📄 'আইনস্টাইন' বিজ্ঞানী কীভাবে হলেন
অপরদিকে কিছু শিশুকে এমনও দেখা যায়, তারা জন্মগতভাবে ছোটকালে তেমন চঞ্চল হয় না এবং অন্য শিশুদের তুলনায় কিছুটা কম মেধা সম্পন্ন মনে হয়। 'কম মেধা সম্পন্ন' কথাটির অর্থ এখানে বুঝতে হবে, যেমন : কিছু শিশু তো আছে যারা extraordinary অর্থাৎ অস্বাভাবিক ও প্রখর মেধার অধিকারী হয়। আর কিছু শিশু আছে যাদের মেধার প্রখরতা বা জ্ঞান পাকা হতে কিছু সময় লাগে। প্রথম দিকে তাদের মেধা কিছুটা কম বা মন্থর গতির হলেও, তাদেরকে এই অভয় দিতে হবে, তুমি তো অনেক বুঝ। অথবা তাকে বুঝাতে হবে, তোমার বুঝশক্তি ভালো। এভাবে তার খেলার বয়সটাকে অভয় দিয়ে এবং সাহস যুগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। শিশু যদি নির্বুদ্ধিতার পরিচয়ও দেয়, তবুও হাল ছাড়া যাবে না। হতাশ হলে চলবে না। নিজে একটু শ্রম দিতে হবে। ইনশাআল্লাহ, বড় হবার সাথে সাথে তার মেধাও বৃদ্ধি পেতে থাকবে।
সাইন্সের (বিজ্ঞান বিষয়ক) এক বইয়ে পাওয়া যায়, আইনস্টাইন দুনিয়ার এত বড় বিজ্ঞানী হবার ইতিহাস। তিনি যখন ছোট শিশু ছিলেন, সবেমাত্র স্কুলে যাওয়া-আসা শুরু করেছেন। এক সময় দেখা গেল, স্কুলের ছাত্ররা অন্য সকল বিষয়ের সাথে অংকেও খুব ভালো করছে। কিন্তু আইনস্টাইন অংকে দুর্বল। তিনি অংক বুঝেন না। এমনকি যাতায়াতের সময় বাস কন্ট্রাক্টরের সাথে প্রায় দিনই টাকার হিসাব নিয়ে বেধে যেত। আর পরে বুঝিয়ে দিলে দেখা যেত বেচারা আইনস্টাইনই হিসাব ভুল করেছেন।
একদিন বাস কন্ট্রাক্টর আইনস্টাইনকে বলল, তুমি হিসাব বুঝো না, তোমার জীবনে তো দেখছি বড় দুর্গতি রয়েছে! আইনস্টাইনের মনে বাস কন্ট্রাক্টরের এই কথাটি বড় ধাক্কা দিল। ভাবলেন, অংক না-বুঝার কারণে জীবনভর আমাকে ধিক্কার শুনতে হবে? সুতরাং তিনি অংক শিখতে মেহনত শুরু করলেন। ফিজিকস নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন। এক পর্যায়ে (theory of realitivity) আপেক্ষিক তত্ত্ব আবিষ্কার করলেন। আর বর্তমানে দুনিয়ার সকল বিজ্ঞানীরা তার এই থিযোরির কারণে তাকে এই পরিমাণ সম্মান করেন, যেমন কোনো ধর্মের উম্মতগণ তাদের নবীকে সম্মান করে থাকে। যদিও এই উদাহারণটি একজন ধর্মহীন কাফের ব্যক্তির জীবনের কিন্তু আমাদের জন্য চিন্তা করার কিছু বিষয় এখানে রয়েছে।
শিশু প্রথমে কিছুটা কম মেধার হলেও সারা জীবনই সে দুর্বল এবং মেধাহীন থাকবে বিষয়টি এমন নয়।
সুতরাং আপনি যদি মনে করেন, আপনার শিশু সন্তানটি খুব মেধাবী, তাহলে প্রথম থেকেই তার শিক্ষার জন্য বিশেষ কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে শিশুকে যোগ্য করে গড়ে তোলা যায়। আমরা এমন অনেক দেখেছি, মানুষ তার দৃষ্টিহীন সন্তানকে এমন প্রশিক্ষণ দেয় যে, সে অনায়াসে বই-পুস্তক ও পত্রিকা পড়তে পারে।
অনেক বাবা-মা তাদের অন্ধ সন্তানকে বড় আলেম, হাফেজ ও ক্বারী বানিয়ে ফেলেন।
মোটকথা সন্তানকে সর্বাবস্থায় শিক্ষা দিক্ষা দিতে থাকবেন। সুন্দরের প্রশিক্ষণ করাতে থাকবেন। আর যদি বাচ্চা প্রতিবন্ধি হয় (আল্লাহ সবাইকে হেফাজত করেন, মাফ করেন) তবে এমতাবস্থায় শিশুকে (ignore) অবহেলা করবেন না। আপনার উপর ফরজ হলো, এই শিশুকে ইলম শিখিয়ে দেওয়া। তার ভেতরের যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে দেয়া। এমতাবস্থায় তার দুনিয়ায় আসা এবং তার জীবনটাকে চালিয়ে নেয়া তার জন্য সহজ হয়ে যাবে। পৃথিবীতে এমন অনেক অসহায় ও একেবারে প্রতিবন্ধি (handicapped) লোকদেরও দেখেছি, তারা নাম করা বিজনেসম্যান হয়েছে। হুইল চেয়ারে বসে লক্ষ কোটি টাকার ব্যবসায়ী লেনদেন করে যাচ্ছে।
📄 শিশুকে দুষ্ট ও খারাপসঙ্গ থেকে বিরত রাখা
সুতরাং এরকম একজন যুবক, যে নাকি একেবারেই প্রতিবন্ধি তবে শিক্ষিত। সে যদি প্রতিবন্ধি হওয়া সত্ত্বেও এত বড় ব্যবসায়ী হতে পারে, এমন সুন্দর চরিত্রের মানুষ হতে পারে এবং যোগ্য আলেমে দ্বীন হতে পারে। তবে আমি কেন আমার সন্তানের বেলায় নিরাশ হব? তাই হতাশ হওয়া যাবে না। একটু কষ্ট করতে হবে। তার পেছনে একটু খাটা-খাটনি করতে হবে। আর এই খাটুনির বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা পিতা-মাতাকে জান্নাত দিবেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালোবাসা দান করবেন।
তাই পিতা-মাতাকে বলব, এটাকে বোঝা মনে করবেন না, বরং ইহা আপনার উপর যিম্মাদারী। জান্নাত লাভের একটি উপায়।
আরেকটি বিষয় হলো, শিশুকে খারাপসঙ্গ থেকে অবশ্যই বাঁচিয়ে রাখবেন। এ ব্যাপারে কোনোরকম শিথিলতা প্রদর্শন করবেন না। মনে রাখবেন, শিশুরা তাদের সহপাঠি ও খেলার সাথী থেকে এমন গান্ধা আচরণ ও পচা কথাও শেখে, যা তার বাবা-মা কোনোদিন কল্পনাও করতে পারে না, এবং কখনো আশাও করেন না। বিশেষ করে স্মার্ট ফোনের দ্বারা শিশুরা খারাপ ও লজ্জাকর বিষয়গুলোর সাথে সহজে পরিচয় হয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে নষ্ট ও দুষ্ট সাথীই তার জীবননাশের মূল কারণ। একজন আরেকজনের কাছে এগুলো শেয়ার করে। আর একে একে নিজের অজান্তেই নিজেদের জীবনচরিত্র নিজে ধ্বংস করে। তাই পিতা-মাতা উভয়ের উচিত শিশু সন্তানের বন্ধুদের প্রতিও খেয়াল রাখা।
ক্লাসে কোন ধরনের শিশুদের সাথে বেশি উঠা-বসা করে এ ব্যাপারে টিচার বা উস্তাদের কাছ থেকে খোঁজ নেয়া। আর টিচারকেও অনুরোধ করে বলা, যেন তার ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখেন।
শিশুর সঙ্গ যদি ভালো হয়, তবে মনে রাখবেন, যেন তার জীবনের নৌকা নদীর তীরে পৌঁছে দিয়েছেন। আর যদি তার সঙ্গ খারাপ পড়ে যায়, দুষ্ট ও খারাপ ছেলেরা তার বন্ধু হয়ে যায়, তবে তার নৌকা সাগরের মাঝে ডুবিয়ে দেয়ার সমতুল্য হবে।
এ কথা স্মরণ রাখবেন, বন্ধুই জীবন গড়ে; আবার বন্ধুই জীবন ধ্বংস করে।
তাইতো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
الرَّجِيلُ عَلَى دِيْنِ خَلِيْلِهِ فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ
মানুষ তার বন্ধুর আদর্শ গ্রহণ করে। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকে যেন ভেবে দেখে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে? -জামে তিরমিযী: ৪/৫০৯ (২৩৭৮)
ছেলে বড় হয়েছে। মেয়ে একটু লম্বা হয়ে গেছে; এখন চৌকান্না হয়ে যান, এবং সর্বদা লক্ষ রাখবেন, আমার সন্তান কাদের সাথে উঠা-বসা করে? যাদের সাথে চলাফেরা করে, তারা কী নামাযী? তারা কি ভালো ঘরের সন্তান? তাদের ঘরের লোকজন কী পর্দা রক্ষা করে? বা তারা কি কোনো গুনাহে লিপ্ত? এই সবকিছু আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ, হয়তো আগামীকাল আপনার ছেলে-মেয়েও তাদের মতো চলতে শুরু করবে। তাদের মতো অভিশপ্ত জীবন নিয়ে বাঁচার দুঃসপ্ন দেখবে।
তাই আমরা যারা বাবা-মা হয়েছি। আমাদের এক নাম্বার এবং প্রধান দায়িত্ব হলো, সন্তানের প্রতি বিশেষ নজর রাখা এবং তাদেরকে সময় দেয়া।
📄 ইমাম বাকের রহ. নিজের সন্তানকে নসীহত
আগের যুগের মনীষীগণ তাদের সন্তানদের ব্যাপারে খুব বুঝতেন, এবং বারবার নসীহত করতেন, কাকে বন্ধু বানাবে এবং কার সঙ্গ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবে।
এ ব্যাপারে হযরত জাফর সাদেক রহ. বলেন, আমার পিতা আমাদের পাঁচটি নসীহত করেছেন। আব্বা বলেছেন, বেটা! পাঁচ ধরনের লোকদেরকে বন্ধু বানাবে না। রাস্তায় চলার সময়ও এরকম লোকদের সাথে চলবে না। তাদের আগে পরে চলবে। তারা খুবই খারাপ প্রকৃতির হয়ে থাকে। আমি বললাম, আব্বাজান! ঐ পাঁচ ধরনের লোক কারা? তিনি বললেন,
এক. মিথ্যুককে বন্ধু বানাবে না। আমি বললাম, কেন? তিনি বললেন, এই কারণে যে, এই মিথ্যুক দূরকে কাছে এনে দেখাবে। আর কাছের জিনিসকে দূরে দেখাবে। এতে সে তোমাকে ধোঁকায় ফেলবে। আমি বললাম, কথা ঠিক।
দুই. কোনো কৃপণকে বন্ধু বানাবে না। আমি বললাম, কেন? তিনি বললেন, সে তোমাকে ওই সময় ভুলে যাবে, যখন তুমি তার প্রয়োজন বোধ করবে। সে তোমাকে তখন ধোঁকা দিয়ে চলে যাবে। তাই তাকেও বন্ধু বানাবে না।
তিন. কোনো ফাসেক বা পাপাচারী যে আল্লাহর হুকুমকে কোনো পরওয়া করে না, এরকম লোককে বন্ধু বানাবে না। আমি বললাম, এর কি কারণ? তিনি বললেন, সে তোমাকে এক রুটির বিনিময়ে বিক্রি করে ফেলবে। বরং এক রুটির কমেও বিক্রি করে ফেলতে পারে। আমি বললাম, আব্বাজান! এক রুটির বিনিময়ে বিক্রি করার কথা তো বুঝলাম কিন্তু এক রুটির কমে কিভাবে বিক্রি করবে? তিনি জবাব দিলেন, বেটা সে শুধু এক রুটির আশায় তোমায় বিক্রি করে দিবে। এক্ষেত্রে তোমাকে সে বুঝতেও দিবে না। অর্থাৎ ফাসেক বা পাপাচারীকে বিশ্বাস করার কোনো উপায় নেই। কারণ, যে স্বয়ং আল্লাহ তাআলার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে, সে বান্দার সাথে কিভাবে বিশ্বাস বজায় রাখবে?
চার. বেওকুফদের সাথে বন্ধুত্ব করবে না। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তার কারণ? তিনি উত্তর দিলেন, সে তোমাকে উপকার করার চেষ্টা করতে গিয়ে তোমার ক্ষতি করে বসবে।
পাঁচ. আত্মীয়তার সম্পর্ক যারা ছিন্ন করে এরকম অকৃতজ্ঞ লোকদের সাথে বন্ধুত্ব করবে না। কারণ, এরকম অকৃতজ্ঞ লোকেরা শেষ পর্যন্ত অকৃতজ্ঞই থেকে যায়।
এরকমভাবেই আগেকার মনীষীগণ নিজেদের সন্তানদের নসীহত করতেন।
📄 শিশুকে সালাম ও শুকরিয়া আদায়ের অভ্যাস করানো
ছোট বাচ্চাদের সালামের অভ্যাস করাবেন। তাদেরকে বলবেন, আম্মু! অন্য কাউকে দেখলে সালাম করতে হয়। সালামের শব্দগুলো তাকে শুদ্ধ করে শিখিয়ে দিবেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
أَفْشُوْا السَّلَامَ بَيْنَكُمْ
তোমরা পরস্পরে খুব বেশি সালাম আদান প্রদান করো।
তাই আমাদের উচিত বাচ্চাদের বেশি বেশি সালামের অভ্যাস করানো। এতে তার মনে প্রফুল্লতা সৃষ্টি হবে। তার যে কোনো (depression) মনমরা ভাব দূর হয়ে যাবে। তখন অন্য কারো সাক্ষাতে আর ভীতু হবে না। তার মন থেকে মাখলুকের প্রতি অহেতুক ভয় দূর হয়ে যাবে। সাহসিকতা পয়দা হবে। নির্বুদ্ধিতা ও গুমরিয়ে থাকার মানসিকতা দূর হবে।
এমনিভাবে শিশুকে অন্যের শুকরিয়া আদায়ের অভ্যাস করাবেন। ছোট থাকতেই যখন কিছুটা বুঝার মতো হবে, তখন থেকে বাচ্চাকে এই শিক্ষা দিতে হবে যে, কেউ তোমাকে কিছু দিলে, কেউ তোমার সাথে ভালো ব্যবহার করলে বা তোমার কোনো কাজে সাহায্য করলে তোমার কর্তব্য হলো, সাথে সাথে তার শুকরিয়া জ্ঞাপন করা।
এভাবে মানুষের শুকরিয়া আদায় করতে থাকলে এক সময় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করাও সে শিখে যাবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَنْ لَا يَشْكُرُ النَّاسَ لَمْ يَشْكُرُ اللَّهَ
'যে মানুষের শুকরিয়া আদায় করে না। সে মহান আল্লাহ তাআলারও শুকরিয়া আদায় করে না।' -জামে তিরমিযী : ৪/২৯৯ (১৯৫৪
সুতরাং এই গুণটি শিশুদেরকে শেখাতে হবে। আশ্চর্যের কথা হলো, যেখানে শুকরিয়া আদায়ের ব্যাপারে আমাদেরকে এত জোর করে বলা হলো, সেখানে আজ কোন এমন বাবা-মা পাওয়া যাবে, যিনি তার সন্তানকে এই বিষয়টি শিক্ষা দেন?