📘 সন্তান আল্লাহর ওলী হয় কীভাবে > 📄 শিশুদের ভালোবাসার বিনিময়ে জান্নাতের সুসংবাদ

📄 শিশুদের ভালোবাসার বিনিময়ে জান্নাতের সুসংবাদ


উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার নিকট একবার এক মা এল। সঙ্গে তার দু'টি সন্তানও ছিল। হযরত আয়েশা (রাযি.) তিনটি খেজুর ওই মায়ের হাতে দিলেন।

গুণবতী ওই মা কী করলেন দেখুন! দু'টি খেজুর দুই সন্তাকে দিলেন আর একটি নিজের হাতে রেখে দিলেন। এবার উভয় সন্তান নিজেদেরটা খেয়ে মায়ের হাতের দিকে আরেকটু পাওয়ার আশায় তাকিয়ে রইল। তাদের মা করলেন কী; হাতের খেজুরটিকে দুই টুকরা করে দুই সন্তানকে ভাগ করে দিলেন। শিশুরা এভাগও খেয়ে নিল। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাযিয়াল্লাহু আনহা ওই মায়ের ব্যবহার দেখে খুবই আশ্চর্য হলেন। মা তার শিশুদেরকে এতোই ভালোবাসেন যে, নিজের ভাগেরটুকুও সন্তানদের খাইয়ে দিলেন।

এরপর যখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে ফিরলেন, মা আয়েশা পুরো ঘটনা রাসূলকে শোনালেন। আল্লাহর রাসূল পুরো ঘটনাটি শুনে বললেন, আল্লাহ তাআলা ওই মহিলার জন্য জান্নাতকে ওয়াজিব করে দিয়েছেন। সুবহানাল্লাহ, জান্নাত লাভের কী সহজ উপায়। মা যখন শিশুকে এভাবে মুহব্বাত করবেন, তো বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা ওই মাকে জান্নাত দেবেন। এ জন্য সকল মায়ের উচিত হবে, শিশুদের সাথে কোমল সুন্দর ব্যবহার করা। স্মরণ রাখবেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা নম্রতার উপর যেরূপ রহমত নাজিল করেন, কঠোরতার উপর তেমন করেন না। সুতরাং সন্তানকে লালন-পালন করতে গিয়ে এই বিষয়টি অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে।

📘 সন্তান আল্লাহর ওলী হয় কীভাবে > 📄 তাওহীদ (একত্ববাদ) শিক্ষা দিবেন

📄 তাওহীদ (একত্ববাদ) শিক্ষা দিবেন


আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুর মনে ছোটবেলা থেকেই ঈমানের বীজ মজবুত করতে থাকবেন। একত্ববাদের শিক্ষা দৃঢ় করে দিবেন। শিশুর দিলে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল সৃষ্টি করে দিবেন। এটা মায়ের নিজের ক্ষমতায় থাকে যে, তিনি সন্তানকে এমন তারবিয়াত করবেন, যেন শিশু ভয় করলে একমাত্র আল্লাহকে ভয় করে। কোনো কিছুর প্রার্থনা করতে হলে আল্লাহর নিকটই সকল আরজি পেশ করে। ভালোবাসার বন্ধন; তাও আল্লাহর সাথেই জুড়বে। শিশুটি যেন হৃদয়ের গভীর ভালোবাসা দিয়ে আল্লাহ তাআলার সাথেই সম্পর্ক গড়তে পারে। আগের জামানার মায়েরা এ ব্যাপারে খুবই সজাগ থাকতেন।

📘 সন্তান আল্লাহর ওলী হয় কীভাবে > 📄 খাজা কুতুবুদ্দীন কাকি রহ.-এর মাতার তারবিয়াত

📄 খাজা কুতুবুদ্দীন কাকি রহ.-এর মাতার তারবিয়াত


ভারত উপমহাদেশের একজন বিখ্যাত বুযুর্গ ছিলেন। যাকে মোঘল বাদশাহদের পীর বলা হতো। তিনি ছিলেন খাজা কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকি রহ.। কুতুব মিনারের পাশেই তার কবর। এই মহান বুযুর্গের নামেই কুতুব মিনার আজ বিশ্বখ্যাত। সেখানে চিরশান্তিতে তিনি শায়িত আছেন।

যখন এই বুযুর্গের জন্ম হলো এবং একটু বুঝ-শক্তিও হলো। একসময় তাঁর বাবা-মা বসে বসে চিন্তা করতে লাগলেন, আমাদের সন্তানের সুন্দর তারবিয়াত কিভাবে হবে? এবং সে কিভাবে আল্লাহর খাঁটি ও প্রিয় পাত্র হবে? উভয়ে এ ব্যাপারে (Discuss) পরামর্শ করতে লাগলেন। পরামর্শের পর যা সিদ্ধান্ত হলো, তা পুরোপুরি বাস্তবায়নও করতে থাকেন। এরই ধারাবাহিকতায় একদিন বিবি সাহেব বললেন, আমার মাথায় একটি খেয়াল এসেছে, আমি কাল থেকেই তার সফল বাস্তবায়ন করব; যাতে আমাদের সন্তান আল্লাহর ওলী হতে পারে। স্বামী তা শুনে বললেন, ঠিক আছে। খুব ভালো হবে, তাই করো।

পরেরদিন ছেলে যখন মাদরাসায় চলে গেল। মা ছেলের অগোচরে খাবার তৈরি করে কোনো নিরাপদ জায়গায় লুকিয়ে রাখলেন। এবার ছেলে মাদরাসা থেকে ফিরে এল। এসেই চিৎকার দিয়ে বলল, আম্মু! আমার খুব খিদে পেয়েছে। আমাকে কিছু খেতে দাও।

মা তখন বললেন, বাবা! আমাকে খাবার আল্লাহ তাআলা দেন। তোমাকেও তিনিই দিবেন। তুমি আল্লাহর কাছে তোমার রুটি চেয়ে নাও।

ছোট শিশু কুতুবুদ্দীন জায়নামায বিছাল এবং দু'হাত তুলে বলতে লাগল, আয় আল্লাহ! আমি এইমাত্র মাদরাসা থেকে এলাম; খুবই ক্লান্ত। বড্ড ক্ষুদা পেয়েছে। বড্ড তিয়াস পেয়েছে। আল্লাহ! আমাকে রুটি দেন। পানিও দেন। আয় আল্লাহ! এগুলো আমাকে তাড়াতাড়ি দেন।

দুআ শেষ করে মাকে বলল, আম্মু এখন আমি কী করব? মা বললেন, বেটা! হয়তো আল্লাহ তাআলা তোমার জন্য খাবার পাঠিয়ে দিয়েছেন। তুমি ঘরে তালাশ করো পেয়ে যাবে। শিশু কুতুবুদ্দীন জায়নামাজ থেকে উঠলেন। ঘরে বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করলেন। মমতাময়ী মাও তাকে খোঁজার কাজে সাহায্য করলেন। একপর্যায়ে তিনি যখন খানার ভুলচি খুললেন, দেখলেন তাতে রান্না করা গরম গরম খাবার রাখা আছে। এটা দেখে তিনি খুব খুশি হলেন এবং খুব মজা করে খেতে লাগলেন। খেতে খেতে বললেন, আম্মু! প্রতিদিন কি আল্লাহই আমাকে খেতে দেন? মা বললেন, হ্যাঁ বেটা, প্রতিদিন আল্লাহ তাআলাই আমাদের রিযিক দেন।

এভাবে প্রতিদিন এই নিয়মেই চলতে লাগল। শিশু কুতুবুদ্দীন প্রতিদিন মাদরাসা থেকে আসেন। জায়নামায বিছিয়ে দুআ করেন এবং নির্দিষ্ট স্থান থেকে খানা পেয়ে যান। আর ওদিকে পূর্ব থেকেই মা খানা রান্না করে সেখানে রেখে দেন।

এভাবে বেস কিছুদিন চলতে থাকে। এক পর্যায়ে মা বিষয়টি বুঝতে পারেন যে, আল্লাহ তাআলার সম্পর্কে জানার আগ্রহ তার বাড়ছে এবং আল্লাহর প্রতি তার ভালোবাসা ও বিশ্বাস দিন দিন বেড়ে চলেছে। কখনো শিশু আম্মুকে জিজ্ঞাসা করে, আম্মু! আল্লাহ তাআলা সকল প্রাণীকে খাবার দেন? আম্মু! আল্লাহ তাআলা কত ভালো! আম্মু, আল্লাহ তাআলা প্রতিদিন খাবার দেন। তিনি অনেক মহান!

এভাবে শিশু কুতুবুদ্দীনের ঈমান দিন দিন বাড়তে লাগল। মাও খুশি মনে শিশুর শিক্ষার প্রতি পূর্ণ যত্ন নিতে লাগলেন। এভাবেই দীর্ঘদিন চলতে লাগল। একদিন শিশু কুতুবুদ্দীনের মা এক আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে গেলেন। বেড়াতে গিয়ে লম্বা সময় সেখানে কেটে গেল। এদিকে শিশু কুতুবুদ্দীনের মাদরাসা থেকে ফেরার সময়ও হয়ে এল। মা খুব পেরেশান হয়ে গেলেন। চিন্তায় তার কপাল বেয়ে ঘام ঝড়তে লাগল। তিনি ভাবতে লাগলেন, এখন কী হবে? আমার আদরের সন্তানতো সম্ভবত মাদরাসা থেকে ঘরে ফিরেছে। আমি তো তার খানা তৈরি করে রেখে আসিনি। সে যদি ঘরে ফিরে খানা না পায়, তাহলে তো আমার সর্বনাশ হয়ে যাবে। আমার এত দিনের মেহনত সব শেষ হয়ে যাবে। তিনি চিন্তায় অস্থির হয়ে গেলেন; এমনকি চোখে পানি এসে গেল। তিনি দ্রুত বাড়ির দিকে চলতে শুরু করলেন। চোখ দিয়ে পানি ঝরছে আর আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করছেন। আয় আল্লাহ! আমি কেবলমাত্র একটি গল্প সাজিয়ে ছিলাম, যাতে করে তার দিলে আপনার মুহাব্বত বসে যায়। আয় আল্লাহ! আমার ভুল হয়েছে। আমি খানা তৈরি করে রেখে আসিনি। আর এদিকে সময়ও ঠিক রাখতে পারিনি। আল্লাহ! আমার সন্তানের একীন-বিশ্বাসটুকু যেন নষ্ট না হয়। আল্লাহ! আমার মেহনত যেন বিনষ্ট না হয়।

সারা পথ কাঁদতে কাঁদতে আর আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করতে করতে যখন তিনি ঘরে পৌঁছলেন, দেখলেন, আদরের সন্তান খাটে ঘুমিয়ে রয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে আরামেই ঘুম দিয়েছে। মা এই সুযোগটাকে গনিমত মনে করলেন, তিনি সন্তান ঘুমিয়ে থাকতে থাকতে খানা তৈরি করে আগের জায়গায় লুকিয়ে রাখলেন। এবার ছেলের নিকট এসে স্বস্থির নিঃশ্বাস ছাড়লেন এবং সন্তানের গালে একটি আদরের চুমু খেলেন। চুমুর স্পর্শে সন্তান ঘুম থেকে জেগে গেল। মা সন্তানকে জড়িয়ে কোলে তুলে নিলেন। আর আদর দিয়ে বলতে লাগলেন, বাবা! তোমার হয়তো ভীষণ ক্ষুদা পেয়েছে। পিপাসাও লেগেছে। সেই কখন এসেছ। ওঠো, জায়নামায বিছিয়ে আল্লাহর কাছে রুটি চেয়ে নাও। শিশু কুতুবুদ্দীন হাসিমুখে মাকে উত্তর দিলেন, আম্মু! আমার ক্ষুদা লাগেনি। তিয়াসও পায়নি। মা বললেন, কেন? ছেলে বললেন, আম্মু! আমি মাদরাসা থেকে ফিরে এসে প্রতিদিনের মতো জায়নামায বিছিয়ে আল্লাহর কাছে আমার খানা চেয়েছি। আল্লাহর কাছে বলেছি, আয় আল্লাহ! আমি ভীষণ ক্ষুধার্ত এবং তৃষ্ণার্ত। ঘরে আজ আম্মুও নেই। আয় আল্লাহ, আমার খানা দেন।

আম্মু, আমি এই দুআ করে আমার কামরায় গিয়ে দেখি রুটি-হালুয়া রাখা রয়েছে। আমি ঐ রুটি-হালুয়া খেয়ে নিয়েছি। কিন্তু আম্মু জান! আজকের রুটিটা না খুব স্বাদের ছিল। এত মজা আর কোনো দিন পাইনি। মা ছেলের মুখ থেকে এই আশ্চর্য ঘটনা শুনে অবাক হলেন। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন। আসলে এই খাবার ছিল জান্নাতি খাবার।

এই ঘটনা থেকেই কুতুবুদ্দীন রহ.-এর নামের সঙ্গে কাকি নামটি প্রসিদ্ধ হয়ে গেল (কাক অর্থ গম, তার থেকে কাকি) খাজা কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকি রহ.।

এই শিশু বড় হয়ে এত বড়মাপের শায়েখ ও বুযুর্গ হলেন, তখনকার বড় বড় মোঘল বাদশাহরা তার মুরিদ ছিল। লক্ষ লক্ষ মানুষ তার হাতে বায়আত গ্রহণ করে নিজেদেরকে সাচ্চা মানুষ বানিয়ে ছিলেন। আল্লাহর ওলী হয়েছেন। সুবহানাল্লাহ, বাবা-মায়ের সুষ্ঠু লালন-পালনে সন্তান কত বড় হতে পারে এবং বিশ্ববাসীর জন্য কত বড় সৌভাগ্যের কারণ হয়ে যায়; তার একটি উত্তম উদাহরণ হলো খাজা কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকি রহ.-এর আম্মা। সুতরাং আপনিও আপনার সন্তানকে ছোটকাল থেকেই আল্লাহর ওলী হওয়ার আখলাক শিক্ষা দিবেন; যাতে ছোটকাল থেকেই শিশুর মনে ভালো ভালো গুণের বীজ জন্মাতে থাকে।

📘 সন্তান আল্লাহর ওলী হয় কীভাবে > 📄 সন্তানকে আল্লাহর ওলীদের ঘটনা শুনানো

📄 সন্তানকে আল্লাহর ওলীদের ঘটনা শুনানো


হাদীস শরীফে এসেছে, সন্তানদেরকে তিনটি জিনিস শিক্ষা দাও।
* আল্লাহর মুহাব্বাত শিক্ষা দাও।
* নবীর মুহাব্বাত এবং নবীর পরিবারের লোকদের প্রতি মুহব্বাত শিক্ষা দাও।
* কোরআনের মুহাব্বাত শিক্ষা দাও।

আর এর জন্য মা-ই হতে পারেন সর্বোৎকৃষ্ঠ শিক্ষক।

শিক্ষার পদ্ধতি এই হবে, আল্লাহর সাথে মুহাব্বাত সৃষ্টি হয় এরকম ঘটনাবলি শোনাতে হবে। নবীজীর জীবনের সুন্দর সুন্দর ঘটনাগুলো শোনাতে হবে এবং কোরআনকে ভালোবাসা ও কোরআন শিখা-শিখানোর বিষয়ে বিভিন্ন ঘটনা শোনাতে হবে। 'কাসাসুল কোরআন' বইতে সুন্দর সুন্দর ঘটনা রয়েছে। শিশুকে ঘুমানোর পূর্বে যখন গল্প শোনানোর প্রয়োজন হয়, তখন তা থেকে কিছু ঘটনা শোনানো যেতে পারে। এত করে এই শিশুটি যখন বড় হয়ে কোরআন পড়বে এবং ইসলাম সম্পর্কে জানবে; তো এরকম অনেক ঘটনা তার আগে থেকেই জানা থাকবে। নিজেকে আরো সুন্দর করে গড়তে সচেষ্ট থাকবে।

এমনিভাবে সাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুমের জীবনী থেকে ঘটনা শোনানো এবং আউলিয়ায়ে কেরামের বিভিন্ন ঘটনা শোনানো; যাতে করে ছোট থেকেই তার মনে ভালো হবার স্বাদ জাগে। নেক ও সৎ হয়ে জীবনযাপনের ইচ্ছা শৈশবকাল থেকেই দানা বাঁধে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00