📄 ইমাম বাকের রহ. নিজের সন্তানকে নসীহত
আগের যুগের মনীষীগণ তাদের সন্তানদের ব্যাপারে খুব বুঝতেন, এবং বারবার নসীহত করতেন, কাকে বন্ধু বানাবে এবং কার সঙ্গ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবে।
এ ব্যাপারে হযরত জাফর সাদেক রহ. বলেন, আমার পিতা আমাদের পাঁচটি নসীহত করেছেন। আব্বা বলেছেন, বেটা! পাঁচ ধরনের লোকদেরকে বন্ধু বানাবে না। রাস্তায় চলার সময়ও এরকম লোকদের সাথে চলবে না। তাদের আগে পরে চলবে। তারা খুবই খারাপ প্রকৃতির হয়ে থাকে। আমি বললাম, আব্বাজান! ঐ পাঁচ ধরনের লোক কারা? তিনি বললেন,
এক. মিথ্যুককে বন্ধু বানাবে না। আমি বললাম, কেন? তিনি বললেন, এই কারণে যে, এই মিথ্যুক দূরকে কাছে এনে দেখাবে। আর কাছের জিনিসকে দূরে দেখাবে। এতে সে তোমাকে ধোঁকায় ফেলবে। আমি বললাম, কথা ঠিক।
দুই. কোনো কৃপণকে বন্ধু বানাবে না। আমি বললাম, কেন? তিনি বললেন, সে তোমাকে ওই সময় ভুলে যাবে, যখন তুমি তার প্রয়োজন বোধ করবে। সে তোমাকে তখন ধোঁকা দিয়ে চলে যাবে। তাই তাকেও বন্ধু বানাবে না।
তিন. কোনো ফাসেক বা পাপাচারী যে আল্লাহর হুকুমকে কোনো পরওয়া করে না, এরকম লোককে বন্ধু বানাবে না। আমি বললাম, এর কি কারণ? তিনি বললেন, সে তোমাকে এক রুটির বিনিময়ে বিক্রি করে ফেলবে। বরং এক রুটির কমেও বিক্রি করে ফেলতে পারে। আমি বললাম, আব্বাজান! এক রুটির বিনিময়ে বিক্রি করার কথা তো বুঝলাম কিন্তু এক রুটির কমে কিভাবে বিক্রি করবে? তিনি জবাব দিলেন, বেটা সে শুধু এক রুটির আশায় তোমায় বিক্রি করে দিবে। এক্ষেত্রে তোমাকে সে বুঝতেও দিবে না। অর্থাৎ ফাসেক বা পাপাচারীকে বিশ্বাস করার কোনো উপায় নেই। কারণ, যে স্বয়ং আল্লাহ তাআলার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে, সে বান্দার সাথে কিভাবে বিশ্বাস বজায় রাখবে?
চার. বেওকুফদের সাথে বন্ধুত্ব করবে না। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তার কারণ? তিনি উত্তর দিলেন, সে তোমাকে উপকার করার চেষ্টা করতে গিয়ে তোমার ক্ষতি করে বসবে।
পাঁচ. আত্মীয়তার সম্পর্ক যারা ছিন্ন করে এরকম অকৃতজ্ঞ লোকদের সাথে বন্ধুত্ব করবে না। কারণ, এরকম অকৃতজ্ঞ লোকেরা শেষ পর্যন্ত অকৃতজ্ঞই থেকে যায়।
এরকমভাবেই আগেকার মনীষীগণ নিজেদের সন্তানদের নসীহত করতেন।
📄 শিশুকে সালাম ও শুকরিয়া আদায়ের অভ্যাস করানো
ছোট বাচ্চাদের সালামের অভ্যাস করাবেন। তাদেরকে বলবেন, আম্মু! অন্য কাউকে দেখলে সালাম করতে হয়। সালামের শব্দগুলো তাকে শুদ্ধ করে শিখিয়ে দিবেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
أَفْشُوْا السَّلَامَ بَيْنَكُمْ
তোমরা পরস্পরে খুব বেশি সালাম আদান প্রদান করো।
তাই আমাদের উচিত বাচ্চাদের বেশি বেশি সালামের অভ্যাস করানো। এতে তার মনে প্রফুল্লতা সৃষ্টি হবে। তার যে কোনো (depression) মনমরা ভাব দূর হয়ে যাবে। তখন অন্য কারো সাক্ষাতে আর ভীতু হবে না। তার মন থেকে মাখলুকের প্রতি অহেতুক ভয় দূর হয়ে যাবে। সাহসিকতা পয়দা হবে। নির্বুদ্ধিতা ও গুমরিয়ে থাকার মানসিকতা দূর হবে।
এমনিভাবে শিশুকে অন্যের শুকরিয়া আদায়ের অভ্যাস করাবেন। ছোট থাকতেই যখন কিছুটা বুঝার মতো হবে, তখন থেকে বাচ্চাকে এই শিক্ষা দিতে হবে যে, কেউ তোমাকে কিছু দিলে, কেউ তোমার সাথে ভালো ব্যবহার করলে বা তোমার কোনো কাজে সাহায্য করলে তোমার কর্তব্য হলো, সাথে সাথে তার শুকরিয়া জ্ঞাপন করা।
এভাবে মানুষের শুকরিয়া আদায় করতে থাকলে এক সময় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করাও সে শিখে যাবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَنْ لَا يَشْكُرُ النَّاسَ لَمْ يَشْكُرُ اللَّهَ
'যে মানুষের শুকরিয়া আদায় করে না। সে মহান আল্লাহ তাআলারও শুকরিয়া আদায় করে না।' -জামে তিরমিযী : ৪/২৯৯ (১৯৫৪
সুতরাং এই গুণটি শিশুদেরকে শেখাতে হবে। আশ্চর্যের কথা হলো, যেখানে শুকরিয়া আদায়ের ব্যাপারে আমাদেরকে এত জোর করে বলা হলো, সেখানে আজ কোন এমন বাবা-মা পাওয়া যাবে, যিনি তার সন্তানকে এই বিষয়টি শিক্ষা দেন?
📄 একটি শিক্ষণীয় ঘটনা
‘জাযাকুমুল্লাহ' অথবা 'জাযাকাল্লাহু খায়রান' শুকরিয়া আদায়ের এই শব্দগুলো শিশুকে শিক্ষা দিবেন। যাতে করে শিশু নবীজির সুন্নত অনুযায়ী শব্দগুলো শিখে ফেলে।
আফসোস আজকে এই সুন্দর শিক্ষাটি আমরা ভুলে গিয়েছি আর অন্য ধর্মের লোকজন এই শিক্ষা নিয়ে সভ্য জাতি হিসেবে আজ পরিচিতি লাভ করছে।
সম্ভবত ১৯৯৭ সালের ঘটনা, আমি প্যারিস থেকে নিউইয়র্কে যাচ্ছিলাম। বিমানের যে সিটে আমি বসা ছিলাম, তার পাশের দুই সিট খালি। আল্লাহ পাকের ইচ্ছা; হয়তো এটা আমার জন্য পরীক্ষা ছিল। কিছুক্ষণ পর ফ্রান্সের এক যুবতী মেয়ে তার শিশু সন্তানকে নিয়ে আমার পাশের সিটে এসে বসল। এক সিটে মা। আরেক সিটে তার ছোট্ট মেয়ে। অন্য সিটে আমি।
আলহামদুলিল্লাহ, সফরে আমি একটি অভ্যাস করে নিয়েছি, বিশেষ করে বিমানের সফরে; সাথে অন্তত একটি কিতাব থাকবেই। আর এই কিতাব পড়ার ব্যস্ততায় এদিক সেদিক তাকানোর একেবারেই সময় হয় না। এভাবে সুন্দর মতো সময়টা পার হয়ে যায়। এবারও তাই করলাম। আমি আমার কিতাব পড়তে লেগে গেলাম। কিছুক্ষণ পর এয়ার হোসটেস এসে বলল, স্যার! খানা উপস্থিত। আমি খানা খাব না বলে তাকে জানিয়ে দিলাম। কারণ, প্যারিসের খানার ব্যাপারে তো আমার জানা নেই। তাদের খানা হালাল-হারাম হওয়ার ব্যাপারে তো যথেষ্ট সন্দেহ থাকে। তাই এরকম সফরে হয়তো সাথে করে কিছু খানা নিয়ে উঠি। অথবা না খেয়ে এভাবেই কাটিয়ে দেই। পরে গন্তব্যে পৌছে খানা খেয়ে নেই।
যাই হোক, আমি খানা ফিরিয়ে দিলাম। অপর দিকে ওই ভদ্রমহিলা তার জন্য এবং তার সন্তানের জন্য খানা রেখে দিলেন। কিছুক্ষণ পরে লক্ষ করলাম, সে তার শিশুমেয়েকে খানা খাওয়াচ্ছে এবং নিজেও খাচ্ছে। সে গায়রে মাহরাম মহিলা ছিল। তার দিকে তাকানো তো দূরের কথা, তার কণ্ঠ শোনাও শরীয়তে নিষেধ। কিন্তু যেহেতু তিনি পাশের সিটের যাত্রী ছিলেন, এক্ষেত্রে কোনো মানুষ যদি ওদিকে খেয়াল নাও করে, তবুও এটা অন্তত বুঝে আসে যে, পাশে কিছু হচ্ছে। আমি কিতাব পড়ছিলাম। খেয়াল না করলেও তাদের নড়াচড়ার দ্বারা বুঝতে পারছিলাম, তারা কিছু একটা করছে।
ওই ভদ্রমহিলা তার শিশু সন্তানের মুখে খাবারের লোকমা তুলে দিচ্ছিলেন আর শিশুটি খেয়ে নিলে তিনি বলছিলেন, (say, thank you) বলো, ধন্যবাদ। তার আদেশ মতো শিশুটি বলছিল, (thank you) ধন্যবাদ। তারপর দ্বিতীয়বার আবার যখন মুখে খাবার তুলে দিলেন, তখনও বললেন, say, thank you. বাচ্চাটিও তার মায়ের কথা মতো thank you বলতে লাগল। এভাবে আমি লক্ষ করলাম, প্রতিবারই মা তার বাচ্চাকে খাবার খাওয়াচ্ছে আর তাকে শুকরিয়া জ্ঞাপন শেখাচ্ছে। আমার ধারণা মতে খাওয়ানোর ওই স্বল্প সময়টিতে ফ্রান্সের ওই মহিলাটি তার বাচ্চাকে ৩৬ বারের মতো thank you বলা শিখিয়েছে। আমি নিশ্চিত ছিলাম, এত বারের (thank you) তালীমে শিশুটির মৃত্যু পর্যন্ত শুকরিয়া আদায়ের শিক্ষা হয়ে যাবে।
অপর দিকে আমি ভেতরে ভেতরে এই ভেবে অস্থির হচ্ছিলাম, হায়! এই সুন্দর স্বভাবটি তো ছিল মুসলমানদের। আজ মুসলমানরা তাদের সন্তানদের শুকরিয়া আদায়ের এই সুন্দর চরিত্রটি শেখানো ছেড়ে দিয়েছে। অপরদিকে কাফেররা তাদের সন্তানদেরকে কত গুরুত্ব দিয়ে তা শিক্ষা দিচ্ছে।
📄 'অন্যকে কষ্ট দেয়া' থেকে শিশুকে বিরত রাখা
মোটকথা, আমাদের উচিৎ সন্তানকে ছোটকাল থেকেই অন্যের উপকারের শুকরিয়া আদায় করার এই গুণটি শিক্ষা দেয়া, এমনিভাবে সালাম করার অভ্যাসও তাকে শিক্ষা দেব। এতে করে এই অভ্যাসের উপরই সে গড়ে উঠবে। ছোটকালে মা যদি এই অভ্যাসগুলো শিখিয়ে দেন, তবে বড় হয়েও সে বাবা-মা ও অন্যদের শুকরিয়া আদায় করবে। পাশাপাশি আল্লাহ তাআলারও শুকরিয়া আদায় করবে। অনেকে তো এমন আছে, বড় হয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করাও শেখে না। এই জুলুম বাবা-মা ছোটকালে তার উপর করেছে। তাই এখন সে না-শোকর অহংকারী হয়ে গেছে। এই জন্য যখনই শিশুকে কোনো জিনিস দেবেন, শিশুকে কোনো জিনিস খাওয়াবেন, তাকে যখন কাপড় পড়াবেন, কাপড় পরিবর্তন করাবেন মোটকথা শিশুর যে কোনো কাজই আপনি করে দেবেন; তখন তাকে বলবেন, আব্বু! আমাকে 'জাযাকাল্লা' বলো। এভাবে সে বুঝে নেবে, আমাকে এই এই ক্ষেত্রে 'জাযাকাল্লাহ' বলতে হবে। এই সুন্দর গুণটি আজীবনের জন্য তার জীবনে চলে আসবে; যা তার জীবনকে আরো সুন্দর করে তুলবে।
আরেকটি বিষয় শিশুকে শিখিয়ে দিবেন, আব্বু! সকল ভালো কাজের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম কাজ হলো, কাউকে কষ্ট না দেওয়া। তাই কখনো কাউকে কষ্ট দেবে না। শিশুরা স্বাধীন প্রকৃতির হয়। তাই খুব দ্রুত বন্ধু বানিয়ে ফেলতে পারে।
কিন্তু আপনি যখন তাকে ছোটবেলা থেকেই শেখাবেন, কাউকে কোনো দিন কষ্ট দেবে না, কারো সাথে ঝগড়া করবে না। এতে করে তার ভেতরে সুন্দর মানসিকতা সৃষ্টি হবে। এক সময় নিজ থেকেই এই ভাবনা সৃষ্টি হবে, আমি কারো মনে দুঃখ দিব না। এতে আল্লাহ আমার উপর নারাজ হবেন। মনে রাখবেন, 'দিলই সবকিছুর মূল'। মনে আল্লাহর ভয় এবং ভালো কিছুর বীজ গজাতে পারলে জীবন সার্থক ও সুন্দর হয়ে যাবে। ইনশাআল্লাহ।
অন্যের মনে আঘাত দেয়া এটাতো বর্তমান সময়ে সবচেয়ে সাধারণ বিষয় মনে করা হয়। অথচ আল্লাহর নিকট মারাত্মক অন্যায় এবং বড় গুনাহ হলো, কোনো মানুষের মনে আঘাত দেয়া। তাই কোনো উর্দু কবি বলেন,
'তুমি মন্দির ভেঙ্গে ফেলো, মসজিদ ভেঙ্গে ফেলো, তোমার মনে যা আসে সব ভেঙ্গে ফেলো।
কিন্তু মানুষের মন ভেঙ্গো না। কারণ, এই দিল দিল-বানানে-ওয়ালার স্থান।'
সুতরাং আপনি যখন শিশুকে এই কথা বুঝাবেন, দিল আল্লাহর ঘর। এতে করে ওই শিশু তার নিজের চরিত্রকে সুন্দর করতে সচেষ্ট হবে, এবং কাউকে কষ্ট দেবে না।