📘 সন্তান আল্লাহর ওলী হয় কীভাবে > 📄 পিতা-মাতা সন্তানের জন্য আদর্শ

📄 পিতা-মাতা সন্তানের জন্য আদর্শ


এ বিষয়টি অবশ্যই জেনে রাখবেন। আল্লাহ তাআলা প্রতিটি শিশুকে জন্মগত ভাবেই অনুকরণ প্রিয় বানিয়েছেন। শিশু তার বড়কে যা করতে দেখে হুবহু সে ঐ কাজটিই করতে উদ্ভূত হয়। সে বড়দের মতো হতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। তাই সন্তান প্রথমত তার বাবা-মাকেই অনুসরণ করে থাকে। এই জন্য মা-বাবার উচিত, তারা যেন শুধু সমালোচকই না হন, অর্থাৎ এটা কেন করলে? এভাবে করলে কেন? এটা ওইভাবে হওয়া উচিত ছিল ইত্যাদি। মোটকথা শুধু শাসাতেই না থাকা। হুমকি ধামকিতেই না রাখা, বরং সন্তানের সামনে পিতা-মাতা নিজেদেরকে আদর্শবান হিসেবে তুলে ধরা। শিশুকে হুমকি-ধামকি করার চেয়ে তার সামনে সুন্দর আদর্শ পেশ করাটাই অধিক উপকারী। শাসন তো দুনিয়ার সকল মানুষই করতে পারে, কিন্তু শিশুর জন্য নিজে পরিশুদ্ধ ও আদর্শবান হওয়া এটা কয়জন পারে। তাই বাবা-মায়ের উচিত, তারা যেন সন্তানের সামনে আদর্শ পিতা-মাতা হিসেবে জীবনযাপন করেন। তারপর দেখবেন, শিশু নিজে নিজেই মা-বাবার প্রতিটি কাজের হুবহু নকল করবে। মেয়ে তাই করবে, যা সে মাকে করতে দেখবে। ছেলেও তাই করবে, যা বাবাকে করতে দেখবে।

একবার এক ঘটনা শুনেছি আমাদের এক বন্ধুর মেয়ে খানা খাচ্ছিল। খানা খাওয়ার মাঝে পানি পান করল। কিছুটা বড় চুমুকে পান করল। এতে দম আটকে ঢেকুর উঠতে লাগল। সন্তানের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে দেখে মা তার পিঠের উপর হালকাভাবে এক দুইবার হাত মারল এবং সাথে এটাও বলতে লাগল, বেটি! আস্তে আস্তে, ধীরে ধীরে। কিছুক্ষণ পর ঠিক হয়ে গেল। অনেক দিন পর কিছু একটা পান করতে গিয়ে ওই মায়েরও একই অবস্থা হলো। আল্লাহর কি কুদরত, ঘটনাস্থলে মেয়েটি তখন মায়ের কাছেই ছিল। তখন সেই শিশুমেয়েটিও মায়ের পিঠে হাত মেরে মেরে বলতে লাগল, আম্মু! আস্তে আস্তে, ধীরে ধীরে। অর্থাৎ মেয়েটি হুবহু ঐ সকল শব্দগুলোই বলল, যা সে তার মাকে বলতে শুনেছিল।

আরেক দিনের ঘটনা, আমাদের আরেক বন্ধু যিনি সরকারি চীফ ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। তার একটা অভ্যাস ছিল, যখনই কোনো ফোন আসত রিসিভ করেই বলতেন, (chief engineer is speaking) চিফ ইঞ্জিনিয়ার বলছি। অর্থাৎ তার অধিকাংশ ফোন অফিসিয়াল সংক্রান্ত থাকতো। তাই তিনি সহজ পরিচয়ের জন্য এই শব্দই ব্যবহার করতেন। তিনি তার একদিনের ঘটনা শোনালেন, একবার আমি গোসল সেরে বের হয়ে দেখলাম, ফোনে রিং বাজছে। আমার তিন চার বছরের ছেলেটি সে দৌড়ে ওই ফোনের দিকে গিয়েই ফোনটা উঠাল এবং উঠিয়ে কানে লাগাতেই বলতে লাগল, 'চীফ ইঞ্জিনিয়ার বলছি'। এখানে লক্ষ করুন, ছেলেটি এই শব্দগুলোর অর্থও জানে না, কিন্তু সে ঐ কথাই বলছিল, যা সে তার বাবাকে বলতে শুনেছে।

এ ঘটনা শোনানোর উদ্দেশ্য হলো এ কথা বুঝানো, সন্তান সর্বদা মা-বাবার আচরণের কপি করে। এখন যদি মা বাবা বলে যে, আমাদের যা খুশি এ জীবনে আমরা তাই করব, কিন্তু সন্তান ভালো ও সৎ হোক; এটা কখনোই হতে পারে না। উভয়টি একবারে বিপরীত জিনিস। অবশ্য মা-বাবা যদি আদর্শবান হন। বরণীয়, অনুসরণীয় হন তাহলে সন্তান খুব সহজেই তাদের অনুসরণকারী হবে।

কিন্তু যদি মা-বাবা এ ব্যাপারে উদাসীন থাকেন, আর এই ভেবে সুধারণা করে বসে থাকেন যে, সন্তান অনেক বড় হবে এবং অনেক নেককার হবে। এরকম ভাবা একেবারেই অর্থহীন। যার সাথে বাস্তবতার কোনোই মিল নেই। এমনটা কখনো হয়নি, হতে পারেও না। এ জন্য সন্তানের সুন্দর লালন-পালনের জন্য বাবা-মাকে প্রথমে 'আমলী নমুনা' তথা বাস্তব নমুনা হওয়া আবশ্যক।

📘 সন্তান আল্লাহর ওলী হয় কীভাবে > 📄 সন্তানকে অধিক বুঝাতে হবে

📄 সন্তানকে অধিক বুঝাতে হবে


সাধারণত দেখা যায়, মায়েরা শুধু মার-পিটই করেন, সন্তানকে বুঝান না। শিশুদেরকে বসিয়ে শান্তভাবে কথা বুঝিয়ে দিতে হয়। নিজেদের কথার সাথে প্রমাণ ও বাস্তবতা দেখাতে হয়। শিশু প্রথমে কথা শুনে তারপর দিল ও দেমাগে তা মেনে নেয় এবং এক সময় সে এই শব্দগুলোই ব্যক্ত করে। বেশির ভাগ এটাই দেয়া যায় যে, শিশু যদি কোনো ভুল করে অথবা কোনো অন্যায় করে ফেলে, তখন মায়েরা এসে রাগে ফুলে-ফুঁসে দু'চার থাপ্পার বসিয়ে দেয়। তারপর নিজেই আবার বসে বসে কাঁদতে থাকে। এরকম দু'চার থাপ্পর মেরে বসে বসে কান্না করার দ্বারা কি লাভ? বরং এর চেয়ে ভালো হতো যদি সন্তানকে কাছে বসিয়ে আদর সোহাগ ও দরদ দিয়ে বুঝানো হতো এবং এটা প্রমাণ করা যেত যে, বাপ! তুমি যে কাজটি করেছ, তা অনেক মন্দ ও অন্যায় কাজ করেছ। যখন শিশুর একথা বুঝে আসবে, এমনটি করা আমার ঠিক হয়নি। আব্বু আম্মু আমার আচরণে কষ্ট পেয়েছেন, তখন ভবিষ্যতে এরকম অন্যায় থেকে সে নিজেই বিরত থাকবে। স্মরণ রাখবেন, যদি শিশুকে কোনো অন্যায়ের জন্য শাস্তি দিতেই হয়, তাহলে সে শাস্তির পরিমাণটা যেন ততটুক হয়; যতটুকু সে শাস্তি হিসাবে মেনে নেবে। তবে শাস্তিটা হালকা হতে হবে। যাতে তা শিশুর মন ভেঙ্গে যাওয়ার মতো কোনো কারণ না হয়। সঙ্কীর্ণ বা মন ছোট হওয়ার কারণও না হয়। বাচ্চাকে বুঝাতে হয় অধিক। তারপরও যদি কোনো খারাপ আচরণের জন্য সন্তানকে মায়ের শাসন করতেই হয়, তবে এটাতো সন্তানের জন্য প্রাপ্য অধিকার।

এমনিভাবে, শিশু যখন কোনো ভালো কাজ করে তখন 'শাবাশ' বলে তাকে উৎসাহ দেয়া এটাও মায়ের গুরু-দায়িত্ব। সাধারণত দেখা যায়, এমন ক্ষেত্রে মায়েরা সন্তানকে 'শাবাশ', 'বাহ বাহ' বলে উৎসাহ যোগায় না। তাকে নিয়ে কারো কাছে প্রশংসাও করে না। শিশুরা নিজেদের কৃতিত্বের প্রশংসা শুনলে খুশি হয়। নিজের ভালো কাজ দেখে আনন্দিত হয়। তাই শিশুর যে কাজ দেখে আপনার মনে হবে যে, এই কাজটি সে ভালো করেছে, তখন তার ভূয়সী প্রশংসা করবেন। তার মনকে আরো খুশিতে ভরে দেবেন। যখন সন্তানকে আপনি শাবাশি করবেন, তখন শিশুটি সেরকম ভালো কাজ আরো করতে অনুপ্রাণিত হবে। যেমন, বাড়িতে মেহমান এল, শিশু মেহমানকে গিয়ে সালাম করল। তারপর মায়ের কাছে দৌড়ে গিয়ে বলতে লাগল, আম্মু! আমি মেহমানকে সালাম করে এসেছি। তখন শিশুর এই ভালো কাজটির কথা স্মরণ করিয়ে সারা দিন বারবার বলতে থাকুন যে, 'আব্বু! তুমি আজ অনেক ভালো কাজ করেছ। আমি এতে অনেক খুশি হয়েছি।' এতে করে যেমনিভাবে শিশুর ভালো স্বভাবটি স্থায়িত্ব লাভ করবে, তেমনিভাবে সে এটাও অনুভব করবে, আমি ভালো কাজও করি। শিশু যেন এটা না ভাবে যে, মা হলো এমন মানুষ, যাকে সারাক্ষণ অন্যকে ধমকা-ধমকি আর মারপিট করার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে।

📘 সন্তান আল্লাহর ওলী হয় কীভাবে > 📄 মারধর থেকে বিরত থাকা

📄 মারধর থেকে বিরত থাকা


অবশ্যই সন্তানকে ধমক দেবেন, রাগ দেখিয়ে শাসনে রাখবেন। চেহারায় এমন ভাব দেখাবেন, যেন আপনি রাগে ফেটে পড়ছেন। তথাপি শিশুকে মারধর থেকে বিরত থাকবেন। পিটানোর দ্বারা কোনো সমাধান হয় না। বরং আমার মতে, যে লোক শিশুকে মার-ধর করে, সে যেন একথার স্বীকারোক্তি দিল, আমি সন্তানকে বুঝাতে বুঝাতে অপারগ হয়ে গিয়েছি। সন্তানকে বুঝাতে অক্ষম হয়ে পড়েছি। শিশুকে মারপিট করার অর্থ এটাই।

যখন শিশুকে শতবার বুঝানোর পরও কোনো কাজে না আসে তখনই শিশুর উপর হাত উঠান, কথা ঠিক। কিন্তু হাত উঠানোর দ্বারা শিশু তা না-মানার আরো মজবুত প্রতিজ্ঞা করে। এই জন্য শিশুকে মারপিটের পরিবর্তে বুঝানো এবং শাসনের প্রয়োজন হলে তার সীমাও ঠিক থাকা চাই। যদি কখনো কোনো মারাত্মক অপরাধ করে বসে অথবা অমার্জনীয় কোনো বেয়াদবী করে ফেলে, তবে তার জন্য তো অবশ্যই তাকে শাসন করতে হবে। এমতাবস্থায়ও যথাসম্ভব বুঝিয়ে-শুনিয়ে ফিরে আনতে চেষ্টা করবেন।

📘 সন্তান আল্লাহর ওলী হয় কীভাবে > 📄 শিশুকে ধমক ও ভয় দেখানোর ক্ষতিসমূহ

📄 শিশুকে ধমক ও ভয় দেখানোর ক্ষতিসমূহ


কখনো শিশুকে নির্দয় জালেমের মতো হুমকি-ধমকি দেবেন না। কোনো কোনো মা এমন আছেন, যারা নিজের সন্তানকে শাসন করতে, গিয়ে বাড়াবাড়ি করে ফেলেন। ভূত আসতে বলব, ঘর থেকে বের করে দেব, ওকে ডাকব, তাকে ডাকব ইত্যাদি ইত্যাদি বলে শিশুকে কখনো শাসাবেন না। কারণ, মা ভূত পেতনিকেও ডাকে না আর ঘর থেকে বেরও করে দেয় না। বরং উল্টো এরকম বানোয়াট কথা ছোটকাল থেকে শুনে শুনে শিশু মিথ্যায় অভ্যস্ত হতে থাকে। পরে নিজের আম্মুকেও মিথ্যুক মনে করতে থাকে। আপনি তো তাকে ভয় দেখাচ্ছেন। কিন্তু সে মনে মনে আপনাকে মিথ্যুক ভেবে বসে আছে। যখন একটি বিষয়ে আপনাকে সে মিথ্যুক পেয়েছে তখন সকল বিষয়ে সে আপনাকে সন্দেহ করে যাবে, আম্মু তো মিথ্যাও বলে। সুতরাং ফলাফল এই দাঁড়াল, কেমন যেন আপনি আপনার শিশুসন্তানকে মিথ্যুক বানাতে সাহায্য করলেন। এমনিভাবে আরেকটি বিষয় হলো, শিশুর সাথে কখনো মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয়া যাবে না। এতে শিশু মিথ্যা বলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে। আর এই সব মিথ্যার গুনাহ আপনার হবে। এই জন্য যদি সন্তানকে ভয় দেখাতেই হয়, তাহলে আল্লাহ তাআলার ভয় দেখাবেন। বেটা! আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন। এর দ্বারা আল্লাহ নারাজ হবেন। এভাবে, এক আল্লাহর ভয় তার দিলে বসিয়ে দেবেন। অন্য কারো ভয় দেখানোর প্রয়োজন নেই। আল্লাহ তাআলার ভয় দিলে জন্মানো এটা এত বড় নেয়ামত যে, আল্লাহকে ভয় করার ফলে শরীয়তের উপর শিশু আমল করতে শুরু করবে। আরব দেশে একথার ব্যাপক প্রচলন আছে যে, যদি শিশুকে ছোটকালে ভয় দেখানো থেকে বাঁচিয়ে রাখা যায়। (অর্থাৎ কুকুর, বিড়াল বা ভূত বলে বাচ্চাকে ভয় দেখানো না হয়) তবে সে শিশু বড় হয়ে বীর বাহাদুর হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00