📄 হুমকি-ধমকির দ্বারা শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠনে (Negative) নেতিবাচক প্রভাব পড়ে
শিশুর দ্বারা কোনো ভুল হয়ে গেলে, এই সামান্য বিচ্যুতির উপর ধমকা-ধমকি শুরু করে দেয়া; এটা আদর্শবান বাবা মায়ের কাজ হতে পারে না। সন্তানকে আদর সোহাগ দিয়ে সমাধানে নিয়ে আসতে হবে। যদি আপনি সন্তানটিকে সম্মান দেখিয়ে সংশোধন করেন, তাহলে শিশুর মধ্যে উন্নত ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি হবে। আর যদি আপনি কথায় কথায় প্যান প্যান ও রাগারাগি করতে শুরু করেন, তাহলে শিশুর ভালো স্বভাবগুলো চাপা পড়ে থাকবে। এরকম ব্যক্তিত্বে কখনো নেতৃত্ব দেবার যোগ্যতা সৃষ্টি হবে না। এই জন্য সন্তানের সুষ্ঠু লালন-পালন করা বাবা মায়ের গুরুত্বপূর্ণ ফরজ দায়িত্ব। যদি সন্তানের দ্বারা কোনো ভুল হয়ে যায় অথবা কোনো ক্ষতি হয়ে যায়, তাহলে তাকে আদর করে বুঝিয়ে দেবেন। উদাহরণস্বরূপ, আপনার মেয়ে সন্তান পানি পান করবে, আর আপনি কোনো কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। এমতাবস্থায় শিশুটি ফ্রিজের দরজা খুলে পানি বের করতে গিয়ে মেহমানদের জন্য ফ্রিজে রাখা অতি মূল্যবান ও সুস্বাদু খাবার নিচে পড়ে সব ডাল খিচুরী হয়ে গেল। এখন এই অসহ্যকর পরিস্থিতিতে আপনি রেগে আগুনের মতো ফুলে শিশুমেয়েটিকে যদি ধমকাতে থাকেন; শাসাতে থাকেন, তাহলে এটা একটা অদূরদর্শিতার কাজ হবে। এটা তার মানসিকতায় খারাপ প্রভাব পড়বে। বরং আপনি কাছে এসে মায়াবী স্বরে মেয়েকে বলবেন, মা-মণি! যাক কিছু হয়নি। তুমি ঘাবরিয়ো না, মন খারাপ করো না। তাকদিরে যা ছিল তাই হয়েছে। আল্লাহ তাআলা হয়তো এমনটি চেয়েছেন যে, এগুলো নিচে পড়ে যাবে। যাক মা, মন খারাপ করো না। সামনে কখনো যদি কোনো কিছু তোমার প্রয়োজন হয় তাহলে আমাকে বলবে, আমি তোমাকে নিয়ে দেব। যখন আপনি এরকম বলতে থাকবেন, তখন দেখবেন, মেয়ে নিজ থেকে বলতে থাকবে, আম্মু! সামনে থেকে আমি খুব সতর্ক হয়ে যাব। আমি পচা মেয়ে হব না। আমি সব কিছু তোমার কাছেই চেয়ে নেব।
শিশুটি আগে বেড়ে আবার আপনার কাছেই জিজ্ঞাসা করবে, আম্মু! আব্বুর সামনে আমায় বকবে না তো? আম্মু! আব্বু যদি জানতে পারে, আমি এমন সর্বনাশ করেছি, আব্বু তখন আমাকে মারবে না তো? আপনি তখন বাচ্চাটিকে এ বলে সান্ত্বনা দেবেন, না মা, কখনোও না। আমি তোমার এ কথা প্রকাশ করব না। বরং বলব, এগুলো পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। আমি তোমার আব্বুকে ফোন করে দিচ্ছি, তিনি যেন আসার সময় তৈরি খানা সাথে করে নিয়ে আসেন। যাতে মেহমান এলে তাদের সামনে ভালো কিছু খাবার পেশ করতে পারি। এমতাবস্থায় আপনার এই অভয় ও বিচক্ষণতার ফলে আপনি লক্ষ করবেন, আপনার শিশুসন্তান আপনাকে নিজের হিতাকাঙ্ক্ষী মনে করবে। আপনাকে সে বিপদে আশ্রয়স্থল হিসেবে গ্রহণ করবে। সে মনে করবে, আম্মু আমার অন্যায়, দোষ-ত্রুটি গোপন রাখেন এবং সর্বদা আমার পক্ষে থাকেন।
শৈশবে যদি মা নিজের সন্তানের প্রতি দরদি ও সহানুভূতিশীল হন, তবে বড় হয়ে এ সন্তান মায়ের অসহায় ও দুঃখের দিনে পরম সাহায্যকারী হবে এবং মায়ের খেদমত ও সেবায় পুরো জীবন সে নিজেকে নিয়োজিত রাখবে। ছোট্ট শিশুদের দ্বারা যখন কোনো কিছু নষ্ট হয়ে যায়, তো তখন আল্লাহ তাআলার স্মরণও তার কাছে তুলে ধরা যে, আল্লাহ তাআলা হয়তো এমনটিই চেয়েছিলেন এবং সাথে সাথে এটাও বলুন, মা-মণি! আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নাও, ইস্তেগফার পড়ো। কারণ, আল্লাহ আমাদের এই নেয়ামত দিয়েছিলেন, কিন্তু আমরা তা নষ্ট করে ফেলেছি। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের আগামীতে এই নেয়ামত থেকে মাহরুম না করেন। যখন আপনি সন্তানকে এই বাহানায় আল্লাহ তাআলার নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন; এতে সহজেই একদিন তার দিলে ঈমান দৃঢ় ও মজবুত হয়ে যাবে। আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা জন্মাবে।
📄 সরাসরি আদেশ না করে কৌশলে কাজ করানো
আরেকটি সূক্ষ্ম বিষয় মাথায় রাখবেন, শিশুকে আদেশ মানানোর জন্য ঘাড় বেঁকে বা আঙ্গুল উঁচিয়ে সরাসরি কোনো Order (হুকুম) দেবেন না, আমি তোমাকে অর্ডার দিচ্ছি, তোমাকে এটা করতেই হবে। না-এভাবে নয়। আল্লাহ হেফাজত করুন! যদি শিশু আপনার এই হুকুমটি না মানে তাহলে এক্ষেত্রে আপনার জন্যই সে গুনাহগার হলো। আমাদের বুযুর্গদের অভ্যাস ছিল, তারা শিশুদেরকে আদেশ করতেন কিন্তু খুব আদর-সোহাগ করে। বাবা! যদি তুমি এটা করে দাও তো আমার বড় উপকার হবে। আব্বু! যদি তুমি আমায় এটা করে দাও তাহলে আমি তোমায় অনেক দুআ দেব। যখন আপনি এমন ভাষায় কথা বলবেন, আর শিশুটিও হুকুম মতো কাজ করে দেবে, তবে সত্বরই সে দুআ পেয়ে যাবে। আর যদি না মানে তাহলে কমপক্ষে গুনাহগার হওয়া থেকে বেঁচে যাবে। তখন সে অবাধ্যতার অভিশাপ থেকেও বেঁচে যাবে। শৈশবের জীবন নিষ্পাপ জীবন। একথা তার পুরো জানা নেই যে, বড়দের হুকুম অমান্য করার কি অশুভ পরিণতি ঘটতে পারে। তাই এ কারণে শিশুকে অভিশাপ থেকে বাঁচানোর জন্য কখনো Diract order pass করবেন না। তার সহযোগী হয়ে পরামর্শদাতার মতো হয়ে বলবেন, আব্বু! পুরো গ্লাস ভরে পানি আনলে ভালো হবে। এভাবে পরামর্শদাতা হিসেবে কথা বলবেন। যাতে শিশু কাজটা করে ফেলে এবং তার বিনিময়ে সওয়াবের ভাগি হয়ে যায়। আল্লাহ না করেন, যদি সে নাও মানে; এক্ষেত্রে না-মানার বেয়াদবী-ও অবাধ্যতার দাগ তার কোমল অন্তরে লাগতে পারবে না।
মা তো হয় অনেক দয়া ও মায়ার অধিকারিনী। যার ফলে সন্তানের মনের ব্যথার অবস্থাও সহ্য করতে পারেন না। যে মা নিজের সন্তানের জুতার তলাকেও চকচকে দেখতে পছন্দ করেন, যদি ব্রাশ নাও পায় তবে নিজের কাপড়ের আঁচল দিয়ে হলেও পরিষ্কার করে দেন। সে মা কিভাবে নিজের সন্তানের দিলে খারাপ-কুস্বভাব নিয়ে বড় হোক; তা পছন্দ করবেন? কিন্তু তিনি নিজেও জানেন না, সন্তান লালন-পালন কীভাবে করতে হবে। তাই এ সকল ব্যাপারে খুব সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
📄 শিশুকে গোলাম বানানো যাবে না
শিশুকে গোলাম বানানো যাবে না, আবার শেঠও বানানো যাবে না। কোনো মা এমন আছেন, যারা শিশুকে এতই কন্ট্রোল ও শাসনে রাখেন, যার ফলে শিশুর ব্যক্তিত্ব ও যোগ্যতায় কোনো কিছুই বিকাশ হয় না।
📄 শেঠও বানানো যাবে না
আবার কেউ তো শিশুকে ছোট থেকেই জমিদারী শেখায়, যার ফলে এক সময় তার নিকট জমিন আর জমিন মনে হয় না বরং সে শুধু হাওয়ায় উড়তে থাকে। তাই শিশুকে এরকম Ex-theorems (বিস্তীর্ণ) উঁচুতে উঠিয়ে, লাইন বিচ্যুতি করার চেষ্টা করবেন না।
স্মরণ রাখবেন, শিশু হলো তরল ও নরম পদার্থের মতো। তাকে যে রকম ডাইশে দেওয়া হবে, সে ওই রকম আকৃতিই ধারণ করবে। মোটকথা শিশুকে বুঝানো এবং সুন্দর মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব প্রথমে মাকেই নিতে হবে।