📘 সন্তান আল্লাহর ওলী হয় কীভাবে > 📄 মারধর থেকে বিরত থাকা

📄 মারধর থেকে বিরত থাকা


অবশ্যই সন্তানকে ধমক দেবেন, রাগ দেখিয়ে শাসনে রাখবেন। চেহারায় এমন ভাব দেখাবেন, যেন আপনি রাগে ফেটে পড়ছেন। তথাপি শিশুকে মারধর থেকে বিরত থাকবেন। পিটানোর দ্বারা কোনো সমাধান হয় না। বরং আমার মতে, যে লোক শিশুকে মার-ধর করে, সে যেন একথার স্বীকারোক্তি দিল, আমি সন্তানকে বুঝাতে বুঝাতে অপারগ হয়ে গিয়েছি। সন্তানকে বুঝাতে অক্ষম হয়ে পড়েছি। শিশুকে মারপিট করার অর্থ এটাই।

যখন শিশুকে শতবার বুঝানোর পরও কোনো কাজে না আসে তখনই শিশুর উপর হাত উঠান, কথা ঠিক। কিন্তু হাত উঠানোর দ্বারা শিশু তা না-মানার আরো মজবুত প্রতিজ্ঞা করে। এই জন্য শিশুকে মারপিটের পরিবর্তে বুঝানো এবং শাসনের প্রয়োজন হলে তার সীমাও ঠিক থাকা চাই। যদি কখনো কোনো মারাত্মক অপরাধ করে বসে অথবা অমার্জনীয় কোনো বেয়াদবী করে ফেলে, তবে তার জন্য তো অবশ্যই তাকে শাসন করতে হবে। এমতাবস্থায়ও যথাসম্ভব বুঝিয়ে-শুনিয়ে ফিরে আনতে চেষ্টা করবেন।

📘 সন্তান আল্লাহর ওলী হয় কীভাবে > 📄 শিশুকে ধমক ও ভয় দেখানোর ক্ষতিসমূহ

📄 শিশুকে ধমক ও ভয় দেখানোর ক্ষতিসমূহ


কখনো শিশুকে নির্দয় জালেমের মতো হুমকি-ধমকি দেবেন না। কোনো কোনো মা এমন আছেন, যারা নিজের সন্তানকে শাসন করতে, গিয়ে বাড়াবাড়ি করে ফেলেন। ভূত আসতে বলব, ঘর থেকে বের করে দেব, ওকে ডাকব, তাকে ডাকব ইত্যাদি ইত্যাদি বলে শিশুকে কখনো শাসাবেন না। কারণ, মা ভূত পেতনিকেও ডাকে না আর ঘর থেকে বেরও করে দেয় না। বরং উল্টো এরকম বানোয়াট কথা ছোটকাল থেকে শুনে শুনে শিশু মিথ্যায় অভ্যস্ত হতে থাকে। পরে নিজের আম্মুকেও মিথ্যুক মনে করতে থাকে। আপনি তো তাকে ভয় দেখাচ্ছেন। কিন্তু সে মনে মনে আপনাকে মিথ্যুক ভেবে বসে আছে। যখন একটি বিষয়ে আপনাকে সে মিথ্যুক পেয়েছে তখন সকল বিষয়ে সে আপনাকে সন্দেহ করে যাবে, আম্মু তো মিথ্যাও বলে। সুতরাং ফলাফল এই দাঁড়াল, কেমন যেন আপনি আপনার শিশুসন্তানকে মিথ্যুক বানাতে সাহায্য করলেন। এমনিভাবে আরেকটি বিষয় হলো, শিশুর সাথে কখনো মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয়া যাবে না। এতে শিশু মিথ্যা বলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে। আর এই সব মিথ্যার গুনাহ আপনার হবে। এই জন্য যদি সন্তানকে ভয় দেখাতেই হয়, তাহলে আল্লাহ তাআলার ভয় দেখাবেন। বেটা! আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন। এর দ্বারা আল্লাহ নারাজ হবেন। এভাবে, এক আল্লাহর ভয় তার দিলে বসিয়ে দেবেন। অন্য কারো ভয় দেখানোর প্রয়োজন নেই। আল্লাহ তাআলার ভয় দিলে জন্মানো এটা এত বড় নেয়ামত যে, আল্লাহকে ভয় করার ফলে শরীয়তের উপর শিশু আমল করতে শুরু করবে। আরব দেশে একথার ব্যাপক প্রচলন আছে যে, যদি শিশুকে ছোটকালে ভয় দেখানো থেকে বাঁচিয়ে রাখা যায়। (অর্থাৎ কুকুর, বিড়াল বা ভূত বলে বাচ্চাকে ভয় দেখানো না হয়) তবে সে শিশু বড় হয়ে বীর বাহাদুর হয়।

📘 সন্তান আল্লাহর ওলী হয় কীভাবে > 📄 হুমকি-ধমকির দ্বারা শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠনে (Negative) নেতিবাচক প্রভাব পড়ে

📄 হুমকি-ধমকির দ্বারা শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠনে (Negative) নেতিবাচক প্রভাব পড়ে


শিশুর দ্বারা কোনো ভুল হয়ে গেলে, এই সামান্য বিচ্যুতির উপর ধমকা-ধমকি শুরু করে দেয়া; এটা আদর্শবান বাবা মায়ের কাজ হতে পারে না। সন্তানকে আদর সোহাগ দিয়ে সমাধানে নিয়ে আসতে হবে। যদি আপনি সন্তানটিকে সম্মান দেখিয়ে সংশোধন করেন, তাহলে শিশুর মধ্যে উন্নত ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি হবে। আর যদি আপনি কথায় কথায় প্যান প্যান ও রাগারাগি করতে শুরু করেন, তাহলে শিশুর ভালো স্বভাবগুলো চাপা পড়ে থাকবে। এরকম ব্যক্তিত্বে কখনো নেতৃত্ব দেবার যোগ্যতা সৃষ্টি হবে না। এই জন্য সন্তানের সুষ্ঠু লালন-পালন করা বাবা মায়ের গুরুত্বপূর্ণ ফরজ দায়িত্ব। যদি সন্তানের দ্বারা কোনো ভুল হয়ে যায় অথবা কোনো ক্ষতি হয়ে যায়, তাহলে তাকে আদর করে বুঝিয়ে দেবেন। উদাহরণস্বরূপ, আপনার মেয়ে সন্তান পানি পান করবে, আর আপনি কোনো কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। এমতাবস্থায় শিশুটি ফ্রিজের দরজা খুলে পানি বের করতে গিয়ে মেহমানদের জন্য ফ্রিজে রাখা অতি মূল্যবান ও সুস্বাদু খাবার নিচে পড়ে সব ডাল খিচুরী হয়ে গেল। এখন এই অসহ্যকর পরিস্থিতিতে আপনি রেগে আগুনের মতো ফুলে শিশুমেয়েটিকে যদি ধমকাতে থাকেন; শাসাতে থাকেন, তাহলে এটা একটা অদূরদর্শিতার কাজ হবে। এটা তার মানসিকতায় খারাপ প্রভাব পড়বে। বরং আপনি কাছে এসে মায়াবী স্বরে মেয়েকে বলবেন, মা-মণি! যাক কিছু হয়নি। তুমি ঘাবরিয়ো না, মন খারাপ করো না। তাকদিরে যা ছিল তাই হয়েছে। আল্লাহ তাআলা হয়তো এমনটি চেয়েছেন যে, এগুলো নিচে পড়ে যাবে। যাক মা, মন খারাপ করো না। সামনে কখনো যদি কোনো কিছু তোমার প্রয়োজন হয় তাহলে আমাকে বলবে, আমি তোমাকে নিয়ে দেব। যখন আপনি এরকম বলতে থাকবেন, তখন দেখবেন, মেয়ে নিজ থেকে বলতে থাকবে, আম্মু! সামনে থেকে আমি খুব সতর্ক হয়ে যাব। আমি পচা মেয়ে হব না। আমি সব কিছু তোমার কাছেই চেয়ে নেব।

শিশুটি আগে বেড়ে আবার আপনার কাছেই জিজ্ঞাসা করবে, আম্মু! আব্বুর সামনে আমায় বকবে না তো? আম্মু! আব্বু যদি জানতে পারে, আমি এমন সর্বনাশ করেছি, আব্বু তখন আমাকে মারবে না তো? আপনি তখন বাচ্চাটিকে এ বলে সান্ত্বনা দেবেন, না মা, কখনোও না। আমি তোমার এ কথা প্রকাশ করব না। বরং বলব, এগুলো পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। আমি তোমার আব্বুকে ফোন করে দিচ্ছি, তিনি যেন আসার সময় তৈরি খানা সাথে করে নিয়ে আসেন। যাতে মেহমান এলে তাদের সামনে ভালো কিছু খাবার পেশ করতে পারি। এমতাবস্থায় আপনার এই অভয় ও বিচক্ষণতার ফলে আপনি লক্ষ করবেন, আপনার শিশুসন্তান আপনাকে নিজের হিতাকাঙ্ক্ষী মনে করবে। আপনাকে সে বিপদে আশ্রয়স্থল হিসেবে গ্রহণ করবে। সে মনে করবে, আম্মু আমার অন্যায়, দোষ-ত্রুটি গোপন রাখেন এবং সর্বদা আমার পক্ষে থাকেন।

শৈশবে যদি মা নিজের সন্তানের প্রতি দরদি ও সহানুভূতিশীল হন, তবে বড় হয়ে এ সন্তান মায়ের অসহায় ও দুঃখের দিনে পরম সাহায্যকারী হবে এবং মায়ের খেদমত ও সেবায় পুরো জীবন সে নিজেকে নিয়োজিত রাখবে। ছোট্ট শিশুদের দ্বারা যখন কোনো কিছু নষ্ট হয়ে যায়, তো তখন আল্লাহ তাআলার স্মরণও তার কাছে তুলে ধরা যে, আল্লাহ তাআলা হয়তো এমনটিই চেয়েছিলেন এবং সাথে সাথে এটাও বলুন, মা-মণি! আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নাও, ইস্তেগফার পড়ো। কারণ, আল্লাহ আমাদের এই নেয়ামত দিয়েছিলেন, কিন্তু আমরা তা নষ্ট করে ফেলেছি। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের আগামীতে এই নেয়ামত থেকে মাহরুম না করেন। যখন আপনি সন্তানকে এই বাহানায় আল্লাহ তাআলার নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন; এতে সহজেই একদিন তার দিলে ঈমান দৃঢ় ও মজবুত হয়ে যাবে। আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা জন্মাবে।

📘 সন্তান আল্লাহর ওলী হয় কীভাবে > 📄 সরাসরি আদেশ না করে কৌশলে কাজ করানো

📄 সরাসরি আদেশ না করে কৌশলে কাজ করানো


আরেকটি সূক্ষ্ম বিষয় মাথায় রাখবেন, শিশুকে আদেশ মানানোর জন্য ঘাড় বেঁকে বা আঙ্গুল উঁচিয়ে সরাসরি কোনো Order (হুকুম) দেবেন না, আমি তোমাকে অর্ডার দিচ্ছি, তোমাকে এটা করতেই হবে। না-এভাবে নয়। আল্লাহ হেফাজত করুন! যদি শিশু আপনার এই হুকুমটি না মানে তাহলে এক্ষেত্রে আপনার জন্যই সে গুনাহগার হলো। আমাদের বুযুর্গদের অভ্যাস ছিল, তারা শিশুদেরকে আদেশ করতেন কিন্তু খুব আদর-সোহাগ করে। বাবা! যদি তুমি এটা করে দাও তো আমার বড় উপকার হবে। আব্বু! যদি তুমি আমায় এটা করে দাও তাহলে আমি তোমায় অনেক দুআ দেব। যখন আপনি এমন ভাষায় কথা বলবেন, আর শিশুটিও হুকুম মতো কাজ করে দেবে, তবে সত্বরই সে দুআ পেয়ে যাবে। আর যদি না মানে তাহলে কমপক্ষে গুনাহগার হওয়া থেকে বেঁচে যাবে। তখন সে অবাধ্যতার অভিশাপ থেকেও বেঁচে যাবে। শৈশবের জীবন নিষ্পাপ জীবন। একথা তার পুরো জানা নেই যে, বড়দের হুকুম অমান্য করার কি অশুভ পরিণতি ঘটতে পারে। তাই এ কারণে শিশুকে অভিশাপ থেকে বাঁচানোর জন্য কখনো Diract order pass করবেন না। তার সহযোগী হয়ে পরামর্শদাতার মতো হয়ে বলবেন, আব্বু! পুরো গ্লাস ভরে পানি আনলে ভালো হবে। এভাবে পরামর্শদাতা হিসেবে কথা বলবেন। যাতে শিশু কাজটা করে ফেলে এবং তার বিনিময়ে সওয়াবের ভাগি হয়ে যায়। আল্লাহ না করেন, যদি সে নাও মানে; এক্ষেত্রে না-মানার বেয়াদবী-ও অবাধ্যতার দাগ তার কোমল অন্তরে লাগতে পারবে না।

মা তো হয় অনেক দয়া ও মায়ার অধিকারিনী। যার ফলে সন্তানের মনের ব্যথার অবস্থাও সহ্য করতে পারেন না। যে মা নিজের সন্তানের জুতার তলাকেও চকচকে দেখতে পছন্দ করেন, যদি ব্রাশ নাও পায় তবে নিজের কাপড়ের আঁচল দিয়ে হলেও পরিষ্কার করে দেন। সে মা কিভাবে নিজের সন্তানের দিলে খারাপ-কুস্বভাব নিয়ে বড় হোক; তা পছন্দ করবেন? কিন্তু তিনি নিজেও জানেন না, সন্তান লালন-পালন কীভাবে করতে হবে। তাই এ সকল ব্যাপারে খুব সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00