📄 শিশুর মানসিকতা বুঝার চেষ্টা করা
মায়ের দায়িত্ব হলো, সন্তানের ব্যক্তিত্বের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়গুলোকে অনুধাবন করা। অতঃপর স্বামী-স্ত্রী উভয়ে মিলে শলাপরামর্শ করা যে, আমাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ কিরূপ হবে। এজন্য তার লালন-পালন কীভাবে করতে হবে। আমাদের মাশায়েখগণ তো নিজ সন্তানদের খুব তারবিয়াত করতে থাকতেন। স্মরণ রাখবেন, প্রতিটি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষের বেড়ে উঠা, বড় হওয়া এবং উন্নত মানসিকতার পেছনে বাবা-মায়ের অবদান অবশ্যই থাকে। যার ফলে সন্তান ব্যক্তিত্বসম্পন্ন বড় মানুষ হয়।
কোনো কোনো সময় শিশুকে কাঁদতে দেখা যায় এবং এমন কান্না যা দীর্ঘসময় ধরে চলতে থাকে। তখন খেয়াল করতে হবে, এই কান্নার পেছনে কি কারণ হতে পারে। কান্না অবস্থায় শিশুকে হাসিয়ে তোলা এবং বিভিন্নভাবে ভুলিয়ে ভালিয়ে মুখে হাসি ফুটানো, এটা মায়ের জন্য অনেক বড় যোগ্যতা। শিশুর প্রতিটি কাজের হেতু একমাত্র মা-ই বুঝতে পারেন। মা-ই পারবেন তার আসল রহস্য বের করতে যে, এ অবস্থায় কিরূপ কথা বলব; যার ফলে শিশু কান্না ভুলে হাসতে শুরু করবে।
আমরা অনেক দেখেছি, এক সেকেন্ডের ভেতরে শিশুর চোখে পানি এসে পড়েছে, পরক্ষণে দ্বিতীয় সেকেন্ডেই হেসে হেসে কোনো কথা শুনিয়ে দিচ্ছে। আসলে শিশুদের হাসি-কান্না এরকমই হয়। তাই কান্নারত শিশুকে কীভাবে হাসানো যায় অবশ্যই আপনাকে এ বিষয়ে ভালো অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে। ব্যাপারটি যখন আপনি ভালোভাবে আয়ত্ত করে নিতে পারবেন, তখন দেখবেন, আপনার মুখ থেকে হাসার মতো কোনো কথা বের হতেই কান্নায় কাতর শিশু ক্ষণিকের মধ্যেই হেসে-খেলে আপনার গলা জড়িয়ে ধরবে। আপনার স্নেহের চাদরে আপসে চলে আসবে।
শিশুটি যখন স্বাভাবিক হয়ে যাবে তখন সবসময় তার সাথে পর্যালোচনা করে নিবেন, বেটা! তখন যে তুমি কান্না করেছিলে তার কারণ কি ছিল? শিশুর খেয়াল ও চিন্তা চেতনা এত সীমিত যে, দেখবেন সে তখন নিজেই তার কান্নার সবগুলো কারণ একে একে বলতে শুরু করে দিয়েছে। সে এ ব্যাপারে সামান্যও চিন্তা করে না যে, আমি যে কান্নার সব ভেদ বলে দিচ্ছি আম্মু তো সব জেনে ফেলছেন। শিশু নিজেই বলে দিবে যে, আম্মু! আমি তখন এ কারণে কান্না করছিলাম এবং কোনো ভাবেই কান্না থামাতে পারছিলাম না। এতে করে এখন আপনারও জানা হয়ে গেল শিশু কি কি কারণে কান্না করতে পারে। সামনে এ ব্যাপারে আপনি অবশ্যই সতর্ক থাকবেন।
মায়েরা শিশুদের সাথে এরকম মত-বিনিময় করেন না এবং বিষয়টি নিয়ে চিন্তাও করেন না। তাদের ভেতরের কথা ও আবেগ বুঝতে চেষ্টাও করেন না। এভাবে শিশুর মানসিকতা বুঝার বিষয়টি যখন অবহেলায় থেকে যায়; দেখা যায় পরবর্তীতে আদরের শিশুটিকে কন্ট্রোল করা আর সম্ভব হয়ে ওঠে না। একটা কথা ভালো করে মনে রাখবেন, যদি আপনার সন্তানকে কোনো গুনাহ করতে বা অন্যায় করতে দেখেন বা কোনো কিছু চুরি করতেও দেখেন বা অন্য কোনো অন্যায় কাজে লিপ্ত হতে দেখেন, আর আপনি যদি ততক্ষণাত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে যান; তবুও তাকে হাতে-নাতে ধরবেন না। ব্যাস, দেখাকে দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখবেন বরং এমন ভাব নিবেন যেন আপনি দেখেনই নাই। এক পর্যায়ে শিশুটি স্থির হবে। তার চালচলন স্বাভাবিক হয়ে যাবে অর্থাৎ নিজেকে আর অপরাধী মনে করবে না, অর্থাৎ এ কথা ভাববে না যে, আমাকে তো অমুক অপরাধে হাতে-নাতে ধরা হয়েছে, কেননা যদি জায়গাতেই তাকে পাকড়াও করা হয় তবে এভাবে একদিন তার থেকে লজ্জা দূর হয়ে যাবে। সে ভাববে, আম্মু তো তখন দেখেই ফেলেছে। যেহেতু জেনেই ফেলেছে আরেকবার করে ফেলি। সুতরাং তার লজ্জাশীলতা যেন বলবৎ থাকে এদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পরে কখনো আদর সোহাগ দিয়ে বিভিন্নভাবে তাকে বুঝিয়ে দিতে হবে, ও কাজগুলো অন্যায় ছিল। ওইসব করা কখনোই ঠিক নয়। এভাবে এক সময় দেখা যাবে, শিশু নিজে নিজেই মাফ চেয়ে নিচ্ছে। এবং এক পর্যায়ে অঙ্গীকার করবে, আম্মু! আমি এরূপ আর কখনোই করব না।
📄 পিতা-মাতা সন্তানের জন্য আদর্শ
এ বিষয়টি অবশ্যই জেনে রাখবেন। আল্লাহ তাআলা প্রতিটি শিশুকে জন্মগত ভাবেই অনুকরণ প্রিয় বানিয়েছেন। শিশু তার বড়কে যা করতে দেখে হুবহু সে ঐ কাজটিই করতে উদ্ভূত হয়। সে বড়দের মতো হতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। তাই সন্তান প্রথমত তার বাবা-মাকেই অনুসরণ করে থাকে। এই জন্য মা-বাবার উচিত, তারা যেন শুধু সমালোচকই না হন, অর্থাৎ এটা কেন করলে? এভাবে করলে কেন? এটা ওইভাবে হওয়া উচিত ছিল ইত্যাদি। মোটকথা শুধু শাসাতেই না থাকা। হুমকি ধামকিতেই না রাখা, বরং সন্তানের সামনে পিতা-মাতা নিজেদেরকে আদর্শবান হিসেবে তুলে ধরা। শিশুকে হুমকি-ধামকি করার চেয়ে তার সামনে সুন্দর আদর্শ পেশ করাটাই অধিক উপকারী। শাসন তো দুনিয়ার সকল মানুষই করতে পারে, কিন্তু শিশুর জন্য নিজে পরিশুদ্ধ ও আদর্শবান হওয়া এটা কয়জন পারে। তাই বাবা-মায়ের উচিত, তারা যেন সন্তানের সামনে আদর্শ পিতা-মাতা হিসেবে জীবনযাপন করেন। তারপর দেখবেন, শিশু নিজে নিজেই মা-বাবার প্রতিটি কাজের হুবহু নকল করবে। মেয়ে তাই করবে, যা সে মাকে করতে দেখবে। ছেলেও তাই করবে, যা বাবাকে করতে দেখবে।
একবার এক ঘটনা শুনেছি আমাদের এক বন্ধুর মেয়ে খানা খাচ্ছিল। খানা খাওয়ার মাঝে পানি পান করল। কিছুটা বড় চুমুকে পান করল। এতে দম আটকে ঢেকুর উঠতে লাগল। সন্তানের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে দেখে মা তার পিঠের উপর হালকাভাবে এক দুইবার হাত মারল এবং সাথে এটাও বলতে লাগল, বেটি! আস্তে আস্তে, ধীরে ধীরে। কিছুক্ষণ পর ঠিক হয়ে গেল। অনেক দিন পর কিছু একটা পান করতে গিয়ে ওই মায়েরও একই অবস্থা হলো। আল্লাহর কি কুদরত, ঘটনাস্থলে মেয়েটি তখন মায়ের কাছেই ছিল। তখন সেই শিশুমেয়েটিও মায়ের পিঠে হাত মেরে মেরে বলতে লাগল, আম্মু! আস্তে আস্তে, ধীরে ধীরে। অর্থাৎ মেয়েটি হুবহু ঐ সকল শব্দগুলোই বলল, যা সে তার মাকে বলতে শুনেছিল।
আরেক দিনের ঘটনা, আমাদের আরেক বন্ধু যিনি সরকারি চীফ ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। তার একটা অভ্যাস ছিল, যখনই কোনো ফোন আসত রিসিভ করেই বলতেন, (chief engineer is speaking) চিফ ইঞ্জিনিয়ার বলছি। অর্থাৎ তার অধিকাংশ ফোন অফিসিয়াল সংক্রান্ত থাকতো। তাই তিনি সহজ পরিচয়ের জন্য এই শব্দই ব্যবহার করতেন। তিনি তার একদিনের ঘটনা শোনালেন, একবার আমি গোসল সেরে বের হয়ে দেখলাম, ফোনে রিং বাজছে। আমার তিন চার বছরের ছেলেটি সে দৌড়ে ওই ফোনের দিকে গিয়েই ফোনটা উঠাল এবং উঠিয়ে কানে লাগাতেই বলতে লাগল, 'চীফ ইঞ্জিনিয়ার বলছি'। এখানে লক্ষ করুন, ছেলেটি এই শব্দগুলোর অর্থও জানে না, কিন্তু সে ঐ কথাই বলছিল, যা সে তার বাবাকে বলতে শুনেছে।
এ ঘটনা শোনানোর উদ্দেশ্য হলো এ কথা বুঝানো, সন্তান সর্বদা মা-বাবার আচরণের কপি করে। এখন যদি মা বাবা বলে যে, আমাদের যা খুশি এ জীবনে আমরা তাই করব, কিন্তু সন্তান ভালো ও সৎ হোক; এটা কখনোই হতে পারে না। উভয়টি একবারে বিপরীত জিনিস। অবশ্য মা-বাবা যদি আদর্শবান হন। বরণীয়, অনুসরণীয় হন তাহলে সন্তান খুব সহজেই তাদের অনুসরণকারী হবে।
কিন্তু যদি মা-বাবা এ ব্যাপারে উদাসীন থাকেন, আর এই ভেবে সুধারণা করে বসে থাকেন যে, সন্তান অনেক বড় হবে এবং অনেক নেককার হবে। এরকম ভাবা একেবারেই অর্থহীন। যার সাথে বাস্তবতার কোনোই মিল নেই। এমনটা কখনো হয়নি, হতে পারেও না। এ জন্য সন্তানের সুন্দর লালন-পালনের জন্য বাবা-মাকে প্রথমে 'আমলী নমুনা' তথা বাস্তব নমুনা হওয়া আবশ্যক।
📄 সন্তানকে অধিক বুঝাতে হবে
সাধারণত দেখা যায়, মায়েরা শুধু মার-পিটই করেন, সন্তানকে বুঝান না। শিশুদেরকে বসিয়ে শান্তভাবে কথা বুঝিয়ে দিতে হয়। নিজেদের কথার সাথে প্রমাণ ও বাস্তবতা দেখাতে হয়। শিশু প্রথমে কথা শুনে তারপর দিল ও দেমাগে তা মেনে নেয় এবং এক সময় সে এই শব্দগুলোই ব্যক্ত করে। বেশির ভাগ এটাই দেয়া যায় যে, শিশু যদি কোনো ভুল করে অথবা কোনো অন্যায় করে ফেলে, তখন মায়েরা এসে রাগে ফুলে-ফুঁসে দু'চার থাপ্পার বসিয়ে দেয়। তারপর নিজেই আবার বসে বসে কাঁদতে থাকে। এরকম দু'চার থাপ্পর মেরে বসে বসে কান্না করার দ্বারা কি লাভ? বরং এর চেয়ে ভালো হতো যদি সন্তানকে কাছে বসিয়ে আদর সোহাগ ও দরদ দিয়ে বুঝানো হতো এবং এটা প্রমাণ করা যেত যে, বাপ! তুমি যে কাজটি করেছ, তা অনেক মন্দ ও অন্যায় কাজ করেছ। যখন শিশুর একথা বুঝে আসবে, এমনটি করা আমার ঠিক হয়নি। আব্বু আম্মু আমার আচরণে কষ্ট পেয়েছেন, তখন ভবিষ্যতে এরকম অন্যায় থেকে সে নিজেই বিরত থাকবে। স্মরণ রাখবেন, যদি শিশুকে কোনো অন্যায়ের জন্য শাস্তি দিতেই হয়, তাহলে সে শাস্তির পরিমাণটা যেন ততটুক হয়; যতটুকু সে শাস্তি হিসাবে মেনে নেবে। তবে শাস্তিটা হালকা হতে হবে। যাতে তা শিশুর মন ভেঙ্গে যাওয়ার মতো কোনো কারণ না হয়। সঙ্কীর্ণ বা মন ছোট হওয়ার কারণও না হয়। বাচ্চাকে বুঝাতে হয় অধিক। তারপরও যদি কোনো খারাপ আচরণের জন্য সন্তানকে মায়ের শাসন করতেই হয়, তবে এটাতো সন্তানের জন্য প্রাপ্য অধিকার।
এমনিভাবে, শিশু যখন কোনো ভালো কাজ করে তখন 'শাবাশ' বলে তাকে উৎসাহ দেয়া এটাও মায়ের গুরু-দায়িত্ব। সাধারণত দেখা যায়, এমন ক্ষেত্রে মায়েরা সন্তানকে 'শাবাশ', 'বাহ বাহ' বলে উৎসাহ যোগায় না। তাকে নিয়ে কারো কাছে প্রশংসাও করে না। শিশুরা নিজেদের কৃতিত্বের প্রশংসা শুনলে খুশি হয়। নিজের ভালো কাজ দেখে আনন্দিত হয়। তাই শিশুর যে কাজ দেখে আপনার মনে হবে যে, এই কাজটি সে ভালো করেছে, তখন তার ভূয়সী প্রশংসা করবেন। তার মনকে আরো খুশিতে ভরে দেবেন। যখন সন্তানকে আপনি শাবাশি করবেন, তখন শিশুটি সেরকম ভালো কাজ আরো করতে অনুপ্রাণিত হবে। যেমন, বাড়িতে মেহমান এল, শিশু মেহমানকে গিয়ে সালাম করল। তারপর মায়ের কাছে দৌড়ে গিয়ে বলতে লাগল, আম্মু! আমি মেহমানকে সালাম করে এসেছি। তখন শিশুর এই ভালো কাজটির কথা স্মরণ করিয়ে সারা দিন বারবার বলতে থাকুন যে, 'আব্বু! তুমি আজ অনেক ভালো কাজ করেছ। আমি এতে অনেক খুশি হয়েছি।' এতে করে যেমনিভাবে শিশুর ভালো স্বভাবটি স্থায়িত্ব লাভ করবে, তেমনিভাবে সে এটাও অনুভব করবে, আমি ভালো কাজও করি। শিশু যেন এটা না ভাবে যে, মা হলো এমন মানুষ, যাকে সারাক্ষণ অন্যকে ধমকা-ধমকি আর মারপিট করার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে।
📄 মারধর থেকে বিরত থাকা
অবশ্যই সন্তানকে ধমক দেবেন, রাগ দেখিয়ে শাসনে রাখবেন। চেহারায় এমন ভাব দেখাবেন, যেন আপনি রাগে ফেটে পড়ছেন। তথাপি শিশুকে মারধর থেকে বিরত থাকবেন। পিটানোর দ্বারা কোনো সমাধান হয় না। বরং আমার মতে, যে লোক শিশুকে মার-ধর করে, সে যেন একথার স্বীকারোক্তি দিল, আমি সন্তানকে বুঝাতে বুঝাতে অপারগ হয়ে গিয়েছি। সন্তানকে বুঝাতে অক্ষম হয়ে পড়েছি। শিশুকে মারপিট করার অর্থ এটাই।
যখন শিশুকে শতবার বুঝানোর পরও কোনো কাজে না আসে তখনই শিশুর উপর হাত উঠান, কথা ঠিক। কিন্তু হাত উঠানোর দ্বারা শিশু তা না-মানার আরো মজবুত প্রতিজ্ঞা করে। এই জন্য শিশুকে মারপিটের পরিবর্তে বুঝানো এবং শাসনের প্রয়োজন হলে তার সীমাও ঠিক থাকা চাই। যদি কখনো কোনো মারাত্মক অপরাধ করে বসে অথবা অমার্জনীয় কোনো বেয়াদবী করে ফেলে, তবে তার জন্য তো অবশ্যই তাকে শাসন করতে হবে। এমতাবস্থায়ও যথাসম্ভব বুঝিয়ে-শুনিয়ে ফিরে আনতে চেষ্টা করবেন।