📄 একটি শিক্ষণীয় ঘটনা
‘জাযাকুমুল্লাহ' অথবা 'জাযাকাল্লাহু খায়রান' শুকরিয়া আদায়ের এই শব্দগুলো শিশুকে শিক্ষা দিবেন। যাতে করে শিশু নবীজির সুন্নত অনুযায়ী শব্দগুলো শিখে ফেলে।
আফসোস আজকে এই সুন্দর শিক্ষাটি আমরা ভুলে গিয়েছি আর অন্য ধর্মের লোকজন এই শিক্ষা নিয়ে সভ্য জাতি হিসেবে আজ পরিচিতি লাভ করছে।
সম্ভবত ১৯৯৭ সালের ঘটনা, আমি প্যারিস থেকে নিউইয়র্কে যাচ্ছিলাম। বিমানের যে সিটে আমি বসা ছিলাম, তার পাশের দুই সিট খালি। আল্লাহ পাকের ইচ্ছা; হয়তো এটা আমার জন্য পরীক্ষা ছিল। কিছুক্ষণ পর ফ্রান্সের এক যুবতী মেয়ে তার শিশু সন্তানকে নিয়ে আমার পাশের সিটে এসে বসল। এক সিটে মা। আরেক সিটে তার ছোট্ট মেয়ে। অন্য সিটে আমি।
আলহামদুলিল্লাহ, সফরে আমি একটি অভ্যাস করে নিয়েছি, বিশেষ করে বিমানের সফরে; সাথে অন্তত একটি কিতাব থাকবেই। আর এই কিতাব পড়ার ব্যস্ততায় এদিক সেদিক তাকানোর একেবারেই সময় হয় না। এভাবে সুন্দর মতো সময়টা পার হয়ে যায়। এবারও তাই করলাম। আমি আমার কিতাব পড়তে লেগে গেলাম। কিছুক্ষণ পর এয়ার হোসটেস এসে বলল, স্যার! খানা উপস্থিত। আমি খানা খাব না বলে তাকে জানিয়ে দিলাম। কারণ, প্যারিসের খানার ব্যাপারে তো আমার জানা নেই। তাদের খানা হালাল-হারাম হওয়ার ব্যাপারে তো যথেষ্ট সন্দেহ থাকে। তাই এরকম সফরে হয়তো সাথে করে কিছু খানা নিয়ে উঠি। অথবা না খেয়ে এভাবেই কাটিয়ে দেই। পরে গন্তব্যে পৌছে খানা খেয়ে নেই।
যাই হোক, আমি খানা ফিরিয়ে দিলাম। অপর দিকে ওই ভদ্রমহিলা তার জন্য এবং তার সন্তানের জন্য খানা রেখে দিলেন। কিছুক্ষণ পরে লক্ষ করলাম, সে তার শিশুমেয়েকে খানা খাওয়াচ্ছে এবং নিজেও খাচ্ছে। সে গায়রে মাহরাম মহিলা ছিল। তার দিকে তাকানো তো দূরের কথা, তার কণ্ঠ শোনাও শরীয়তে নিষেধ। কিন্তু যেহেতু তিনি পাশের সিটের যাত্রী ছিলেন, এক্ষেত্রে কোনো মানুষ যদি ওদিকে খেয়াল নাও করে, তবুও এটা অন্তত বুঝে আসে যে, পাশে কিছু হচ্ছে। আমি কিতাব পড়ছিলাম। খেয়াল না করলেও তাদের নড়াচড়ার দ্বারা বুঝতে পারছিলাম, তারা কিছু একটা করছে।
ওই ভদ্রমহিলা তার শিশু সন্তানের মুখে খাবারের লোকমা তুলে দিচ্ছিলেন আর শিশুটি খেয়ে নিলে তিনি বলছিলেন, (say, thank you) বলো, ধন্যবাদ। তার আদেশ মতো শিশুটি বলছিল, (thank you) ধন্যবাদ। তারপর দ্বিতীয়বার আবার যখন মুখে খাবার তুলে দিলেন, তখনও বললেন, say, thank you. বাচ্চাটিও তার মায়ের কথা মতো thank you বলতে লাগল। এভাবে আমি লক্ষ করলাম, প্রতিবারই মা তার বাচ্চাকে খাবার খাওয়াচ্ছে আর তাকে শুকরিয়া জ্ঞাপন শেখাচ্ছে। আমার ধারণা মতে খাওয়ানোর ওই স্বল্প সময়টিতে ফ্রান্সের ওই মহিলাটি তার বাচ্চাকে ৩৬ বারের মতো thank you বলা শিখিয়েছে। আমি নিশ্চিত ছিলাম, এত বারের (thank you) তালীমে শিশুটির মৃত্যু পর্যন্ত শুকরিয়া আদায়ের শিক্ষা হয়ে যাবে।
অপর দিকে আমি ভেতরে ভেতরে এই ভেবে অস্থির হচ্ছিলাম, হায়! এই সুন্দর স্বভাবটি তো ছিল মুসলমানদের। আজ মুসলমানরা তাদের সন্তানদের শুকরিয়া আদায়ের এই সুন্দর চরিত্রটি শেখানো ছেড়ে দিয়েছে। অপরদিকে কাফেররা তাদের সন্তানদেরকে কত গুরুত্ব দিয়ে তা শিক্ষা দিচ্ছে।
📄 'অন্যকে কষ্ট দেয়া' থেকে শিশুকে বিরত রাখা
মোটকথা, আমাদের উচিৎ সন্তানকে ছোটকাল থেকেই অন্যের উপকারের শুকরিয়া আদায় করার এই গুণটি শিক্ষা দেয়া, এমনিভাবে সালাম করার অভ্যাসও তাকে শিক্ষা দেব। এতে করে এই অভ্যাসের উপরই সে গড়ে উঠবে। ছোটকালে মা যদি এই অভ্যাসগুলো শিখিয়ে দেন, তবে বড় হয়েও সে বাবা-মা ও অন্যদের শুকরিয়া আদায় করবে। পাশাপাশি আল্লাহ তাআলারও শুকরিয়া আদায় করবে। অনেকে তো এমন আছে, বড় হয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করাও শেখে না। এই জুলুম বাবা-মা ছোটকালে তার উপর করেছে। তাই এখন সে না-শোকর অহংকারী হয়ে গেছে। এই জন্য যখনই শিশুকে কোনো জিনিস দেবেন, শিশুকে কোনো জিনিস খাওয়াবেন, তাকে যখন কাপড় পড়াবেন, কাপড় পরিবর্তন করাবেন মোটকথা শিশুর যে কোনো কাজই আপনি করে দেবেন; তখন তাকে বলবেন, আব্বু! আমাকে 'জাযাকাল্লা' বলো। এভাবে সে বুঝে নেবে, আমাকে এই এই ক্ষেত্রে 'জাযাকাল্লাহ' বলতে হবে। এই সুন্দর গুণটি আজীবনের জন্য তার জীবনে চলে আসবে; যা তার জীবনকে আরো সুন্দর করে তুলবে।
আরেকটি বিষয় শিশুকে শিখিয়ে দিবেন, আব্বু! সকল ভালো কাজের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম কাজ হলো, কাউকে কষ্ট না দেওয়া। তাই কখনো কাউকে কষ্ট দেবে না। শিশুরা স্বাধীন প্রকৃতির হয়। তাই খুব দ্রুত বন্ধু বানিয়ে ফেলতে পারে।
কিন্তু আপনি যখন তাকে ছোটবেলা থেকেই শেখাবেন, কাউকে কোনো দিন কষ্ট দেবে না, কারো সাথে ঝগড়া করবে না। এতে করে তার ভেতরে সুন্দর মানসিকতা সৃষ্টি হবে। এক সময় নিজ থেকেই এই ভাবনা সৃষ্টি হবে, আমি কারো মনে দুঃখ দিব না। এতে আল্লাহ আমার উপর নারাজ হবেন। মনে রাখবেন, 'দিলই সবকিছুর মূল'। মনে আল্লাহর ভয় এবং ভালো কিছুর বীজ গজাতে পারলে জীবন সার্থক ও সুন্দর হয়ে যাবে। ইনশাআল্লাহ।
অন্যের মনে আঘাত দেয়া এটাতো বর্তমান সময়ে সবচেয়ে সাধারণ বিষয় মনে করা হয়। অথচ আল্লাহর নিকট মারাত্মক অন্যায় এবং বড় গুনাহ হলো, কোনো মানুষের মনে আঘাত দেয়া। তাই কোনো উর্দু কবি বলেন,
'তুমি মন্দির ভেঙ্গে ফেলো, মসজিদ ভেঙ্গে ফেলো, তোমার মনে যা আসে সব ভেঙ্গে ফেলো।
কিন্তু মানুষের মন ভেঙ্গো না। কারণ, এই দিল দিল-বানানে-ওয়ালার স্থান।'
সুতরাং আপনি যখন শিশুকে এই কথা বুঝাবেন, দিল আল্লাহর ঘর। এতে করে ওই শিশু তার নিজের চরিত্রকে সুন্দর করতে সচেষ্ট হবে, এবং কাউকে কষ্ট দেবে না।
📄 শিশুকে ভুলের উপর অনুতপ্ত হওয়ার শিক্ষা দেওয়া
যদি কখনো আপনার শিশু সন্তান কারো সাথে ঝগড়া করে বসে, এমতাবস্থায় আপনি দেখবেন, মূলত অন্যায় কার? যদি কখনো দেখেন, আপনার শিশুটিই অন্যায় করেছে। তখন তাকে কাছে টেনে খুব আদর সোহাগ করে বুঝান, আব্বু! ভুলের জন্য এখন ক্ষমা চেয়ে নাও। তাহলে কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার সামনে তোমার এই ভুল আর তোলা হবে না। তাকে ক্ষমা চাওয়ার পদ্ধতিও বলে দেবেন। ক্ষমা চাইতে লজ্জা হয়, এ বিষয়টিও তার থেকে মুছে দেবেন। যাতে নিঃসংকোচে নিজের ভুলের জন্য মাফ চেয়ে নেয়ার ব্যাপারে অভ্যস্ত হয়ে যায়।
ভুল ছোটরাও করতে পারে, আবার বড়দের থেকেও হতে পারে। ছোটদেরকে বুঝাবেন, আব্বু! যদি কখনো এমন অন্যায় হয়ে যায়। যা কোনো বান্দা হিসেবে করা ঠিক নয়। তখন তৎক্ষণাৎ ওই ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নেবে। এমনিভাবে কোনো মানুষের কাছে অন্যায় করে ফেললে, তার থেকেও মাফ চেয়ে নিতে হবে। নিজের ভাই বোনদের সাথেও যদি খারাপ আচরণ করে ফেলে, অথবা ঝগড়া করে বা তাদের মনে কোনো কষ্ট দেয়, তবুও তাদের থেকে মাফ চেয়ে নেবে। অতঃপর শিশুকে বলতে হবে, এখন আল্লাহর কাছেও মাফ চেয়ে নাও। যাতে আল্লাহ তোমার উপর নারাজ না থাকেন। সর্বদা আল্লাহর অসন্তুষ্টির বিষয়টি তার মনে জাগিয়ে দিতে হবে, ভালো কাজ করলে আল্লাহ খুশি হন আর অন্যায় কাজে তিনি নারাজ হন। অবস্থা যেন এমন হয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির বিষয়টি তার জীবনের মূল (লক্ষ-উদ্দেশ্য) হয়ে থাকে। এটা শিশুর লালন-পালনের জন্য খুবই জরুরি বিষয়।
📄 শিশুর কাছে বড়দের থেকে পাওয়ার মতো কিছু আশা না করা
তবে তার অর্থ কিন্তু কখনোই এই নয় যে, শিশুকে প্রথম থেকেই বন্দিশালায় আবদ্ধ করে রাখবেন। যাতে করে সে আর খেলা-ধুলা ও আনন্দ-উল্লাসের অবকাশও না পায়। শিশুর খেলার বয়সই তো এখন। সুতরাং বৈধ যতো রকমের খেলা-ধুলা হতে পারে, আনন্দ ও বিনোদনের যত জায়েজ পদ্ধতি আছে, তাকে করতে দেবেন। দৌড়া-দৌড়ি ও লাফা-লাফি করতে যথেষ্ট ব্যবস্থা করে দেবেন। এতে তার শারিরীক গঠনও বৃদ্ধি পাবে, এবং জ্ঞান-বুদ্ধিও প্রখর হবে।
শিশু তো শিশুই। খেলাধুলা যদি না করে, তাহলে তার শারীরিক গঠন বৃদ্ধি ও মানবিক স্বভাব উন্নত হবে কী ভাবে? তাই তার মতো করে তাকে বেড়ে উঠতে দিতে হবে।
আরেকটি ব্যাপার হলো। শিশুর থেকে অতটুকুই পাওয়ার আশা রাখবেন; যতটুকু একটি শিশু থেকে পাওয়া সম্ভব। তাদের থেকে বড়দের মতো বড় কিছু আশা করবেন না। বাচ্চারা কাঁচা হয় (যেমন কাঁচা আম), অপরিপক্ক হয়। তাই এখনকার কথা তারা এখনই ভুলে যায়। এই তার শিশুসুলভ কাঁচা আচরণ। নিষ্পাপ কথা কখনো কখনো ক্ষমাও করে দিতে হবে। কিছু সময়ে দেখেও না দেখার ভান করতে হবে। কেমন যেন তার এই ভুলটি আপনি দেখেন-ই-নি। এরকম লালন-পালন তার বেড়ে উঠার জন্য ও তার প্রতিভা বিকাশের জন্য খুবই সহায়ক হবে।