📄 কাংক্ষিত অভিভাবক
আমি এই সংক্ষিপ্ত বইটিতে সঠিক ও কাঙ্খিত পদ্ধতিতে শিশুর যত্ন ও পরিচর্যার সূমহান দায়িত্বকে পালন করবেন সে আলোচনার প্রয়াস পাবো।
গৃহে মা-বাবা, বিদ্যালয়ে শিক্ষকবৃন্দ এবং মসজিদের ইমাম প্রমূখ, এরা সকলেই কাংক্ষিত অভিভাবকদের অন্তর্ভুক্ত। তবে কতিপয় এমন অভিভাবক আছেন যাদেরকে হিসাব করা হয় না তারাও কিন্তু অভিভাবকের বাইরে নন। যেহেতু জাতিগঠন ও সমাজ বিনির্মাণে কখনো কখনো অনাকাংক্ষিত অভিভাবকদের থেকেও বাস্তবে এমন বিরাট ও প্রত্যক্ষ ভূমিকা এবং গভীর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়- যা অনেক সময় কাংক্ষিত অভিভাবকদের ভূমিকাকেও ছাড়িয়ে যায়।
শিশু-সন্তানের বয়সভেদে অভিভাবক বিন্যাস
শিশুর বয়স স্তরের তারতম্যের কারণে অভিভাবকের ভূমিকার বিভিন্নতা সর্বজন স্বীকৃত। এক্ষেত্রে কিছু বিকল্প কর্মপন্থা শিশুর মননে প্রভাব বিস্তারে কার্যকর ও ফলপ্রসূ হতে পারে।
ক- বাহিরের সমাজ-সংশ্রব ও বিদ্যালয় ভর্তি হওয়াপূর্ব বয়োঃস্তর বা নিরেট শৈশব: তখন শিশুর প্রধান অভিভাবক হলো তার মা-বাবা। তাদের সহকারী হিসেবে থাকতে পারে ভাই-বোন এবং নিকট আত্মীয়- যাদের সঙ্গে তার নিয়মিত সাক্ষাত হয়।
খ- ভালোমন্দ নির্ণয় করার বয়োঃস্তর যখন সে বিদ্যালয় ভর্তি হবে: তখন বিদ্যালয়ের শিক্ষক যেভাবে তার কাংক্ষিত অভিভাবক হিসেবে পরিগণিত হবে, বিদ্যালয়ের বন্ধুমহল, সহপাঠীবৃন্দ এবং তাকে পরিবেষ্টিত সমাজও গণ্য হবে সহকারী অভিভাবক হিসেবে। যেমন: প্রতিবেশী। যেহেতু একটি শিশু এই বয়সে তার প্রতিবেশী এবং বিদ্যালয়ের আসা যাওয়ার পথে যে সকল ছেলে-মেয়ের সঙ্গে দেখা হয় তাদের সঙ্গে মেলামেশা করতে ও সংশ্রব থেকে শিখতে আরম্ভ করে।
গ- মাধ্যমিক স্তর বা যখন সে ভালোমন্দ সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারে: এ সময় তার প্রধান অভিভাবক হিসেবে পরিগণিত হবে মসজিদের ইমাম। যেভাবে তার চতুর্পাশ বেষ্টিত সমাজের সক্রিয় ভূমিকা সহকারী অভিভাবক হিসাবে শিক্ষার্থীর মনে প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি স্বীকৃত। এ ক্ষেত্রে আরো সহকারীর ভূমিকা পালন করে থাকে প্রচার মাধ্যম, বন্ধুমহল, সভা-সেমিনার এবং বিবিধ জ্ঞানের মাধ্যম। যথা: বই, ক্যাসেট, গোলকধাঁধাঁ ও ইন্টারনেট ইত্যাদি।
এখানে একটা বিষয় নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত যে, শিশু পরিচর্যার ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ নয়, পরোক্ষ-এমন সহকারী অভিভাবকদের একটা ধ্বংসাত্মক ও বিপদজনক ভূমিকা রয়েছে, যার দায়ভার কিন্তু আসল অভিভাবকদের ঘাড়ে গিয়ে পড়বে। শিশু প্রতিপালনের এ সকল সহায়ক উপকরণের ব্যবহার-পদ্ধতি ও তার সঠিক ব্যবহার, তা হতে শিক্ষা গ্রহণের সুন্দর ও সঠিক দিক-নির্দেশনা প্রদান করতে পারে। যাতে সে আহরিত জ্ঞান দ্বারা সার্বিক কল্যাণ ও মঙ্গল লাভে সফল হতে পারে এবং অকল্যাণ ও ধ্বংসের দিকে ধাবিত করে এমন বস্তু থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে।
📄 প্রতিপালনের ক্ষেত্রসমূহ
প্রতিপালনের ক্ষেত্রসমূহ: শুধুমাত্র দেহের নাম মানুষ নয়। বরং মানুষ আত্মা, হৃদপিণ্ড, বুদ্ধি ও দেহ এ সবের সমন্বয়ে গঠিত একটা সত্তার নাম। যার ওপর ভর করে আবর্তিত হয় আবেগ, অনুভূতি, দৃষ্টিভঙ্গি, পরিকল্পনা, বিশ্বাস ও পারস্পারিক সম্পর্ক। আচার-ব্যবহার ও চরিত্রের নিয়ন্ত্রণ, মানুষের উদ্দেশ্য সাধনের প্রচেষ্টা ও অন্যের সংঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ধরন- এ সবই তার অন্তর্ভুক্ত।
নিচে সন্তান পরিচর্যার ক্ষেত্র বিন্যাস করা হলো:
দেহ পরিচর্যা: অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের সংস্থান হতে হবে হালাল উপার্জন দ্বারা। সাথে সাথে যত্নবান হতে হবে সন্তানের স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা ও বিনোদনের প্রতি। এ ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে মা-বাবাকে।
ফকিহ্ সিরাজী রহ. শিশুর এই পরিচর্যার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, 'পশুর দুধে শিশুর পরিচর্যা তার স্বভাবকে ধ্বংস করে দেয়।'
ইমাম গাজ্জালী রহ. বিষয়টির প্রতি সবিশেষ গুরুত্বারোপ করে বলেন, 'ধর্মানুরাগী এবং হালাল ভক্ষণকারী নয় এমন কোন মহিলাকে যেন শিশুর লালন-পালন ও দুগ্ধপানের জন্যে নিয়োগ দেওয়া না হয়। কারণ হারাম থেকে লব্ধদুধের মধ্যে কোন বরকত থাকে না। সুতরাং এর থেকে শিশুর যে শারীরিক বিকাশ-সেটা হবে দুষ্টমূল থেকে তার গঠন। তখন তার স্বভাব দুষ্টুমি ও অপবিত্র বিষয়ের দিকে ঝুঁকে পড়বে।' তিনি আরো বলেন, 'এবং দিনের কোন এক ভাগে তাকে হাঁটানো, নড়া-চড়া ও শরীর চর্চায় অভ্যস্ত করতে হবে, যাতে অলসতা কখনো তার ওপর বেঁকে বসতে না পারে।'
খ- হৃদপিণ্ড বা অন্তরের পরিচর্যা: বিশুদ্ধ বিশ্বাস এবং সুদৃঢ় ঈমানের আলোকে অন্তরকে উদ্ভাসিত করা। ইমাম গাজ্জালী রহ. তার বক্তব্যে এই দিকেই ঈঙ্গিত করেন-শিশুদেরকে 'কুরআন ও হাদীসের জ্ঞান আহরণ করাবেন। অধ্যয়ন করাবেন আউলিয়ায়ে কেরামের জীবনী ও আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের ঘটনাবলী। যাতে নেককারদের প্রতি ভালোবাসা তার অন্তরে অংকুরিত হয়ে থাকে।'
গ- আত্মার পরিচর্যা: এটা অর্জিত হবে নান্দনিক চরিত্র ও ভালো আচরণের দিকে আহবান, শরিয়ত কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব ও ইবাদতের প্রতি যত্নবান হওয়া এবং আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে।
এ প্রসঙ্গে ইমাম গাজ্জালী রহ. বলেন, 'শিশু হচ্ছে মা-বাবার নিকট আল্লাহ প্রদত্ত একটি আমানত। তার পবিত্র আত্মা যে কোন ছবি ও অংকন থেকে মুক্ত, নির্মল ও উৎকৃষ্ট একটি রত্ন। সেখানে যা অংকিত হবে তাই সে গ্রহণ করতে সক্ষম। যে দিকে তাকে আকৃষ্ট করা হবে সে দিকেই সে ধাবমান হবে। সুতরাং যদি কল্যাণকর বিষয় বা শিষ্টাচার শিক্ষা ও এর ওপর তাকে অভ্যস্ত করা হয়; তাহলে এভাবেই সে গড়ে উঠবে। সৌভাগ্য তার পদচুম্বন করবে ইহ ও পরলোকে। সে সফলতা ও পুরুস্কারে অংশীদার তার মা-বাবা এমনকি শিক্ষকবৃন্দও। পক্ষান্তরে যদি তাকে-আল্লাহ না করুন- চতুস্পদ জন্তুর মত ছেড়ে দিয়ে অকল্যাণ ও মন্দের ওপর অভ্যস্ত করা হয়, তাহলে সে হবে ব্যর্থমনোরথ ও হতভাগ্য। তখন এর দায়ভার সন্তানের লালন-পালনের দায়িত্বপ্রাপ্ত অভিভাবকদের কাঁধে গিয়ে পড়বে।
আল্লাহ তাআ'লা ইরশাদ করেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا. ( التحريم (6)
'হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের এবং পরিবার পরিজনকে সেই অগ্নি থেকে রক্ষা কর....।'
একজন পিতা যখন তার সন্তানকে জাগতিক অগ্নি থেকে রক্ষা করতে সদা তৎপর থাকে, তখন পরকালের অগ্নি হতে তাকে রক্ষা করতে আরো বেশি সচেষ্ট ও তৎপর হওয়া দরকার। সচ্চরিত্র, শিষ্টাচার ও ভদ্রতা শিক্ষাদান এবং দুষ্ট সঙ্গ হতে নিবৃত করা- এসবের মাধ্যমেই প্রকৃত পক্ষে সন্তানকে অগ্নি হতে রক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। সন্তান পরিচর্যার উল্লেখিত ক্ষেত্রদ্বয়ে কর্তব্য পালনে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, মসজিদের ইমাম ও মা-বাবা সকলে সমভাবে জড়িত।
গ- বুদ্ধির পরিচর্যা:
সঠিক স্বপ্ন, নির্ভুল পরিকল্পনা, চিন্তা-গবেষণা, প্রমাণ উপস্থাপনের পদ্ধতি, কোন নির্দিষ্ট বিষয়ের প্রাথমিক ভূমিকা থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে চূড়ান্ত ফলাফল বের করার পদ্ধতি, জ্ঞানগত দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণনা, গবেষণাধর্মী তৎপরতায় অংশগ্রহণ এবং পার্থিব উপকারী তত্ত্ব প্রভৃতি বিষয় শিক্ষা দানের ক্ষেত্রে মূখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ।
টিকাঃ
৬. সূরা আত-তাহরীম: ০৬
📄 প্রতিপালনের স্তরবিন্যাস
প্রতিপালনের স্তর বিন্যাস
পার্থিব জীবনে মানুষের বয়োঃস্তর দু'টো বিস্তৃত অধ্যায়ে বিভক্ত।
প্রথমত, অদৃশ্য ও স্বভাবজাত স্তর তা হচ্ছে- মাতৃগর্ভে অবস্থানকালীন স্তর- শুক্রবিন্দু থেকে জমাটবাঁধা রক্ত, সেখান থেকে মাংসপিণ্ড অতঃপর অস্থিমজ্জা এবং তা গোস্ত দ্বারা আবৃত করণ, অত:পর একটি পূর্ণাঙ্গ ভ্রুণ এবং তার জন্ম গ্রহণ।
দ্বিতীয়ত, দৃশ্যমান স্তর তা হলো জন্ম গ্রহণের পরের স্তর। এটাকেও আবার বড় দু'টি স্তরে বিভক্ত করা সম্ভব।
ক- শৈশব স্তর: জন্ম থেকে বয়োপ্রাপ্তির পূর্ব পর্যন্ত সময়।
খ- বয়োপ্রাপ্তি স্তর: যার সূচনা বয়সের পূর্ণতা প্রাপ্তি থেকে, এবং সমাপ্তি ঘটে মানব মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। যাতে সে পারলৌকিক জীবনের দিকে প্রত্যাবর্তন করতে পারে, কবর যার প্রথম মনযিল।
শৈশব এবং বয়োপ্রাপ্তি এ দু'স্তরের মধ্যে আরো একটি প্রকরণ লক্ষ করা যায়। মূল কথা একজন মানুষের পরকালের দিকের এই দীর্ঘ ভ্রমণে তাকে এক স্তর থেকে অন্য স্তরে উপনীত হতে হয়। এবং প্রত্যেকটি স্ত রেই তাকে বিশেষ প্রস্তুতি ও পরিচর্যার মুখোমুখী হতে হয়। সে কারণেই মানব বয়সের অগ্রগতির ধারা প্রবাহের সঙ্গে প্রতিপালন ও পরিচর্যার স্তর বিন্যাস ওৎপ্রোতভাবে জড়িত।
শৈশব স্তরেরই অন্ত স্তরকে আরো সুস্পষ্টভাবে আলোচনা করা নেহায়েত প্রয়োজন। যেহেতু র্ভুক্ত এমন আরো দু'টি স্তর রয়েছে যার একটি অন্যটি থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত। যে দু'টি স্তরের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে শরিয়তের অসংখ্য বিধান। আর এ জন্যেই শিশু পরিচর্যার স্তর বিন্যাসের মূল আলোচনা তিন ভাগে বিভক্ত।
ক- ভালোমন্দ পার্থক্য নির্ণয়-অযোগ্য শৈশবকাল: এটা সাধারণত জন্মের পর থেকে সাত বছর পূর্ণ হওয়া বা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত।
খ- ভালোমন্দ পার্থক্য নির্ণয়যোগ্য শৈশবকাল: এটা সাধারণত সাত বছর থেকে বয়োপ্রাপ্তি অথবা পনের বছরের পূর্ব পর্যন্ত। প্রকাশ থাকে যে, উল্লেখিত প্রথম এবং মধ্যম স্তরও এই স্তরেরই অন্তর্ভুক্ত।
গ- বয়সের পূর্ণতাপ্রাপ্তি কাল সেটা হল পুরুষ বা নারীত্বের চিহ্নসমূহ প্রকাশ ও শরিয়তের আদেশ ও নিষেধ বাধ্যতামূলক হওয়ার স্তর। এর সূচনা হয় বয়োপ্রাপ্তি হওয়ার জ্ঞাত নিদর্শনসমূহ প্রকাশ অথবা পনের বছরে উপনীত হওয়ার পর।
এ বয়স উচ্চ-মাধ্যমিক স্তরের বিপরীত। আলোচ্য প্রকারটি কুরআনে কারীমের আয়াত দ্বারা প্রমাণিত। যেখানে ভালোমন্দ নির্ণয় করতে পারে না এমন শৈশবকেই বুঝানো হয়েছে।
أَوِ الطِّفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَى عَوْرَاتِ النِّسَاء . ( النور -31)
'সেই বালক, যারা নারীদের গোপনাঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ....।' আয়াতখানা অবতীর্ণ হয়েছে মহিলাদের সৌন্দর্য্য অবলোকন ও প্রবেশাধিকার যাদের জন্য স্বীকৃত তাদের সম্পর্কে।
ইবনে কাসির রহ. বলেন, 'তারা নেহায়েত ছোট বলে মহিলাদের অবস্থা, তাদের গোপনাঙ্গ, কোমল বাক্যালাপ, মৃদু পদচালনা এবং মেয়েলী আচার-আচরণ কিছুই বুঝতে পারে না। একটি শিশু খুব ছোট হওয়ার দরশ যেহেতু কিছুই অনুভব করতে পারে না তাই মহিলাদের নিকট প্রবেশ করতে তার কোন বাধা নেই। পক্ষান্তরে সে যখন সাবালক বা এর নিকটবর্তী বয়সে উপণীত হবে, মহিলাদের মেয়ে-সূলভ আচার-আচরণ বুঝতে ও অনুভব করতে এবং সুন্দরী ও অসুন্দরির মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে শিখবে তখন কোন অবস্থাতেই মহিলাদের নিকট তার প্রবেশাধিকার গ্রহণযোগ্য নয়।
ইমাম বগভী রহ. মুজাহিদ রহ. এর উদ্ধৃতি দিয়ে এ আয়াতের ব্যাখ্যা এভাবে করেন- 'ছোট হওয়ার দরুণ অন্যের গোপনীয় অঙ্গ সম্পর্কে তারা ওয়াকিবহাল নয়।'
আবু বকর আল-জাস্সাস রহ. বলেন, 'মুজাহিদ রহ. এর বক্তব্য একেবারে সুস্পষ্ট। যেহেতু আয়াতের অর্থই হচ্ছে- তারা অতিশয় ছোট্ট হওয়া ও জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে মেয়েলী আচরণ ও নারী-পুরুষের গোপনাঙ্গের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে না। তবে যে সব শিশু মেয়েদের গোপনাঙ্গ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল তাদেরকে মহিলাদের নিকট প্রবেশের ক্ষেত্রে তিন সময় অনুমতি গ্রহণ আল্লাহ তাআলা বিধি- বদ্ধ করে দিয়েছেন।
ইরশাদ হচ্ছে-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِيَسْتَأْذِنْكُمُ الَّذِينَ مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ وَالَّذِينَ لَمْ يَبْلُغُوا الْحُلُمَ مِنْكُمْ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ مِنْ قَبْلِ صَلَاةِ الْفَجْرِ وَحِينَ تَضَعُونَ ثِيَابَكُمْ مِنَ الظَّهِيرَةِ وَمِنْ بَعْدِ صَلَاةِ الْعِشَاءِ ثَلَاثُ عَوْرَاتٍ لَكُم ( النور- 58)
'হে মুমিনগণ, তোমাদের দাস দাসীরা এবং তোমাদের মধ্যে যারা প্রাপ্তবয়স্ক হয়নি তারা যেন তিন সময়ে তোমাদের কাছে অনুমতি গ্রহণ করে। ফজরের নামাজের পূর্বে, দুপুরে যখন তোমরা পোশাক খুলে রাখ এবং এশার নামাজের পর।'
অন্য স্থানে আল্লাহ পাক প্রাপ্তবয়স্কদের অনুমতি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন-
وَإِذَا بَلَغَ الْأَطْفَالُ مِنْكُمُ الْحُلُمَ فَلْيَسْتَأْذِنُوا كَمَا اسْتَأْذَنَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ. ( النور- 59)
'তোমাদের সন্তান-সন্ততিরা যখন বয়োঃপ্রাপ্ত হয়, তারা যেন তাদের পূর্ববর্তীদের ন্যায় অনুমতি চায়।'
উপরোক্ত বয়োঃস্তরের বিন্যাস বাস্তবসম্মত ও সুপ্রমাণিত। অবিকল এই প্রকরণের কথাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
عَلِّمُوا الصَّبِيَّ الصَّلَاةَ ابْنَ سَبْعِ سِنِينَ وَاضْرِبُوهُ عَلَيْهَا ابْنَ عَشْرِ
'সাত বছর হলে সন্তানকে তোমরা নামাজের প্রশিক্ষণ দাও। এবং নামাজের জন্য প্রহার কর, যখন তার বয়স দশ বছরে উপনীত হয়!'
এই হাদীস থেকেও আমরা বুঝতে পারলাম যে, সাত বছরের নীচের বয়োঃস্তর ভালো-মন্দ নির্ণয়ের বয়স নয়। তবে পূর্ণ সাত বছর বা তার পরবর্তী বয়োঃস্তর অবশ্যই ভালোমন্দ নির্ণায়ক বয়স। এখানে উল্লেখিত স্তরসমূহে বর্ণিত বয়সসীমাই একান্ত এবং চূড়ান্ত সীমা নয়। কারণ ব্যক্তি ও পরিবেশের বিভিন্নতা ভেদে এটা ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। তবে হাদীসের দিক-নির্দেশনা সাধারণভাবে ও অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সেটা সাধারণত ভালো-মন্দ অনির্ণায়ক বয়োঃস্তর তথা সাত বছরের নীচের বয়স। সাত বছর ও তার উপরের বয়স ভালো-মন্দ নির্ণায়ক বয়োঃস্তর। যখন একটি শিশুর বয়স এর চেয়েও বেশি হবে তখন সে আরো বেশী ভালোমন্দ নির্ণয় করতে পারবে। এমন কি তাকে নির্দেশ প্রদান ও নিষেধ করা হবে। তিরস্কার কিংবা শান্তি পর্যন্ত দেয়া হবে যদি এর বিরুদ্ধাচরণ করে। এভাবে তার বয়োঃপ্রপ্তি পর্যন্ত চলতে থাকবে। বয়োঃপ্রাপ্ত হয়ে গেলে তো দস্তুরমত তার আমলনামা লিপিবদ্ধ হতে থাকবে।
টিকাঃ
৭- সুরা আন-নুর: ৩১
৮-সুরা অন-নুর-৫৮
৯-আন-নুর-৫৯
১০-সহিহ ইবনে খুযাইমাহ-২/১০২
১১-আর-হুজরাত-১৩
📄 প্রতিপালনের সার্বজনীন উদ্দেশ্য
প্রতিপালনের সার্বজনীন উদ্দেশ্য: গোত্র ও জাতিসমূহ থেকে কতিপয় মানব ইউনিট নিয়ে গঠিত হয় একটি সমাজ। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন -
وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا (الحجرات -13)
'এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হও!'
এই একতা বিনির্মাণের ক্ষুত্রতম ও সর্বপ্রথম শৃংখলাবদ্ধ ইউনিট হলো 'পরিবার'। যা মা-বাবা, ছেলে-মেয়ে তথা সন্তান-সন্ততি নিয়ে গঠিত। এটা এমন ব্যক্তিগোষ্টির সমষ্টি যাদের পারস্পরিক সম্পর্ক সুদৃঢ় ও অটুট বন্ধনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই ব্যক্তিসমূহের তথা একটি পরিবারের উৎকৃষ্ট ও উত্তম পরিচর্যার মাধ্যমে সমাজের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। সমাজের সভ্যতা-সংস্কৃতি অনুধাবন করতে সক্ষম ব্যক্তিকে সমাজের একটি যোগ্য অঙ্গ হিসেবে প্রস্তুত করতে হবে। এখান থেকে আমরা এ সিদ্ধান্ত নিতে পারি যে, সভ্যতা-সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হয়ে যে হবে সমাজের জন্য আদর্শ।
বাস্তব কর্ম, চিন্তা ও গবেষণায় ভারসাম্য আনয়নের মাধ্যমে সমাজ উন্নয়নে থাকবে সদা নিবেদিতপ্রাণ। এটাই হলো সার্বজনীন তরবিয়তের এর মূল লক্ষ্য।
ইসলামী সমাজের জন্য সার্বজনীন তরবিয়ত এর লক্ষ্য হল ব্যক্তিকে প্রস্তুত করতে হবে ইসলামী সুউচ্চ ইমারতের একটি ইট হিসেবে- যিনি ইসলামের হাকিকত সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান ও তার বাস্তব অনুশীলন, সমাজ উন্নয়ন ও অগ্রগতি এবং বিশ্ববাসীর কাছে আল্লাহর দীন পৌঁছানোর ব্রতে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করবেন। যাতে আল্লাহ প্রদত্ত সকল যোগ্যতা ও সর্বশক্তি ব্যয় করে তাকে সৃষ্টির উদ্দেশ্য সে বাস্তবায়িত করতে পারে।