📄 শেঠও বানানো যাবে না
আবার কেউ তো শিশুকে ছোট থেকেই জমিদারী শেখায়, যার ফলে এক সময় তার নিকট জমিন আর জমিন মনে হয় না বরং সে শুধু হাওয়ায় উড়তে থাকে। তাই শিশুকে এরকম Ex-theorems (বিস্তীর্ণ) উঁচুতে উঠিয়ে, লাইন বিচ্যুতি করার চেষ্টা করবেন না।
স্মরণ রাখবেন, শিশু হলো তরল ও নরম পদার্থের মতো। তাকে যে রকম ডাইশে দেওয়া হবে, সে ওই রকম আকৃতিই ধারণ করবে। মোটকথা শিশুকে বুঝানো এবং সুন্দর মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব প্রথমে মাকেই নিতে হবে।
📄 শিশুর পরিচর্যা কীভাবে করবেন? অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু উদাহরণ
আপনাকে একটি সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে দিচ্ছি, যা নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে পেয়েছি এবং যার অনেক ফায়দাও এ জীবনে দেখেছি। আপনি নিজেও পরীক্ষা করে দেখবেন, ইনশাআল্লাহ ফল দেখতে পাবেন। যখন আপনার সন্তানের মাদরাসায় বা স্কুলে যাওয়ার মতো বয়স হয়ে যাবে। ছোট হোক বা বড়, যখনই সে বাসায় ফিরবে এবং দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। ওই সময়টা বড়ই precious moment (বড় মূল্যবান) সময়। তখন বিশেষ একটি মুহূর্তের অবতারণ হয়।
মা কখনো শিশুকে unattended (উদাস মনে) বেপরোওয়া ভাব নিয়ে ঘরে প্রবেশ করতে দেবেন না। বরং যখনই সন্তান ঘরে আসবে তখনই তাকে স্বরণ করিয়ে দেবেন যে, বেটা! যখনই ঘরে ঢুকবে আমি যেখানেই থাকি তুমি এসে প্রথমে সালাম করবে। যদি শিশু সালাম না করে তবে নিজে সালামের অভ্যাস করিয়ে দেবেন। শিখিয়ে দেবেন। আর যদি শিশু ভুলে যায়, এমতাবস্থায় শিশুকে পুনরায় বাইরে পাঠিয়ে বলবেন, আব্বু! দরজার বাইরে যাও এবং আম্মুকে সালাম দিয়ে আবার প্রবেশ করো। এটা আমাদের নবীজির সুন্নাত, তোমার অনেক সওয়াব হবে। যাও আবার সালাম দিয়ে প্রবেশ করো। শিশু যখন বারবার এভাবে সালাম করবে, এতে করে তার মাঝে ওই সুন্নাতটার আমল চলে আসবে। যখন শিশু মাদরাসা বা স্কুল থেকে এসে আপনাকে সালাম করবে। তখন আপনিও সব সময় তার সালামের উত্তর দেবেন। জবাব দেওয়ার পর তাকে অবশ্যই জিজ্ঞাসা করবেন, আব্বু! আজকে মাদরাসায় কেমন কেটেছে? এভাবে তিন-চার মিনিট সন্তানের সাথে কাটিয়ে দেন। আদর করে তাকে ছোট ছোট কিছু প্রশ্ন করেন। বেটা! আজ মাদরাসায় কেমন কাটল? দেখবেন একটু হাফ ছেড়ে একে একে আপনাকে সব কিছু বলে দেবে। এক্ষেত্রে যত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই সে আপনাকে বলুক, আপনি silent (চুপ) হয়ে শুনবেন। যতক্ষণ না তার সব কথা শেষ হবে। আপনি শুধুই শুনেন। আজ উস্তাদজী এটা বলেছেন। আজ আমি পুরস্কার পেয়েছি। আজকে আমার উপর মার পড়েছে। ওই বন্ধু এটা বলেছে। এরকমভাবে যখন শিশুটি সব বলতে থাকবে। তখন ভালো কাজের উপর তাকে শাবাশ দেবেন। আর খারাপ বিষয়গুলোর উপর সতর্ক করে দেবেন যে, বেটা! তোমার বন্ধু তোমাকে এটা ঠিক বলেনি, এটা এরকম নয় বরং ওরকম হবে। মোটকথা, শিশু আট ঘণ্টার মাঝে যা কিছু শিখেছে, তার মধ্যে ভালো বিষয়গুলো আপনি তার মনে মজবুত করে বসিয়ে দিলেন। আর অন্যায় কাজগুলো আপনি তার থেকে নিখোঁজ করে দিলেন। এভাবে আপনার আট মিনিটের মেহনত আট ঘণ্টার শিক্ষাকে মজবুত ও পরিশুদ্ধ করে দিল।
আর যদি আপনি শিশুটি বাড়ি ফেরার পর কিছুই জিজ্ঞাসা না করেন। তাহলে সে ক্লাসে যা শুনেছে, আর বন্ধুর থেকে যা শিখেছে, এখন ওইসব ভালো হোক বা মন্দ; সকল বিষয়ের একটি প্রতিচ্ছবি তার মনে গেঁথে যাবে। বন্ধুর কথা মাথায় নিয়ে নেবে। এই জন্য এই কয়েক মিনিট সময় আপনার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যখনই শিশু বাইরে থেকে আসবে, প্রথমে সালাম করবে, তারপর আপনার ঘরে প্রবেশ করবে। সালামের উত্তর দিয়ে আপনি অবশ্যই জিজ্ঞাসা করবেন, আব্বু! আজ মাদরাসায় সারা দিন কিভাবে কাটল? মেয়েকে জিজ্ঞাসা করবেন, আম্মু! মাদরাসায় আজ সারা দিন কি কি শিখেছ? সেও আপনাকে অল্প কথায় বলে দেবে, আম্মু! আজ এই হয়েছে, ওই হয়েছে। আপনি খেয়াল করে শুনবেন এবং ভালো কথায় বাহ্ বাহ্ দিবেন। আর খারাপ বিষয়ে তাকে সাবধান করে দিবেন, এটা ভালো নয়। তোমার বন্ধুর এ কথা ঠিক নয়। এমন কথা ভালো নয়।
📄 শিশুর মধ্যে সুন্দর অভ্যাস গড়ে তোলার ফলপ্রসূ পদ্ধতি
এভাবে অল্প সময়ের মধ্যে আপনি আপনার সন্তানকে খারাপ মানসিকতার হাত থেকে বাঁচালেন। ভালো কিছু তার মনে বসিয়ে দিলেন। যখন আপনি এমনটি করে ফেললেন, এখন শিশুকে আপনি নিজের কাছে ডেকে আনেন। শিশুটি যখন আপনার কাছে এসে দাঁড়াল, আপনি তার মাথায় আদর সোহাগ দিয়ে হাত বুলিয়ে দেন, মাথায় সোহাগ মাখা এই হাত বুলানোটা আজীবন শিশুর মনে দাগ কেটে থাকবে। অতঃপর শিশুর কপালে মিষ্টি একটি চুমু খেয়ে বলেন, আম্মু! আজকের দিনটি অনেক সুন্দর কেটেছে তোমার। আপনি যখন এরকম একটি অভ্যাস করে নিবেন, সন্তান এসে আপনাকে সালাম করবে। বাসায় ফেরার পর আপনি তার অবস্থা জিজ্ঞাসা করবেন এবং ভালো বিষয়গুলোকে সাপোর্ট করবেন। আর মন্দ বিষয়ের প্রতি ঘৃণা দেখাবেন। আবার পরক্ষণে ডেকে মাথায় আদরের হাত রাখবেন। এসব কিছু এমন একটা ছায়া হিসেবে কাজ করবে, যার ফলে শিশুটির মনে এ কথার বিশ্বাস যোগাবে, আমার উপর পিতা-মাতার ছায়া আছে। এই বয়সগুলোতে সন্তানের উপর আপনার হাত রহমতের ছায়ার ন্যায় হবে।
শিশুর protected feel (নিরাপদ আশ্রয়স্থল) মনে হবে। alighted feel হালকা ও নিরাপদ মনে হবে। সর্বদা আনন্দ উপভোগ করবে এই ভেবে যে, আমার উপর কারো ছায়া আছে। সুতরাং মাথায় আদর মাখা হাত বুলিয়ে দিবেন এবং চুমু দেওয়ার পর তার পছন্দমতো কোনো কিছু দিবেন। এক্ষেত্রে খেয়াল করে আগের থেকে ফ্রিজে ভালো খাবার, পানীয় বা মিষ্টিজাতীয় কোনো জিনিস, যা সে পছন্দ করে তৈরি করে রেখে দিবেন। আদর করে একটা কিছু খেতে দিবেন। মধুমাখা সুরে বলবেন, আম্মু! নাও, এটা আমি তোমার জন্য তৈরি করে রেখেছি। খেয়ে নাও।
এমন মুহূর্তে যখন শিশুটি ক্ষুধার্ত পিপাসিত হয়ে মাদরাসা বা স্কুল থেকে ফিরেছে। আর আপনি তার পছন্দমতো কোনো খাবার খেতে দিলেন। ওই সামান্য কিছুর ফলে আপনি আপনার শিশুর মনকে জয় করে ফেললেন। আপনি ধারণাও করতে পারবেন না, ওই মুহূর্তে সে আপনাকে কত বেশি ভালোবেসে গ্রহণ করে নিয়েছে। এতক্ষণ শিশু আট ঘণ্টা কাটিয়ে যা না শিখে এসেছে। আপনি আট মিনিটে এমন প্রশিক্ষণ দিয়ে দিলেন, যাতে শিশুর দিলে আপনার ভালোবাসা ও মুহব্বাত দৃঢ় হয়ে গেল। সব ভালো বিষয়গুলো তার সামনে পরিষ্কার এসে গেল। এভাবে প্রতিটি দিনই তার জন্য বরকতময় হবে। বাকি সময়টা তো আপনার সামনেই কাটাবে। এক্ষেত্রে আপনার তিনজন, চারজন বা যত সন্তানই হোক, যখনই তারা ঘরে আসবে আপনিও বারবার তাদের সাথে এরকম কোমল ব্যবহার করবেন। সকলকে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে মূল্যায়ন করবেন। সকলকে সময় দিবেন। এমন যেন না হয় যে, ছেলেকে তো আদর করে খাইয়ে দিলেন আর মেয়েকে বললেন, যাও নিজে গিয়ে খেয়ে নাও। এমনটি যেন কখনোই না হয়। এটা একটা সামান্য দায়িত্ব, নিজের জন্য তা অবধারিত করে নিবেন। মনে করবেন এটা প্রত্যেক আদর্শ মায়ের প্রতিদিনের রুটিন। আল্লাহর পক্ষ থেকে ফরজ দায়িত্ব।
শিশু কয়েক ঘণ্টা বাইরে থেকে বেরিয়ে এসেছে। ঘরে ফেরার পর ওই মুহূর্তে শিশুকে এমন ভালোবাসা ও মুহব্বাত দিবেন, যাতে তার মনে 'সুন্দর ও ভালো লাগাগুলো' দৃঢ় মজবুত হয়ে বসে যায়। আর মন্দ ও দুশ্চিন্তা আনে এমন স্বভাবগুলো তার থেকে দূর হয়ে যায়। এই জন্য শিশু যখন মাদরাসা বা স্কুল থেকে ঘরে ফেরে, ওই মুহূর্তের কিছু সময়ের দায়িত্ব যেসব মায়েরা ভালো করে খেয়াল করেন; তাদের সন্তানরাই নেককার ও ভালো চরিত্রের অধিকারী হয়। খুব শান্ত সুষ্ঠু ও উন্নত চরিত্রের হয় এবং বাবা-মাকে সম্মান ও সেবা করতে শেখে। এরকম সন্তান কখনো ছোট বেলার স্মৃতি ভুলতেই পারে না, যখন আমি মাদরাসা থেকে আসতাম, আম্মু তখন খুব আদর করে আমার অবস্থা জানতো, আমাকে ভালোবেসে খাইয়ে দিতো।
📄 নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র সুন্নত
যখন আপনি বৃদ্ধ হয়ে যাবেন আর শিশুটি হবে যুবক, তখন সে আপনার সন্তুষ্টির প্রতি খেয়াল রাখবে। যে রকম আপনি তার প্রতি তার ছোট সময় খেয়াল রেখেছেন। সুতরাং আমি আপনাকে এ ব্যাপার কিছু মূল্যবান পরামর্শ দিলাম। আপনি যদি সে মোতাবেক কাজ করেন, ইনশাআল্লাহ শিশুর জীবনে এর প্রতিফলন আপনি নিজ চোখে দেখবেন।
একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ ঘরেই অবস্থান করছিলেন। আদরের নাতি হযরত হাসান (রাযি.) নবীজীর কাছে এলেন। তিনি ছিলেন ফাতেমাতুয যাহরা (রাযি.)-এর গর্ভের বড় সন্তান। নবীজী তাকে বড়ই আদর করতেন। এবারও নবীজী তাকে খুব আদর করলেন এবং ধরে চুমু খেলেন। পাশেই বসা ছিলেন সাহাবী হযরত আকরা ইবনে হাবেস তামীমী (রাযি.)। তিনি ছিলেন তামীম গোত্রের লোক। তিনি নানা-নাতির এই চিত্র দেখে হয়রান হয়ে গেলেন। বিস্ময়ের সাথে বলতে লাগলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার নিজের দশ জন সন্তান রয়েছে, আমি তো কখনোই তাদেরকে এত ভালোবাসা দেইনি। আল্লাহর রাসূল বললেন,
مَنْ لَا يَرْحَمْ لَا يُرْحَم
'যে মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহ তার প্রতি দয়া করেন না।'
আরেকদিন এক গ্রাম্য লোক এরকমই একটি ঘটনায় নবীজীকে বললেন, হে আল্লাহর নবী! আমি তো শিশুদেরকে এমন আদর কখনোই করি না; যেমনটি আপনি করলেন। নবীজী উত্তরে বললেন, যদি আল্লাহ তোমার অন্তর থেকে মায়া-মমতা উঠিয়ে নেন এবং তোমাকে এই নেয়ামত থেকে বঞ্চিত করতে চান, তবে আমার কি করার আছে বলো?
এর থেকে বুঝা যায়, শিশুদের মায়া-মুহব্বাত করতে হবে, আদর-স্নেহ দিতে হবে। আর এটা একটা মানবিক গুণ।