📄 শিশুর মধ্যে সুন্দর অভ্যাস গড়ে তোলার ফলপ্রসূ পদ্ধতি
এভাবে অল্প সময়ের মধ্যে আপনি আপনার সন্তানকে খারাপ মানসিকতার হাত থেকে বাঁচালেন। ভালো কিছু তার মনে বসিয়ে দিলেন। যখন আপনি এমনটি করে ফেললেন, এখন শিশুকে আপনি নিজের কাছে ডেকে আনেন। শিশুটি যখন আপনার কাছে এসে দাঁড়াল, আপনি তার মাথায় আদর সোহাগ দিয়ে হাত বুলিয়ে দেন, মাথায় সোহাগ মাখা এই হাত বুলানোটা আজীবন শিশুর মনে দাগ কেটে থাকবে। অতঃপর শিশুর কপালে মিষ্টি একটি চুমু খেয়ে বলেন, আম্মু! আজকের দিনটি অনেক সুন্দর কেটেছে তোমার। আপনি যখন এরকম একটি অভ্যাস করে নিবেন, সন্তান এসে আপনাকে সালাম করবে। বাসায় ফেরার পর আপনি তার অবস্থা জিজ্ঞাসা করবেন এবং ভালো বিষয়গুলোকে সাপোর্ট করবেন। আর মন্দ বিষয়ের প্রতি ঘৃণা দেখাবেন। আবার পরক্ষণে ডেকে মাথায় আদরের হাত রাখবেন। এসব কিছু এমন একটা ছায়া হিসেবে কাজ করবে, যার ফলে শিশুটির মনে এ কথার বিশ্বাস যোগাবে, আমার উপর পিতা-মাতার ছায়া আছে। এই বয়সগুলোতে সন্তানের উপর আপনার হাত রহমতের ছায়ার ন্যায় হবে।
শিশুর protected feel (নিরাপদ আশ্রয়স্থল) মনে হবে। alighted feel হালকা ও নিরাপদ মনে হবে। সর্বদা আনন্দ উপভোগ করবে এই ভেবে যে, আমার উপর কারো ছায়া আছে। সুতরাং মাথায় আদর মাখা হাত বুলিয়ে দিবেন এবং চুমু দেওয়ার পর তার পছন্দমতো কোনো কিছু দিবেন। এক্ষেত্রে খেয়াল করে আগের থেকে ফ্রিজে ভালো খাবার, পানীয় বা মিষ্টিজাতীয় কোনো জিনিস, যা সে পছন্দ করে তৈরি করে রেখে দিবেন। আদর করে একটা কিছু খেতে দিবেন। মধুমাখা সুরে বলবেন, আম্মু! নাও, এটা আমি তোমার জন্য তৈরি করে রেখেছি। খেয়ে নাও।
এমন মুহূর্তে যখন শিশুটি ক্ষুধার্ত পিপাসিত হয়ে মাদরাসা বা স্কুল থেকে ফিরেছে। আর আপনি তার পছন্দমতো কোনো খাবার খেতে দিলেন। ওই সামান্য কিছুর ফলে আপনি আপনার শিশুর মনকে জয় করে ফেললেন। আপনি ধারণাও করতে পারবেন না, ওই মুহূর্তে সে আপনাকে কত বেশি ভালোবেসে গ্রহণ করে নিয়েছে। এতক্ষণ শিশু আট ঘণ্টা কাটিয়ে যা না শিখে এসেছে। আপনি আট মিনিটে এমন প্রশিক্ষণ দিয়ে দিলেন, যাতে শিশুর দিলে আপনার ভালোবাসা ও মুহব্বাত দৃঢ় হয়ে গেল। সব ভালো বিষয়গুলো তার সামনে পরিষ্কার এসে গেল। এভাবে প্রতিটি দিনই তার জন্য বরকতময় হবে। বাকি সময়টা তো আপনার সামনেই কাটাবে। এক্ষেত্রে আপনার তিনজন, চারজন বা যত সন্তানই হোক, যখনই তারা ঘরে আসবে আপনিও বারবার তাদের সাথে এরকম কোমল ব্যবহার করবেন। সকলকে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে মূল্যায়ন করবেন। সকলকে সময় দিবেন। এমন যেন না হয় যে, ছেলেকে তো আদর করে খাইয়ে দিলেন আর মেয়েকে বললেন, যাও নিজে গিয়ে খেয়ে নাও। এমনটি যেন কখনোই না হয়। এটা একটা সামান্য দায়িত্ব, নিজের জন্য তা অবধারিত করে নিবেন। মনে করবেন এটা প্রত্যেক আদর্শ মায়ের প্রতিদিনের রুটিন। আল্লাহর পক্ষ থেকে ফরজ দায়িত্ব।
শিশু কয়েক ঘণ্টা বাইরে থেকে বেরিয়ে এসেছে। ঘরে ফেরার পর ওই মুহূর্তে শিশুকে এমন ভালোবাসা ও মুহব্বাত দিবেন, যাতে তার মনে 'সুন্দর ও ভালো লাগাগুলো' দৃঢ় মজবুত হয়ে বসে যায়। আর মন্দ ও দুশ্চিন্তা আনে এমন স্বভাবগুলো তার থেকে দূর হয়ে যায়। এই জন্য শিশু যখন মাদরাসা বা স্কুল থেকে ঘরে ফেরে, ওই মুহূর্তের কিছু সময়ের দায়িত্ব যেসব মায়েরা ভালো করে খেয়াল করেন; তাদের সন্তানরাই নেককার ও ভালো চরিত্রের অধিকারী হয়। খুব শান্ত সুষ্ঠু ও উন্নত চরিত্রের হয় এবং বাবা-মাকে সম্মান ও সেবা করতে শেখে। এরকম সন্তান কখনো ছোট বেলার স্মৃতি ভুলতেই পারে না, যখন আমি মাদরাসা থেকে আসতাম, আম্মু তখন খুব আদর করে আমার অবস্থা জানতো, আমাকে ভালোবেসে খাইয়ে দিতো।
📄 নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র সুন্নত
যখন আপনি বৃদ্ধ হয়ে যাবেন আর শিশুটি হবে যুবক, তখন সে আপনার সন্তুষ্টির প্রতি খেয়াল রাখবে। যে রকম আপনি তার প্রতি তার ছোট সময় খেয়াল রেখেছেন। সুতরাং আমি আপনাকে এ ব্যাপার কিছু মূল্যবান পরামর্শ দিলাম। আপনি যদি সে মোতাবেক কাজ করেন, ইনশাআল্লাহ শিশুর জীবনে এর প্রতিফলন আপনি নিজ চোখে দেখবেন।
একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ ঘরেই অবস্থান করছিলেন। আদরের নাতি হযরত হাসান (রাযি.) নবীজীর কাছে এলেন। তিনি ছিলেন ফাতেমাতুয যাহরা (রাযি.)-এর গর্ভের বড় সন্তান। নবীজী তাকে বড়ই আদর করতেন। এবারও নবীজী তাকে খুব আদর করলেন এবং ধরে চুমু খেলেন। পাশেই বসা ছিলেন সাহাবী হযরত আকরা ইবনে হাবেস তামীমী (রাযি.)। তিনি ছিলেন তামীম গোত্রের লোক। তিনি নানা-নাতির এই চিত্র দেখে হয়রান হয়ে গেলেন। বিস্ময়ের সাথে বলতে লাগলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার নিজের দশ জন সন্তান রয়েছে, আমি তো কখনোই তাদেরকে এত ভালোবাসা দেইনি। আল্লাহর রাসূল বললেন,
مَنْ لَا يَرْحَمْ لَا يُرْحَم
'যে মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহ তার প্রতি দয়া করেন না।'
আরেকদিন এক গ্রাম্য লোক এরকমই একটি ঘটনায় নবীজীকে বললেন, হে আল্লাহর নবী! আমি তো শিশুদেরকে এমন আদর কখনোই করি না; যেমনটি আপনি করলেন। নবীজী উত্তরে বললেন, যদি আল্লাহ তোমার অন্তর থেকে মায়া-মমতা উঠিয়ে নেন এবং তোমাকে এই নেয়ামত থেকে বঞ্চিত করতে চান, তবে আমার কি করার আছে বলো?
এর থেকে বুঝা যায়, শিশুদের মায়া-মুহব্বাত করতে হবে, আদর-স্নেহ দিতে হবে। আর এটা একটা মানবিক গুণ।
📄 শিশুদের ভালোবাসার বিনিময়ে জান্নাতের সুসংবাদ
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার নিকট একবার এক মা এল। সঙ্গে তার দু'টি সন্তানও ছিল। হযরত আয়েশা (রাযি.) তিনটি খেজুর ওই মায়ের হাতে দিলেন।
গুণবতী ওই মা কী করলেন দেখুন! দু'টি খেজুর দুই সন্তাকে দিলেন আর একটি নিজের হাতে রেখে দিলেন। এবার উভয় সন্তান নিজেদেরটা খেয়ে মায়ের হাতের দিকে আরেকটু পাওয়ার আশায় তাকিয়ে রইল। তাদের মা করলেন কী; হাতের খেজুরটিকে দুই টুকরা করে দুই সন্তানকে ভাগ করে দিলেন। শিশুরা এভাগও খেয়ে নিল। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাযিয়াল্লাহু আনহা ওই মায়ের ব্যবহার দেখে খুবই আশ্চর্য হলেন। মা তার শিশুদেরকে এতোই ভালোবাসেন যে, নিজের ভাগেরটুকুও সন্তানদের খাইয়ে দিলেন।
এরপর যখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে ফিরলেন, মা আয়েশা পুরো ঘটনা রাসূলকে শোনালেন। আল্লাহর রাসূল পুরো ঘটনাটি শুনে বললেন, আল্লাহ তাআলা ওই মহিলার জন্য জান্নাতকে ওয়াজিব করে দিয়েছেন। সুবহানাল্লাহ, জান্নাত লাভের কী সহজ উপায়। মা যখন শিশুকে এভাবে মুহব্বাত করবেন, তো বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা ওই মাকে জান্নাত দেবেন। এ জন্য সকল মায়ের উচিত হবে, শিশুদের সাথে কোমল সুন্দর ব্যবহার করা। স্মরণ রাখবেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা নম্রতার উপর যেরূপ রহমত নাজিল করেন, কঠোরতার উপর তেমন করেন না। সুতরাং সন্তানকে লালন-পালন করতে গিয়ে এই বিষয়টি অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে।
📄 তাওহীদ (একত্ববাদ) শিক্ষা দিবেন
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুর মনে ছোটবেলা থেকেই ঈমানের বীজ মজবুত করতে থাকবেন। একত্ববাদের শিক্ষা দৃঢ় করে দিবেন। শিশুর দিলে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল সৃষ্টি করে দিবেন। এটা মায়ের নিজের ক্ষমতায় থাকে যে, তিনি সন্তানকে এমন তারবিয়াত করবেন, যেন শিশু ভয় করলে একমাত্র আল্লাহকে ভয় করে। কোনো কিছুর প্রার্থনা করতে হলে আল্লাহর নিকটই সকল আরজি পেশ করে। ভালোবাসার বন্ধন; তাও আল্লাহর সাথেই জুড়বে। শিশুটি যেন হৃদয়ের গভীর ভালোবাসা দিয়ে আল্লাহ তাআলার সাথেই সম্পর্ক গড়তে পারে। আগের জামানার মায়েরা এ ব্যাপারে খুবই সজাগ থাকতেন।