📘 সন্তান আল্লাহর ওলী হয় কীভাবে > 📄 শিশু রাগী কেনো হয়?

📄 শিশু রাগী কেনো হয়?


এ কথাও স্মরণ রাখতে হবে, যখন শিশু তার চাহিদা মোতাবেক কোনো জিনিসই পাবে না। তার ব্যাপারে কোনো গুরুত্ব কারো মাঝে সে দেখবে না, তখন শিশু জিদ ধরে কেঁদে কেঁদে তার কথা ও দাবির গুরুত্বকে তুলে ধরার চেষ্টা করবে। এভাবে শিশুর মাঝে স্বভাবগত একটি চাহিদা সৃষ্টি হয়। আর তা হলো, 'সে তার গুরুত্ব চায়।' যদি শিশুকে অবজ্ঞা করা শুরু হয়, তবে শিশুটি হয়তো কান্না করাকেই সর্বশেষ উপায় হিসেবে বেছে নেবে। না হয় জিদ ধরবে অথবা হুকুমটি অমান্য করে বসবে। আর বাস্তবে যে করেই হোক সে আপনার থেকে তার গুরুত্বের দাবি করে যাবে। মাকে এ ব্যাপারটি বুঝার চেষ্টা করতে হবে। যদি শিশুকে আপনি গুরুত্ব দেন তাহলে শিশু রাগ করবে না, বরং দ্রুত হুকুম পালন করে দেখাবে। শিশুর কাজে বা ইচ্ছা পূরণে যখন কোনো বাধা আসে এবং কঠিন ধর-পাকড়ের মাঝে পড়ে, তখনই শিশুর রাগ উঠে। প্রতিটি মায়ের কর্তব্য হলো, তিনি যেন শিশুর ব্যক্তিগত বিষয়গুলো নিয়ে বিশ্লেষণ করেন।

স্মরণ রাখবেন, প্রতিটি শিশু ভিন্ন ভিন্ন মন-মানসিকতা নিয়ে দুনিয়াতে আসে। জরুরি নয় যে, একই মা-বাবার থেকে যত সন্তানাদি জন্মগ্রহণ করবে তারা সকলেই সমান যোগ্যতা সম্পন্ন হবে। বরং কোনো শিশুর মধ্যে অযোগ্যতা ও মুর্খতা প্রবল থাকে, কারো মধ্যে লজ্জাশীলতা বেশি, আবার কারো মধ্যে বীরত্ব ও সাহসিকতা বেশি থাকে, তেমনই কারো মধ্যে জিদ এবং অভিমান বেশি থাকে। একেক শিশু একেক স্বভাবজাতে তৈরি হয়।

📘 সন্তান আল্লাহর ওলী হয় কীভাবে > 📄 শিশুর ব্যক্তিত্ব বুঝার উপায়

📄 শিশুর ব্যক্তিত্ব বুঝার উপায়


মায়ের জন্য উচিত, তিনি শিশুর ব্যক্তিত্ব বুঝার চেষ্টা করবেন। শিশুর ব্যক্তিত্ব বুঝার তিনটি উপায় :

প্রথমত, মাকে এ ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে যে, যখন আমি শিশুকে কোনো কাজ করতে বলি, তখন তার মানসিক অবস্থা এবং চেহারার অবস্থা কিরূপ হয়। কখনো দেখা যাবে 'হুকুম' সাথে সাথেই মেনে নেয়। আবার কখনো দেখা যাবে, আদেশ মানছে না। অমান্য করছে। বিষয়টি মাকে সর্বদা খেয়াল রাখতে হবে। সুতরাং যখন এরকম খেয়াল রাখা হবে, তো এক সময় তিনি বুঝে যাবেন যে, আমি আমার কোন বাচ্চাকে কি ভাবে মানুষ করব। এভাবে একটু সজাগ দৃষ্টির মাধ্যমে শিশুর ব্যক্তিত্ব বুঝার উপায় বের করা যাবে।

দ্বিতীয়ত, যদি কোনো শিশু খারাপ কথা বা আচরণ করে ফেলে, তো পরবর্তীতে যখন ভালোবাসা বা আদর সোহাগের সময় উপস্থিত হয়, তখন সে বাচ্চাটি যে নাকি এক সময় রাগ করেছিল, হুকুম অমান্য করেছিল এবং স্নেহময়ী মায়ের হাতে চরও খেয়েছিল; অল্প কিছু সময় পরই খানা খাওয়ার সময় আম্মুর সাথে সুন্দর ব্যবহার করে। মিষ্টি মধুর আলাপ করে। আপনি যখন এরকম দেখবেন, সে সময় আপনি তাকে কিছু প্রশ্ন করবেন, বেটা! তুমি এমনটা তখন কেন করেছিলে? তোমার মনে কি চিন্তা ছিল? এভাবে মা শিশুটিকে কিছু প্রশ্ন করবেন। এরূপ জিজ্ঞাসার ফলে শিশুর মানসিক অবস্থাটা সামনে আসবে। এটা শিশুর মানসিক রুচিবোধ বুঝার দ্বিতীয় আরেকটি প্রদ্ধতি।

তৃতীয়ত, শিশুর সাথে আচরণ করা হবে, সে যেরূপ ব্যবহারের উপযুক্ত। শিশুর কাছ থেকে জেনে নিবেন, বেটা! একটা কথা বলো, যখন আমি তোমাকে কোনো কথা বলি এবং তুমি তা মাথা পেতে মেনে নাও এতে আমি খুবই খুশি হই, কিন্তু কখনো কখনো কিছু হুকুম যা তুমি মানো না। এর কারণ কি? এতে কি তুমি কোনো কষ্টবোধ করো? এভাবে সন্তানের কাছ থেকে মাশওয়ারাহ চাইবেন। তখন দেখবেন, সন্তান জবাব দিবে যে, এই এই কারণে আমি আপনার কথা মান্য করতে পারিনি। এবং নিজে নিজেই তখন অনুতপ্ত হবে।

মোটকথা তিন জিনিসের মাধ্যমে শিশুর ব্যক্তিত্ব ও মানসিকতা বুঝে আসে।
(১) সজাগ ও সচেতন তত্বাবধান,
(২) বিভিন্ন বিষয় জিজ্ঞাসার মাধ্যমে,
(৩) এবং শিশুর সাথে পরামর্শের মাধ্যমে।

📘 সন্তান আল্লাহর ওলী হয় কীভাবে > 📄 শিশুর মানসিকতা বুঝার চেষ্টা করা

📄 শিশুর মানসিকতা বুঝার চেষ্টা করা


মায়ের দায়িত্ব হলো, সন্তানের ব্যক্তিত্বের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়গুলোকে অনুধাবন করা। অতঃপর স্বামী-স্ত্রী উভয়ে মিলে শলাপরামর্শ করা যে, আমাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ কিরূপ হবে। এজন্য তার লালন-পালন কীভাবে করতে হবে। আমাদের মাশায়েখগণ তো নিজ সন্তানদের খুব তারবিয়াত করতে থাকতেন। স্মরণ রাখবেন, প্রতিটি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষের বেড়ে উঠা, বড় হওয়া এবং উন্নত মানসিকতার পেছনে বাবা-মায়ের অবদান অবশ্যই থাকে। যার ফলে সন্তান ব্যক্তিত্বসম্পন্ন বড় মানুষ হয়।

কোনো কোনো সময় শিশুকে কাঁদতে দেখা যায় এবং এমন কান্না যা দীর্ঘসময় ধরে চলতে থাকে। তখন খেয়াল করতে হবে, এই কান্নার পেছনে কি কারণ হতে পারে। কান্না অবস্থায় শিশুকে হাসিয়ে তোলা এবং বিভিন্নভাবে ভুলিয়ে ভালিয়ে মুখে হাসি ফুটানো, এটা মায়ের জন্য অনেক বড় যোগ্যতা। শিশুর প্রতিটি কাজের হেতু একমাত্র মা-ই বুঝতে পারেন। মা-ই পারবেন তার আসল রহস্য বের করতে যে, এ অবস্থায় কিরূপ কথা বলব; যার ফলে শিশু কান্না ভুলে হাসতে শুরু করবে।

আমরা অনেক দেখেছি, এক সেকেন্ডের ভেতরে শিশুর চোখে পানি এসে পড়েছে, পরক্ষণে দ্বিতীয় সেকেন্ডেই হেসে হেসে কোনো কথা শুনিয়ে দিচ্ছে। আসলে শিশুদের হাসি-কান্না এরকমই হয়। তাই কান্নারত শিশুকে কীভাবে হাসানো যায় অবশ্যই আপনাকে এ বিষয়ে ভালো অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে। ব্যাপারটি যখন আপনি ভালোভাবে আয়ত্ত করে নিতে পারবেন, তখন দেখবেন, আপনার মুখ থেকে হাসার মতো কোনো কথা বের হতেই কান্নায় কাতর শিশু ক্ষণিকের মধ্যেই হেসে-খেলে আপনার গলা জড়িয়ে ধরবে। আপনার স্নেহের চাদরে আপসে চলে আসবে।

শিশুটি যখন স্বাভাবিক হয়ে যাবে তখন সবসময় তার সাথে পর্যালোচনা করে নিবেন, বেটা! তখন যে তুমি কান্না করেছিলে তার কারণ কি ছিল? শিশুর খেয়াল ও চিন্তা চেতনা এত সীমিত যে, দেখবেন সে তখন নিজেই তার কান্নার সবগুলো কারণ একে একে বলতে শুরু করে দিয়েছে। সে এ ব্যাপারে সামান্যও চিন্তা করে না যে, আমি যে কান্নার সব ভেদ বলে দিচ্ছি আম্মু তো সব জেনে ফেলছেন। শিশু নিজেই বলে দিবে যে, আম্মু! আমি তখন এ কারণে কান্না করছিলাম এবং কোনো ভাবেই কান্না থামাতে পারছিলাম না। এতে করে এখন আপনারও জানা হয়ে গেল শিশু কি কি কারণে কান্না করতে পারে। সামনে এ ব্যাপারে আপনি অবশ্যই সতর্ক থাকবেন।

মায়েরা শিশুদের সাথে এরকম মত-বিনিময় করেন না এবং বিষয়টি নিয়ে চিন্তাও করেন না। তাদের ভেতরের কথা ও আবেগ বুঝতে চেষ্টাও করেন না। এভাবে শিশুর মানসিকতা বুঝার বিষয়টি যখন অবহেলায় থেকে যায়; দেখা যায় পরবর্তীতে আদরের শিশুটিকে কন্ট্রোল করা আর সম্ভব হয়ে ওঠে না। একটা কথা ভালো করে মনে রাখবেন, যদি আপনার সন্তানকে কোনো গুনাহ করতে বা অন্যায় করতে দেখেন বা কোনো কিছু চুরি করতেও দেখেন বা অন্য কোনো অন্যায় কাজে লিপ্ত হতে দেখেন, আর আপনি যদি ততক্ষণাত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে যান; তবুও তাকে হাতে-নাতে ধরবেন না। ব্যাস, দেখাকে দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখবেন বরং এমন ভাব নিবেন যেন আপনি দেখেনই নাই। এক পর্যায়ে শিশুটি স্থির হবে। তার চালচলন স্বাভাবিক হয়ে যাবে অর্থাৎ নিজেকে আর অপরাধী মনে করবে না, অর্থাৎ এ কথা ভাববে না যে, আমাকে তো অমুক অপরাধে হাতে-নাতে ধরা হয়েছে, কেননা যদি জায়গাতেই তাকে পাকড়াও করা হয় তবে এভাবে একদিন তার থেকে লজ্জা দূর হয়ে যাবে। সে ভাববে, আম্মু তো তখন দেখেই ফেলেছে। যেহেতু জেনেই ফেলেছে আরেকবার করে ফেলি। সুতরাং তার লজ্জাশীলতা যেন বলবৎ থাকে এদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পরে কখনো আদর সোহাগ দিয়ে বিভিন্নভাবে তাকে বুঝিয়ে দিতে হবে, ও কাজগুলো অন্যায় ছিল। ওইসব করা কখনোই ঠিক নয়। এভাবে এক সময় দেখা যাবে, শিশু নিজে নিজেই মাফ চেয়ে নিচ্ছে। এবং এক পর্যায়ে অঙ্গীকার করবে, আম্মু! আমি এরূপ আর কখনোই করব না।

📘 সন্তান আল্লাহর ওলী হয় কীভাবে > 📄 পিতা-মাতা সন্তানের জন্য আদর্শ

📄 পিতা-মাতা সন্তানের জন্য আদর্শ


এ বিষয়টি অবশ্যই জেনে রাখবেন। আল্লাহ তাআলা প্রতিটি শিশুকে জন্মগত ভাবেই অনুকরণ প্রিয় বানিয়েছেন। শিশু তার বড়কে যা করতে দেখে হুবহু সে ঐ কাজটিই করতে উদ্ভূত হয়। সে বড়দের মতো হতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। তাই সন্তান প্রথমত তার বাবা-মাকেই অনুসরণ করে থাকে। এই জন্য মা-বাবার উচিত, তারা যেন শুধু সমালোচকই না হন, অর্থাৎ এটা কেন করলে? এভাবে করলে কেন? এটা ওইভাবে হওয়া উচিত ছিল ইত্যাদি। মোটকথা শুধু শাসাতেই না থাকা। হুমকি ধামকিতেই না রাখা, বরং সন্তানের সামনে পিতা-মাতা নিজেদেরকে আদর্শবান হিসেবে তুলে ধরা। শিশুকে হুমকি-ধামকি করার চেয়ে তার সামনে সুন্দর আদর্শ পেশ করাটাই অধিক উপকারী। শাসন তো দুনিয়ার সকল মানুষই করতে পারে, কিন্তু শিশুর জন্য নিজে পরিশুদ্ধ ও আদর্শবান হওয়া এটা কয়জন পারে। তাই বাবা-মায়ের উচিত, তারা যেন সন্তানের সামনে আদর্শ পিতা-মাতা হিসেবে জীবনযাপন করেন। তারপর দেখবেন, শিশু নিজে নিজেই মা-বাবার প্রতিটি কাজের হুবহু নকল করবে। মেয়ে তাই করবে, যা সে মাকে করতে দেখবে। ছেলেও তাই করবে, যা বাবাকে করতে দেখবে।

একবার এক ঘটনা শুনেছি আমাদের এক বন্ধুর মেয়ে খানা খাচ্ছিল। খানা খাওয়ার মাঝে পানি পান করল। কিছুটা বড় চুমুকে পান করল। এতে দম আটকে ঢেকুর উঠতে লাগল। সন্তানের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে দেখে মা তার পিঠের উপর হালকাভাবে এক দুইবার হাত মারল এবং সাথে এটাও বলতে লাগল, বেটি! আস্তে আস্তে, ধীরে ধীরে। কিছুক্ষণ পর ঠিক হয়ে গেল। অনেক দিন পর কিছু একটা পান করতে গিয়ে ওই মায়েরও একই অবস্থা হলো। আল্লাহর কি কুদরত, ঘটনাস্থলে মেয়েটি তখন মায়ের কাছেই ছিল। তখন সেই শিশুমেয়েটিও মায়ের পিঠে হাত মেরে মেরে বলতে লাগল, আম্মু! আস্তে আস্তে, ধীরে ধীরে। অর্থাৎ মেয়েটি হুবহু ঐ সকল শব্দগুলোই বলল, যা সে তার মাকে বলতে শুনেছিল।

আরেক দিনের ঘটনা, আমাদের আরেক বন্ধু যিনি সরকারি চীফ ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। তার একটা অভ্যাস ছিল, যখনই কোনো ফোন আসত রিসিভ করেই বলতেন, (chief engineer is speaking) চিফ ইঞ্জিনিয়ার বলছি। অর্থাৎ তার অধিকাংশ ফোন অফিসিয়াল সংক্রান্ত থাকতো। তাই তিনি সহজ পরিচয়ের জন্য এই শব্দই ব্যবহার করতেন। তিনি তার একদিনের ঘটনা শোনালেন, একবার আমি গোসল সেরে বের হয়ে দেখলাম, ফোনে রিং বাজছে। আমার তিন চার বছরের ছেলেটি সে দৌড়ে ওই ফোনের দিকে গিয়েই ফোনটা উঠাল এবং উঠিয়ে কানে লাগাতেই বলতে লাগল, 'চীফ ইঞ্জিনিয়ার বলছি'। এখানে লক্ষ করুন, ছেলেটি এই শব্দগুলোর অর্থও জানে না, কিন্তু সে ঐ কথাই বলছিল, যা সে তার বাবাকে বলতে শুনেছে।

এ ঘটনা শোনানোর উদ্দেশ্য হলো এ কথা বুঝানো, সন্তান সর্বদা মা-বাবার আচরণের কপি করে। এখন যদি মা বাবা বলে যে, আমাদের যা খুশি এ জীবনে আমরা তাই করব, কিন্তু সন্তান ভালো ও সৎ হোক; এটা কখনোই হতে পারে না। উভয়টি একবারে বিপরীত জিনিস। অবশ্য মা-বাবা যদি আদর্শবান হন। বরণীয়, অনুসরণীয় হন তাহলে সন্তান খুব সহজেই তাদের অনুসরণকারী হবে।

কিন্তু যদি মা-বাবা এ ব্যাপারে উদাসীন থাকেন, আর এই ভেবে সুধারণা করে বসে থাকেন যে, সন্তান অনেক বড় হবে এবং অনেক নেককার হবে। এরকম ভাবা একেবারেই অর্থহীন। যার সাথে বাস্তবতার কোনোই মিল নেই। এমনটা কখনো হয়নি, হতে পারেও না। এ জন্য সন্তানের সুন্দর লালন-পালনের জন্য বাবা-মাকে প্রথমে 'আমলী নমুনা' তথা বাস্তব নমুনা হওয়া আবশ্যক।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00