্টাচার শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে স্বৈরাচারী বা কঠোর না হওয়া। '
শিশুকে শাস্তিদানের ক্ষেত্রে ধীরতা অবলম্বন করা উচিত। তাহলে বিভিন্ন প্রকার শাস্তির দ্বারসমূহ অভিভবাকের নিকট উম্মোচিত হবে। তখন কঠোরতা আরোপ একই প্রক্রিয়ায় হবে না। বরং প্রতিটি জায়গায় তার উপযোগী শাস্তির ব্যবহার করতে সক্ষম হবে।
শাস্তির একটি প্রকরণ শুধুমাত্র শারীরিক শাস্তির ওপর নির্ভরতা, দৈহিক শাস্তি ভিন্ন অন্য অসংখ্য শাস্তির প্রকরণ সম্পর্কে অভিভাবকের অজ্ঞতা অথবা তার ফলাফল সম্পর্কে অতৃপ্তি থাকা উচিত নয়। সে কারণেই শাস্তি, তার অসংখ্য পদ্ধতি আয়ত্ব করা ও তার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সম্যক অবগতি অর্জন করা দরকার। মনে রাখতে হবে দৈহিক যাতনা শাস্তির কোন নির্ভরযোগ্য পদ্ধতিই হতে পারে না।
ঐ ব্যাপারে অসতর্কতাকে ভাল মনে করা ঠিক নয়। কখনো কখনো এ জাতীয় ভুলও হয়ে থাকে। কখনো শুধুমাত্র চোখের দৃষ্টি নিক্ষেপের প্রয়োজন হয়ে থাকে অথবা এক প্রকারের অসন্তুষ্টি বা অগ্রাহ্যের প্রকাশ করা যেতে পারে। অনেকে তো এ ক্ষেত্রেও একটি মার্জিত বাক্য অথবা সূক্ষ্ম ইঙ্গিতের ওপরই তৃপ্ত থাকেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে শিশু সন্তানকে তার পছন্দনীয় বস্তু থেকে বঞ্চিত রাখারও প্রয়োজন পড়ে।
এই বয়োঃস্তরে যে সকল শাস্তি প্রয়োগ করা সম্ভব তা অবশ্যই শিশুর ওপর প্রভাব বিস্তারকারী। চেহারার প্রফুল্লতা না রাখা অথবা তার সঙ্গে হাসি-আনন্দ পরিহার করা। তাকে উপেক্ষা করা ও তার অপর ভাই-বোনদের প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ করা, তার সঙ্গে কথাবার্তা ও গল্প বলা বন্ধ করে দেয়া।
এ বয়োঃস্তরে এটা তাকে দৈহিক শাস্তি থেকে দূরে রাখতে সক্ষম হবে। তবে শাস্তি প্রদান নিতান্ত প্রয়োজন হলে শাস্তির উপকরণ প্রকাশের সীমা অতিক্রম করা উচিত নয়। যথা-লাঠি, চাবুক ও এ দ্বারা ভীতি প্রদর্শন, অতঃপর কানমলা। পক্ষান্তরে দৈহিক শাস্তির সীমা এখান থেকে অতিক্রম করে গেলে তা পরবর্তী বয়োঃস্তরের জন্য বিলম্ব করা উচিত। আর একজন অভিভাবকের কাজ হচ্ছে এগুলোর মধ্যে তাৎপর্য নির্ণয় করা ও সবগুলোর মধ্য হতে সংঘটিতব্য ভুলের জন্য উপযুক্তটা নির্বাচন করা।
একজন অভিভাবকের অসতর্কতার আশঙ্কা করে ভুলের জন্য শিশুর জবাবদিহিতা স্থগিত করা কখনোই উচিত নয়। যখন তার সকল কর্মকাণ্ড অভিভাবককে পর্যবেক্ষণ ও দেখাশুনা করতে হবে এবং শিশুটিও তা উপলব্ধি করতে পারবে। তখন এ পথ শিশুকে একটি বিপদজনক পরিণতি উপহার দেবে। কারণ শিশুর এ জাতীয় আচরণের মধ্যে দোষারোপ করার মত অথবা শাস্তিযোগ্য তেমন কিছুই নেই। অথবা ভুল সংঘটিত হলে অভিভাবক কর্তৃক স্নেহ-বাৎসল্য ও বয়সের স্বল্পতা অথবা অনুধাবন করতে পারে না দাবী করে কোন দুর্বলতা কিংবা শিথিলতা প্রদর্শনও উচিত নয়। কারণ শাস্তির উদ্দেশ্য দণ্ডবিধি কার্যকর করা নয়। বরং শিশুকে অভিযোগের ভিত্তিতে শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে এক প্রকারের দিক-নির্দেশনা। কারণ এর দ্বারাই তার মন্দ কর্ম ও কথার প্রতি ইঙ্গিত প্রদান করতে হবে। এমনকি যদি সেই দিক-নির্দেশনা কোনরূপ দৈহিক শাস্তি ব্যতীত শুধু আলোচনাই হোক না কেন।
এরূপ ঘটনা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায়ও সংঘটিত হয়েছিল। একদা হাসান বিন আলী রা. এর মুখে (যখন সে একটি ছোট শিশু) তার মা ফাতিমা রা. সাদকার একটি খেজুর দিয়েছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, 'ছি! ছি! (যাতে সে ওটা ফেলে দেয়) তুমি কি জানো না যে, আমরা সদকার বস্তু আহার করি না?' অপর এক বর্ণনায় এসছে- হাসান রা. ছোট একটি শিশু যার ওপর এখনো আদেশ নিষেধের সম্বোধন আবর্তিত হয়নি; তা সত্ত্বেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার মুখ থেকে খেজুরটা বের করে ফেললেন।'
ইবনে হাজার রহ. এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, 'এখানে 'কাখ' (ছি! ছি!) শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে, যা শিশুকে কোন অবাঞ্চিত বস্তু আহার থেকে বিরত রাখতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ইমাম আহমদ রহ. বর্ণনা করেন- 'অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাসানের রা. দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলেন, সে একটি খেজুর চিবুচ্ছে। তখন তার গাল ধরে টান দিলেন এবং বললেন- বৎস, ওটা ফেলে দাও, হে বৎস, ওটা ফেলে দাও।'
এ হাদীস থেকে আরো প্রমাণিত হয়; শিশুদেরকে মসজিদে নিয়ে যাওয়া, তাদেরকে উপকারী বিষয় শিক্ষা দেয়া, ক্ষতিকারক বস্তু এবং নিষিদ্ধ বস্তু আহার হতে সংযত থাকার প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে তাদেরকে বিরত রাখা সংগত। যদিও তারা শরিয়ত কর্তৃক আদিষ্ট নয়। এখানে নিষেধাজ্ঞার কারণও জানিয়ে দেয়া হয়েছে, যারা ভালোমন্দ নির্ণয় করতে পারে তাদেরকে শুনানোর উদ্দেশ্যে যারা ভালোমন্দ নির্ণয় করতে পারে না তাদেরকে সম্মোধন করা। যেহেতু হাসান রা. তখন শিশু ছিলেন।
এই হাদীসটির মধ্যে আর একটি বিষয় বিশেষভাবে প্রনিধানযোগ্য, আর তা হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাসান রা. কে কেবলমাত্র তার বুদ্ধিগত সামর্থের ওপর ছেড়ে দেননি। বরং তার সঙ্গে বড়দের মত সম্বোধন করে কথা বলেছেন। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'তুমি কি জানো না যে, আমরা সদকার বস্তু আহার করি না?' এই পদ্ধতি একটি শিশুকে তার আত্ম-মর্যাদাবোধ উজ্জীবিত করে দেয় ও তার আত্ম-বিশ্বাসকে করে সুদৃঢ় ও শক্তিশালী। যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিষেধাজ্ঞার বিবরণ দিতে গিয়ে তাকে আহ্বান করেছেন তাঁর বাণী- 'হে বৎস,' এর দ্বারা; আর তা হলো স্নেহ ও অনুকম্পা।

টিকাঃ
৪০. আবু দাউদ-৪৩৩৯, মুসনাদে আহমদ-১৫১৪৭
৪১. মুসনাদে আহমদ-৯৪৬০
৪২. মুকাদ্দামা ইবনে খালদুন-৫০৮
৪৩ বুখারী-১৩৯৬, মুসলিম-১৭৭৮

📘 সন্তান লালন পালন ও তালীম তরবিয়ত > 📄 পঞ্চম অধ্যায় : নির্দেশনা ও উপদেশাবলী

📄 পঞ্চম অধ্যায় : নির্দেশনা ও উপদেশাবলী


শিশুর যত্ন ও প্রতিপালনের ক্ষেত্রে উপস্থাপনযোগ্য অসংখ্য দিকনির্দেশনা ও উপদেশ রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নিম্নে প্রদত্ত হলো:

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00